তৈমুর খান-এর একগুচ্ছ কবিতা

তৈমুর খান on

taimur_khan

মৎস্যগন্ধার দেশে

আমার বিকেল নিয়ে চলে যাচ্ছে কারা ?
ব্যস্ত শহরের এককোণে বসে আছি
গ্রাম থেকে উড়ে আসা কাক —
সঙ্গে সেই মফস্বলী হাওয়া
খালিগায়ে রোদ মেখে নেওয়া

এসব ভাবে না শহর
লোহার মানুষ হাঁটে দ্রুত
অথবা প্লাস্টিকের রমণী
সোনার বিস্কুট খায়
পিতলের ছেলে মেয়ে

জীবিকার ছিপ হাতে সারাদিন কাটে
কংক্রিটের জলে বিকেল ডুবে যায়
একটাও স্নেহের মাছ নেই
মৎস্যগন্ধার দেশে শুধু ঢেউ
তরঙ্গলীলায় দেখি ভেসে যায় জীবন

বিকেলের চিঠি

আমার ঠিকানা কোথায় হারিয়ে গেছে
বিকেল গড়িয়ে গেছে তবু পোস্টম্যানের হাতে
চুপচাপ বসে আছি
তাপ কমে যাওয়া শরীরে হিমবর্ণ জামা

দুয়ারে দুয়ারে খুঁজে ফিরছে পোস্টম্যান
বিকেলের চিঠি কোথায় গিয়ে উঠব এবার ?

অনেক অরণ্যরোদন সেরে সভ্যতা দেখা শেষ হল
কথা হল পুণ্যবতী লীলার সঙ্গেও
এখন ঠিকানা খুঁজে পৌঁছানো চাই

অদ্ভুত মায়ার ফুল লবঙ্গ সদৃশ ফুটে আছে
কোথাও দেখছি না আমার চাতক পাখিটিকে
অক্ষরেরা মুছে গেছে হাতে হাতে অযত্ন ছোঁয়ায়
এখন মুশকিল নিজস্ব ঠিকানায় যাওয়া
হাঁটতে হাঁটতে পোস্টম্যান ভেদ করে চলে যাচ্ছে
গ্রাম গঞ্জ সভ্যতা পাড়া….

মাছরাঙা বিকেল

আমার মাছরাঙা বিকেলটির কথা কেউকে বলিনি
রোদের নৌকায় ভেসেছি তীব্র জলে
স্রোত ছিল, স্রোতে এক কাহিনিও…

ভিরু দিন, মুখ ঢেকে এসেছিল কাছে
তার হাতে স্বপ্নমুকুল দিয়েছি সঁপে
কণ্ঠে জড়িয়ে গানের লতা
প্রাচীন মমির যুগ থেকে তুলে আনা উপমার ফুল

সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে দুই হাত মেলে ডাকা…

যদিও ভাষায় তত স্বয়ংক্রিয়তা ছিল না
যদিও রোদের পায়ে নূপুর ছিল না
বোধের ঝনাৎকার থেকে কিছু বিশ্বাস পেয়ে
ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সদর্থক ক্রিয়া

সেই বিকেলের মূর্খরা শোনো
তপস্যা ভঙ্গ হয়ে গেলে
আবার ফিরল পৃথিবীতে আদিম দেবতার দল
আর নষ্ট কারমাইকেলে তাদের চাউনির নীল পরোয়ানা
মিলল রমণীদের ঘরে প্রবেশের

সঙ্গম প্রবহমান হল পৃথিবীতে

কোথাও দেখি না হৃদয়

তোমার ভ্রমর কত দূর যায় ?
ডানার কম্পনে বসন্তের চিঠি
ঘুমঘোর স্বপ্নের উদয়

নির্বাসিত এইখানে ভাঙা সংসার
কচ্ছপের মতো দিন কাটে
নিজেরই গর্তের সীমানায় চেয়ে রই

সভ্যতার ইঁটগুলি একে একে খসে
ধ্বংসস্তূপ থেকে আলোর কন্যারা বেরিয়ে আসে
অসামান্য তাদের প্রতিভা —
প্রতিভা কি হৃদয় ধারণ করে ?

কোথাও দেখি না হৃদয়
সৈনিকের সতর্ক বাঁশি বাজে
লংমার্চ শুরু হয় যুদ্ধের মহড়ায়


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


তৈমুর খান

তৈমুর খান নব্বই দশকের কবি হিসেবেই পরিচিত। তাঁর কবিতায় জীবনযাপনের নানা মুহূর্ত উঠে এসেছে। মূলত প্রেম ও বিষাদের তীব্র অভিঘাত । শব্দ ব্যবহারে ও চিত্রকল্পের ব্যাপ্তিময় প্রয়োগে কবির অসাধারণ দক্ষতা চোখে পড়ে। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল :বৃত্তের ভেতরে জল, জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা, নির্বাচিত কবিতা, উন্মাদ বিকেলের জংশন, স্তব্ধতার ভেতর এক নিরুত্তর হাসি, নির্ঘুমের হ্রস্ব ধ্বনি, কাহার অদৃশ্য হাতে, ইচ্ছারা সব সহমরণে যায়, আকাঙ্ক্ষার ঘরের জানালা ইত্যাদি ।পুরস্কার পেয়েছেন :নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার। ঠিকানা :রামরামপুর (শান্তিপাড়া), রামপুরহাট, বীরভূম।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।