ব্যস্ততা

শুভঙ্কর চ্যাটার্জী on

আচ্ছা আপনাদের বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয় না? প্রশ্নটা করেই ফেললেন অমীয় সরকার।
-কেন হবে না?
-তখন আপনারা কী করেন?
-এটা কেমন প্রশ্ন হল! বিশ্রাম নেই।
-কীভাবে?
-কীভাবে আবার? সবাই যেভাবে নেয়। চোখ বন্ধ করে।
-বিছানায় শুয়ে পড়েন?
-না শুয়ে নয়।
-তাহলে কীভাবে? বসে না দাঁড়িয়ে?
-দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়া যায় নাকি? বসেই নেই।
চিরিৎ করে খানিকটা থুতু মুখ থেকে পিচকারির মত বের করে ফেলল লোকটা- দেখেন তাহলে আপনাকে দেখাই। এই যে টুপিটা দেখছেন, সাধারণ টুপি। কালো রঙের। শোলার টুপির মত। ভারও নেই। এই টুপি মাথায় দিয়ে কোন চেয়ারে বসে যান। আর এই যে ঠিক মাথায় একটা বোতাম দেখছেন, সেটা টিপে দেন। ব্যাস, আপনার দু- চোখের পাতায় দেখতে দেখতে অন্ধকার ঘনাবে। কানে ঝিঁ ঝিঁ শব্দ পাবেন। তবে খুব মৃদু। ঠিক বিশ্রাম হয়ে যাবে।
-মানে ঘুমিয়ে যাবেন?
-না, ঠিক ঘুম না। তবে ওই যে বললাম বিশ্রাম।
-কীসের বিশ্রাম?
-মাথার, আবার কীসের?
-কিন্তু সে তো এমনিতেই হবে। আপনি যদি শুয়ে চোখ বুজে থাকেন তাহলেই তো ঘুমিয়ে যাবেন। বিশ্রাম হয়ে যাবে।
-কিন্তু তাতে প্রোবলেম আছে যে। গোটা বডি বিশ্রামে চলে যাবে।
-মানে? আপনি…
-হ্যাঁ রে বাবা, অত সময় নাই যে শুয়ে শুয়ে সারা শরীরকে বিশ্রাম দেব। আর বিশ্রামের দরকার তো শুধু মাথার নার্ভ সেলগুলোর। সেটা বিশ্রাম পেলেই হল।
-তার মানে চোখ বুজে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই আপনি কাজ করেন?
-শুধু আমি নই, আমরা সবাই। অভ্যাসে কী না হয়? এই যে বসে ঘুমানো সেও তো অভ্যাসেই হয়েছে নাকি?
-তা না হয় হয়েছে। তবু তো এটা রিস্কি।
-রিস্ক তো সব জায়গাতেই আছে। আপনি রাস্তায় হাঁটছেন, তাতেও রিস্ক। বাথরুমে গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে স্নান করছেন তাতেও রিস্ক।
-তাই বলে চোখ বুজে অমন ধারাল ব্লেডের কাজ?
-ওই যে বললাম অভ্যেস।
-কিন্তু…
-আর কিন্তু কিন্তু করেন না। এমনিতেই অনেকটা সময় নষ্ট করেছেন। আপনার সংগে বকবক করে আমার নার্ভসেলগুলো দেখছি ক্লান্ত হয়ে গেল।


বলতে বলতে লোকোটা কালো টুপিটা মাথায় দিয়ে চোখ বুজল। হাত কিন্তু সমানে কাজ করতে লাগল। পশুর মাংসগুলো নরম কাদার তালের মত করে নিয়ে থপ করে টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে ঘূণার্য়মান ব্লেডের সামনে ঠেলে অসাধারণ দক্ষতায় সামনে পিছনে করে ঠিক মাপমতো কেটে কেটে পাশের ঝুড়িতে জমা করছে সে। ত্রিভুজাকারে কাটা মাংসগুলো কেটে কেটে পড়ছে ঝুড়িতে। বিজ্ঞান প্রমান করেছে ট্রাইএংগুলার শেপে কাটা টুকরোতে মাংস ভালো থাকে। স্বাদ ঠিক থাকে।


অবশ্য আরেকটা কারণও আছে। এই শেপে কাটা মাংস মানুষের মুখের আকারে হয়। অর্থ্যাৎ এক গ্রাসে মুখে পোরা যায়। এখন ব্যাস্ত মানুষের আর অত সময় নেই যে টেনে, ছিঁড়ে, চিবিয়ে কোন খাবার খাবে।


মাংস কাটা দেখতে কেমন নেশা ধরে যায়। নরম মাংসের তালের ওপর দিয়ে ধারাল ব্লেডটা যেন অদ্ভুতভাবে নিজের রাস্তা করে নিচ্ছে। ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস বিরামহীন শব্দ।

মাংস কিনে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন অমীয় সরকার। তিনি পড়েছেন সংকটে। বিশ্রাম নিয়ে সংকট। এখন মানুষের আর সব আছে। শুধু বিশ্রাম নেওয়ার সময় নেই। এখন প্রত্যেকেই কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার নিজস্ব পদ্ধতি বের করে নিয়েছে। কেউ বসে বসে মাথায় টুপি চাপিয়ে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে চোখে কালো চশমা চাপিয়ে। এদের যুগে তিনিই হয়ে পড়েছেন বেমানান। হাত-পা ছড়িয়ে আট ঘন্টার ঘুমোনোর অভ্যেসটা কিছুতেই ছাড়তে পারছেন না।


একটা জেট বাস সামনে এসে দাঁড়াতেই চিন্তিত মুখে তাতে উঠে বসলেন অমীয় সরকার। গাড়ি ছুটল দ্রুত গতিতে। মাথার ওপরে তিন হাজার ছ-শো সাতাশ সালের গনগনে সূর্য।


ক্লান্ত পৃথিবী টেনে পার করছে আরো একটা বিশ্রামহীন ক্লান্ত দিন।



শুভঙ্কর চ্যাটার্জী

জন্মঃ ১৯৮২ সালের ২৭শে জুলাই। পড়াশোনাঃ বালুরঘাট হাই স্কুল। লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত স্নাতক স্তর থেকে। বর্তমান পেশাঃ প্রাথমিক শিক্ষক। সঙ্গে লেখালেখি। এছাড়া ছবি আঁকার সঙ্গে যুক্ত।ছবি আঁকার প্রথাগত কোন শিক্ষা নেই। অনেকটাই দেখে শেখা। সে অর্থে স্বশিক্ষিত। ছবি আঁকার সঙ্গে যুক্ত ছেলেবেলা থেকেই। অয়েল এবং অ্যাক্রেলিকে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। মুলত ছোটগল্প ও অণুগল্প লিখতে ভালোবাসেন। এছাড়া কিছু বড় গল্প এবং উপন্যাস ও লিখেছেন। মানুষের কথা, সমাজের কথা, সাংসারিক টানাপড়েন এইসবই লেখার উপজিব্য বিষয় । আনন্দমেলা, পত্রপাঠ প্রভৃতি পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে। স্থানীয় পত্রিকা আত্রেয়ীর পাড়াতে লেখা ছাপা হয়। কিছু উল্লেখযোগ্য গল্প - ফ্রেন্ডশিপ, ফেরী, বিষ ইত্যাদি।

1 Comment

রাহেবুল · এপ্রিল 24, 2020 at 12:36 অপরাহ্ন

ভালো লাগল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।