সুবর্ণরেখা

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় on

subarnorekha.jpg

বিকেল, পৃথিবীর একটা আশ্চর্য সময়। হাওয়াটা যেন হঠাৎ করেই কেমন একটা ঠান্ডার আমেজ নিয়ে আসে। আকাশটা তখনও লাল। দূরের আকাশে একেকটা মেঘের টুকরো, ঘন কমলা রঙ। বৃষ্টি হবে বোধহয়। রেণুর, সুব্রতকে মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল শেষ যেবার, সুব্রতকে নিয়ে সে এই জায়গাটায় বেড়াতে এসেছিল – পুলুর বয়স তখন সাত বছর। সময় কিভাবে হারিয়ে যায়। রেণুর একটা শ্বাস পড়ল। বাড়ি ফিরতে হবে। পুলু খানিক দূরে একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যারাজটার ছবি তুলছিল। বৈশাখের শেষ। ইংরেজীতে মে-মাসের মাঝামাঝি। নদীতে জল শুকিয়ে এসেছে। বড় বড় পাথর স্তুপ হয়ে রয়েছে। ব্যারাজের ওপারে একটি জলাধার। এপার থেকে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাতেও যে জল বড় বেশী আছে তা নয়। নদীর নাম সুবর্ণরেখা। সময় কিভাবে হারিয়ে যায়।

-“পুলু, এবার বাড়ি যাই নাকি ?” রেণু একটু গলা তোলেন।
-“আর কটা স্ন্যাপ নিয়ে নিই মা, ইনস্টাগ্রামে দিতে হবে তো – এরকম লোকেশন তো আবার কবে পাবো তার ঠিক নেই,” পুলু ছবি তুলতে থাকে।

এই এক সোশ্যাল মিডিয়া হয়েছে আজকালকার প্রজন্মের। যেখানেই যাও না কেন, সঙ্গে যাচ্ছে ওয়াইফাই, নেটফ্লিক্স আর ইনস্টাগ্রাম। রেণু অতশত বোঝেন না। কেবল বলেন, “আচ্ছা, কিন্তু আর বেশীক্ষণ নয়। আকাশের অবস্থা মোটেই ভালো ঠেকছে না।”

-“না না, একদম না – ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটে আর কয়েকটা নতুন এ্যাংগল ট্রাই করব জাস্ট, ব্যস! পাঁচ মিনিট,” পুলু মুখ ফিরিয়ে একগাল হেসে আবার তার ক্যামেরাটাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রেণু দূরের মেঘটার দিকে তাকায়। একেকটা সময় পুলুকে ভুলে যেতে ইচ্ছে করে রেণুর। সুব্রতকে নিয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, তার চাকরি জীবনের প্রথম দিনগুলোয়। একদিকে সরকারি চাকরির আরাম, তার উপরে আবার বদলির নেশা। সবমিলিয়ে ভালোই লাগতো তার। কারণ সুব্রত’র কাজের ধরণটাই এমন ছিল যে ওদের বদলির জায়গাগুলোও হতো ততটাই ইন্টারেস্টিং। কোনো শহরে নয়, একেকটা সময়ে তো সেই অর্থে জনপদ বলতে যা বোঝায় তাতেও নয়। সুব্রত’র কাজ ছিল ফরেস্ট সার্ভিসে, বদলি হতে হত এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম – বিশাল ভারতবর্ষের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পোস্টিং পড়ত। রেণুর ভালো লাগত খুব। প্রকৃতির কোলে এভাবে সারাটা জীবন কাটানোর যে আনন্দ, রেণুর মনে হয় আর কেউই সেটা বুঝবে না।

পুলু কলকাতার বোর্ডিংয়ে পড়ত। ছুটিতে আসত বাবা মার কাছে। এই সুবর্ণরেখা থেকেই চাকরি জীবন শুরু করেছিল সুব্রত। হয়তো এই কারণেই বাংলা ঝাড়খন্ড সীমান্তের কাছে এই জায়গাটাই, রেণুর কাছে বারবার বিশেষ অর্থবহ হয়ে থেকেছে। আজ, সুব্রত অপেক্ষা করছে ডাকবাংলোতে। রেণু ওর কাছে ফিরতে চায়।

-“তুমি আসবে না আমার সঙ্গে ? নদীটাকে একবার দেখবে না ?”
-“তুমি যাও,” সেই একইরকমের ভাবলেশহীন একটা চাউনি। রেণু আর জোর করে না। বরং মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডক্টর বৈদ্যকে একটা ফোন করতে চেষ্টা করে।

-“হ্যালো, ডক্টর বৈদ্য বলছেন ?”
-“হ্যাঁ, কথা বলছি – আপনি মিসেস চক্রবর্তী তো ? হ্যাঁ বলুন,”
-“ও যে ডাকবাংলো ছেড়ে বেরুতেই চাইছে না ডাক্তারবাবু। বলছে ক্লান্ত, ইচ্ছে করছে না, কি করা যায় বলুন তো ?” রেণুর গলায় উদ্বেগ নেই তেমন। গত তিন বছর, এই নিরুত্তাপ সুব্রতর সঙ্গে ও নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছে। ওর আর অসুবিধে হয় না এসবে।
-“দেখুন ম্যাডাম, আপনারা একটু ক’দিন সময় দিন ওনাকে। আপনারা তো এখন ওখানে থাকছেন কয়েকদিন ?”
-“হ্যাঁ, আপাতত তো পাঁচদিনের ব্যবস্থা হয়েছে। প্রয়োজন পড়লে …”
-“আপাতত পাঁচদিনই দেখুন না। দুতিনদিন থাকলে পরেও তো ওনার মনে ইচ্ছে হতে পারে যে একটু বাইরেটা বেরিয়ে দেখার। আপনি চিন্তা করবেন না একদম, আমি সবসময় এ্যাভেলেবল আপনাদের জন্য।”

রেণু অল্প হাসে, “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। পুলুও দিন দশেকের ছুটি নিয়েই এসেছে, দেখা যাক এখন,”
-“অল দ্য বেস্ট মাদাম, ভাগ্য আপনার সহায় হোক, ঈশ্বরের কাছে এই প্রার্থনাই থাকবে আমার,” ডক্টর বৈদ্য ফোন নামিয়ে রাখেন।

“ঈশ্বর” শব্দটাকে রেণু আনমনেই একবার উচ্চারণ করে। বিশ্বাসটা যেন হারিয়ে গেছে কোথাও।

-“হয়ে গেছে মা, চল …” পেছল বোল্ডারগুলোর ওপর দিয়ে লাফ দিতে দিতে বিপজ্জনক ভাবে এগিয়ে আসছিল পুলু অর্থাৎ প্রণব, রেণু আর সুব্রত’র একমাত্র সন্তান। রেণু ধমক দেন।
-“এইই, কি হচ্ছেটা কি ? কতবার করে তোকে বলেছি না, ওভাবে বোল্ডারের উপরে লাফাবি না !” তিনি প্রায় চিৎকার করে ওঠেন।
-“ওহহ, সরি মা সরি,” পুলু বলে ওঠে, “আঃ তুমি খালি চিন্তা করছ আজকাল। কাম অন, কিছু হবে না আমার – দিস ইজ নট অরুণাচল …”
-“পুলু!” রেণুর গলা চিরে গেলো প্রায়।
-“সরি মা,” পুলু মাথা নামিয়ে নিয়েছে। ওর ভুল হয়ে গেছে। রেণু রুমালে মুখ ঢাকেন।

অরুণাচল। জায়গাটার নাম মুখে আনতেও রেণুর ভয় করে। ভালো লাগে না তার। তিনবছর আগে সুব্রত’র শেষ পোস্টিং, বমডিলায়। বমডিলা থেকে আরেকটু ইন্টিরিয়রে। রেণুর খুব আনন্দ হয়েছিল। চাকরি জীবনের একদম প্রথম দিকে কিছুদিন মেঘালয়ে কাটালেও, আরও উত্তর-পূর্বের অরুণাচলে এর আগে কখনও সুব্রতদের আসতে হয়নি। সেদিন অনেক রাত,

বিরাট বাংলোটার বারান্দায় রেণু একা বসে আছে। পুলুর সঙ্গে বিকেলে কয়েকবার কথা হয়েছে, সুব্রত তখনও ফেরেনি। এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে রেণুর পরিচিতি আছে। চাকরিজীবনে সুব্রতকে একাধিকবার এভাবে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে । বিভিন্ন জঙ্গলে কাঠপাচারকারী অথবা চোরাশিকারীদেরকে শায়েস্তা করতে বেরুতে হয়েছে তাকে। টানা কয়েকটা রাত সে বাড়ি ফিরতে পারেনি, এরকমটাও অভিজ্ঞতা আছে রেণুর। প্রথম প্রথম তার ভয় করত, কিন্তু ক্রমশ এসব তার গা সওয়া হয়ে গেছে। আজও হয়তো সেইরকম। সুব্রত সবসময় তাকে বলেও যায় না যে কোথায় যাচ্ছে সে। কেবল বলে যায় যে, ফিরতে রাত হতে পারে। রেণু যেন খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে, তার জন্য অপেক্ষা না করে। রেণু এসবে অভ্যস্ত। কিন্তু আজ, কোথায় যেন একটা অস্বস্তি হয়ে চলেছে। রেণুর ঘুম আসছে না। দুএকবার উঠে জল খেল। তারপর থেকে বারান্দায় বসে আছে, তার ঘুম আসছে না।

বাংলোটা হাইওয়ের ওপরেই। জঙ্গলের বুক চিরে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে উত্তরে, খুব সম্ভবত তাওয়াং। এশিয়ার সবচাইতে বড় বুদ্ধমূর্তির অবস্থান সেখানে। রেণু একবার বারান্দার রেলিংটাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এজায়গায় মিলিটারি যানবাহনই বেশী। ৬২’র চীন যুদ্ধের পর, সেই যে অরুণাচল নিয়ে ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছে দু’দেশের ভিতরে – তারই লংটার্ম এফেক্ট। রেণু একটা শ্বাস ফেলে। ফেলতে গিয়েও থেমে যায় হঠাৎ – গাড়ির শব্দ না ?

হ্যাঁ, তাইই তো। দূরের অন্ধকারে বুক চিরে হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা মিলিটারি জীপ ছুটে আসছে। রেণু রেলিং ধরে ধরে আরও দুপা এগিয়ে আসে। গাড়িটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ঠিক রেণুদের বাংলোটার সামনে এসে দাঁড়ায়। সেনার উর্দিতে কমবয়সী একটি শিখ নেমে আসে, “আপনিই মিসেস আর চক্রবর্তী ?” –“হ্যাঁ, কি ? কি হয়েছে ওর ?” রেণুর গলা দিয়ে একটা চাপা কান্নার মতো আওয়াজ।

-“মিসেস চক্রবর্তী, উই হ্যাভ ট্রায়েড আওয়ার বেস্ট। উনি এতদিনকার একজন পোড় খাওয়া অফিসার, কোনও দরকার ছিলো না ওভাবে নালাটাকে অত তাড়াহুড়ো করে পেরুতে যাওয়ার, মোস্ট অব দ্য মিসক্রিয়েন্টস ওয়্যার অলরেডি নিউট্রালাইজড। কিন্তু তা সত্ত্বেও,” সেনা হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক মাথা নামান, “ব্লিডিং যে খুব বেশী হয়েছিলো তা নয়, খুব তাড়াতাড়িই আমরা অপারেট করেছি, বাহাত্তর ঘন্টা কেটে গেছে, হি ইজ আউট অব ডেঞ্জার নাও – কিন্তু,”
-“আপনি বলতে পারেন ডক্টর, আমি নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছি – সবকিছুর জন্য,” রেণুর গলা শুকিয়ে গেছে।
-“লুকস লাইক, ওনার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, হি হ্যাজ সাফারড এ মেজর মেমরি লস,”

রেণুর ভেতরটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসে। প্রথম সূর্যের দেশ – অরুণাচল।

-“ডক্টর বৈদ্য’র আইডিয়াটা কিন্তু খুব ইনোভেটিভ, এটা মানতেই হবে তোমায়,” পুলু বলে ওঠে। ওরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে আসছিল। দুপাশে ধু ধু জমি। এদিকটায় এখনও সভ্যতা হাত বসাতে পারেনি। একেকটা ছোটো ছোটো জমিতে কিছু কিছু সবুজের চিহ্ন দেখা যায়। লাল মাটিতে চাষের চেষ্টা ততটাও ফলপ্রসূ হয়নি। বাংলোটা নদী থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার। একটা ঢিলার ওপরে। দূরে দলমার রেঞ্জ দেখা যায়। এখন চৈত্রমাস। হাতিরা গ্রামে নেমে আসবে। সামান্য যেটুকু ফসল – দলমার দাঁতালদের সামনে চাষীদের অসহায়তা দেখা আছে রেণুর। সেই সব নিয়ে তিনি আজ আর ভাবিত নন। কেবল অনেকদূরে, পিছনে তাকিয়ে তিনি দেখলেন – ব্যারাজটা যেন ক্রমশ ম্লান হয়ে এসেছে। আর ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, “হ্যাঁ আইডিয়াটা তো ইনোভেটিভ, নিঃসন্দেহে,” তিনি পুলুর কথায় সায় দিলেন।

-“এভাবে পুরোনো জায়গাগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে অকেজো মেমরি সেলগুলোকে আবার নতুন করে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা,” পুলু বলে চলে, “নাঃ ইনোভেটিভ! তুমি দেখ মা – বাবার ঠিক সব মনে পড়ে যাবে,” পুলু মার হাতটাকে জড়িয়ে ধরে হঠাৎ।

রেণুর শরীরটা কেমন করে ওঠে। সুব্রতও ঠিক এভাবে ওর হাতটাকে জড়িয়ে ধরত। সেই উষ্ণতাটাই যেন পুলুর মধ্যেও ফিরে এসেছে। রেণু নিজেকে সামলে নেয়। এতগুলো বছর।

আকাশের মেঘটা থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। লক্ষণ ভালো নয়। ওরা দুজনে তাড়াতাড়ি পা চালায়। আকাশের রঙটা ক্রমশ লাল থেকে গাঢ় খয়েরীর দিকে মোড় নিচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকাল আবার। ঝড় এসে পড়েছে। বাংলোর হাতায় ঢুকতে না ঢুকতেই রেণুর চোখে পড়ল একটা পুরোনো মারুতি ওমনিও পার্ক করা রয়েছে। ওদের চকোলেট রঙের ইনোভাটার পাশেই। বৃষ্টির দাপট সামলাতে সামলাতে আর বেশী কিছু দেখা হয়ে ওঠে না। তুমুল ঝড়ে শুকনো পাতার দাপটে সবকিছু ওলটপালট।

-“আসুন আসুন ম্যাডাম,” বেয়ারাদের একজন দৌড়ে আসে, “ইসস একেবারে ভিজে গেছেন যে, ফ্রেশ তোয়ালে দেওয়া আছে ম্যাডাম আপনাদের ঘরে – আপনারা,”
-“একমিনিট, সেসব হবেখন – কিন্তু সাহেব কোথায়, ওনার কোনোরকম অসুবিধে হয়নি তো ?” রেণু জিজ্ঞেস করে।
-“কোন অসুবিধে নেই ম্যাডাম, উনি ডায়নিং রুমে আছেন। কফি চেয়েছিলেন, দিয়েছি। উনি দিব্যি আছেন,” বেয়ারা জবাব দেয়।
-“আচ্ছা,” একটা শ্বাস পড়ে রেণুর।

কোন অসুবিধে নেই, সত্যিই – কোন অসুবিধে নেই মানুষটার। বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই। শান্ত যেন তথাগত বুদ্ধের মত একটা দৃষ্টি নিয়ে মানুষটা কাটিয়ে দিয়েছে তিন বছর। কাউকে চিনতে পারে না। চেষ্টাও করে না চেনবার। কেবল শান্ত হয়ে উঠতে বলে ওঠে, বসতে বললে বসে – আর হ্যাঁ মাঝে মধ্যে কফির আবদার করে। ওই বোধহয় একটিই নেশা, ওর স্মৃতিতে কোনোভাবে রয়ে যেতে পেরেছে। রেণু নিজের ঘরে দিকে যায়। পুলু ওর বাবার সাথে আছে। ঘরে গিয়ে দরজা আটকে ভালো করে স্নান করে সে। হঠাৎ যেন তার ভীষণ গরম লাগছিল। স্নান করে গায়ে তোয়ালেটা জড়িয়ে বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখে রেণু। কতদিন এভাবে সে নিজেকে দেখেনি। বয়স বাড়ছে ওর। চুলের গোছগুলোতে পাক ধরতে শুরু করেছে, চামড়াতে দুটো-একটা ভাঁজ।

রেণুর চোখদুটো ভিজে ওঠে হঠাৎ। এমনিতে সে মোটেও আবেগপ্রবণ নয়। কিন্তু, মানুষ তো কেবল দুঃখে কাঁদে না – কাঁদে ক্লান্তিতেও। রেণু বোধহয় ক্লান্ত। মাসের পর মাস এই নিঃস্তব্ধতা। কেবল স্বামীর নামে একটা নিঃস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করে রেখেছে। কোন সাড়া নেই, কোন শব্দ নেই, ঝগড়া নেই, মান অভিমান নেই, রাগারাগি কান্নাকাটি ভালোবাসা – কিছুই নেই। একটা নিঃস্তব্ধতা। দুফোঁটা জল পড়ল বেসিনের ওপর। রেণু লজ্জা পায়। তবু, একেকটা সময়ে মানুষকে কাঁদতে দেওয়া উচিত। রেণুর ভেতরটা কেমন যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে। রেণুর বোধহয় আরও কিছুক্ষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু … দরজায় শব্দ হচ্ছে, কড়া নাড়ছে কেউ।

“সেদাই দিন রেনা কথা চিকম হিরিঞ্জা – মসে মেতেঞ জেলা অন্তর কথা অনাকি হিরিঞ্জা …”

সুরটা আশ্চর্য পরিচিত, কিন্তু শব্দগুলোকে ধরতে ধরতেই যেন রেণুকে চমকে দিয়ে আবার ধরলেন ভদ্রলোক, এবার শব্দগুলো বাংলাতে বদলে গেছে,

“পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায় ও সে চোখের দেখা প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায় …”

রেণু একদৃষ্টিতে সুব্রতকে দেখছিল। সুব্রত’র ঠোঁট নড়ছে। সুব্রত গান গাইছে। সাঁওতালী ভাষায় এই গানে সুব্রতকে ও শেষ কবে ঠোঁট মেলাতে শুনেছে, রেণুর মনে পড়ছে না। কে এই ভদ্রলোক ? কি তার পরিচয় ? নিঃসন্দেহে বাইরের পুরোনো মারুতি ওমনিটা এনারই, কিন্তু এনাকে দেখেই কি সুব্রত’র … নাকি সুব্রত’র কেবল সুরটাকে মনে পড়ছে। সুব্রতকে হঠাৎ গান গাইতে দেখেই যে উত্তেজিত হয়ে রেণুকে ডেকে এনেছে পুলু, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রেণু ওর সবথেকে কাছের চেয়ারটায় খানিকটা হতবুদ্ধি হয়েই বসে পড়ে। ডায়নিং রুমটায় কেবল ওরা চারজন এখন। ভদ্রলোক গেয়ে চলেন।

“ভোর বেরাগে বহঞ্জ গদা, দোলারেলঙ দোলে, তিয়াও আরাঞ সেরেঞ্জ অলঞ বকুল বুতরে …”

“তার মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি গেলেম কে কোথায়, আবার দেখা যদি হলো সখা, প্রাণের মাঝে আয় …” রেণু বাদে আর সবাই গাইছে। রেণু যেন আর সকলের মধ্যে কেমনটা বোকা বনে গেছে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বাজ পড়ছে একেকবার। সুব্রত যেন অস্ফূটে ডাকল একবার, “রেণু …” পুলু ওর মার পাশে এসে দাঁড়ায়।

-“আপনি আমাকে চিনবেন না ম্যাডাম, রেঞ্জার সাহেব আমাকে চিনতেন। আপনার সঙ্গে আমার কখনও আলাপ হয়নি,” ভদ্রলোক রেণুকে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করেন। সুব্রতকে নিয়ে পুলু ঘরে গেছে। ওকে ওষুধ খাওয়াতে হবে।

-“বিয়ের পর আপনি এখানে এসেছিলেন, কিন্তু তার আগে থেকেই বোধহয় এখানে ওনার পোস্টিং ছিল, তাই নয় কি ?” ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন।
-“হ্যাঁ, আমি আসার পর – উনি, মানে আমরা এখানে মাত্র তিনমাস মত ছিলাম। পরে অবশ্য আমরা এসেছিলাম আবার, কিন্তু,”
-“ওই মাস তিনেকে আপনার সঙ্গে আলাপ হয়নি। কিন্তু তার আগে রেঞ্জার সাহেব প্রায় সাত মাস ছিলেন এখানে, তখনই আমার সঙ্গে ওনার পরিচয়।”

রেণু কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যেতে থাকে। একেকটা ছবির মত দৃশ্যপট যেন ক্যালাইডোস্কোপে সাজিয়ে ওর সামনে ধরে দিয়েছে কেউ।

“আমি তখন স্কুলে পড়ি বুঝলেন,” ভদ্রলোক বলছিলেন, “এদিকে বুঝতেই পারছেন – সংসারে অভাব ছিল। আমার বাবা ঝুমুর গাইতেন, সাঁওতালী ফোক সং গাইতেন এদিকওদিক, তাতে একরকম ভাবে চলে যেত। কিন্তু টানাটানির সংসার ছিলো আমাদের। মা দুচারজনের বাড়িতে কাজ করতেন। এইসময় যা হয়, উঠতি বয়স – লোভে পড়ে চোরাশিকারীদের ইনফর্মার হিসেবে কাজ করতে শুরু করলাম। শুধু খবর এনে দিতে পারলেই কাঁচা পয়সা। লোভ বেড়ে গেল। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরবার পথে, সকালে যাবার সময়, থানায় – রেঞ্জ অফিস বীট অফিসে, আড়ি পাততে শুরু করলাম। বাচ্চা ছেলে বলে কেউ গা করতো না অতটা। দুএকজন কনস্টেবলের সঙ্গেও ভাব জমিয়ে ফেলেছিলাম। কাজেই, তাদের কাছ থেকে ‘গল্প শুনব গল্প শুনব’ করতে করতে, কবে তারা এ্যাকশনে বেরুবে তার – দুচারটে কথা হলেও জেনে ফেলতাম। বাজারের কাছে একটা চায়ের দোকান ছিলো আমার রিপোর্টিং পয়েন্ট। সেখানে আমার যে হ্যান্ডলার, পরে বই পড়ে জেনেছি ওদেরকে হ্যান্ডলার বলে – সেই লোকটা এসে আমার থেকে সব জেনে যেত, যাবতীয় খবর। পয়সাটাও ওই দিয়ে যেত, দু’তিনদিন পরেপরেই। টুকিটাকির হাতখরচাটা ভালোভাবেই উঠে যেতো আমার,” ভদ্রলোক একটু দম নেবার জন্য থামেন।

রেণু কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় না। সে কেবল শুনবে আজ।

-“এরপর একদিন, রেঞ্জার সাহেব আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ওনার অফিসঘরের জানালাটার নীচে বসে আড়ি পাতছিলাম, কপালে অশেষ দুঃখ ছিলো আমার। কিন্তু,” ভদ্রলোক অবাক গলায় বলে ওঠেন, “এটাই আশ্চর্য যে তেমন কিছুই কিন্তু বললেন না উনি আমায়। কেবল কথাগুলো সমস্ত জেনে নিলেন, ধমকধামক দিলেন বেশ খানিকটা। বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। এরপর আর চায়ের দোকানের সেই লোকটাকেও আর কোনোদিন সেখানে আসতে দেখিনি। বোধহয় উনি তাকেও ধরে ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই থেকে, আমার ওপর নজর বেড়ে গেলো ওনার। সপ্তাহে, কি পনেরো দিনে একবার করে এসে বাবার কাছ থেকে আমার খোঁজ নিয়ে যেতেন। আমার গলায় গান ছিলো,” ভদ্রলোক মাথা নামান, “একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে আবার ধমক দিলেন, ‘এত সুন্দর গানের গলা তোমার, আর তুমি কি না ওই সমস্ত বাজে লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়েছিলে! বনের নিরীহ জানোয়ারগুলোকে ওরা মেরে ফেলত যখন, কষ্ট হতো না তোমার!’ আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি। উনি আমাকে আরও ভালো করে বাংলা পড়তে শেখাচ্ছিলেন। উনি যে সাঁওতালি জানতেন, আমার জানা ছিলো না। বাবার কাছ থেকে সাঁওতালিতে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে খুব ভালবাসতেন উনি। তারপর, আপনি এলেন” ভদ্রলোক সলজ্জভাবে হাসেন, “আমার সাথে দেখাসাক্ষাৎ কমে গেল ওনার। আপনারাও আর বেশীদিন রইলেন না এখানে। আর আজ, এতদিন পরে,” ভদ্রলোক বড় বড় চোখে তাকান, “ভাবতে পারিনি ম্যাডাম, যে ওনাকে আবার দেখতে পাব। এতদিন পর,” ভদ্রলোক শার্টের খুঁটে চোখ মোছেন।

-“আপনি,” রেণু আস্তে আস্তে বলে, “আপনি যে আমাদের কতটা উপকার করেছেন সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না, আমি,”
-“কিছু বলতে হবে না ম্যাডাম, আমি কাল আবার আসব,” ভদ্রলোক বলে ওঠেন, “আমার বাড়ি কাছেই। এখানে আসি মাঝে মধ্যে একটু খাওয়াদাওয়া করতে, বিয়ে-থা করিনি। রোজ রোজ কি আর হাত পোড়াতে ইচ্ছে করে বলুন ?” ভদ্রলোক হাসেন, “কাল আসব আমি আবার, সন্ধেয়। মিষ্টি নিয়ে আসব ম্যাডাম। হাইওয়ের ওপরে একটা দোকানে ঘাটশিলা স্টাইলের ভালো রসমালাই পাওয়া যায়,” ভদ্রলোক একটু থেমে যোগ করেন, “উনি খুব ভালবাসতেন।” রেণু আর কিছু বলতে পারে না। পরিবেশটা কেমন সুন্দর হয়ে এসেছে। ভদ্রলোক উঠে পড়েন।

বৃষ্টি কমেছে। পুলু এসে বলল, “বাবা ঘুমিয়ে পড়লেন, ওষুধটা খেয়েই। খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছিল।” রেণু জবাব দিলেন, “ঠিক আছে, তুই বরং আজ রাতটুকু একটু সজাগ থাকিস। কাল সকালে নাহয় অবস্থা বুঝে ডক্টর বৈদ্যকে ফোন করা যাবে।” পুলু ঘাড় নেড়ে সায় দিল। সেই ভদ্রলোক চলে গেছেন। অনেক রাতে একলাটি ঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়ে রেণু ভাবছিল, সময় কিভাবে হারিয়ে যায়।

-“মা, মা!” রেণু ধড়মড়িয়ে বিছানাতে উঠে বসেন, “দরজা খোলো, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো মা, দেরী কোরো না – মা!” বাইরে থেকে পুলু চিৎকার করছে। রেণু কোনোমতে গায়ে কাপড়টা জড়িয়ে দরজাটা খোলেন, হুড়মুড়িয়ে পুলু ঢুকে আসে।
-“কি হয়েছে ?” রেণু জিজ্ঞেস করবার আগেই পুলু বলে ওঠে,
-“সরি মা,” ও হাঁফাচ্ছে উত্তেজনায়, “আমি সকালের দিকটায় কখন যেন একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বাবা -”
-“ কি হয়েছে বাবার!” রেণু বিশ্বাস করতে পারছেন না।
-“বেরিয়ে গেছেন, সাতসকালে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে বেরিয়ে গেছেন। মেন গেটের যে দরোয়ান, সে বললো নদীর দিকে গেছেন, আমি” পুলু খানিকটা ধাতস্থ হয়েছে, “আমি গাড়িটাকে বের করছি তাহলে, চলো যাই। এক্ষুণি যেতে হবে!” পুলু আবার দৌড়ে বেরিয়ে যায়।

রেণুর মাথাটা কেমন যেন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। ওর মন বলছে, বিপদ নেই। বিপদ কেটে যাচ্ছে। এখন, যে করেই হোক শান্ত থাকতে হবে। তিনি মুখেচোখে অল্প জল দিয়ে বেরিয়ে আসেন, ডায়নিং রুমের সামনেটায়। পুলু ওদের গাড়িটাকে গিয়ারের এক ঝটকাতে বের করে আনে। আরেকটু হলেই বাম্পারটা যাচ্ছিল। রেণু নিজেকে শান্ত করতে চেষ্টা করেন।

সুবর্ণরেখা। এখন ভোর। পুলু গাড়িটাকে ব্যারাজের একটু আগেই ব্রেক কষে দাঁড় করিয়ে দিল। মানুষটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখন। ব্যারাজের ওপরে আর একটিও মানুষ নেই। রেণু গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যাচ্ছে। পুলু পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর মন বলছে, এখন আর ওকে প্রয়োজন হবে না। রেণু, সুব্রত’র দিকে এগিয়ে যায়।

-“কথিত আছে এই সুবর্ণরেখার জলে নাকি সোনার রেণু এসে মিশতো, তাই নদীর নাম সুবর্ণরেখা। মনে পড়ে তোমার ?” সুব্রত’র গালে দুতিনদিনের না কামানো দাড়ি। তিনবছরের রুগ্নতা। চোখের তলাকার যে হাড়গুলো এতদিন অল্পস্বল্প করে জানান দিচ্ছিল – আজ সেসব অতীত। রেণু সুব্রত’র দিকে তাকায়।
-“ওর বাবাকে খুন করেছিল জানো, চোরাশিকারীরা। আমি খবর পেয়েও বাঁচাতে পারিনি। আমাদের বিয়ের ঠিক সতেরোদিন আগে। তার পরের দিন রাতেই আমার কলকাতার ট্রেন। ছেলেটাকে যেভাবে কাঁদতে দেখেছিলাম” সুব্রত কথা বলছে, “তারপর থেকেই ঠিক করেছিলাম, কোনও সহানুভূতি নয়। চোরাশিকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে চলতে হবে, তারপর” সুব্রত একটা নিঃশ্বাস ফেলে, “অরুণাচল!”
-“তুমি, তোমার -” রেণু এখনও ভালো করে কথা বলতে পারছে না, “তোমার সব কথা – সবকিছু মনে পড়ে গেছে ?” রেণু যেন অবিশ্বাস করে, “এ কি করে হয় ?”

সুব্রত ঘন চোখে রেণুর দিকে তাকায়। নদীর জলের ওপরে দিনের প্রথম রোদটুকু এসে পড়েছে। চিকচিক করছে সোনালী জল।

-“হয়তো সুবর্ণরেখা, এই নদীর আশেপাশেই হয়তো বা কোথাও – এখনও মিরাকলের জন্ম হয়” সুব্রত যেন কেমনটা শিশুর মতো হয়ে গেছে। অথবা যেন আবার সেই প্রথম যৌবনের উষ্ণতা। রেণু বিশ্বাস করতে চায়। নিজেকে বিশ্বাস করতে চায়। সুব্রতকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে সে মাথা রাখে। পুলু গাড়িটাকে স্টার্ট দিয়ে, তার মুখ ঘোরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সুবর্ণরেখায়, সকাল হয়ে গেছে। এখন আর বাংলোতে ফিরতে ব্যস্ততা নেই কারোর।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন

Categories: গল্প

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।