দিনাজপুর ও নেতাজীর অন্তর্ধানের এক অজানা ইতিহাস

কৌশিক বিশ্বাস on

দুইজন দুই সময়কালের হলেও তাঁদের মধ্যে এক সাদৃশ্য আছে- দু’জনেরই মৃত্যুরহস্য ঘিরে বিরাট কৌতুহল ও পরবর্তীতে জল্পনা৷ আক্ষেপের বিষয় এই যে এই দু’জনের সামগ্রিক জীবনের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। একজন সুভাষ বোস আরেকজন চৈতন্যদেব। ইতিহাস আলোচনা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ইতিহাসের গুরুত্ব আজ সর্বজন স্বীকৃত। ইতিহাসের সামগ্রিক মূল্যায়নের ভিত্তিপ্রস্তর এই ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি, তা প্রবাহমান হয়ে নির্ধারণ করে ইতিহাসের গতিপথ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বাংলা যদি একটি উল্লেখযোগ্য স্থান হয় তবে নেতাজী অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। অবিভক্ত বাংলার একটি সমৃদ্ধশালী জনপদ দিনাজপুর জেলা। স্বাধীনতা আন্দোলনে এই জেলার ভূমিকা সম্পর্কে প্রায় সকলেই অবহিত ; কিন্তু কতটা যোগ ছিল এই জেলার সাথে নেতাজীর? উত্তর -নিবিড় যোগ ছিল।

১৯২২ সালে বন্যা কবলিত দিনাজপুরে ত্রান দিতে এসেছিলেন যুবক সুভাষ। বর্তমান দিনাজপুরের হিলি সহ গোটা এলাকা জুড়ে অগনিত মানুষকে ত্রান-সাহায্য দিয়েছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের নির্দেশে যে রিলিফ কমিটি গঠিত হয়েছিল তার সম্পাদক মনোনীত হয়েছিলেন সুভাষ চন্দ্র আর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন তার সভাপতি। ১৯২৮ সালে সুভাষ কলিকাতা থেকে ট্রেনে করে এসে নামলেন হিলি স্টেশনে। স্থানীয় কংগ্রেস নেতা প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন স্টেশনে, তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য৷ উপস্থিত জনগনের আকুল অভ্যর্থনায় ভেসে যান সুভাষ। হিলি স্টেশন তখন মুখরিত বন্দেমাতরম ধ্বনিতে। হিলির বারোয়ারী তলায় তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেবার পর; তিনি ঘুরে দেখেন সারদা ভবন পাঠাগার। পাঠাগার দর্শনের পর মুগ্ধ হয়ে তিনি ভিজিটর’স বুকে লিখেছিলেন তার প্রশংসাসূচক মন্তব্য। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুসারে তিনি উপস্থিত হলেন পত্নীতলার সভাস্থলে। অগনিত মানুষ অপেক্ষায় ছিল জননেতার ভাষণের জন্য। ঠিক ছিল প্রথমে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার কর্মপন্থা ঠিক করা হবে, তারপর হবে কংগ্রেসের সাধারণ সভা৷ কিন্তু শেষ অবধি সেই সভা বাতিল হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন তাঁদের প্রিয় নেতার সামনে। দেশমাতৃকার পরাধীনতার জ্বালা তাদের কাছে অনাহারের জ্বালা অপেক্ষা বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। অগত্যা কংগ্রেসের সেই সভা হয়েছিল পরেরদিন একই স্থানে। সেইসময় তিনি বালুরঘাটে কংগ্রেস ভবনের উদ্বোধন করেছিলেন। সেই অনুসারে সংলগ্ন পাড়ার নাম হয়েছিল লোকমুখে কংগ্রেস পাড়া। সেই নাম আজও বর্তমান। এই দিনাজপুরের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন নিশীথনাথ কুন্ডু; তাঁর সাথে নেতাজীর নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

.

১৯৪১ সালে নেতাজী নিজবাড়িতে অন্তরীণ অবস্থায় তাঁর অন্তর্ধানের পরিকল্পনা করেছিলেন। দেশের বাইরের সাথেসাথে দেশের ভেতরেও সমআন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন দেশের ভিতর এই কাজ কংগ্রেস ছাড়া কেউ করতে পারবে না। টেলিগ্রাম করলেন দিনাজপুরের নিশীথনাথ কুন্ডুকে। নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন কালবিলম্ব না করে তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে এসে দেখা করেন। কিঞ্চিৎ দেরি হওয়ায় সেই সময় তিনি হেমন্ত সরকারকে পাঠিয়েছিলেন দিনাজপুরে নিশীথবাবুকে কলিকাতায় তাঁর কাছে নিয়ে যাবার জন্য৷ অবশেষে তারা মিলিত হয়েছিলেন নেতাজীর বাসভবনে। সেখানে নিশীথবাবুকে তিনি শুধু কংগ্রেসে ফিরে যাবার নির্দেশ দিয়ে তাঁর পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। তাঁর দাদা শরৎ বসু তখন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি। তাঁকেও তিনি নিশীথবাবুর উপর থেকে বহিষ্কার তুলে নেবার নির্দেশ দিলেন। ব্যস, বাকিটা আজ ইতিহাসের পাতায়। সেটাই ছিল দিনাজপুরের প্রবাদপ্রতিম কংগ্রেস নেতা নিশীথনাথ কুন্ডুর সাথে নেতাজীর শেষ সাক্ষাৎ। দেশভাগের পর নিশীথবাবু বর্তমান উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে চলে আসেন এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রথম ত্রানমন্ত্রী হয়েছিলেন। নেতাজীর বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের শাখা ছিল হিলিতে। এছাড়াও যে পথ দিয়ে আই,এন,এ কলিকাতা দিয়ে উত্তর ও মধ্য ভারতে ঢোকার পরিকল্পনা ছিল তার একটা রুট ছিল এই ঢাকা, বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই আই,এন,এ অগ্রসর হলে তার প্রভাব এসে পৌঁছাত এই জেলাতেও। এভাবেই এই জেলার সাথে গড়ে উঠেছিল নেতাজীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যা আজ ইতিহাসের অজানা ফলকে মোড়া।

***উত্তরবঙ্গ সংবাদে প্রকাশিত।

কপিরাইট : লেখক।



কৌশিক বিশ্বাস

তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।