ছেলেবেলার খেলা

সবিতা বিশ্বাস on

“ঘুঘু সই

তোর পুত কই

হাটে গেছে

কি কিনতে

খই মুড়ি কিনতে

খই মুড়ি কই

তালগাছে

কে খাবে

সোনা খাবে

এই সর্ সর্

তালগাছ পড়ল

ধপ্ ধপ্ ধপাস”

জীবনের প্রথম খেলাটি ছিল এই ঘুঘু সই খেলা | বেশ সুর করে ছড়াটা বলতে হতো | এটা সাধারণত ঠাকুরমা দিদুনদের সাথে নাতি নাতনিরা খেলে | কিন্তু আমার খেলার সাথি ছিল আমার মাসি | চোখ বুজলে এখনো দেখতে পাই বেশ বড় হয়েও মাসির হাঁটুর উপরে বসে আছি | মাসি বেশ কষ্ট করেই আমাকে নামাচ্ছে, “ এই তালগাছ পড়ল ধপ্ ধপ্ ধপাস”|

আর একটু বড় হয়ে খেলেছি “ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি”| চার পাঁচজন বন্ধু মিলে হাত পেতে মুখে ছড়া কেটে এই খেলাটা খেলতে হতো | এটা মেয়েরাই খেলতো | কখনো কখনো ছোটো ভাই যোগ দিত |

ছোটবেলার খেলাগুলোর সঙ্গে কম বেশি ছড়ার যোগ ছিল | বেশ একটা ছন্দময়তা | যেমন এই ইকড়ি মিকড়ি খেলাটা, “ইকড়ি মিকড়ি চাম চিকড়ি/ চাম কাটে মজুমদার /ধেয়ে এলো দামোদর/দামোদরের হাঁড়িকুড়ি /দুয়ারে বসে চাল কুড়ি/ চাল কুড়তে হল বেলা/ ভাত খেয়ে যাও দুপুরবেলা/ভাতে পড়ল মাছি/ কোদাল দিয়ে চাঁছি/কোদাল হল ভোঁতা/ খা শিয়ালের মাথা”|

খেলেছি পাঁচ গুটি খেলা | পাঁচটা পাথরের বা ইটের টুকরো নিয়ে খেলতে হতো | এর সাথেও একটা সুন্দর ছড়া ছিল “তেলোটা কামিনী /গুটিকে যামিনী —

চুটিয়ে খেলেছি “রুমাল চুরি”| খেলতাম ছেলে মেয়ে সবাই মিলে | গোল হয়ে বসে থাকতাম সবাই | চোর টুক করে কোনো একজনের পিছনে রুমাল রেখে যেত | সে টের না পেলে একপাক ঘুরে এসে তার পিঠে জোরে একটা কিল মারতো | যে মার খেত সে হতো চোর | লিখতে বসে কতো খেলার কথাই যে মনে পড়ছে, কিতকিত, এক্কাদোক্কা, খেটে, গাদি | তবে যে খেলাগুলোতে শারীরিক শক্তি লাগে সেগুলো থেকে দূরে থাকতাম | যেমন গাদি খেলা |

কিন্তু পুতুল খেলেছি জমিয়ে | আর বায়না করেছি তার থেকেও বেশি | মাঝে মাঝেই পুতুলের বিয়ে দিতাম, সে বিয়ের সব দায় দায়িত্ব পড়ত মাসির ঘাড়ে | বাবার ধুতি ছিঁড়ে নীলের গুটি দিয়ে ( তখন উজালা ছিল না, নীলের গুটি পাওয়া যেত | সেটা কাপড়ের টুকরোয় বেঁধে জলে গুলে কাপড় ফর্সা করতে হতো |) সরু পাড় করে নিপুণ হাতে ভাঁজ করে মাসি দেশলাইয়ের বাক্সে ভরে দিত | এইভাবে মায়ের শাড়ি দিয়ে তৈরি হতো পুতুল কনের কাপড় | পুতুল ছিল মাটির | তার গলায় হার, কানে দুল সব থাকতো | রান্না হয়ে গেলে রোদে শুকানো মাটির পুতুল উনুনে দিয়ে পোড়ানো হতো | কখনো,কখনো দুম করে ফেটেও যেত |

সব থেকে আনন্দের ব্যাপার বিয়ে উপলক্ষে নেমন্তন্ন খাওয়া | ছোট্ট ছোট্ট লুচি আর সিংহী মশাইয়ের দোকানের বোঁদে |  আর বিয়ে উপলক্ষে গাওয়া হত গান – “হলুদ কুটি চিঁড়া কুটি / আজ পুতুলের বিয়ে/পুতুলকে নিয়ে যাবে/ ঢাকে বাড়ি দিয়ে/পিসি কাঁদে মাসি কাঁদে/ কাঁদে মেয়ের মা /হুলো বেড়াল কেঁদে মরে/ ঢোক গেলে না |”

আর একটা খেলা ভাই, বোন, বন্ধু সবাই মিলে খেলতাম | “ইচিং বিচিং”| “ইচিং বিচিং চিচিং চা/প্রজাপতি উড়ে যা |”দুজন খেলুড়ের দুই পা, চার হাতের বিঘত উচ্চতা লাফাতে হত | হাত স্পর্শ করলেই প্রজাপতি মারা যেত |

আরো একটা খেলা খুব খেলেছি “ লাফ দড়ি “| যেটাকে স্কিপিং বলা হয় | তখন গরু বাঁধার দড়ি বা হাতে পাকানো দড়ির দুই পাশে গিঁট বেঁধে খেলা হত | স্কুলে এটা স্পোর্টসের অন্তর্গত ছিল | কবে যে এটা উঠে গেল!

খেলেছি” সিঁদুর ঠোকাঠুকি” , “পাতা লুকানো” , “নাম দেশ ফুল ফল”,”ফুল টোক্কা”,”লুকোচুরি”, “রস কষ সিঙারা বুলবুলি মস্তক, কুমীর ডাঙা”,| বেশ বড় হয়েও খেলেছি “চোর ডাকাত পুলিশ”,| লুডু খেলেছি কত | তবে লুডুতে আমার পরের ভাই কান্টি করতো, তাই রাগ করে দান ছেড়ে উঠে যেতাম |

কিন্তু রান্নাবাটি খেলাতে ছিল আমার আধিপত্য | চড়ুইভাতিতেও | সত্যিকারের ভাত রান্না করতাম | একটু তলাটা ধরে গেলেও সে ছিল অমৃত |

আমার দুই ভাই খুব খেলতো ডাংগুলি, মার্বেল গুলি, লাট্টু লেত্তি | মার্বেল গুলিতে ওদের পকেট ঝনঝন করতো | আর ছিল গুলতি | পাখি দেখলেই টিপ |

“ওপেন টি বাইস্কোপ/নাইন টেন টেলিস্কোপ/ সুলতানা বিবিয়ানা/ সাহেব বাবুর বৈঠকখানা/ সাহেব বলেছে যেতে/ পান সুপারি খেতে/ পানের আগায় মরিচ বাটা/ স্প্রিং এর চাবি আঁটা/ যার নাম মনিমালা/ তাকে দেব মুক্তার মালা”|

এই খেলাটা ছড়া কেটে খেলতাম | আহা কি দারুন মজার সে দিনগুলো |

আমাদের সময়ে কখনো বিষন্নতা গ্রাস করতো না আমাদের | সব সময়ই হৈ হুল্লোড় মজা | তার মধ্যেই চলত পড়াশোনা | সে এক আশ্চর্য্য জগৎ ছিল আমাদের |এই ভাব এই আড়ি | এটাও একটা খেলা ছিল | “ আড়ি আড়ি আড়ি /পরশু যাবো বাড়ি / তরশু যাবো ঘর / হনুমানের লেজ ধরে টানাটানি কর |”

কিন্তু আমি আড়ি দিতে চাই না, তাই “ভাব ভাব ভাব/ খাও কচি ডাব/ “ছেলেবেলার খেলা”/ আজ তবে এইটুকু থাক”|



সবিতা বিশ্বাস

লেখিকা সবিতা বিশ্বাসের জন্ম ১৯৫৭ সালের ১৯ শে জানুয়ারী উত্তর ২৪পরগণার ঠাকুরনগরে | পড়াশোনা এম.এস সি.(অঙ্ক) | পেশাগত জীবনে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের কঠিন দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সাহিত্য সেবা করে গেছেন নিষ্ঠার সাথে | সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তার অনায়াস বিচরণ | ছোটদের জন্য লেখা গল্পগ্রন্থ “আহ্লাদী”, “জারোয়াদের দেশে পিকু”,”মঙ্গলদ্বীপের মংলু” এবং ছড়ার বই “ইন্তি বিন্তি” পাঠকের প্রশংসা পেয়েছে | এ যাবৎ প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আট | মানব মনের গলি ঘুঁজি আলো অন্ধকার চমত্কার ভাবে ফুটে উঠেছে গল্পগ্রন্থ “আত্মজা” তে | প্রতিবাদে কবিতা কবিতায় প্রতিবাদ | সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ “আমি আমানত আমি দামিনী”| এবং শুভ নববর্ষে প্রকাশিত ছড়াক্কা সংকলন- “ছড়াক্কায় প্রেম প্রেমে ছড়াক্কা” | প্রকাশিত হয়েছে আঞ্চলিক ভাষার আবৃত্তির কবিতা “মাধব লুটুর বিটি”র | লেখিকা শুধুমাত্র লেখার জগতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি একজন সফল নাট্যকার ও পরিচালক | এ পর্যন্ত পনেরোটি মঞ্চসফল নাটক তার ঝুলিতে | নিজেও সুঅভিনেত্রী | কলতান সংস্কৃতিক সংস্থার (৩০ তম বর্ষ) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক | কলতানের তিরিশতম রবীন্দ্র প্রণামে প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকা “কলতান” | সম্পাদনা করেছেন লেখিকা | কলম ধরেছেন প্রতিষ্ঠিত লেখকের পাশাপাশি কলতানের সদ্যসরা | নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করাই কলতানের মূল উদ্দেশ্য | সমাজসেবা তার নেশা | ভারতীয় রেড ক্রশ সোসাইটির আজীবন সদস্য | তিনি এপার ওপার দুই বাংলার বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে ( কিশোর ভারতী,তিতলি,দোলনা,বিহানবেলা,আলোর ফুলকি, ক্রান্তিক, শাব্দিক, চুনুমুনু, সম্পর্কের শিকড়,গৃহশোভা,আনন্দধারা,ছোটদের রূপকথা,ইত্যাদি) নিয়মিত লিখে চলেছেন | লেখার জন্য পুরস্কার ও পেয়েছেন অজস্র | তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য “বার্তা সাহিত্য সম্মান” (সেরা গল্পকার),”ফুলকুঁড়ি কিশোর সাহিত্য সম্মান”, “কবি অরুন দত্ত স্মৃতি সাহিত্য সম্মান”,”কবি তরুণ সান্যাল স্মৃতি পুরস্কার”, “দোলনা সাহিত্য সম্মান” ইত্যাদি |

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।