গান শুধু চিরদিন থাকে…

মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া on

গড়পড়তা বাঙালির যেমন আচমকাই পদ‍্য লেখার বাতিক গজায়,আমারও তাই।গড়পড়তা
বাঙালি মেয়ে ছোট থাকতে ফি রোববার খাতা হাতে গান দিদিমণির বাড়িমুখো হয়,আমিও
তেমন।এই যেমন ভোরবেলা ঘুম চোখে চেনা কিছু বন্দিশ আর জাগো মোহন প‍্যারে…,অথবা
পঁচিশে বৈশাখ শুভ্র নব শঙ্খ তব…আর অগাস্টের পনেরোই ,নীলশাদা ইউনিফর্ম আর
অবাধ্য ব‍্যলেরিনায় গেমটিচারের কড়া মার্চপাস্ট।তখন পতাকা থেকে গোলাপ-টগরের
পাপড়ি ঝরে পড়ে নীল রিবনে বাঁধা “বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি” গানের সিঁথিতেই।
একটু বড় হয়ে পাড়ার ক্লাবের বড় দাদা দিদিদের সঙ্গে জুটে “মিথ্যা কথায় আগুন যে
জ্বলে না…পশুরা কখনো স্বপ্নই দেখে না…”গণসঙ্গীতের এসব তোলপাড় খুব কিছু না
বুঝেই কিশোরী বুকে তার স্বপ্নের উত্তাপ ভরে শুধু গানের হাত ধরেই হেঁটে যাওয়া সেই
কৃষ্ণচূড়ার রাস্তা…।
ততদিনে গানের তিনক্লাস পরীক্ষা দিয়েই আমার সামনে মাধ্যমিক!অতএব গানের
খাতা তাকে তুলে, হারমোনিয়াম, গিটার খাটের নিচে ঢুকিয়ে শুধু কেবল বাড়ি-স্কুল-কোচিং।
তখন পুজোর পরপরই বিকেলের গোড়ায় ঝুপঝুপ সন্ধে নামতো,আর শ্রীকান্ত
স‍্যারের কেমিস্ট্রি বা জ‍্যোতিস‍্যারের ফিজিক্স কোচিং থেকে ফিরতি পথে বল্লীর
বিলের সামনে সাইকেল থামাতাম আমরা।এতক্ষণ ক‍্যাল ক‍্যাল করতে করতে আসছিল
যেসব বন্ধুরা ফালতু কথাতেই যত হা হা হি হি,আবছায়া বিকেলে বিলের সেই নিঝুম একলার
সামনে ওরাও কেমন শান্ত হয়ে আসত।
ঋতা “হিমের রাতে ঐ গগনের” বা কাকলি কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে” ধরলে
দেখতে পেতাম সেই সব সুর,মন কেমন করা এক আলোর সঙ্গে মিশে ধান ক্ষেতের ওপর
থোকা থোকা কুয়াশার হয়ে জমে যাচ্ছে।
সেই গান,কবিতা, গিটারের সুর,গণসঙ্গীতের সেই উত্তাল বোকা মফস্বলে ফেলে রেখে
পড়তে এলাম মহানগরে আর আধা গ্ৰামীন ছটফটে আমার চোখের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ল
তারা এমন, কোনওদিনও জাগবে না যেন আর।
ছোট ছিলাম তখন আর বোকা ছিলাম বলেই হয়তো ভাবতাম মানুষের কথা ভাবিনাতো
আর স্বার্থপর হয়ে গেছি নেহাতই, তাই আলোর পথযাত্রী বা ডিঙ্গা ভাসাও এর মতো

গানগুলি আনমনে গুনগুন করলেও কেমন অপরাধবোধে থেমে যেতাম যখন নাগরিক
সভ‍্যতা পেঁচিয়ে ধরছে আমায়, ঘাড় মুচড়ে গিলছে একটু একটু করে,ভারি মেডিকেল
বুকসে চাপা পড়ে যাচ্ছে আমার নিঝুম সন্ধ্যার কী যেন কাকলি ,আমি নিজেই তা হতে
দিচ্ছি যেন নিজেরই স্বেচ্ছা নির্বাসনে নিবে আসছে আগুন প্রতিরোধের আর বোবা হচ্ছে
ঢেউয়ের তলোয়ার।
ভেবেছিলাম আর কখনোই গানের মুখোমুখি আমায় হতে হবে না।সন্ধেতারার পারে
হারিয়ে গেছে যে পথ তাকে খুঁজতে কান পেতে আর থাকবোনা ঝরা পাতার মর্মরে কিন্তু
সোজাসুজি রেললাইনের মতো চলে নাতো জীবন।কখনো কখনো সাঁতার শেখার মতনই জল
খাবলে খাবলে পায়ের নিচের মাটিও খুঁজে পাওয়া যায় না যখন, অথবা চারদিকেই জ্বলছে
আগুনের বেড়ি,তেতে উঠছে জতুগৃহ যেন,হলকা লাগছে এমনই, তখন
খাতা খুলে কাটাকুটিভরা এক কলি চেনা সুরের ওপর উপুড় হচ্ছি যেন ওই ছোট্ট লাইনদ ছায়া
পেতেছে খাতায়,…গান শুধু চিরদিন থাকে ।কেন লিখেছি এ লাইন?কোথায় আছে সে আমার?কেন
সন্ধেবেলা কাজ থেকে ফিরে স্নান করে একখানা চন্দন ধুপ জ্বেলে চুপ করে বসেছি আর সি
ডি থেকে নেমে আসছে শান্ত জলোচ্ছ্বাস।গীতসুধারসে,স্নেহ সুধা রসে আমাকে জড়িয়ে
নিচ্ছে অখন্ড গীতবিতান।কপালে র চুল বেয়ে একফোঁটা জল নেমে এসে বলছে শান্তি।সব
অস্থিরতা চন্দনগন্ধ ব‍্যথার সুরে জড়িয়ে মড়িয়ে ধুপের ধোঁয়ার সাথে মিশে বলছে
শান্তি।আমার ভেতর ঘরে সেই যে ঘুমিয়ে পড়া গান শীতল জলের ছায়া কলস পেতে দিচ্ছে
আমারই বুকভর্তি তেষ্টার সামনে।তার হাত ধরেই আম ভ্রান্ত সন্ধ্যার বাইরে এসে
দাঁড়াচ্ছি আরও একবার।
আবার দ‍্যাখো বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিনের মতো গান সন্তাপ আনে এতখানিই,চামড়ার
নীচে পাতলা কাঁচের মতো পরতে পরতে জমে যায় সব অনুভব আর তানপুরোর তারের মতোই
টানটান হয়ে ওঠে স্নায়ু যেন ছুঁয়ে দিলেই বেজে উঠবে ঝনঝন জোছনার রুপো তার।সে সব ঘুম
না আসা রাতে জানলা দিয়ে দেখি পাঁচিলের ওপাশে হেলাফেলায় বেড়ে ওঠা যজ্ঞিডুমুড়ের গাছ
ঝমঝম করছে চাঁদের আলোয়..তারও তবে আলোর পানে প্রাণের চলা?
সেদিন বর্ষাশেষে মাঠ পেরোতে গিয়ে দেখি ,ঝকমকে সবুজ পশমে বোনা দূরের কিনারে
সটান ঋজু গাছের নীচে পুরনো একখানা ল‍্যান্ডস্কেপের মতো একলা দুপুর টাঙানো।আর
হঠাৎই তার মধ্যে সালংকারা গান এসে দাঁড়ালো যখন মনে এলো,”হেথায় তরুতৃণ যত/মাটির
বাঁশি হতে ওঠে গানের মতো…”।মেঠো বাঁশির ধূলোকুটো মাখা সে গান শুধু সুর ভুলে ঘুরে ঘুরে
বেড়ায় কোথায় আমিতো জানি নে।

থেকে থেকে ডেকে ওঠে অচেনা এক পাখি।ডাকেই কেবল।সে কি গায়?সেতো জানেই না সে
গায়! উসুমকুসুম রোদে গা মেলে ঘাড় ফুলিয়ে সঙ্গীকে কাছে ডাকা, আদর জানানো, খাবার
খুঁটে কিচিমিচি লালচে হাঁ-এর মধ্যে গুঁজে দেওয়া,ঝড়ে বাসা ভেঙে গেলে মরা বাচ্চা ঘিরে
করুণ স্বরে ডাকাডাকি,এসব কি তার গান?প্রকৃতির কাছে সে পেয়েছে এক আশ্চর্য
সুর,তাই পাখি যাই করে, সবই গান হয়ে ওঠে।আমার কাছেতো অমন করে ধরা দেয় না
সুর।কন্ঠস্বরের ওই ম‍্যাজিক আমার নেই।সারাদিন ঘরে বাইরে ছাপোষা এক মানুষ আমি
গান থেকে,কতো কতো দূরে যাই রোজ।ট্রফি হাতে ব‍্যস্ত জীবনের সরু টানেল ধরে কেবলই
লম্বা দৌড়।অন্ধকারে ছোট্ট একটা বিন্দুর মতো সে কি জ্বলে? তাকে কেন্দ্র করেই কি
তবে ঘুরে ঘুরে মরি অথবা বেঁচেও উঠি একদিন, মরতে পারি না বলেই?কাজে অকাজে
নিরন্তর এই ঘুরে মরাও গান তাহলে? শোনে কেউ?
চৌরাশিয়ার বাঁশি শুনতে বসি যখন, মনে হয় যেন রঙ।ধুপের ধোঁয়ার মতো রঙের ঢেউ
উঠছে পাক খেয়ে খেয়ে।আবছা অবয়ব ফুটে উঠে উঠে আবার ছড়িয়ে যাচ্ছে গড়িয়ে
যাচ্ছে,মিলিয়েও যাচ্ছে গভীর আনন্দ আবার অতখনিই বিষাদে।ঢেকে যাচ্ছে রঙ ফের নতুন
করে ঢেউ এসে পড়ছে শূন্যের কিনার ঘেঁষে।
তার মধ‍্যিখানে দাঁড়ালে টনটন করে বুক,কেননা আমি ছুঁতে পারছিনা ওই ফাঁকা হয়ে
যাওয়া, ওই ভরে ওঠা,তবু সে নিজেই কেমন ছুঁয়ে থাকছে আমায়!
মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখি সেই জায়গাটার।ইচ্ছামতীর ঘোলা জল স্রোতের টানে লালচে
ছোট ছোট ঢেউ হয়ে ভাঙে।“গাছগাছালি হাতপাগুলো সব আকাশপানে মেলছে”…কার জন্য
গো?কিসের জন্য অমন হাত পেতেছো তোমরা?তলায় সোনাঝুরি ফুলেরা গুড়ো গুড়ো হয়ে
ঝরছে।দু-একটা পাতাও মাটিতে নেমে আসছে ঘুরপাক খেয়ে।শরতের কাঁসাভরন এমন রোদ,
চোখ খুললেই নদীর ধার দিয়ে ধার দিয়ে যেন ফুটে যাবে কাশ যতদূর দৃষ্টি চলে।ছোট একটা
মেয়ে ফ্রকের কোঁচড় ভর্তি শিউলি নিয়ে দাঁড়াবে ওই কার্পাস গাছটার তলায় যেখানকার
মাটি সবসময় ভিজে ভিজে আর কেমন আতপ চালের গন্ধ ওঠা।
শঙ্খ নদীর দুধারেতে কাশের বন বেয়ে/আবার এলে একোন সুরে গান
শোনাতে”…আমার মায়ের গাওয়া এই গানে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় আমার
রান্নাবাটির ধুলোখেলার দিন। রোদ আমার বাদামি চামড়া ঝলসে দেয়,ছায়া আদর করে।
ওইখানে হাওয় মাটি রোদ্দুর খোলা আকাশ আর ছুটি পাওয়া নদী, সবই গান!সবকটা
ইন্দ্রিয় দিয়ে আমি তা শুষে নিই আর বহন করি।

আমার পাড়া জাগানো কাঁদুনে মেয়ে শান্ত হতো শুধু গান শুনতে পেলে।ঘুম পাড়ানি গান
হতাম যখন,”I see the moon/And the moon See’s me…”অথবা ”Star light Star bright/Oh star I
see tonight”…তখন চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিই বন্ধ চোখের পাতা,শান্ত হাওয়ার রাতে তখন
আমার বেঁচে থাকার সুখ যখন “গান তুমি হও আমার মেয়ের ঘুমিয়ে পড়া মুখ” আর মায়ার
চাইতেও বেশি কিছুতে ভরে উঠতে থাকি আমি, দেখি স্ট‍্যান্ডের ওপর দোলনাটাতে
নয়,লালাবির ওপরেই দুলছে আমার ছোট্ট তিতির পাখি।
গান তাহলে কি?আমার কাছে?দিনের শেষে ঘরে ফেরার অবকাশ?প্রবল জ্বরে ঠাণ্ডা
জলের উপশম?ঘরের শেকল নাড়া দেওয়া কোনও দূরের ডাক যা আমি ফেলে এসেছি গত
জন্মের ছায়ার কাছে?শঙ্খ নদী উজাইলো…মরা কইন‍্যা জিয়াইলো…সেকি বনজোছনায়
হারিয়ে ফেলা পরন কথার মায়া?একলা রাতের অন্ধকারে আমি বারবার যার কাছে আলো
চাই সুরের, আখরের উত্তাপও।সব হেরে যাওয়া,দৈনন্দিন তুচ্ছ অপমান পার হয়ে ফুরিয়ে
ফেলা এক জলছবি খুঁজে খুঁজে বারবার গানের খুব কাছে পৌঁছোই,গান শুনি,গানে ডুবি,গান হতে
পারিনা কখনও।
 আজন্ম ধরতে পারিনি যাকে, ধরে রাখতে পারিনি পারবো না জেনেও ফের
ব‍্যাকুল আঙুল বাড়াই তার দিকেই সে ফিরে আসে যদি।যদি তাকে শুধোতে পারি
,যদি একবারও জানতে চাই কোন বাতাসে ঘুরে ঘুরে তুমি ঘুরেবেড়াও অনেক
দিনের আমার সে গান কি উত্তর জানাবে যদি লেখার খাতায় অজস্র কাটাকুটির
মধ্যে ফুটে থাকে ছোট্ট লাইন… গান শুধু চিরদিন থাকে…



মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া

উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাটে জন্ম। ন‍্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি.বি.এস.ডিগ্রি। বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে কর্মরত। মূলত কবিতা লেখারই আকাঙ্ক্ষা। শখ বই পড়া। প্রকাশিত বই -'জোনাকির বাতিঘর', 'বিষাদ ও অহংকার'এবং 'দূরে বাজে'।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।