ঘরে ফেরার নাম ভালো থাকা

কৌশিকরঞ্জন খাঁ on

শহরের আড্ডাগুলোর অসুখ করেছে। পরিত্যক্ত ফলের ঝুড়ির মতো পড়ে রয়েছে আড্ডার অতীত গায়ে মেখে মোড়গুলো। সেখানে কথারা বৃষ্টি হয়ে নামে না বহুদিন। এখন বাইরের জগৎ বলতে খোলা ছাদ। কর্মক্ষেত্র বলতে বেশ কিছু টবের গাছ। যত্নে যত্নে সেগুলো কবে যেন গান গাইতে শুরু করেছে। অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে। একটা ঘন সবুজ রঙ স্থায়ী হয়ে বসছে টবগুলোর ওপরে। মাঝে মাঝে ফুল ফুটছে খুব। মৌমাছি, বোলতা আরও নাম জানা পতঙ্গের আনাগোনা বেড়েছে। চুটিয়ে পরাগ সংযোগ হচ্ছে আর নতুন নতুন বীজ হওয়ার খবর কাগজের হেডলাইন হচ্ছে।

জরুরী কাজে বাইরে বেরিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছে বন্ধুর কথা। একটু ঘুরে এলেও তো হয় তার বাড়ির সামনে থেকে। হয়তো দেখা যাবে তার একরত্তি মেয়েটা বারান্দায় গ্রীলের পাহারায় বসে একা একা পুতুল খেলছে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে যদি লুকিয়ে তার আত্মমগ্ন সংলাপ শোনা যায় কিছুক্ষণ! অনেকরকম বেয়ারা ইচ্ছে পেরে ফেলতে চাইছে ক্রমশ।

স্তব্ধ গলিটায় ঢুকে মনে হবে ভুল করে ফেলেছি। মনে হবে প্রাচীনকালে এখানে সভ্যতা ছিলো। অনেক মানুষ দেখা যেত বাড়িগুলোর জানালায়। কাউকে কাউকে হেঁটে আসতে দেখা যেত। এখন শুধু ছাদগুলোর তারে কাপড় ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। কারা যেন কয়েক শতাব্দী আগে সেগুলো রোদে মেলে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেছে। লক ডাউন শেষে কোনও এক বিকেলে কাপড়গুলো ওঠানো হবে। তখন বড়ো রাস্তার মোড়ের লন্ড্রিটার ঝাঁপ খোলা হবে। বহুদিন ইস্ত্রি করতে না পারা লন্ড্রিওয়ালা দোমড়ানো মোচড়ানো কাপড় দেখে ঝাপিয়ে পড়বে ইস্ত্রি হাতে।

মুখে ফেসিয়াল মাস্ক দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কুকুরটা মুখ তুলে দায়সারা ভাবে তাকিয়ে আবার মুখ গুঁজে দেবে ঘুমের কাছে। এখন ফেসিয়াল মাস্ক পরা মানুষ তার কাছে স্বাভাবিক। মাস্ক না পরা মানুষ দেখলেই তার তেড়ে যেতে ইচ্ছে করে।

বন্ধুর বাড়ির সামনে এসে সে ভাববে জোড় গলায় ডাকবে নাকি কলিংবেলের সুইচ টিপবে! হঠাৎ নজর যাবে দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুর দিকে। চেনা যাচ্ছে না। কাঁচাপাকা চুলগুলো বড়ো হয়েছে। মুখের দাড়িও বেশ বড়ো হওয়ায় উস্কোখুস্কো দেখাচ্ছে। বন্ধু আকাশে ভেসে থাকা পাতলা একটা মেঘের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পরিশ্রান্ত হয়ে নীচে তাকিয়ে দেখেই তার চোখে এক ঝলক হাসি খেলে যাবে। আরে! কখন এলি? ভেতরে আয়।

লক ডাউন চলছে। দুম করে কি আর কারো বাড়ির ভেতরে ঢোকা যায়! কাজেই বলতে হবে – না না। এখন না। এখন এমনিই দেখা করে গেলাম। বাড়ির সবাই ভালো তো? মেয়ে?

কাছে এসেও কাছে যাওয়া যাবে না। সময়ের নিদান এমনই। ফিরে যেতে হবে। এখন সকাল এগারোটা। রাস্তায় জবাবদিহি করতে হবে না। এর পরে অনেক হ্যাপা। পুলিশের চোখ এড়িয়ে নির্বিঘ্নে বাসায় ফেরা মুশকিল হবে। যাক!  বাড়ি যখন ফিরতেই হবে রোজকার  আড্ডার জায়গাটা একবার দেখে গেলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

চৌমাথার মোড়ের সেই জায়গাটায় কারা যেন বসে আছে। দু একটা বাইক ডাবল স্ট্যান্ড করা। হ্যা। ঐ তো অনুপ বসে আছে। হাতে সিগারেট। পুস্কি, জয়ন্ত, বরুণ। সবাই হাজির। একটু দূরে রক্তিম অমিত। সম্ভবত নাটক নিয়ে কিছু বলছে। নীহার সন্দীপন এলেই তো নাটক কনভার্ট হবে রাজনীতিতে। রক্তিম রীতিমত হল্লা বাঁধিয়ে ছাড়বে। ক্যাপিটালিজম ভার্সেস স্যোসালিজম হবে। প্রসেনিয়াম থিয়েটার ভার্সেস গ্রুপ থিয়েটার হবে। সন্দীপন বলবে, ওসব ছাড়! বাড়ি গিয়ে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় পাতার সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের গল্পটা পড়ে দ্যাখ। আহা! কি লিখেছেন! মন ছুঁয়ে গেল। এরই মাঝে সঞ্জয় স্কুটি নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে বলবে, তোদের চা হয়ে গেছে? আমি খেয়ে আসবো?

তাপসের চায়ের দোকানের সামনেও ভীড়। কয়েকজন দাঁড়িয়ে চায়ের গ্লাস হাতে। এসময় ঠেক থেকে যতই চায়ের অর্ডার যাক না কেন, তাপস শুনতে পাবে না। দোকানে অন্য কাস্টমার থাকলে তাপস শুনতে পায়না। কিছুক্ষণ পর ভীড় পাতলা হলে নিজেই চেঁচিয়ে বলবে— কয়টা হবে রে? কুকুরগুলো ল্যাজ নাচিয়ে নাচিয়ে হাফসে যাবেনা যতক্ষণ না ভাঙা বিস্কুটের টুকরোটা ছুড়ে দেওয়া হবে। কয়েকদিন আগে মোড়ের জনপ্রিয় কুকুর ‘শিডো’ পাশের মোড়ের রকির সাথে বাওয়াল করতে গিয়ে ব্যাপক ঝাড় খেয়েছিল। চোখটা ফুলে দগদগে ঘা হয়ে আছে। মিনি এই সময় রোজ সিঙারার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক পুরে খাওয়াবার চেষ্টা করবে।

জায়গাটায় এসে দাঁড়াতেই মরিচিকার মতো আড্ডাটা উবে যাবে। কেউ কোথাও নেই। অন্য সময়ের জমজমাট রাস্তাটা ফাঁকা মাঠ মনে হবে। নিস্তব্ধতায় ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনে হবে একটা বিরাটাকায় অজগর রিক্ততার নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে এগিয়ে আসছে। সেটা বোধহয়। চৌরাস্তার মোড় সমেত আড্ডা, আড্ডায় চলতে থাকা তর্ক বিতর্ক সব কিছুকেই গ্রাস করে নেবে। আসলে সেটা অজগর নয়, একটা মহামারী। রাস্তার ভীড়ে, মানুষের ঘামের গন্ধে, তার ক্ষুধা বাড়ে।

ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে শরীরের ভেতরে একটা হিম স্রোত বয়ে যাবে। একটা মৃত্যু মৃত্যু গন্ধ মাথার উপরের গাছ থেকে ঝুলে আছে আড্ডার জায়গাটায়। মানুষ নেই, বন্ধু নেই, স্বজন নেই। রাস্তায় থাকা মানেই একটা মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। কেউ তো কোথাও নেই। তবে আমি কেন দাঁড়িয়ে আছি মহামারীর জাঁদরেল শিকার হতে! এখন ঘরে ফেরাই ভালো। আবার একদিন জমিয়ে আড্ডা মারতে আজকে অন্তত ঘরে ফিরতেই হবে।



কৌশিকরঞ্জন খাঁ

১৯৭৭ সালে জন্ম। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর । সব রকম গদ্য লিখলেও ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখতে বেশি পচ্ছন্দ করেন। আনন্দবাজার, নন্দন, কথাসাহিত্য, শিলাদিত্য, তথ্যকেন্দ্র, উত্তরভাষা, মোহিনী তে লেখা ছাপা হয়।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।