এক সন্ধ্যায়

শুভাশিস চক্রবর্তী on

— বউ একটা চ্যাংড়া হামাঘরে পিচে পিচে আসোচে।
— আসুক আসপা দাও।
— অয় খালি মোক দেখোসে।
— দেকপেই। তোমাক কি সাধে লোকে পাগলা মনোজ কয়ে ডাকে?
— এখানে আমাক কেউ চেনে না।
— না চিনুক। এইগরমেত কুত্থেকে অ্যাটা ধোকরা জামা আনিচে। টুটির
বোতাম লাগাব কে কোসে তোমাক?
— কেউ কয়নি বউ। তোকে এখন এলা দেখফা লাগবে না। তাড়াতাড়ি হাঁটা
পারোসু না?
— তাড়াতাড়ি হাঁটপ কেন? তোমার মাতাত কি ভূত ঢুকিসে?
— হঁ ঢুকিসে। তুই তো মোর মাতাত ঢুকে বসে আসু। অন্য ভূত কি আর ঢুকা
পারে?
— টাউনেত ঠাকুর দেখফা আনবা কে কসিলল তোমাক?
— কেউ কয়নি।
— তালে আনলেন ক্যান?
— অ! পিচাদিকের ওই ক্লাবোত তো দাঁড়ায় খুব কোলু, কত্ত উঁচা মন্দির করিসে,
আলো ঝলমলাসে, খাঁড়া হয়ে তো নাচও দেখলু?
— হঁ দেকিসি। ভুল করিসি নাকি? ওংকা করে কতা কোচ্চ ক্যান?
— ওই এখন কিন্তু আবার কাঁদবা ধরবু না!
— তাড়াতাড়ি হাঁট, মেলা বকিসু।
— মুই কতা কোলেই তো তোমার মাতাত অক্ত উটে যায়। ক্যান, মোক চাড়ে
দিবা পারো না?
— তোক চাড়ে দিলে, তুই কি মোক চাড়া পারবু?
— পারমো।
— পারমো! এক বচ্চর ধরে শোনোচি। খালি বাজে বকিস। জোরে হাঁট। দেখোসি
না চ্যাংড়াটা তখন থেকে পিচে পিচে আসোচে।
— কোন চ্যাংড়া?
— তোক সেটা জানা লাগবি না। টাউনের চ্যাংড়ার বিশ্বাস ন্যাই।
— আচ্চা। অয় পিচে পিচে আসোচে ক্যান?
— মুই ক্যাংকা করে কোমো?
— তালে তুমি ভয় পাসো ক্যান?
— তোক কে কোলো মুই ভয় পাসি?
— ভয় পাসো না তো কি?
— আচ্চা মুই ভয়য় পাসি।
— ক্যান, এখনো তোমার ভয় ক্যান? এখন তো ভয় পাওয়ার কতা না।
— মুই ভয় পাসি তোর জন্য বউ। জানিস না, তোক মুই কত্ত ভালবাসো।
— চিন্তা ন্যাই, অয় খালি তোমাক দেখোসে, মোক নয়। শুনবা, তোমার মুকেত
না… ছবি ফুটে উটিচে।
— ক্যাংকা ছবি? মুই ভয় পাসি… এংকা?
— হঁ। মনে আচে, মোর তখন দুই মাস চলোসে। একদিন আতে কামেত থে
আসে কোলেন, বউ চাঁদ উটিচে। মুই কলাম অমাবস্যার আতত তুমি চাঁদ
দেখোসেন কোনটে? তুমি কোলা, ক্যান আয়নাটা নিয়ে আসে দেখ। তোর
মুখেত চাঁদের ছবি ফুটে উটিচে।
— ওলা দিনের কতা তোর মনে পড়ে বউ?
— পড়ে। গাঁয়ের মন্ডপেত অঞ্জলি, সন্ধ্যাবেলা মঙ্গলচন্ডী গান, বাদাম কালাইয়ের
দোকান, আর মঙলুর দোকানের কাচের চুড়ি।
— তোক তিন রঙের কাচের চুড়ি কিনে দিসনু বউ। ছুন ছুন… ছুন ছুন।
— তুমি খালি কোতা, বউ হাতের চুড়ির আওয়াজ কর। ক্যান চুড়ির আওয়াজে
কি আচে গা?
— জানি না, কেন্তু কিবা একটা আচে। তোর চুড়ির আওয়াজ এখনো মোর
কানেত বাজে, গায়েত কাটা দেয়।
— চলো গাঁয়েত যাই, যাবা?
— গাঁয়েত গেলেই যে মোর ব্যাবাক মনে পড়ে বউ। মাথা উলোট পালোট
হয়ে যায়।
— শুনিচু, মোর এখুনি যাবা ইচ্চা করোসে।
— এই যে দাদা শুনছেন, আপনি কার সাথে কথা বলছেন?
— কারো সাথে না।
— চলে যাবেন না প্লিজ। বলুন না। অনেকক্ষণ থেকেই দেখছি আপনি একাই
হেঁটে যাচ্ছেন। আর কথাও বলছেন একা একাই।
— ক্যান একা একা কথা কওয়া টাউনেত মানা করা আচে নাকি?
— না মানা নেই। দাঁড়ান শুনুন না।
— বউ দৌড়া।



শুভাশিস চক্রবর্তী

জন্ম আশির দশকের গোড়ার দিকে। জন্ম দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কাঁজিয়ালসী গ্রামে হলেও স্থায়ী বসবাস বালুরঘাটে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক। পেশায় ও নেশায় চিত্রশিল্পী, কর্মসূত্রে দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও মাটির টানে আবার আত্রেয়ীর পাড়ে। মূলত ছোটগল্প লেখায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নাটকের দলের সাথেও জড়িত। দধীচি, আয়নানগর, আত্রেয়ীর পাড়া সহ কিছু পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

1 Comment

Ranjan Roy · অক্টোবর 2, 2019 at 3:17 অপরাহ্ন

I agree

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।