অর্পিতার একগুচ্ছ কবিতা

অর্পিতা on

রত্নাকর

কতোকাল হাঁটু পেতে বসে আছি মৃত্তিকাবুকে!
একরোখা আলো এসে রোজ বিঁধে দেয় পাঁজরের ভূমি
পুণ্যলোভী মাথা ঝুঁকে যায় সম্মুখ পানে
মাটি হয়ে আসা শরীরের বাঁকে জড়িয়েছে হংসলতার গাছ ,
পুষ্পে পত্রে আজ আর মন ভোলে না,

হে খেয়ালি ঈশ্বর! নিদ্রা শেষ হলে
নেমে এসো,
আশিষমুদ্রার হাত ঠেকাও কপালে।
আমি পুনরায় দস্যু হয়ে যাই ;
বাল্মীকির প্রতারক বিজয়ের গাথা তোমাদেরই থাক, মুক্তি দাও।
সন্তানের দুধভাত আয়েশের তরে
পাপ করি এই দুই হাতে।

ঘর

ধূলার দেবতা এইবার বাড়ি ফিরে চলো।
এই মসৃণ পাথরের বুকে জলও দাঁড়ালো না,
প্রেমনাম আসবে কেমনে বলো?
তারচেয়ে হেঁটে যাই ওই পথ দিয়ে
পাতার মুকুট পরে খেজুর গাছের সারি মুখ দেখে পুষ্করিণী জলে ,
ওই পথে গেলে ঘরে ফেরা যায় ।

আকুল তোমাকে ডাকে
বৃন্দার ঝোপ, নয়নতারা ফুল আর সন্ধ্যার বাতি,
এইখানে জুড়াও শরীর
স্নান সেরে শীতলপাটিতে এসে বোসো
মায়ের হাতের যত্নভাত দুইটিতে ভাগ করে খাই।

স্বপ্নপ্রেমিক

প্রেমিকার হলুদ কপালে এঁকে দেবে ‘গোধূলির টিপ’,
দুরাশার মতো দিগন্তের কাছে
হাত পাতে রোজ
ওই নবীন যুবক,

যে পাখিরা ঘরে ফিরে যায়
তাদের ডানার দাগ পড়ে থাকে জলে
দিবসের ধুলো মুছে তার কাছে গিয়ে বসে ।
ছুঁয়ে থাকে গোপন যাপন।

চিতল হরিণের মতো প্রেমিকার চোখ,
সেইখানে ঘর বাঁধে যদি–
খড়কুটো জড়ো করে রাখে।
মুঠোচার হাসি খুশি, অফুরান কথা
রাঙা পায়ে রুপোলি শিশির,
বাড়ির সীমানায়
বেড়ে ওঠা দরদী বৃক্ষের সারি,

এলোমেলো স্বপ্নপথ ধরে
হেঁটে যায় সে
বিষাদী আঁধারের মাঝে
ধানের শিষের মতো আলো
ফেলে রাখে বুকের কিনারে।

চন্দনগন্ধী নিশিথের মোহে বুঁদ
প্রেমিক যুবক
চেয়ে চেয়ে দেখে
প্রেমিকার কাঁধ ঘেঁষে ডুবে যায় চাঁদ
দুই পক্ষ, রাহু-কেতু, জোয়ারের জল
তারপর ভোর হয়ে আসে,

একদিন ঠিক
প্রেমিকার হলুদ কপালে
সে এঁকে দেবে ‘গোধূলির টিপ’ ।

শান্তিভূমি

আকাশটা ক্রমে নেমে আসছে আমার ঠোঁটের কাছে। অযুত বছরের পাহাড়গুলো ছোট হতে হতে ধুলো হয়ে গেল– অনন্ত নোনাজলে তলিয়ে যেতে যেতে কানে বেজে উঠলো–” বিজয়ী ভবঃ”

কেন?
কেন আজও দেউটি জ্বলে চৌকাঠের পায়ে ?
চন্দনের গন্ধ ভেসে আসে স্নানঘর থেকে ?

সেই অনার্য নারীর অভিশাপে সব তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে এতদিন ,
তার রক্ত লাল আঁচলের ছায়া ধরে
দিগন্তে মিলিয়ে গেছে আমার প্রিয় কৃষ্ণ অশ্ব ,
তোমার, আমার, আমাদের সন্তানেরা।

তুমি বলেছিলে, যুদ্ধ শেষ হলে বিজয়ী বাতাসে সব পাপ ধুয়ে যাবে। শান্তি থিতু হয়ে বসবে আমার ঘরে। অথচ,ঝড়ের কালো মেঘের মতো ওই নারীর দুই আঁখি।

যাও, জানু পেতে বোসো ।
নতচোখে ক্ষমা ভিক্ষা করো।

আমার এখনো বিশ্বাস , শুধু সেই পারে বৃষ্টি নামাতে,


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


অর্পিতা

জন্ম কাটোয়া মহকুমার দাঁইহাটে, ১৯৯১ এ। বাবা একজন গর্বিত কৃষক। বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা পেরিয়ে এখন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় কর্মরত । লেখালিখি ' অপদার্থের আদ্যক্ষর' পত্রিকায় । কবিতার থেকেও উপন্যাস পড়তে বেশি পছন্দ করেন ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।