স্বাধীনতা দিবস

সন্দীপা বসু on

মোড়ের মাথায় নিতাই সাহার গোডাউনের সিঁড়িটায় বসে কান খোঁচাচ্ছিল নবা। নবা, মানে নবেন্দু গাঙ্গুলি। বাবা শশধর গাঙ্গুলি অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। মা সুনয়নী গাঙ্গুলি বিশ্বভারতীর ছাত্রী। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কোন একটি বিষয়ের ওপর গবেষণা করেছেন। সঙ্গীত নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। গাঙ্গুলি পরিবার এই মফঃস্বলের একটি নামকরা বনেদী পরিবার। কৃতকর্মা ও সফল ব্যাক্তিদের মাঝে নবা যেন একটি অন্য গ্রহের প্রাণী। ওকে নিজেদের মত করে গড়ে তলার অনেক ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর ওর বাবা মা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।

এই পর্যন্ত পড়ে যদি কেউ ভাবেন নবা অকর্মণ্য ছিল, তিনি ভুল ভাববেন। একেবারেই না। বরং ঠিক তার উল্টোটাই ছিল সে। কলেজের ডিগ্রি পাবার আগেই সে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলো। যেমন পাড়ার মেয়েদের পেছনে লাগা, মাঝে মাঝে কারো প্রেমে দিওয়ানা হয়ে জ্যামিতি বাক্সের কাঁটা কম্পাস দিয়ে খুঁচিয়ে হাতে, বুকে তার নাম লেখা, কোন মেয়ে কখন কোথায় যাচ্ছে সেসব খবর রাখা, রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করা, মেয়েদের স্কুল বাসে চিঠি ছুঁড়ে দেওয়া, পিছু পিছু ধাওয়া করা। একসময় ওর জ্বালায় পাড়ার মেয়েরা রাস্তায় বেরোতে ভয় পেত। তারপর একটা সময় এলো যখন নবা আচমকাই যেন সন্ন্যাসী হয়ে গেলো। আর কোন মেয়ের দিকে সেভাবে তাকাত না। পাশ দিয়ে চলে গেলেও দেখতে পেত না। ততদিনে কিছু সাঙ্গপাঙ্গ জুটেছিল নবার। তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে বলত, “ওসব ছোটবেলার ব্যাপার। কিস্নকে দেখিসনি? আবে, কিস্ন বে, রাধাকিস্ন। একটা বয়সের পর শুধু কাজ করতে হয়, বুইলি?”

তা কাজটা কী? সব রকম নেশার খবর নবার কাছে ছিল। উঁহু, সেই খবর নয়। সে তো নেট ঘাঁটলেই পাওয়া যায়। সবাই জানে। নবা জানত কাজের কথা। যেটা ওর কাজে লাগবে, সেই কথা। ওর এলাকার আশেপাশে কোথায় কোন নেশার বস্তুটা পাওয়া যায়, কার থেকে কীভাবে পাওয়া যায়, কোথা থেকে চালান আসে, কারা কেনে, কোনটার কত দাম – সব ওর নখদর্পণে ছিল। তো সেসবও কয়েক বছর আগের কথা। তখন নবা কুড়িও ছোঁয়নি।  এখন নবা নেশার খবর ছাড়াও আরও অনেক খবর রাখে। যেমন কোন নেতার কী দুর্বলতা, কাকে কী দিয়ে খুশি রাখতে হবে সব ওর মুখস্থ। পাড়ার লোককে কীভাবে চমকে সিধে রাখতে হবে সেটাও বেশ চটপট রপ্ত করে নিয়েছে। অবশ্য ওদের পাড়াটা বেশ শান্তশিষ্ট, ভদ্রলোকের পাড়া। ওর নিজের বাড়িও যেমন। অবিশ্যি ওই বাড়িটাকে আর নিজের বাড়ি বলা যায় কিনা সে বিষয়ে নবার নিজেরই সন্দেহ আছে। ওখানকার লোকজন ওকে পছন্দ করে না। ওর সাথে কথাবার্তাও বলে না। নবারও ওদের কেমন অচেনা লাগে। কিন্তু কি আর করা যাবে? দু বেলা খাওয়া আর মাথার ওপর ছাদটা জুটে যাচ্ছে, সেই অনেক। নবার ইচ্ছে আছে নিজের জন্য একটা কিছু ব্যাবস্থা করতে পারলেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে ও। বাড়ির লোকও শান্তি পাবে, ও জানে।

এসব কাজকে যারা সহজ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নবার খুব ইচ্ছে হয় তাদের একবার লকআপে পুরে পেছনে রুলের গুঁতো খাওয়াতে। অথবা উঠতি নেতার জুতো সাফ করাতে। কিন্তু সে ইচ্ছে ইচ্ছেই থেকে যায়। অমুকের ছেলে, তমুকের বাচ্চা শুনেও না শোনার ভান করে নিজের কাজটি করে যেতে হয় দাপটের সাথে। তাতে ইজ্জত বাড়ে। পাড়ার লোকেরা সমীহ করে। দাপটে ঘুরে বেড়াতে পারে নবা। ভদ্রলোকের মত মিনমিন করে নয়। সে কি কিছু কম নাকি? ও হ্যাঁ বললে পাড়ার কারুর ক্ষমতা নেই না বলার। সামনের ইলেকশনে ওর ইচ্ছে আছে ভোটে দাঁড়ানোর। একবার কাউন্সিলার হতে পারলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। এলাকায় দাপট তো আছেই, সাথে আছে লোকের বিপদে আপদে সাহায্য করা। হাসপাতাল থেকে মর্গ, শ্মশান – সবখানে সবার পাশে নবা আছে নিজের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে। সব কিছুর ওপরে উপরি যেটা আছে সেটা হল নাম করা শিক্ষিত পরিবারের ছাপটা আর রাজপুত্তুরের মত চেহারাখানা। সব মিলিয়ে ইলেকশন ও জিতেই যাবে। 

যাই হোক, এই পাড়ায় একছত্র রাজত্ব চালায় নবা। সবাইকে শান্তিতে রাখে। এলাকায় কোন গণ্ডগোল হতে দেয় না আর তার বদলে ওর কিছু রোজগার হয়। এই পাড়ার দোকানদারগুলো, এই ডেকরেটার, যার গোডাউনের সামনে বসে এখন ও একটা কাঠি দিয়ে কান খোঁচাচ্ছে, সেই নিতাই সাহা – এরাই টাকা দেয় ওকে নিয়মিত। তাই দিয়ে সন্ধেবেলা পাড়ার ক্লাবের ছাদে বসে একটু চানাচুর, বাদাম নিয়ে বাংলার ছেলের বাংলা পান। নবা শান্ত, পাড়াও শান্ত। 

হ্যাঁ, যেখানে ছিলাম, নবা নিতাই সাহার গোডাউনের সিঁড়িতে বসে কান খোঁচাচ্ছে। উঁহু, একটু ভুল হল, আসলে ভাবছে। সামনেই স্বাধীনতা দিবস। নবার ওপর এখন বড় দায়িত্ব। পাড়ার ক্লাবে পতাকা তোলা হবে। তারপর বড়দের চা বিস্কুট, বাচ্চাদের লজেন্স। সব খরচ খরচার মোটামুটি একটা হিসেব করলে তারপর টাকা তলার কথা হিসেব করা যাবে। কান খোঁচাতে খোঁচাতে সেই হিসেবই করছে নবা। বড় পতাকা, যেটা তোলা হবে লম্বা ডাণ্ডার মাথায়, কম করে হলেও শ’পাঁচেক। সুতিরই ভালো। কয়েক ঘণ্টার মামলা। সিল্ক কিনে পয়সা নষ্ট করার দরকার নেই। বেশ কিছু হাতে নেবার প্লাস্টিকের ছোট পতাকা আরও শ’দুই। এছাড়া দড়ি, চা, বিস্কুট, লজেন্স আরও টুকটাক যা খরচখরচা আছে – সব মিলিয়ে আরও পাঁচশো। নেতাজির ছবি ক্লাব ঘর থেকে নামিয়ে পরিষ্কার করে বসিয়ে দিলেই হবে। একটা গাঁদার মালা লাগবে তাতে। ছবি বসানর জন্য একটা টেবল, সাদা টেবল কভার আর কিছু প্লাস্টিকের চেয়ার -এগুলো নিতাই সাহা করে দেবে। সকালের বন্দোবস্ত শেষ। সন্ধ্যেবেলা একটু প্রোগ্রাম না করলে মানায় না। পাশের পাড়া তো ফাটিয়ে প্রোগ্রাম করে। নবা কম কিসে? খান চারেক ডি জে বক্স ছাড়া হবে না। কিছু দেশাত্ববোধক গান লাগবে, বাংলা, হিন্দি মিলিয়ে মিশিয়ে। তাছাড়া সব মিটেফিটে গেলে নবার নিজের কিছু খরচ আছে। মাগনায় তো আর সব কাজ হয়না। নবার একটা পারিশ্রমিক তো আছে। সব মিলিয়ে হাজার ত্রিশেক টাকা হলেই হবে আপাতত। 

সব ব্যাবস্থা তেরো তারিখের মধ্যেই করে ফেলতে হবে। নাহলে ডি জে বক্স পাওয়া চাপের হয়ে যাবে। অন্য পাড়ার ছেলেরা নিয়ে গেলেই চিত্তির। আশেপাশের দু তিনটে পাড়া মিলিয়ে এই নিতাই সাহাই একমাত্র ডেকরেটর। মালটার বহুত রোয়াবি। বেকার বেকার ঝাম করতে হবে তখন বেপাড়ার ছেলেগুলোর সাথে। এ পাড়ায় নবাই শেষ কথা। কিন্তু বেপাড়ায় তো অন্য শের আছে। ভালো কাজের আগে এসব ছুটকো ঝাম ভালো লাগে না নবার। 

বাজেট করেই নবা ভাবতে বসে টাকা কী করে তোলা যায়। চাঁদা তো তুলতেই হবে পাড়া থেকে। কিন্তু তাতে পুরোটা হবে না। ওদিকে সবার কাছ থেকে তো আর জোরজুলুম করে টাকা তুলতে পারবে না। ওই যেমন অভিদার বউ, রুনা বৌদি। অভিদা জাহাজে জাহাজে ঘুরে বেড়ায়। বছরে একবার বাড়ি আসে। কয়েকমাস থাকে। যে সময়টা থাকে না তখন রুনা বউদির কষ্ট চোখে দেখা যায় না। মানে, দেখা যাবার মত কষ্ট তো নয়। পয়সা, গাড়ি, বাড়ি, চাকর সবই আছে। সে সব নয়। কিন্তু আরও তো কিছু কষ্ট থাকে। একা থাকার কষ্ট কি আর ওসব দিয়ে ঢাকা পরে? নবা বার কয়েক চেষ্টা করেছে কথা বলতে। তেমন পাত্তা দেয়নি। তা না দিক, এসব তো আর ফালতু রাস্তার মেয়েছেলে নয় যে সে একটু ইশারা করলেই গলায় ঝুলে পড়বে। ভালো ঘরের মেয়ে, একটু দেমাকি না হলে মানায় না। নবা তক্কে তক্কে আছে। চোখাচোখি হলে হাসে। একদিন না একদিন কথা বলবেই। সেদিন নবা ওর সব একাকীত্ব ভুলিয়ে দেবে।

কী ভাবতে বসে কী ভাবছে নবা! কান খোঁচানর কাঠিটা দুই আঙ্গুলের টোকায় দূরে ছুঁড়ে ফেলে। মোদ্দা কথা হল রুনা বৌদির কাছ থেকে পাঁচশর বেশী নেবে না ও। ওই বড় পতাকার দামটাই নেবে। মোড়ের কম্পিউটার সেন্টার থেকে বড় করে বৌদির নাম প্রিন্ট করিয়ে নেবে পতাকার স্পনসর বলে। এসব এখন হেব্বি চলছে। পাবলিকও খাবে, আর ফাঁকতালে যদি বৌদি খুশ হয়ে যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই কোন। ভাবতেই মনটা নেচে ওঠে নবার। প্ল্যানখানা জব্বর হয়েছে। শালা, কে বলে নবার ব্রেন নেই? নেহাত এসব কাউকে বলা যায় না তাই, নয়ত পাশের পাড়ার পেলুকে দেখিয়ে দিত, মাসল পাওয়ারই যে সব নয়, বুঝিয়ে দিত সেটা। 

সব থেকে বেশী টাকা তুলতে হবে দত্ত বুড়োর থেকে। মালটা আগে ওকে দেখলেই জ্ঞান দিত। অমুক বাড়ির ছেলে হয়ে তুমি তমুক করছ, এই সব আলফাল কথা। আজকাল আর বলে না। শুধু যখনই সামনে দিয়ে যায় কেমন একটা চোখে দেখে ওকে। প্রচণ্ড রাগ হয় নবার। তার ওপর আবার প্রতিবার সেলিব্রেশনের পর রাস্তায় নেমে ছোট পতাকা কুড়োয়, বলে নাকি জাতীয় পতাকা পায়ে লাগানো মানে দেশকে অপমান করা। শালা যে দেশে মানুষের সম্মান নেই সে দেশে আবার পতাকার সম্মান! “দেশপ্রেম প্রচুর মালটার। চাঁদা তোলার পর যা বাকি থাকবে পুরোটাই ওর থেকে নেব। গড়বড় করলে কেলিয়ে ওই বড় পতাকার ডাণ্ডা পুরে দেব জায়গা মত। শালা নিজেই পতাকা হয়ে ঝুলবে।“ ভাবে নবা।  দৃশ্যটা কল্পনা করে নিজের মনেই ফিক করে হেসে ফেলে। 

সন্ধ্যে নেমেছে অনেকক্ষণ। রাস্তার আলোগুলোও জ্বলতে শুরু করেছে একে একে। ক্লাবে ঢোকার মুখে চোখ পড়ল উল্টো দিকে ল্যাম্পপোস্টের দিকে। “পাগলিটা ফেরেনি এখনও?” মনেমনে ভাবল ও। এমনিতে রোজই অন্ধকার নামার আগেই এসে বসে থাকে এখানে। রুটির দোকানের মাসি দোকান খুলেই দুটো রুটি আর একটু ডাল পাঠিয়ে দেয় ওর জন্য। আজও মাসির দোকানের ছেলেটা সেই ডাল রুটির প্লাস্টিক নিয়ে গেল। পাগলিটা নেই। ওদিকে দোকানে তার বিস্তর কাজ এখন। নবা দেখল ছেলেটা বুঝতে পারছে না কী করবে। আড় চোখে ক্লাবের দিকে তাকাচ্ছে। কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। হাতের ইশারায় ছেলেটাকে কাছে ডাকল নবা। বলল, “ওই ওর জন্য তো? রেখে যা। এলে পাঠিয়ে দেবো।“ 

ছেলেটা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। প্যাকেট রেখে দৌড়ে ফিরে গেলো দোকানে। এক এক করে নবার সাঙ্গপাঙ্গরা জমতে শুরু করেছিলো। কিছুক্ষণ ক্যারাম পিটিয়ে নবা ছাতে গিয়ে বসল। সাঙ্গপাঙ্গরাও সাথে গেল। গ্লাসে গ্লাসে বাংলা। কাগজের প্লেটে চানাচুর। হাতে গ্লাস তোলার আগে ক্লাবের সব থেকে বাচ্চা ছেলেটাকে ডাকল নবা। বলল, “খেয়াল রাখিস, পাগলিটা ফিরলে রুটি দিয়ে আসবি গিয়ে।“ ছেলেটা ঘাড় নাড়ল। ছাদের ধারে গিয়ে দাঁড়ালো যাতে পাগলিটা ফিরলেই দেখতে পায়। নবা গ্লাস তুলে চুমুক দিতে দিতে দুপুর থেকে ভেজে রাখা প্ল্যানটা খুলে বলল ছেলেদের। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাঁদা তোলার কাজটা যত শিগগির সম্ভব শুরু করতে হবে। দিন পনেরো মাত্র আছে হাতে। ওরাই শুরু করুক। ঝামেলা হলে নবা যাবে। টাকা এলে কেনাকাটা করতে হবে। শুধু ওই শুঁটকে দত্ত বুড়োর কাছে নবা নিজে যাবে। ছেলেদের বলল, “ডি জে বক্সটা কালকেই কথা বলে রাখ। আর একটা বিল বই কিনে আনবি। চাঁদা তুলতে লাগবে।“ পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরাল নবা। দুটো টান মেরে গলাটা খাদে নামিয়ে যেন নিজের সাথেই কথা বলছে এমনভাবে বলল, “রুনা বউদির কাছেও আমিই যাবো।“

কথায় কথায় সময় গড়ায়। একসময় ছাদের মাটিতেই শুয়ে পরে নবা। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, “সব্বার স্বাধীনতা আছে। সব্বার স্বাধীনতা দিবস আছে।“ ছেলেরা বুঝে যায় ধুনকি চড়েছে নবার। 

“গুরু, রুটি তড়কা খাবে নাকি? মাসির দোকান থেকে?” একজন বলে।

হাত নেড়ে নবা বলে , “তোরা খা।“ বলেই চুপ করে যায়। মাথার ভেতরটা হালকা হয়ে আসছে ওর। চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছে যেন বিরাট একটা দোলনায় ও শুয়ে আছে আর কেউ দোলাচ্ছে সেই দোলনাটা। নিজেকে পালকের মত হালকা মনে হচ্ছে। এখন রুনা বৌদিকে পাশে ডেকে নিলেই বা আটকাচ্ছে কে? তুলোর মত হালকা শরীরে, মাখন মাখন বৌদিকে পাশে নিয়ে ভেসে গেলেই বা দোষ কী? স্বাধীনতা … স্বাধীনতা… ফুলটু মস্তি।

ঠিক সেই মুহূর্তে ছাদে উঠে আসে সেই ছেলেটা, যাকে একটু আগেই নবা দায়িত্ব দিয়েছিল পাগলিটা ফেরার দিকে নজর রাখার। “একবার নীচে চল তো। পাগলিটা কেমন করছে।“ গলার উত্তেজনা চাপতে পারেনা বাচ্চা ছেলেটা। 

“কী হল আবার?” শুয়ে শুয়েই জানতে চাইল নবা। 

“জানিনা দাদা। কেমন একটা করছে। খাবার দিলাম। নিল না। ছুটে বেড়াচ্ছে গোল গোল…”

“যা তো, দেখ কী হল…” নবা এক সঙ্গীকে বলে।

দুজনে নেমে গেলো নীচে। একটু পরে আবার উঠে এলো ওপরে। বলল, “শালি কী যে বলছে বুঝতে পারছি না। বাওয়াল হয়েছে কিছু একটা। নবা দা, একবার দেখবে না কি?” একটু ইতস্তত করে বলল ওরা। একটু গড়িমসি করেই উঠে বসল নবা। পাগলি হলেও পাড়ার মানুষ তো বটে। খেয়াল রাখাটা ওর কর্তব্যের মধ্যেই পরে। টাল সামলে উঠে দাঁড়ালো। জলের বোতলটা তুলে কোনায় গিয়ে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে নিল খানিকটা। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো।

নবাকে দেখেই হাউমাউ করে উঠল পাগলি। জড়িয়ে জড়িয়ে অনর্গল কিছু বলে যাচ্ছে, নবা বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারল না। “আরে ঠিক করে বল না…” ধমকে উঠল নবা। মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো পাগলি। তারপর আচমকাই নবার একটা কব্জি ধরে ফেলল নিজের মুঠিতে। টানতে লাগলো রাস্তার দিকে। নবার সাঙ্গপাঙ্গরা হইহই করে উঠল। ছাড়িয়ে দিতে চাইল পাগলির হাত। হাত তুলে ওদের থামতে বলল নবা। নেশা উড়ে গেছে ওর। চোখ দুটি স্থির। শান্ত। “কিছু একটা গড়বড় আছে। চল, দেখতে হবে।“ ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল ও। তারপর পাগলির দিকে ফিরে বলল, “চল, কোথায় নিয়ে যাবি।“        

সরকারদের পুরনো বাড়িটা ভেঙ্গে ফ্ল্যাট হচ্ছে। খাঁচা দাঁড়িয়ে গেছে। গাঁথনির কাজও শেষের দিকে। পাগলি নবাকে টানতে টানতে ওর ভেতরেই নিয়ে চলল। গন্ধ পাচ্ছে নবা। কিছু একটা গন্ধ পাচ্ছে। লোহা বের করা সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়েও থেমে গেলো। ঝুঁকে পাগলির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “তুই যা তোর জায়গায়। এখানে আমরা আছি।“ পাগলি জোরে জোরে মাথা নাড়ে… যাবে না সে। চোখ বড় করে নবা। ধমকের সুরে বলে, “যাবি তুই? আমাকে রাগাস না, বলে দিলাম।“ কী বুঝল কে জানে, পাগলিটা ওর হাত ছেড়ে চলে গেলো। মুহূর্ত দেরী করলনা নবা। একসাথে দু-তিনটে সিঁড়ি পেরিয়ে দুদ্দারিয়ে উঠতে লাগলো। তিনতলার মুখে এসে থেমে গেলো। নিচু গলায় কথা বলছে কারা। গেলাস, বোতলের টুংটাং শব্দ। কিন্তু সব ছাপিয়ে কানে এসে ধাক্কা মারছে একটা চাপা গোঙ্গানি। 

রাস্তার ছিটকে আসা আলোতে সে দেখলো তিনজন ছেলে, দেখে মনে হয় বাড়ির মিস্তিরিগুলোই, বসে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বোতল গেলাস ছড়ানো। আসর চলছে পুরো দমে। একজন উঠে দাঁড়ালো। টলছে যেন একটু একটু। এগিয়ে যাচ্ছে আরও ভেতরের দিকে, যেদিক থেকে গোঙ্গানির শব্দটা আসছে। 

নবার চোখ খুঁজছিল গোঙ্গানির উৎস। ওই লোকটাই যেন দেখিয়ে দিল। টলতে টলতে গিয়ে জোরে একটা লাথি কষাল মাটিতে পরে থাকা কোন কিছুর গায়ে। ততক্ষণে অন্ধকার সয়ে গেছে নবার চোখে। পরিষ্কার দেখতে পেল একটা মেয়ে পরে আছে মাটিতে। হাত পা পিছমোড়া করে বাঁধা। পোশাকের বেশিরভাগ অংশই ছেঁড়া, ঠোঁটের কোণে রক্ত ঝরছে, মনে হয় আগেও মার খেয়েছে। মেয়েটার বয়স চোদ্দ পনেরোর বেশী হবে না। পাড়ার নয়, বোঝাই যাচ্ছে। তাহলে আর কেউ না হোক, নবা ঠিক চিনতে পারত।

লাথি পরতেই গোঙ্গানিটা যেন একটু জোরে হল। “শালী, তেজ দেখনা।“ বলে পেছন ফিরে বসে থাকা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “কই রে, আয় তোরা। দেখবি না? তারপর তো আবার তোদের পালা… আয় আয়…”  

“যাক, তার মানে এখনও কিছু করেনি। জয় মা তারা” বলে, ছেলেগুলোকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়েই নবা ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ওপর। সাথে নবার গোটা দলবল। কিন্তু ছেলেগুলোও রাজমিস্ত্রি। গায়ে জোর তো আছেই আর একেবারে নিরস্ত্রও নয়। কিন্তু নবারা সংখ্যায় বেশী। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবা একজনকে মাটিতে ফেলে বুকের ওপর চেপে বসল। দুহাতে টিপে ধরল তার গলা। আর তখনই কেউ একজন একটা লোহার রড সোজা ঢুকিয়ে দিল নবার কাঁধের পাশ দিয়ে। রডটা হাতের মাংপেশি ফুটো করে গেঁথে গেলো অনেকটা। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেও হাত আলগা করল না একটুও নবা। গণ্ডগোলের আঁচ পেয়ে লোক জুটে যেতে সময় লাগেনি। টর্চ, মোবাইলের আলো। পাড়ার লোকেদের মাঝে রুনা বউদিকেও দেখতে পেল নবা। কোন কথা না বলে আগেই নিজের সালওয়ারের দোপাট্টা দিয়ে ঢেকে দিল মেয়েটাকে। তারপর নবার দিকে তাকিয়ে বলল, “হা করে দেখছো কী, নিজের অবস্থা দেখো, প্রচুর রক্ত পড়ছে যে। কেউ একটা এ্যাম্বুলেন্স ডাকুন প্লিজ।“

কেউ একজন ফোন করেছিল স্থানীয় থানায় ফোন করেছিল। পুলিশ এসে পড়ল এ্যাম্বুলেন্সের আগেই। ততক্ষনে মেয়েটার জন্য একটা জামা আনা হয়েছে। রুনা বৌদি সেটা পরিয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে। আর রুনা বউদির সেই ওড়নাটা, যেটা দিয়ে মেয়েটাকে ঢেকে দিয়েছিলও, সেটা এখন নবার হাতে জড়ানো। ফালি হয়ে যাওয়া হাত চেপে বেঁধে রাখা হয়েছে। পুলিশ এসে প্রথমেই মেয়েটার বয়ান নিল। যে কনস্টেবলটা মাস ছয় আগে একটা ছুটকো কেসে নবাকে থানায় ডেকে কেলিয়েছিল, সে মেয়েটার বয়ান শুনে নবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “বাঘের বাচ্চা রে তুই! জানতাম না তো!“ 

একটু পরে এম্বুলেন্স এসে গেলো। নবা আর ওই বাচ্চা মেয়েটাকে তুলে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল, রুনা বৌদি জোর করে সাথে চলল। বৌদি মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর মাঝে মাঝেই দেখে নিচ্ছে নবার হাতের বাঁধন ঠিক আছে কিনা। পেছনের দরজার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নবা ভাবছিল তাহলে সেই দিন এলো, যে দিনের জন্য নবা এত অপেক্ষা করে ছিল। বৌদি ওর সাথে কথা বলছে, ওর পাশে বসে মাঝে মাঝেই হাত রাখছে ওর হাতে। আশ্চর্য হয়ে নবা আবিষ্কার করল বৌদিকে এখন তার অন্যরকম ভালো লাগছে। আগের থেকে আরও অনেক বেশী। অনেক গভীর। কিন্তু কোন খারাপ চিন্তা আসছে না আর। চেষ্টা করলেও না। উল্টে ঠিক যেন মায়ের মত লাগছে। 

তখনই হাঁটুর ওপর আলতো হাতের ছোঁয়া পেল একটা। ফিরে দেখে বাচ্চা মেয়েটা শুয়ে শুয়েই হাত বাড়িয়ে হাঁটু ছুঁয়েছে নবার। ওর দিকে তাকাতেই বলল, “ধন্যবাদ দাদা”।

আরেহ্‌! নবা তো অবাক! এই দাদা হবার জন্য কত কিছুই না না করেছে এত দিন ও। এতো সহজ? এত সহজ দাদা হওয়া?

অবশেষে সেই পনেরই আগস্ট এসে পড়ল। প্রথা মতো, এই দিনে পাড়ার বুড়োদের খোঁজ পরে। আজও তাই হলো। নবাও হাজির এক হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে। সে দিনের সেই ঘটনার পর সব কেমন বদলে গেছে ওর জীবনে। কেউ আর খিস্তি করে কোন কথাই বলছে না। দেখা হলেই হেসে কুশল জিজ্ঞাসা করছে। এমনকি ওই পাগলিটাও ওকে দেখলেই খুশি মুখে হাসছে। নবা ঠিক করেছে ক্লাবের পেছনে পাগলিটার জন্য একটা ঘর তুলে দেবে। পাড়ার লোকে এক কথায় রাজি হয়েছে চাঁদা দিতে। এতকিছু দেখে নবা আজকাল একটু লজ্জাই পাচ্ছে। আজও লাজুক মুখে দাঁড়িয়েছিল দূরে। কিন্তু সে আর হল না। দত্তবাবু মাইকের সামনে গিয়ে ওর নাম ঘোষণা করলেন। পতাকার নীচে আসতে বললেন। ছেলেরা ঠেলে তুলে দিল নবাকে পতাকার সামনে। দত্তবাবু নবার হাতে দড়িটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “নাও এ দায়িত্ব, তুমিই পারবে এ ভার বইতে।“

পতাকা উঠলো, জাতীয় সংগীত বাজলো ডি জে বক্সে। নবা বিড়বিড় করে আওড়ালো ছোটবেলায় শেখা জাতীয় সংগীত।

আজ নবার স্বাধীনতা দিবস।



সন্দীপা বসু

শুধুই একজন লেখক। লেখক আর পাঠকের মাঝে অন্য কোন পরিচয়ের দেওয়াল থাকতে নেই বলেই লেখিকার বিশ্বাস।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।