মরশুম

জয়াশিস ঘোষ on

মেঘ ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছ কি? আজকাল বড় শব্দ। কিছু শোনা যায় না। মাঝরাতে উঠে পড়ি। জল খুঁজি। জ্বরের ঘোরে মনে হয় চাদর পাল্টে দিল কেউ। পাল্টে ফেলা কি এত সহজ? হাওয়া আসবে বলে তবে বন্ধ করলে কেন দক্ষিণের জানালা? সামনের জন্মে পাহাড় হবো। সব শব্দ খেয়ে ফেলবো। যা অভিধানে নেই, এমন কোন বিষাদ জানো তুমি? জানো কেমন করে মেঘ ছিঁড়ে ছিঁড়ে বেহালা হয়?

বাজাতে পারো। ওষুধ জানো না…..

বৃষ্টি থেমে গেল। দু চারটে ঝরা পাতা কুড়িয়ে নিলাম। এসব পথে দীর্ঘকবিতারা বসে থাকে। আর একটা নাছোড়বান্দা লোক। আমার জামা টেনে ধরে। কথা বলেনা। কথা হয়নি বহুকাল। সমস্ত পোয়াতি মেঘ ফিরে যাচ্ছে দীর্ঘ অবসরে। উৎসবের গন্ধ উড়ে আসছে মফস্বল থেকে। ফুরিয়ে আসছে প্রিয় হাতঘড়ি। যেখানে তার ওড়না রাখা ছিল।

জেগে উঠে দেখবো, কাশফুল ফুটে আছে….

আলো পা টিপে টিপে আসে। তুমি তার হাত ছাড়িয়ে চলে যাও। গর্তে ঢুকে পড়ো। আলো দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়। কান্না আসে। কাঁদার আগেই কান্না গলা টিপে ধরে। হাঁসফাঁস করো। পালাবার পথ নেই। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে উৎসব। দলা দলা আলো। না রাখা কথারা জড়িয়ে ধরছে তোমাকে। মিসড কল আসেনি কাল থেকে। স্বপ্নে বেলুনওয়ালা আসে। এবার পুজোয় যার একটাও বিক্রি হয়নি। বৃষ্টি পড়ছে কাল রাত থেকে।

সমস্ত চলে যাওয়া বৃষ্টি নিয়ে আসে….

হতে পারে, চলে যাওয়ার সময় একটা বাসও আমার জন্য দাঁড়ালো না। বা হলুদ শাড়ি মেয়েটি ওড়ালো না রুমাল। হতে পারে, সেদিন বৃষ্টিতে কলকাতা ভেসে গেল। অথবা কাঁদতে ভুলে গেল মহানগর। হতে পারে, সেদিন তোমার অ্যালজোলামের শিশি হারিয়ে গেল। মোবাইলে হারিয়ে ফেললে কললিস্ট।

হতে পারে, চলে যাওয়ার সময় এসব কিছুই হলো না। একটা শহর ভুলে গেল কালভার্টের নীচে প্রথমবার শালুক ফুটেছিল। কেউ দেখলোনা এক শহর বিজ্ঞাপনের পাশে একঝুড়ি ভুল শুয়ে আছে…..

চেনা বন্ধুদের ঘর থেকে ওষুধের গন্ধ আসে। আমি তার বিকেল শুনি। ঘরে ফেরা কখন গান হয়ে যায়। ঝিম ধরে আসে। পুরোনো চায়ের দোকান। একটা দুটো কাঠ উনুনে গুজে দিচ্ছে মালকোষ। পিঠে তার বহু বছরের সন্ধে। যেমন তোমার চিঠি। আসেনা কিন্তু অন্য রকম হাওয়া দেয়। শীত করে। গ্লাসের নীচে দাগ জমেছে। এত নিপুণ গোল আমি আঁকতে পারি না। চৌকো আঁকি। আঁকি জলের কুশন।

ফেরার সময় চটি হারিয়ে যায়…

বুকের মধ্যে পশমের গোলা। উলের কাঁটা দেখছে ফেলে আসা ট্রেন। জানলায় রডোড্রেনড্রন। কাঁধের মাপ ভুল। গড়াতে গড়াতে নদীর পার। কেটে যাওয়া ঠোঁট। বালি চিকচিক করছে। উড়ে আসা প্রজাপতি জানে কঘর ভুলে একটা জীবন কেটে যায়। বিষাদের কাছে চিঠি জমা থাকে। সোয়েটার অর্ধেক শেষ হলে মরে যায় হেমন্তের ধান।

বোর্ড সাজিয়ে বসে আছো, স্টেশনমাস্টার! শীত এলো কই?



জয়াশিস ঘোষ

জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৬ শে জানুয়ারী। বেড়ে ওঠা মফস্বলে। তাই মফস্বল ঘুরে ঘুরে আসে তার কবিতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর। রাজ্য সরকারী চাকুরি করেন। লেখালেখি ছাড়া ঘুরতে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন বৃষ্টি ভিজতে, ছবি তুলতে, মানুষ চিনতে। লেখা বেরিয়েছে দেশ, কৃত্তিবাস, শুধু বিঘে দুই, আদরের নৌকা, তবুও প্রয়াস, মাস্তুল ইত্যাদি ম্যাগাজিনে। রংছুট নামের লিটল ম্যাগাজিনের সাথে যুক্ত। প্রথম বই ' বৃষ্টি আসার পরে', নীলকন্ঠ প্রকাশনী। প্রকাশিত কবিতার বই- ' বৃষ্টি বাই লেন', অপদার্থের আদ্যক্ষর; ' চুল্লী', রংছুট। গদ্যের বই ' ডার্ক চকোলেট ও অন্যান্য', অপদার্থের আদ্যক্ষর।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।