ঝরাপাতা

তিস্তা চক্রবর্তী on

“ঝরাপাতা গো, ঝরাপাতা আমি তোমারই দলে, ঝরাপাতা …”

গুনগুন করে গাইত মা,ভরসন্ধের উঠোনে বিছিয়ে পড়ে থাকা শুকনো খসখসে নির্জীব পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে।খুব যে সুরে গাইত তা যদিও নয়! তবু কিছু বেসুরো কলি আমাদের নিভাঁজ পরিপাটি জীবনের চৌহদ্দিতে এতোলবেতোল হাওয়া ডেকে আনতো প্রায়শই।আমরা পড়া ফেলে হাঁ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

গান শুনতে শুনতে ঝিমুনি আসতো।চটাস করে আওয়াজ তুলে মশা মারতে মারতে ঠাকুমা হাঁক দিত, “আইজ তো বড়পোলা আইবো, রান্ধাবাড়া নাই তরার!গান শুইন্যা প্যাট ভরব? “

গান শুনে পেট ভরে না।আর ভরে না বলেই পাতাঝরা উঠোন পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাবা দূরের কোন স্টেশনে পাড়ি দেয় প্রতি সোমবার, কাকডাকা ভোরে। আজ শনিবার।হেঁশেল থেকে গোবিন্দভোগ চালের গন্ধ ভেসে আসছে।আলুসেদ্ধ আর কাঁচালঙ্কা সাথে।

কতদিন মাংস খাই না।বাবাকে বলব?না থাক।

গরাস পাকিয়ে মা মুখে ভরে দেয় ভাতের দলা।ঢুলি আর গিলি। আর তখনই ঠাকুমার নাকডাকার আওয়াজ ছাপিয়ে ঝরাপাতায় কার পায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।চেনা গলার ডাকে ঘুম ছুটে যায় …”বিলু, অ বিলু, ঘুমাইলা নাহি!দ্যাহো তোমার লাহান কি আনসি!”

একটা দম দেওয়া গাড়ি চেয়েছিলাম। মেলায় দেখে লোভ হয়েছিল খুব।বাবা বলেছিল, “জিলাপি খাবা, জিলাপি?নকল গাড়িঘুড়ায় চাপন যায় না।ল্যাহাপড়া কইর‌্যা একখান মস্ত গাড়ি কিনবা, আসল।”

জলভরা চোখে জিলিপির রসমাখা আঙুল চেটেছিলাম অনেকক্ষণ।

পাতাঝরার মরশুম ফের আসন্ন।কান পেতে থাকি, যদি খসখস মচমচ আওয়াজ তুলে কেউ চেনা নামে ডাক দেয়! মস্ত গাড়ির গম্ভীর চালক ঠিক তখনই দরজায় টোকা দেয়, “স্যার, বেরোবেন তো?”

মুচকি হেসে তাকে অবাক করে দিয়ে বলি, “জিলিপি খাবে, জিলিপি?”


তিস্তা চক্রবর্তী

জন্মঃ হাওড়ার আন্দুলে। বর্তমানে গড়িয়ায় বসবাস। শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজিতে এম.এ (২০০৪) পেশাঃ স্কুল শিক্ষিকা লেখালেখি শুরু লিটল ম্যাগাজিনের হাত ধরে। 'উৎসব ','সাপলুডো ','অপদার্থের আদ্যক্ষর' ইত্যাদি ম্যাগাজিনের পাশাপাশি 'নতুন কৃত্তিবাস ' ও 'দেশ ' পত্রিকাতে কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

2 Comments

কমল সরকার · ফেব্রুয়ারী 23, 2019 at 4:02 অপরাহ্ন

দারুণ লাগল। মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা। আগেও পড়েছিলাম বোধহয়।

Nrishandu naskar · ফেব্রুয়ারী 28, 2019 at 2:23 অপরাহ্ন

Khub bhalo laglo

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।