সরু গলির বিস্ফোরণ

মৃণালিনী ... on

soru_golir_bisforon

অটো ড্রাইভার আজ ট্রাফিক ক্রস করে মার্কেটের রাস্তায় বাঁদিকে দাঁড় করিয়ে উপকার করলেন। রিক্সা ধরতে হলে মেন রোড ক্রস করা ছাড়া আর উপায় নেই। রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে সবে এক দু’পা এগিয়েছি কি বাঁদিক থেকে আসা চলমান অটো রাস্তার জমে থাকা জলের ওপর দিকে সাঁই সাঁই করে চলে গেলেন। সমুদ্রে জাহাজ চালাবার অনুভূতিজনিত সুখ তিনি পেলেন হয়তো কিন্তু এই অধমের ওপর মহা উপকার করলেন। বড় ঢ্রেনের পচাকাদা কালো জলের সঙ্গে রাস্তার ঘোলাটে জলের ককটেল পিচকিরির মতো আমার সাদা জামাকাপড়ে ছিটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

       বর্ষার জলে ভেজাবার দায়িত্ব শুধু আকাশের নয়, এমন আহাম্মক, কিছুটা নির্বোধ হয়তো পুরোটাই স্বার্থপর এই বিচিত্র জীবেদের হাতে রথের চাকা থাকলে মাটিও সে দায়িত্ব পালনে সিদ্ধহস্ত। এরকম ভিজে অবস্থায় শর্টকাট নেবার জন্যে সরু গলিতে পা রাখতেই হঠাৎ চমকে গেলাম।

       না। অদ্ভুত বিচিত্র রকমের আওয়াজ। বৃষ্টি হচ্ছে ঠিক, কিন্তু এ পুরুষোচিত বজ্রবিদুতের আওয়াজ নয়। কয়েক পা এগোতে মহিলা কণ্ঠের বিদ্যুৎ ঝলকানি কানে এল। বজ্রপাত একটু দূরে হচ্ছিল তাই কথাগুলো চমকহীন ফ্যাকাসে।

       দেখলাম, একজন লম্বা, রোগা মতো একটি পুরুষ, মুখে তিন-চার দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে মাথা নীচু করে গলিটার দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা একবার এদিক, একবার ওদিক ছটফট করছে। বেজায় মুখরা মনে হচ্ছে তাকে দেখে কিন্তু তার সারামুখে অর্ধসামান্ত বাক্যের রেষ যেন দীর্ঘ দিনের জমায়িত রোষ প্রকাশ করতে চাইছে। পুরুষটির উদাসীনতায় তিনি তার কথা ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারছেন না বলেই এদিক-ওদিক ছটফট করতে করতে হঠাৎ বজ্রের মতো ফেটে পড়তে চাইছে।

      আমি কোনরকমে উদাসিনীতার বজ্রবিদুৎ ক্রস করতেই বৃষ্টি বিন্দু মতো চকচকে কথাগুলো কান ছুঁয়ে গেল। মহিলাটি চিৎকার মেশানো গলায় বলছে, ‘আর কী চাও তুমি, তোমাকে বিশ্বাস করব! কলকাতায় থাকবার নাম করে সব টাকা নিয়ে নিয়েছ। এখন আমার হাত একেবারে শূন্য। বাড়ি ভাড়া এমনকি কাল কী খাব সে পয়সাটুকু নেই। তার ওপরে ছ’মাস চলছে। কোথায় যাব আমি? এ অবস্থাতেও চাইছ তোমাকে আমার ভাড়া বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সোহাগ করি।’

       আগের চেয়েও চিৎকার, ‘তোমাকে আমি ছেড়ে দেব ভেবছ?’ মহিলাটির মাথায় সিঁদুর ছিল না, হলে সিঁদুরে সরু গলির উপাখ্যান হত।

       আরও কয়েক পা এগোতেই পেছনের ভাব আমার মনে জমাট বাঁধবার আগেই দেখলাম, সামনে থেকে কানে হেডফোন লাগিয়ে এগিয়ে আসছে একটি কালো, লম্বা বিশ- বাইশের ছেলে। রেনকোটের বাইরে বেরিরে আসা মুখটি নড়ছে। তাকে ক্রস করতে করতে ছেলেটির কথাগুলো কানে এসে পৌঁছল, ‘ও বললেই হবে?…. না। আমার পাশে ওকে একেবারে মানাই না। ও চাইলে কি হবে? আমাকে নিজের দিকটাও তো ভেবে দেখতে হবে…. দ্যাখ প্রেম-সেম সব ঠিক আছে। আমাদের মধ্যে আর যা সব হয়েছে তা দুজনের ইচ্ছেতে হয়েছে। এরমধ্যে আবার ওই কথা কেন? এখনও কলেজ শেষ হল না। হা হা হা। ঠিক বলেছিল, ওর মুখের চেয়ে ফিগার বেশি সুন্দর, আর ওই দুটো কী তুলতুলে। তোর ইচ্ছে থাকলে এগোতে পারিস। হা হা হা।’

       ছেলেটি পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেও পেছন থেকে ভেসে এল, ‘তুই যা ইচ্ছে বল ওকে। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। এরপর পেছনে পরে থাকলে সব ছবি, ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে দেব। ও চেনে না আমাকে।’

       নতুন কিছু ভাববার আগেই বাঁপাশে চোখে পড়ল পালবাড়ির বেড়ার ঘরে বিক্ষিপ্ত মাটির টুকরো বর্ষাকালের জন্যে ভেতরে শুকোচ্ছে। উঁকি দিয়ে দেখলাম, মাটির টুকরোর মতো লাগলেও আসলে  সেগুলো বিভিন্ন আকৃতির দেবী দুর্গার মূর্তি। বিবর্ণ ফ্যাকাশে স্তূপের মতো এক কোণে রাখা, এখন রঙ করা হয়নি। শ্রাবণ বৃষ্টির জলে গলে যাওয়ার আতঙ্কে আগলে রেখে দেয়া হয়েছে পরম চিন্তায়।



মৃণালিনী ...

লেখালেখি করতে ভালবাসেন। এছাড়া সিনেমা দেখতে ও বই পড়তে পছন্দ করেন। প্রকাশিত বই- ১.স্বপ্নের ধূসর রঙ ২.বাতিলের একটি দিন ৩. মনেও আছো ব্রহ্মান্ডেও আছো ৪. No Parking জোন ৫. জীবাশ্মের মুখ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।