ব্রহ্মা ও পাখির কবিতা

শানু চৌধুরী on

bromha_o_pakhir_kobita

तत् त्वम् असि

হে ব্রহ্মা!
পাখির পছন্দ নয়
খাঁচা ঘেরা আলোর বিকারে
চিবুক দুলিয়ে যে লতা
অমর হতে চায়
তার নীলাক্ষী বুকে থাকুক
সফেনের ডোরাকাটা দাগ
হে রূপ আর আকার
পৃথিবীর ঝিমুনিতে
কত অন্ধের পরমত
বালি ঝড়ের সঞ্চয়ে
ত্যাগ লিখে যায়

হে ব্রহ্মা!
দোয়েলের ভোর ভেঙে
জাগে পেঁপেফুলের অঙ্গার
তবু জ্বলে কি এ সমর
স্মৃতির কন্ঠস্বরের হতাশায়
ললিত হাসি ও চুম্বনকালে
দস্তানা বাঙ্ময় হয়
সুদূরের লিপির অবকাশে
নীড় তোলে শীত
নিরন্ন গরীবের থাবায়
মৃদুল পাঁজরের কুঠার
পাখির পছন্দ নয়

হে ব্রহ্মা!

পাখির পছন্দ নয়
মাছিরা উড়ে আসুক
নির্দয় পিয়ানোর বুকে
সীমাবদ্ধতা জেনে চতুর্দশপদীর
যতিচিহ্ন হারায় রঞ্জক
আর্দ্রতার বুকে তিরতির সান্ধ্য আঘাতে
কাশিদের অতীত ফোটে
কেন দেবদারুর কোটরে
হায় জানালার আলো
কেড়ে নেয় নিভৃত বিতান
খড়ের প্রতিমা ফেরীর চাতকে

হে ব্রহ্মা!
গুল্মের কলমে দ্যাখো
কচ্ছপের ঘুমন্ত প্রস্তুতির রীতি
মিহি তবু বিঠোফেনের
একান্ত মহিমময় শ্রবন
হায় জাগতিক নক্সার ঢেউ
পাথরপ্রাণিত জ্যামিতিকে
করেছ চপলা শিকড়ের
স্নান শেষের ভাষ্যকার
উড়িয়ে দাও সংকোচে
মৌন ভিক্ষার পান্থশালা
ও স্ফীত উল্লাস
পাখির পছন্দ নয়


হে ব্রহ্মা!

পাখির পছন্দ নয়
সন্তের আঙুলে দেখা
জোৎস্নারত ঝিনুকের ভার
গ্রামীণ প্রগলভ ঠোঁট দ্যাখে
খোলসের স্তূপে কেটে যাওয়া
আসক্ত মায়ের মুখ
আলোড়ন খোলো কালো পথে
বলিরেখার অশোকে
কুমারী জল ও বিদর্ভ পাম
প্রগাঢ় হবে আবিষ্কৃত সীলমোহরের দেশে

হে ব্রহ্মা!
পামীরের ধাঁচেই অভ্র থেকে
স্খলন ওঠে সুপক্ব বার্লির খেতে
তবু মেধা কেন ধ্বনির স্রোতে
বিকলাঙ্গ রমণীর স্মৃতি
মনে রাখে বন্দনার তেজে
মস্তিষ্কপ্রসূত মন্দিরের শোভা
বহমান বেবিলনের সাংকেতিক
বিবমিষার আহ্লাদের তৃষায়
বনেদি শেকলের সভাঘরে
রাখে রাখালের সরল লাগাম

পাখির পছন্দ নয়

হে ব্রহ্মা!
পাখির পছন্দ নয়
স্পর্শাতুর শিশিরের স্তাবকে
নুইয়ে পড়ুক ক্লান্ত অশ্বের আঙ্গিক
দুলুক শকট তার বিভীষিকা তীরে
তবু দেখি মৃত্যুর প্রান্তরে ঝোলে
ঔধের শৌখিনতা নিয়ে কারো
বলয়িত কৃমিকীট জীবন
সবিনয় নীল ফুল, পায়রার শোক
ঝেড়ে ফ্যালে ক্ষালিত কার্তিকের ভ্রমে
হায়েনার তৃষ্ণিত আত্মার চোখ

হে ব্রহ্মা!
জিরাফের গ্রীবাভঙ্গির পরবশে
পিতার স্নেহ কেন ডুবে যায়
ও শ্বাসকষ্ট ও পাখির পালক
অর্বুদ হোক স্মৃতিভারাতুর
মাতৃশব্দের শাহানাজ হাত
পদচিহ্ন আঁকুক লক্ষ্মীর আবাহন
টিনের আতুরনিবাসের সফেদ সিঁড়ি
ফলপ্রসূ হোক তোমার সফর তারানায়
জন্মতিথির অহেতুক বিকাশ
পাখির পছন্দ নয়

হে ব্রহ্মা!
পাখির পছন্দ নয়
সেবনীয় ওষুধের বড়ি
নশ্বরতার অলীক সাধনায়
বলপূর্বক পেনিট্রেটিভ হাওয়া ঝরাক
ঋতুকালের সঞ্চিত শাঁস
নিষ্পাপ কান্না ভুলে আবার
বাগদত্তা হোক ম্রিয়মাণ কীটদুষ্ট ফসলের গোলা

হে ব্রহ্মা!
আলোর কটিদেশ
চঞ্চল হল কেন
ধুয়ে ফেলা এস্রাজের গীতিকায়
হে শার্দূল ছোঁয়া অনগ্রসর রাগ
তবু মুকুল ওড়ে গৃহস্থের আঙিনায়
ভাঙা মুকুর রেণু খোঁজে বেঁচে ওঠার
স্বপ্ন মার্জনা, ভাগ্যলীন সুন্দর কোশে
পাখির পছন্দ নয় 

হে ব্রহ্মা!
এ কাঁকন শিমূল তুলোর মতো ভারহীন
তবু লোহার সিন্দুক ষড়যন্ত্রহীন ভাবে
প্রত্যাশা করে মনীষীদের বিশুদ্ধ কবর
তবু মহাপুঁজ শরীর নিয়ে চলো, আক্ষেপে
জীবন সম্পর্কে ধারনাই হল না, আফিম
ও ঝড়োপেট্রেলের নেশাগ্রস্ত চোখের অনুতাপে
হে অলীক আশীর্বাদের ভঙ্গিমা কাঠপুতুলের
মতো উন্মাদবৎ হয়ে যাচ্ছে আমাদের শরীর
একালে পাখির পছন্দ হোক

হে ব্রহ্মা!
পাখির পছন্দ হোক
ধ্রুবঘাটে ঈশ্বরের ধ্যান চিন্তারত
হৃদয়োপরি নারকেল ফুলের খসে পড়া
পৃথিবীর সমস্ত পথ গুলচীর শোভায়
 খোঁজে কোকিলাক্ষের ওঁকার লয়

হে ব্রহ্মা!
চাঁদের মাংস মায়াবী হলে
বর্তুল নগ্নতার বেদী নিষিদ্ধ করে অর্জিত বীজ
অশান্ত কন্ঠনালীর প্লাবন, কতকাল দেখবে
ধানখেত থেকে ধীর হওয়া শামুকের আভা
তড়িতাসক্ত হও, ঢেলে দাও সন্তুরের তারে
প্রকাশ্য প্রস্তাব, অপূর্ব হোক ব্যথার তারিখ
 পরস্পরকে খুঁজে পাওয়া-
পাখির পছন্দ হোক 


[ এই কবিতায় ব্রক্ষ্মা বলতে উদ্ভাবক শক্তিকে বন্দনা করেছি বারবার, পাখি বলতে ‘ Birds passage’ অর্থাৎ ‘উত্তরণের প্রতীক’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছি।]  

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


শানু চৌধুরী

শানু চৌধুরীর জন্ম ১৯৯২ সালে। ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতক শানুর লেখালেখি শুরু ২০১৫ সাল নাগাদ। এখনও পর্যন্ত একটি কবিতার বই ‘আলো ও আত্মহত্যা’, প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালে। এছাড়াও কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও গল্প লেখেন।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।