লাগলো যে দোল

কৌশিকরঞ্জন খাঁ on

দোল আর হোলি , এই নিয়েই তো রঙের উৎসব। আসলে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এই উৎসব। প্রিয়জনদের খুশি দেখতে চায় মানুষ। তাই তাকে নিজের হাতে রাঙিয়ে দিতে চা রাধাকৃষ্ণকে আবির নিবেদন করে পালিত হয় দোল আর রাজা হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকার আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকেই হোলি। হোলিকা উপর আশীর্বাদ ছিলো সে কখনো আগুনে দগ্ধ হবে না। তাই হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে হত্যা করতে হোলিকাকে নির্দেশ দেন– প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করতে। আরাধ্যের আশীর্বাদে প্রহ্লাদ রক্ষা পায় কিন্তু হোলিকাই দগ্ধ হয়ে মারা যায়। এই ঘটনা থেকেই অশুভ শক্তির বিনাশের আকাঙ্ক্ষায় হোলি উৎসবের সুচনা।সারা ভারতে হোলির সাথে বড়ু চন্ডীদাস জয়দেবের বাংলায় দোল পালিত হয়।এই বিশ্বাসেই রং এর উৎসবে মেতে ওঠে প্রান্ত মফস্বল বালুরঘাট। রঙের উৎসব এর প্রথম দিনটি দোল। পূর্নিমার এই দিনটি  রাধাকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে বিশেষ দিন। সকালের দিকে কত যে কীর্তনের দল আগে নগর পরিক্রমায় বেরোতো  সংকীর্তন গাইতে গাইতে! খোল করতাল নিয়ে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা বাতাসে গোলাপি আবির ছড়িয়ে দিতেন গানে গানে। হোলি আসার কিছুদিন আগে থেকেই কুলিকামিনদের মহল্লাও জমে উঠত। বালুরঘাট বাস স্ট্যান্ড এলাকার পশ্চিমা কুলিরা প্রচন্ড পরিশ্রমের পর সন্ধ্যাবেলায় ছা রা রা গানে মেতে  উঠতেন হোলি আসার কিছুদিন আগে থেকেই। হোলির গানে তাদের ঠেক জমজমাট হয়ে উঠতো।খেটে খাওয়া মানুষগুলো ইয়ার বন্ধু নিয়ে হোলির দিনে দিল খুলে আনন্দ করতেন।স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এই একটি দিন অবাধ হওয়ার ছাড় পেত। দল বেধে বন্ধুরা সাইকেল চালিয়ে কোচিং এর বান্ধবীর বাড়িতে হাজির হতো। খুব “ফেমাস” রাও এদিন ধরা দিত রঙের টানে। হুড়োহুড়ি করে এক চোট রং খেলার পর থালায় করে রসগোল্লা নিয়ে আসতো পরম স্নেহে ফেমাস বান্ধবীটির মা। এ যেন নন্দগাঁও থেকে তরুনের দলের বর্ষাণা গাঁয়ের গোপিনীদের রং দিতে আসা যা  ‘লাঠমার হোলি’ নামে বিখ্যাত। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে।কিছু বছর আগে দোলের দিনে বালুরঘাটের একটি পরিচিত দৃশ্য ছিলো – বিকেলবেলা পাড়ার এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে মাথায় লাল ওড়নার ঘোমটা টেনে রাধাকৃষ্ণ সাজতো।শিশু কৃষ্ণটি বাড়ির উঠোনে এসে এক পা দিয়ে আরেক পা পেঁচিয়ে বাঁশি ঠোঁটে তুলে নিয়ে দাঁড়াতো।  তাকে ঘিরে রাধা ও তাঁর সখীরা নেচে নেচে গান করতো। নাচ ও গান শেষে তারা একটা আবির ছড়ানো থালা বাড়িয়ে ধরতো। তাতেই জমা পড়তো ভালোবাসার খুচরো পয়সা। সেই পয়সায়  বিস্কুট, চানাচুর, আর লজেন্স কিনে
তারা মজা করে খেতো।রাস্তার মোড়ে মোড়ে একাল ও সেকাল জুড়ে অস্থায়ী বিপনি বসছে। তখন কেবল রং সাজানো থাকতো ছোট ছোট ব্যাগে, কিছু প্যাকেট আবির আর হাজারপাউরির শিশিও থাকতো। আর ঝুলতো পিচকারি। সেই সব অস্থায়ী দোকানে বাবার সাথে দোকানে আসতো তার বাচ্চা ছেলেটিও। সকাল থেকে বাবার সাথে বসে থাকতো দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়া পর্যন্ত। এখন শুধু পিচকারি নয়। রঙের দোকানে ঝোলে হরেক মুখোশ, রঙিন পরচুল, টুপি। খোলা আবিরের সাথে ভেষজ আবির।দিন বদলে কীর্তনীয়ারা পাড়ি দিয়েছে কোন দূর দেশে কে জানে! নগরসংকীর্তনের দলগুলো বিলুপ্তির পথে। পাড়ার রাধাকৃষ্ণ আর আসে না বাড়ির উঠোনে। আসবে কি এখন তো উঠোনটাই নেই। রাধাকৃষ্ণদেরও কম্পিউটার ক্লাস, আবৃত্তির ক্লাস থাকে। বন্ধুদের সাথে মেশার সুযোগ কোথায়? গড়েই ওঠেনা পাড়ার বন্ধুত্ব। অবসর নেই। সামান্য সময় পেলে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঘরেই কেটে যায়। ভার্চুয়াল বন্ধুর সাথেই মোবাইলের স্ক্রিনে আঙ্গুল রেখেই দোল বা হোলি পার হয়ে যায়। তাই বন্ধুর রঙ গায়ে উঠে আসে না, মোবাইল স্ক্রিনেই ভেসে বেড়ায়।।তবে এখন তো বিজ্ঞাপনের যুগ। তাই নাচের স্কুলগুলোর দায়িত্ব থেকে যায় এইদিন রাস্তায় নামার। হলুদ কিংবা বাসন্তী রঙের শাড়িতে সেজে রাস্তা দিয়ে ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’  গাইতে গাইতে তারা চলে। যে নাচের স্কুলের দল যত বড় তার স্ট্রেংথ তত বেশি। বাচ্চারা আগে আগে নাচতে নাচতে আবির ছড়ায় বাতাসে। বাবামায়ের দল মোবাইল বাগিয়ে তা ক্যাপচার করতে করতে তৃপ্তির হাসি গড়িয়ে এগিয়ে চলেন। সিলেক্টেড ফটো–ভিডিও আপলোড হয় সোস্যাল মিডিয়ায়। কখনো প্রভাত ফেরীর ফেসবুক লাইভ হয়। তবুও ছড়ানো আবিরে রাস্তা রাঙিয়ে উঠলে কার না ভালো লাগে? কালো পিচের রাস্তায় লুটিয়ে পরা লাল হলুদ সবুজ বেগুনী আবিরের রংবাহারে মেতে ওঠে শহর।কিন্তু সকাল গড়িয়ে দিন যখন দুপুরে যায় কি জানি কেন একটা অলিখিত বনধ এর মতো গুমোট হয়ে আসে মফস্বলের জনজীবন। শুনশান রাস্তায় চলে বাইক বাহিনীর দাপট। পৈশাচিক উল্লাসে হঠাৎ হঠাৎ খান খান হয়ে যায় ফাগের দুপুরের নিস্তব্ধতা।রূপোলী বা সোনালী বার্নিশে আদুল গায়ে লিকলিকে ছেলেরা হুশহাশ বেরিয়ে যায়। ভীড় জমে ফরেন লিকারের অন শপে। দোলের যে শান্ত–স্নিগ্ধ রূপ নিয়ে এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে তা কিভাবে যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে! বাঙালির দোল বদলে যাচ্ছে লাগামহীনতার হোলি তে।বস্তি এলাকায় কারা যেন চুল্লু খেয়ে ঝামেলা বাঁধায়। দিন বিকেলে গড়ালে কেউ কেউ রাস্তা ছেড়ে ঘরে যেতে পারে না। নেশাতুর আর রঙিন হয়ে পরে থাকে রাস্তায়, মাঠেঘাটে, আনাচকানাচে। কোনো একটা গাছের ডালে ডালে ঝুলতে থাকে রং খেলার পর ছেড়াফাটা বাতিল জামাকাপড় হুজ্জতির দৃষ্টান্ত হয়ে। আর এলাকার কোনো কুকুর জোর করে মাখানো গায়ের রঙ নিয়েই ইতিউতি খাবার খুঁজে চলে।আগে অনেক পুকুরঘাট ছিলো। রংখেলা শেষে পুকুরের ঘাট রঙিন হয়ে উঠতো। নদীর ঘাটে ঘাটেও স্নান ও রং তোলার ধূম পড়ে যেত। এখন তো সেই সব পুকুরগুলো চুরি হয়ে গেছে। পাড়ার সর্বজনীন টিউবওয়েল পারটিও নেই আর। থাকলেও অব্যবহারে টিউবওয়েল দিয়ে জল পরে না। তাই বাড়ি বাড়ির বাথরুম থেকে রঙের রেখা এসে মিশে যায় নর্দমায়। বহুজনের রঙ মিশে যায় শহরের নর্দমায়। রাস্তায় পড়ে থাকা আবির ফিকে হয়ে যায় ফেসবুকে রংমাখা মুখের ডিপিগুলো বদলে যাওয়ার সাথে সাথে। তবুও একটা রঙের রেশ থেকেই যায় আত্রেয়ীর জলে আগামী দোল পর্যন্ত।
…………………………………………………..

কৌশিকরঞ্জন খাঁ

১৯৭৭ সালে জন্ম। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর । সব রকম গদ্য লিখলেও ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখতে বেশি পচ্ছন্দ করেন। আনন্দবাজার, নন্দন, কথাসাহিত্য, শিলাদিত্য, তথ্যকেন্দ্র, উত্তরভাষা, মোহিনী তে লেখা ছাপা হয়।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।