আবার গরম অসুখে

সমিধ গঙ্গোপাধ্যায় on

Samidh_gangopadhyay

১.

আলো নিভে যাচ্ছে আর আমার
একশোতম অপরাধ মেনে নিচ্ছ তুমি
আমি কিন্তু থামছি না
তুমি থামতে দিচ্ছ না
তুমি থামতে বলছো
আমি শুনতে পাচ্ছি না
আমি শুনতে পাচ্ছি
তুমি থামতে বলছো না

অথচ একশো এক একশো দুই তিন চার চারশো…

রানওয়ে বানিয়ে বৃষ্টি উড়ে যাচ্ছে দুর্ঘটনায়

বিকারগ্রস্ত লাইন আমার পছন্দের সই
তাই তোমার গমগমে সম্মতির তোয়াক্কা না ক’রে
ঢেঁড়া পিটিয়ে দিচ্ছি–
“তুমি তোমার মতো যেখানে খুশি থাকো,
না ডাকলে যদি দেখি সাড়াশব্দ নেই তবে…”

পুটুরানী,
আমার মতো এমন করে কেউ তোমায় লিখতে পারবে না
তোমার মতো এমন করে কেউ আমায় লেখাতে পারবে না।

২.

ন্যাকা অন্ত্যমিল দিয়ে 
প্রেমের শরীরপোষণ করি

ততক্ষণে রাস্তা বসে গেছে
কোনো এক দুর্বার ভাইরাসের হাঁটুর ওজনে

চড়াই-উতরাই নেই
খালি চোখে দেখাও যায় না

কম্পাসের উৎসাহে কেবল প্রয়োজনীয়
মাছের বাজার

তুমি পসরা সাজিয়ে এখানে ওখানে এলোমেলো

ক্যাকটাসের মগজ থেকে কাঁটা সরিয়ে নামি
ঘন কাদার বিষাদে

তুমি একটু পরে জাল গুটিয়ে নিতে নিতে
তাকাবে আমার দিকে
যতক্ষণ অন্ত্যদেশ মিলে যাওয়ার আগ্রহে
নিজের শবের কাছে অনশন-বন্দী হয়ে থাকে

তাকাবে আমার দিকে
যতবার দুর্বোধ্য প্রাণায়ামে শুধু চাইবো
যতটুকু তোমার সহজ

তাকাবে আমার দিকে
আর তোমার পলক পড়বে না।

৩.

দহনকে চেয়ারে বসাই

হাত পা ধুইয়ে দিই
জেনে নিই দুপুরে কি খাবে

তারপর একরকম অন্যের সম্ভাবনায়

ভুলে যাই

কয়েকটা লাইন ধরে আপ-ডাউনে ট্রেনহীন
যাত্রীদের থেমে যাবার পর এসে দেখি–

চলে গেছে

মনকেমন করে

মন কেমন হয়?
আমি অবশ্য আরেকবার লেখার পাশে বসি

তুমি চলে গিয়েও তো ফিরে আসতে পারো বেখেয়ালে।

৪.

গুহার ভেতরে প্রথমে অন্ধকার ছিলো
প্রয়োজন ছিলো

গুহার বাইরেও ছিলো থইথই জলের কুয়াশা

তারপর যেদিন আগুন এলো অতিথি হয়ে
আর আগুনের থেকে একটু দূরে বসা একজন হঠাৎ
অন্ধকারে উধাও হলো
সেদিন আমরা অন্ধকারকে প্রথম ভয় পেলাম

আগুনের মজলিশে তোমাকে এই প্রথম লক্ষ্য করলাম
দেখল আমার মতো আরো অনেকেই
আমার মতো আরো অনেকেরই শরীরে,
তখন থেকে শুরু হলো আগুনের অবাধ যাতায়াত
আমরা বুঝলাম তোমার যা আছে তাকে সৌন্দর্য বলে ডাকা যায়

তোমার সঙ্গে ইশারাবিনিময়
তোমার জন্য সবচেয়ে মাংসল কোনো শিকার ধরে আনার সে কি ধুম
আমার মধ্যে আগুন যেন ছলকে উঠত
অসম্ভব গরমে যেন খাক হয়ে যেত সব ভেতরে ভেতরে
তখন বুঝিনি
তারপর যেদিন দেখলাম
তোমায় মাঝখানে রেখে দু’জন সুদর্শন নিয়ান্ডারথাল
সহজাত পৌরুষের বিচারে ব্যস্ত
সেদিন যে বীভৎস লড়াইয়ের পর,
তোমার হাত ধরে টেনে নিয়ে এলাম আমার কাছে
সেও একরকম আগুন,
তাকে হিংসা বলে চেনা যাবে আরও অনেক পরে

ততদিনে আর আমরা অন্ধকারকে ভয় পাই না
কাঁধে কাঁধ মেলানোর দিনগুলো দূরে সরে যায়
আমরা শিখি যার কাছে যতটুকু আছে তাকে লুকোনোর খেলা
আমরা শিখি সব সম্পদ, সবার ভাগে সমান দিতে নেই
আমরা শিখি হাত পা’য়ের নখ কেটে বদলে যেতে হয়
এসব যে শেখায় তাকে সময় নামক তিন কাঁটায় গাঁথব
আরো অনেকগুলো দিন এইভাবেই শেষ হওয়ার পর

চাকা এলো এরপরে
দরকারী ওজনের মাপামাপি ছাড়াই সে নিয়ে গেলো
আমাদের এদিক ওদিক
মুখের চামড়া আর চোখের রং অনেকটাই পাল্টে ফেলেছে
ততদিনে তা’ও বেশ কয়েকজন
এত সবের মধ্যেও আমি তোমার হাত কিন্তু ছাড়িনি
তুমিও ধরে রেখেছো তোমার মতো
আগুন তোমার একটা নামও বেঁধেছে ততদিনে
বলা তো যায় না তবে হয়তো কোনোদিন,
কেউ কোথাও ওই নামে ডাকবে তোমায়

চাকার বৃত্তে আমাদের ছোটগল্প জুড়ে দিয়ে,
তোমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ি
“পুটুরানী আমার সঙ্গে ঘুরতে যাবে কি?”

যখন সাড়া দাও আর যখন আসতে পারো না–
আগুন তখন যে দু’রকম আচরণ করে এই ভেতরে ভেতরে,
জানিনা ঠিক কবে থেকে তাকে ভালোবাসা বলতে
শিখে গেছি আমি…

৫.

একটা শুন্যতাকে অনেক শুন্যতায়
মানিয়ে নাও তুমি

সময় তোমাকে একা ছাড়ে না কখনও
বরং তাকেই তুমি স্নানঘরে একা ফেলে যাও

হাসতে হাসতে খ্যাতি দু’মলাটে নিজেকে বাঁধে
হাতে আসে প্রিয়তর ডাকাতের চিঠি
অমাবস্যাও কানা বসন্তের ঝুলি নিয়ে একবার ডাকে
জীর্ণ নৌকোগুলো তোমাকে ভাসায় উদ্যমে

সমস্ত ফসলিয়া যুক্তির বন্ধুতায় কমেডি ঘেরাও করে
তোমার দৃপ্ত আয়না

আমি তো এত অল্পে চাই না তোমাকে

অমোঘ শিকারীও আজকাল
ভুলে যায় তিনদিন আগেকার লুকোনো শিকার
পাতার বিমর্ষতা চিনতে চিনতে কেউ অন্য রাস্তা
ধরে নেয়

সবাই জানে উপকথা বেশিদিন সেজেগুজে থাকতে
পারে না
তবু আমি তো তোমার চোখে এত অল্প দেখতে চাই না

তোমার আদুরে উদাসীন বৃন্তের নিরূপম,
অন্য কোনো বিস্ময়ে সম্মোহন পাওয়ার আগেই
দাঁতে পিষে দিতে চাই

সামান্য মগজের ছাই তুমি অযত্নে একবারও যদি
উড়িয়ে দেওয়ার আগে নেহাত কৌতূহলে…

না না একবার নয় প্রত্যেকদিন এই নচ্ছার
রিপুহীনতার নাম থেকে গ্লানি নেওয়ার ও দেওয়ার খাঁচায়
কয়েদী হয়ে ছুটতে চাই তোমার অনেক ভেতরে

রাখবে না আমায়
বলো
মাখবে না আমায় পুটুরানী?

৬.

আরো একটা মনোনীত না হওয়া লেখায়,
আমি মাধ্যম হীন দেখে নিই তোমার জানলা

আর্দ্রতা চেয়ে যারা মাথা কুটে মরে
তাদেরই হয়ত আজ আধুনিক বলে ডাকে তোমার জানলা

অন্ত্রের বাঁকাচোরা ব্যাকটেরিয়ার মুখে সুরেলা নজরুল–
শ্রাবণী কলমে ভাগশেষ রাখে তোমার জানলা

মাঝারি বিষণ্ণতা বেনামী বিনোদনের আশনাই দোলায় যেখানে,
বিনীত পাগলামির নসিবের নিরামিষে মুনাসিব হতে পারে জানলা তোমার

এরও পরে আসে খই ছেটাতে, জীবনবাহকেরা

ভণিতা ভালো লাগেনা হ্যালোজেন ছাড়া আর কোনো জলসায়

সুতরাং সোজা কথা সহজ আদলে বলা শ্রেয়–

এই মুহুর্তে শুধু তোমার পশমে ঘুম পায়
এই মুহুর্তে শুধু তোমার বারণে এই শরীর অবশ হয়ে ওঠে
এই মুহুর্তে শুধু তোমার ঊরুর ভাঁজে আমার জ্যান্ত নির্মাণ

তবু সময়েরই কাঁধে মুখস্থ করবার দায়?
তুমি তো জানোই সময়েরও ইদানিং,
দোতলায় উঠতে হাঁপ ধরে
ওষুধ ছাড়া রক্তচাপ শাসনে থাকে না

তোমায় যেভাবে ভালোবাসি
সেভাবে নায়াগ্রাও এখনও প্রপাত শেখেনি

তবু তুমি মুখ ফেরাবে, ব্যস্ত হবে,
অভিনীত হবে দূরগামী মাদকের অছিলায়?

সমস্ত নেওয়ার পরও আরেকটুর জন্য তুমি বুঝবে না আমায়?


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


সমিধ গঙ্গোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৯০। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ "নিউক্লিয়াসের বিষ"।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।