নির্বাক

সুদীপ পাল on

nirbak

(১)

আজ আমার কলেজের প্রথম দিন। সবেমাত্র স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমার বাড়ি থেকে কলেজ বেশি দূরে না, তাই সকাল সকাল কলেজে এসেছি। এসে দেখি আমার আগেই অনেকজন চলে এসেছে লেকচার থিয়েটারে। কলেজে পা দিয়েই অনেক পুরোনো স্মৃতি উঁকি দিয়ে উঠলো মনের চিলেকোঠায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম সেই স্মৃতি গুলোকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। কিন্তু চোখে পড়লো, ব্ল্যাকবোর্ডের বড় বড় লেখাটা ” পরিচিতি প্রদান পর্ব। সকলের উপস্থিতি আবশ্যিক। সৌজন্যে – দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রী।” দেখলাম সকলেই বিশেষ উত্তেজিত এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনাতে ব্যস্ত। একজনের কাছ থেকে বোর্ডের বাংলায় লেখাটার আসল অর্থটা জানতে পেরেই ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো। আজকে ক্লাসের শেষে ইন্ট্রো সেশন্ হবে। নিজের নাম, ধাম, কাম, ছাম, আর ঝাম বলতে হবে। যারা জানে না তাদের জন্য বলি, কাম মানে কলেজের নাম, ছাম মানে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আর ঝাম মানে ঝামেলা। এই পুরোটাই বিশুদ্ধ বাংলা তে বলতে হবে, কোথাও একটু ইংরেজী বের হলেই ধেয়ে আসবে প্রশ্নবান। তাই সবাই নিজেদের মধ্যে এটা নিয়ে ডিসকাস করে নিচ্ছে। আমিও শুরু করলাম। স্কুলে পড়ার সময় আমরা ক্লাসের আগে পড়া গুলো ঝালিয়ে নিতাম আর এখন এইসব। হয়তো এইভাবেই এক একটা খোলস ছাড়িয়ে আমরা ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছি।

 যথারীতি অ্যানাটমি, ফিজিয়োলজি, আর বায়োকেমিস্ট্রির ক্লাস শেষ হতে না হতেই বুকের ভিতরের জমে থাকা ভয়টা হৃদস্পন্দন রূপে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নতুন পরিবেশ, নতুন আশঙ্কা তাই ভয়টা যেন আজ একটু বেশিই লাগছে। আজকে যদি কেউ পাশে থাকতো তাহলে হয়তো ভালো হতো, এই ভেবেই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম। আসতে আসতে দাদা দিদিরা আসছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হোল ইন্ট্রো সেশন্। যেমন টা আশঙ্কা করেছিলাম, সেই ভাবেই চলতে থাকলো। একটা দাদা, আমার দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, ” এই পিঙ্ক সালোয়ার  আর ব্ল্যাক চশমা তোকে বলছি, এবার তুই ইন্ট্রো দে ” 

আমি বলতে শুরু করলাম, নাম চিত্রাঙ্গদা গাঙ্গুলি, ধাম পুরুলিয়া, কাম পুরুলিয়া চিকিৎসাশাস্ত্রীয় মহাবিদ্যালয়ের ও হাসপাতালের স্নাতক স্তরের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ঝাম নেই, ছাম…। হঠাৎ একজন ঢুকলো আমাদের লেকচার থিয়েটারে। তাকে দেখেই অবাক হয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে গেলো, “অভিরূপ” । আমার সমস্ত ব্যাচমেটরা সবাই দেখলাম দাঁড়িয়ে গেলো, আর সব দাদা দিদিরা ওকে দেখে আনন্দিত হয়ে উঠলো। অভিরূপ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, সবাই বসে পড় তোরা, আজকের মতোন তোদের ইন্ট্রো শেষ। এই সেই অভিরূপ যাকে আমি আজ থেকে দুবছর আগে দেখেছি, অভিরূপের সাথে কাটানো সেই স্মৃতি গুলো মনে পড়ে গেলো………

আমার আর অভিরূপের বন্ধুত্ব শুরু ক্লাস ইলেভনের শুরুতেই। ওর সাথে প্রথম দেখা বায়োলজি টিউশনে। যেদিন ও প্রথম আমাদের টিউশনে এসেছিল সেদিন থেকেই ওর প্রতি একটা আলাদা টান অনুভব করতে শুরু করি। আস্তে আস্তে অভিরূপ নিজের প্রতিভা দেখাতে শুরু করলো। পড়াশোনা, খেলাধূলা, গান সবেতেই ওর প্রতিভা আমাদের বন্ধু মহলে ছড়িয়ে গেলো। ওকে ভালো লাগলেও ওর সাথে বেশি কথা বলতে পারতাম না। টিউশন শেষে আমার অনেক বান্ধবীরা যখন ওর সাথে কথা বলতে যেতো, তখন আমার খুব হিংসে হতো। একদিন সাহস করে ওর ফোন নাম্বার টা চেয়ে নিলাম, পড়ার ডাউটস্ গুলো সলভ্ করে দেওয়ার তাগিদে। বেশ কিছুদিনের মধ্যেই ওর সাথে আমার বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়ে উঠল। আমি কোনদিন কোনো ছেলেদের সাথে কথা বলতাম না কিন্তু কেন জানিনা অভিরূপের প্রতি আমার এক অদ্ভুত টান কাজ করত, বোধ হয় আমার স্বপ্নের মানুষের মত অবিকল তাই হয়তো। 

আমার জন্মদিনের সেরা উপহার দিয়েছিল অভিরূপ, নিজের হাতে গিটার বাজিয়ে “মাঝে মাঝে তব দেখা পাই” গানটা গেয়ে। আর এই উপহার পেয়ে এতটাই তৃপ্তি পেয়েছিলাম যে, ওকে আনন্দে জড়িয়ে ফেলেছিলাম। একজন সুদক্ষ গিটারিষ্টের হাতের ছোঁয়াতে যেমন গিটারের তার গুলো সুমধুর ছন্দ তুলে গান গুলোকে পূর্ণতা দান করে, ঠিক সেই ভাবেই অভিরূপের সান্নিধ্যে আমি পূর্ণতা পেতে শুরু করলাম। বন্ধুত্বের সীমানাটা ছাড়িয়ে কখন যে আমরা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠলাম জানি না। অভিরূপ থেকে আমার কাছে অভি হয়ে গেলো ও। হয়তো ভালোবাসা এই ভাবেই চুপিসারে ঝুপ করে চলে আসে। আমরা দুজনে ঠিক করেছিলাম, আমরা একসাথে একই কলেজে পড়ব, তারপর বাকি জীবনটাও একসাথে কাটিয়ে দেব। তারপর এইভাবে দেখতে দেখতে ক্লাস ইলেভনের ফাইনাল পরীক্ষা চলে এলো। অভি যথারীতি ভাল রেজাল্ট করেছে। সব স্কুলের স্টুডেন্টদের মধ্যে ও টপ করেছে। আর আমি কোনোমতে পাশ করেছি। এই নিয়ে বন্ধুমহলে খিল্লির পাত্রী হয়ে উঠলাম আমি। বাড়িতেও শুরু হোল একই ব্যাপার। ফলত আমাদের মধ্যে ঝগড়া অশান্তি সৃষ্টি হতে শুরু হলো। দুজন দুজনকে সময় না দেওয়া, ভালো কলেজ পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। আমাদের দুজনেরই লক্ষ্য একটাই ভালো ডাক্তার হওয়া। আমি আর পারছিলাম না সম্পর্কের চাপ, পড়াশোনার চাপ, বাড়ির লোকের চাপ একসাথে নিতে। তাই ঠিক করলাম সম্পর্কটাকে শেষ করে দেব। অভিরূপ কে বললাম, “আমি সম্পর্কটা শেষ করতে চাই, পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।” অভি বলেছিল, “আমরা ঠিক ব্যালেন্স করতে পারব, একটু সময় দে। সম্পর্কের সাথে সাথেই পড়াশোনাটা চালিয়ে যাব দেখিস তুই। আর তোকে পুরো হেল্প করব আমি, তোর সাথে সব সময় থাকব।” 

কিন্তু আমি অভি কে বলেছিলাম, “তুই ব্রিলিয়ান্ট তুই পারবি। কিন্তু আমি পারব না, আর আমি সারাজীবন লোকের কাছ থেকে এটা শুনতে চাই না যে, আমি তোর জন্য কলেজে চান্স পেয়েছি। আমি নিজের যোগ্যতাই সবটা অর্জন করব।” তাই সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম । অভিরূপ কিন্তু আমাকে কোনদিনও জোর করেনি, তাই সেদিনও আমাকে জোর করলো না। আমার ইচ্ছেমতোই সম্পর্কটা শেষ করেছিল তারপর কোনদিনও কথা বা দেখা হয়নি। শুধু বন্ধুদের মুখে শুনেছিলাম, ও কোটা চলে গেছে। 

আমিও শুরু করলাম NEET এর প্রস্তুতি। ক্লাস টুয়েলভের বোর্ড এক্সামের পর NEET দিলাম, কিন্তু ভালো হোল না। যথারীতি কোনো কলেজ পেলাম না। হতাশাই ভেঙে পড়লাম। অভি কে হারানোর যন্ত্রণা, কলেজ না পাওয়ার যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করতে লাগলো। একদিন আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনলাম, ও কোনো একটা কলেজে অ্যাডমিশন নিয়েছে। সব পুরোনো স্মৃতি গুলো, দৃশ্যমান হয়ে উঠলো আমার স্মৃতিপটে। ঠিক করলাম আরো একবছর প্রিপারেশন নেবো। তার ফল হিসাবে আজকে আমি এইখানে এসে দাঁড়িয়েছি।

দাদাদের চেঁচামেচিতে আমার ঘোরটা কেটে উঠলো। একটা দাদা অভিকে দেখিয়ে বললো, “এই দাদার সাথে তোদের পরিচয় করিয়ে দিই, এর নাম অভিরূপ সান্যাল। আমাদের কলেজের হার্ট থ্রব বলতে পারিস। ফার্স্ট ইয়ারের তিনটে সাবজেক্টেই গোল্ড মেডেলিস্ট , আমাদের ব্যান্ড এর মেন সিঙ্গার, স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সোশাল সেক্রেটারি আর কত কি বলবো বলত।” 

অভি স্মিতহাসি হেসে বললো,” আরে না না তেমন কোনো ব্যাপার না। তোদের জন্য একটা announcement আছে। সেটা বলার জন্যই আজ এখানে এসেছি। 1st সেপ্টেম্বর আমাদের কলেজের annual fest হবে, অর্থাৎ একমাস পর। সেখানে তোরা সবাই আসিস, আর কেউ যদি participate করতে চাস, তাহলে তোরা আমার সাথে contact করে নিস। “

অভি সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডে নিজের নম্বর টা লিখে দিলো। তারপর বললো,” আজকের মতোন তোরা যা, পরে আবার দেখা হবে।” তারপর দাদারা সবাই চলে গেলো, অভির সাথে। 

আমার পাশের বসে থাকা মেয়েটা আমাকে ডেকে বললো,” দাদাটা কি handsome বল? আমার দেখেই ভালো লেগে গেছে। দাদাকে আজকেই call করব।” হঠাৎ কেন জানি না আমার রাগ লাগতে শুরু করলো আমি বললাম, “যেই দাদাটা তোর intro নিলো, তাকে গিয়ে আমি বলে দিই?” 

মেয়েটা কেমন একটা দমে গেল। আর সেটা দেখে আমি মনে মনে খুব খুশি হলাম। সবাই বেরিয়ে যেতে আমি আমার ফোনটা বের করে অভির নম্বরটা save করে রাখলাম। 

(২)

অ্যানাটমিতে cadaver dissection, ফিজিয়োলজি ল্যাবে নিজের রক্ত দিয়ে ব্লাড টেস্ট করা, বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবে reagent এর ঝাঁঝালো গন্ধে কিছু দিনের মধ্যেই প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। নতুন নতুন জিনিষ শিখছি, ভুলেও যাচ্ছি অনেক কিছু কিন্তু অভির ওই মুহূর্তগুলো এখনও ভুলতে পারছি না। শুধুই মনে হচ্ছে আবার আগের মতোন হয়তো অভি আমাকে সবকিছু হাতে ধরে বুঝিয়ে দেবে, লেকের ধারে বসে বসে গান শোনাবে, রেললাইনের ধারে বসা ঝাল মুড়ির দোকানে গিয়ে ঝালমুড়ি খাওয়াবে। কিন্তু এটা তো এখন আর সম্ভব নয়, সব কিছু তো আমিই শেষ করে দিয়েছিলাম দুবছর আগে। অভি ও হয়তো আমাকে ভুলে গেছে, এইসব ভাবতে ভাবতে দেখি unknown একটা নম্বর থেকে কল আসছে। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একজন বলে উঠলো, “কি রে চিত্রা, বুঝতে পারছিস কে বলছি?” 

আমার চেনা গলা, যার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে গেছি তার আওয়াজ এত সহজে কি করে ভুলে যায়! 

আমি বললাম,” অভি?” 

ফোনের ওপার থেকে অভি বললো, “যাক তাহলে চিনতে পেরেছিস। আমি ভাবলাম একেবারেই ভুলে গেছিস হয়তো!” 

আমার গলার স্বর যেন আটকে গেল। আমি কিছু বলতে পারছি না। 

অভি একটু থেমে বললো, “তোকে আগেই কল করব ভেবেছিলাম, কিন্তু fest এর এত কাজ, তার উপরে শরীর টা মাঝে মাঝেই খারাপ করছে। তাই তোকে কল করা হয়নি।” 

আমি বললাম, ” কি হয়েছে ?” 

“তেমন কিছু না, এই মাঝে মাঝে গলা তে ব্যথা করছে, কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে কখনো কখনো। বাকি একদম বিন্দাশ।” 

আমি বললাম,” অভি তোকে একটা কথা বলব? “

” হ্যাঁ, বল। “

” I’m sorry”

একটু ক্ষণের জন্য অভি চুপ হয়ে গেলো, তারপর অভি বললো,” তোকে আর কিছু বলতে হবে না। আমি সব জানি। আমি সব খবর রাখি তোর। “

আমি অবাক হয়ে বললাম,” মানে? “

অভি হেসে বললো,” তুই আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলি কিন্তু আমি তোকে একদিনের জন্যও ভুলতে পারিনি। যাতে তোর সাথে আমার দেখা না হয়, তাই আমি কোটা চলে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে তোর বন্ধু সুমনাকে আমি প্রত্যেকদিন কল করে তোর খবর নিতাম। “

” তুই কেন চলে গিয়েছিলি অভি? আমার হাতটা ধরে আমাকে একটু বকে দিতে পারতিস। তাহলে তোকে ছেড়ে দুবছর থাকতে হতো না। আমি ভালো ছিলাম না রে অভি, এখনও ভালো নেই। “

” সে আমি জানি, তাই তুই সুমনাকে বারবার জিজ্ঞেস করতিস আমার খবর জানে কিনা। কিন্তু ওকে আমি বারণ করেছিলাম আমার কথা না বলতে, যাতে তুই তোর ফোকাস থেকে নড়ে না  যাস। আমার ও অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু তোর কথা ভেবে আমি তোকে কোনোদিন কল করিনি। মনে মনে ঠিক করেছিলাম যেদিন তুই কলেজে উঠবি সেদিনই তোকে কল করব ।”

আমি আর নিজের কান্নাটা কে আটকে রাখতে পারলাম না, কাঁদতে কাঁদতে অভি কে বললাম ” তুই আমার জন্য এত কিছু করেছিস, কিন্তু আমি শুধু আমার নিজের কথা ভেবে গেছি। আমি খুব স্বার্থপর অভি। আমি তোকে deserve করি না অভি…. “

অভি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,” তুই কান্না থামা। এরপর যা কথা হওয়ার, আমাদের সেই পুরোনো লেকের ধারের আড্ডাটা তে হবে। কাল ক্লাস শেষের পর কিন্তু। আমি এখন রাখলাম। কাল মনে করে আসবি। “

এই কথাটা বলেই অভি ফোনটা রেখে দিলো। আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, অভি আমাকে কল করেছে। কালকের জন্য খুব উত্তেজনা লাগছে, মনে হচ্ছে যেন আমি আমার অনেক পুরোনো কোনো জিনিস খুঁজে পেলাম। রাত্রে ঘুম হোল না। পরদিন সকাল সকাল কলেজে এলাম। সেদিনের কলেজের ক্লাস গুলো যেনো শেষই হচ্ছিল না, মনে হচ্ছে সময়টা যেন আটকে গেছে। কোনোমতে ৫ টার সময় ক্লাস শেষ হতেই, আমি তাড়াতাড়ি চল্লাম লেকের দিকে। পৌঁছে দেখি, আমার আগেই অভি পৌঁছে গেছে। আমার দিকে এগিয়ে এসে, আমার হাতটা ধরে নিয়ে গিয়ে পাশের বেঞ্চটাতে বসিয়ে দিলো। আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তার আগেই অভি আমাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো, “তোকে কিছু বলতে হবে না। আমরা সব ভুলে গিয়ে নুতন করে সব কিছু শুরু করি আবার। পুরোনো সব ভুলে যা, মনের মধ্যে কিচ্ছু রাখিস না। তোর মনের ক্যানভাসটা কে সাদা করে দে, তারপর ওখানে আমরা আবার নতুন করে নিজেদের ছবি আঁকবো।” 

আমি বললাম, “অভি তুই এত সহজে কি করে ভুলে যেতে পারলি সব? “

অভি বললো,”তোর মনে আছে তুই একবার আমাকে বলেছিলি, ভালোবাসা মানে বেঁধে রাখা নয়, উড়তে দেওয়া। পাখি সারাদিন যেখানেই উড়ে বেড়াক কিন্তু দিনের শেষে সে নিজের ঘরেই ফিরে আসে। আমি তাই ভেবেছিলাম, তুই হয়তো এখন উড়তে চাইছিস নিজের মতোন, তাই তোকে উড়তে দিয়েছিলাম। কোনোদিন আঁটকাই নি। জানতাম একদিন তুই নিশ্চয়ই ফিরে আসবি।” 

অভির কথা গুলো শুনে, আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। অভি কে জড়িয়ে ধরলাম। অভির ঠোঁটের শীতল স্পর্শটা আমার কপালে অনুভব করতে পারলাম। কতক্ষণ এইভাবে ছিলাম জানি না। অভির ঝাঁকুনি তে আমার ঘোরটা কাটলো। তারপর বললো, “তোকে যে জন্য আজকে ডেকেছি, সেটাই তো বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম। তোর জন্য একটা surprise আছে। সেটা ঠিক fest এর দিন পাবি ।” 

আমি আশ্চর্যের স্বরে বললাম,” কি surprise অভি?”

অভি বললো,” না সেটি তো হচ্ছে না, সেটা সেদিনই সবার সামনে দেখতে পাবি। “

আমি বললাম,” আচ্ছা, তাই হবে। সেদিনই দেখাস” 

অভি বললো, “চল আজকে তাহলে তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।” 

অভির হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। বিকালের পড়ন্ত রক্তাভ আলোতে, পাখি গুলো কিচিরমিচির আওয়াজ করতে করতে 

নিজের বাসাতে রওনা দিচ্ছে। 

(৩)

এই সাত দিনে অভির সাথে আবার আগের মতোন কথা শুরু হয়েছে। একদিন অভি ওর বন্ধুদের সাথে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছে। একদিন ওদের ব্যান্ডের rehearsal দেখাতে নিয়ে গেছে। মনে মনে খুব আনন্দ পেলাম। আস্তে আস্তে fest এর দিনটা এগিয়ে আসছে। ততই যেন, মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। অভির সব বন্ধুদের ও জিজ্ঞেস করলাম, সারপ্রাইজের ব্যাপারে, কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারলো না। অভি খুব চাপা স্বভাবের, তাই ওর কাছ থেকে কোনো কিছু জানার আশা আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এক দুদিন অভি ওদের ব্যান্ডের rehearsal এ গেল না। ওকে জিজ্ঞেস করতে ও বললো, “শরীরটা ভালো নেই, তাই একদিন যায়নি। আসলে গান গুলো খুব হাই পিচের তো, তাই গলাটা একটু ব্যথা করছে। ওটা তেমন কিছু না, তুই চিন্তা করিস না।” বাচ্চা ছেলেদের যেমন মা বাবারা ভুলিয়ে দেই, অভি ও আমাকে এমন করে কথা বলত আমি ওর উপরে কোনো কথা বলতে পারতাম না। 

আস্তে আস্তে চলে এলো, 1st সেপ্টেম্বর। আমার  প্রতীক্ষিত সেই দিন। আজ অভি আমাকে সারপ্রাইজ দেবে, এটা ভেবেই সারাদিন দু চোখের পাতা এক করতে পারিনি। যথারীতি সন্ধ্যে হতেই অভির সাথে চলে এলাম, আমাদের কলেজের auditorium এ। জীবনের প্রথম কলেজ fest, তার উপরে সারপ্রাইজ, সর্বোপরি অভি আমার সাথে আছে, ভগবানকে মনে মনে বললাম, ভগবান সারাজীবন যেন অভির সাথে এই ভাবে থাকতে পারি। অভি আমাকে একবারে ব্যালকনিতে বসিয়ে দিয়ে গেলো। যাওয়ার সময় বলে গেলো, “এখান থেকে একদম নড়বি না কিন্তু। আমার শো একটু পরে হবে। এখন বাকি গুলো enjoy কর। আর আমি ওদিকে যায় অনেক কাজ বাকি।” অভি চলে গেলো। অনেক গান, নাচ, হল। মুম্বই থেকে একটা নামকরা ব্যান্ড এসে গান করে গেলো। তারপর রাত 10 টার দিকে অভিদের ব্যান্ড, “তাঁরকাটা” স্টেজে উঠলো। বিভিন্ন আলোর সাথে সাথে অভির মনহরণ করা গান গুলো যেন স্বর্গের অনুভূতি দিতে লাগলো আমায়। ওদের ব্যান্ডের performance হয়ে যাওয়ার পর।  অভি  মাইকটা মুখের কাছে টেনে নিয়ে বললো, “আজকে একজন স্পেশাল মানুষের জন্য, একটা স্পেশাল গান শোনাবো তোমাদের। ” সাথে সাথে পুরো auditorium অন্ধকার হয়ে গেলো। উল্টো দিক থেকে অভির কন্ঠে ভেসে এলো, “মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।” সাথে সাথে সকলে হাততালি দিয়ে উঠলো, আর কোথা থেকে একটা স্পটলাইট আমার উপরে এসে পড়লো। উল্টো দিকে অভির গলায় তখন শুনতে পাচ্ছি,” 

মোহ-মেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না,

মোহ-মেঘে তোমারে অন্ধ করে রাখে

তোমারে দেখিতে দেয় না… ” 

এটা শোনার পর আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। মনে হোল, পৃথিবীর সব সুখ মনে হয় আমার জন্যই লেখা আছে। মনে হতে লাগলো, এই পৃথিবীতে হয়তো আমার থেকে খুশি আর কেউ নেই। এটাই ছিল অভির সারপ্রাইজ। সেই আগে যেই গানটা আমাদের মিলিয়ে ছিল আজকে সেই গানটা আমাদের আজকে আবার মিলিয়ে দিলো। এর থেকে বড় উপহার আর কী হতে পারে? 

গান শেষ হতে অভি আমার কাছে এসে বললো, ” কেমন লাগলো সারপ্রাইজটা?” 

আমি অভিকে বললাম, ” অভি এরপর আর মাঝে মাঝে নয়, আমাকে চিরদিনের মত দেখতে পাবি, কথা দিলাম। আমি তোকে খুব ভালোবাসি রে অভি।” 

অভি বললো, “আমিও।” 

হাত ঘড়িটার দিকে অভি তাকিয়ে বললো, ” 1.30 টা বেজে গেছে। এবার বাড়ি চল, নাহলে কাকিমা এবার হার্ট ফেল করবেন। “

আমি বললাম, “আর একটু থাকি তোর সাথে। “

অভি বললো,” জেদ করিস না, বাড়ি চল এবার। “

অগ্যতা বাড়ি ফিরে এলাম। 

সারাদিনটা যেন স্বপ্নের মতোন কেটে গেলো। গানটার কথা, সেই মুহূর্তটার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগে অভিকে টেক্সট করলাম। কিন্তু অভি কোনো রিপ্লাই দিলো না, ভাবলাম, performence এর পর হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। 12 টার পর ও কোনো রিপ্লাই নেই দেখে, অভি কে কল করলাম, কল ধরলো না। আরো বার কয়েক কল করলাম, full ring হয়ে কেটে গেলো । WhatsApp এর last seen check করলাম, লেখা আছে “last seen today at 2.05 pm” আমি একটু চিন্তিত হলাম, অভি কোনোদিন এতক্ষণ ঘুমায় না। ঘুমালেও কলটা রিসিভ করে। আর কিছু না ভেবে ওর বন্ধু রনজয়কে কল করলাম, ও বললো ও কিছু জানে না। তাই কোনো কিছু উপায় না পেয়ে দুপুরের দিকে ওর বাড়িতে কল করলাম, ওর মা কল তুললেন, 

জিজ্ঞেস করলাম, “কাকিমা, অভি বাড়ি আছে?” 

উল্টোদিক থেকে কাকিমার কান্নার আওয়াজ এলো, কাঁদতে কাঁদতে কাকিমা বললো, অভি হাসপাতাল এ admit আছে। “

আমি আশ্চর্যের স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,” কি হয়েছে কাকিমা? “

উনি বললেন,” কাল রাত্রে অনেক বারণ করেছিলাম, গান করিস না আর। ডাক্তার বারণ করেছে। তবু আমার কথা শুনলো না। তবু ওকে কালকে যেতেই হোল। “

কাকিমা কাঁদতে কাঁদতে আরো বললেন,” ওর যে vocal cord এ ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তার ওকে গান করতে বারণ করেছিলেন, তবু কারো কথা শুনলো না ছেলেটা। কালকে রাত্রে বেলায় আসার পর মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে থাকে। আর কথা বলতে পারেনি কাল থেকে। আর কোনোদিন বলতে পারবে কিনা জানি না। “

এই কথাগুলো শোনার পর, আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। আমার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হোল না। 


                         ॥  সমাপ্ত ॥

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


সুদীপ পাল

বর্তমানে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ক্লাস 12 এ পড়ার সময় থেকে গল্প, কবিতা লেখার শুরু। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার ভক্ত। তাই ঐতিহাসিক গল্প লেখার প্রতি টান বেশি। সব ধরণের গল্পের বই পড়তে ভালোবাসেন। কচিপাতা প্রকাশনী থেকে "বৃষ্টি ও মা" প্রকাশিত হয়, ২০২০ সালে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।