জন্মান্তর

অরূপম মাইতি on

আস্থা ফার্নিশার্সে, সাতটায় দিন শুরু হয়। রোজ সকালে সুখেনের পিছনে লাগা, বিজনের পুরানো অভ্যাস। আবার দোকানের ডান কোণে, রাস্তার কলে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজা, এটাও বিজনের অনেক দিনের অভ্যাস। আজও তার ব্যতিক্রম নেই। দূর থেকে তাকে আসতে না দেখার ভান করে, মুখ নীচু করে চুপচাপ লোহাতে যন্ত্র ঘষায় মন দিল সুখেন। কাছাকাছি এসে বিজন বলে ওঠে

     কাল রাতে ভিডিওটা দেখলি?

            উত্তর নেই সুখেনের মুখে।

     কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে নালাতে ওয়াক থুঃ করল বিজন। খালি হল মুখভর্তি ফেনা। এবার সুর নরম করে, বলল

     কানে কি তুলো গুঁজে রেখেছিস?  আমি তো কিছু বলছি না কি!

            এবারও সুখেনের মুখে উত্তর নেই।

     আরও সুর নামিয়ে, মুখ নীচু করে বলল

     কথা বলবি না ঠিক করেছিস?

            কি কথা বলব? তোর ফালতু কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে না।

     ফালতু কথা মানে? তোকে একটা মজার ভিডিও পাঠালাম কাল রাতে। সেটা কেমন দেখলি, সেটাই তো জানতে চেয়েছি। এটা ফালতু হয়ে গেল?

            মন-মেজাজ ভাল নেই। কাজ করতে দে।

     কাজ তো করছিস এত দিন ধরে! তাও যদি রতন তোকে ঘষাইয়ের কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজ শেখাত! আমাকে আর কাজ দেখাস না! চেয়ার-টেবিল বানাতিস, বুঝতাম তাহলে!

            যা না শালা, ভাগ! ভাগ এখান থেকে। সকাল সকাল যত্ত ঝামেলা! জ্ঞান দিতে এসেছে!

     তোর ভাল চাই, তাই বললাম। নাহলে আমার কি?

            তুই আমার ভাল চাস? সেটাও বিশ্বাস করতে হবে?  থাক, অনেক হয়েছে। এবার নিজের ভালটা বোঝ।

     শুধু তোর কেন? আমি সবাইয়ের ভাল চাই।

তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বাড়ি যা। ওদিকে দ্যাখ, দু-একজন চলে এসেছে, জল নিতে। পরপর আরও অনেক এসে পড়বে। তোর মুখধোয়া শেষ হলে তবে ওরা জল নিতে পারে। যা, এখানে সময় নষ্ট না করে কলতলা খালি কর।

     তাড়িয়ে দিচ্ছিস?

     দেখ। ভাল হবে না বলে দিচ্ছি। একবার বললে কি মাথায় ঢোকে না?

     হুমম, বুঝেছি। দেখছি, কি করা যায়!

            সুখেন এবার পাশ থেকে বাতিল কাঠের একটা টুকরো তুলে নিতে, বিজন কেটে পড়ল। অবশেষে সুখেন ভালই খচানো গেছে। এবার কেটে পড়াই ভাল।

     সুখেনের দোকান থেকে শুরু করলে সাইকেলে আধ ঘন্টা থেকে পৌনে এক ঘন্টা দূরত্বের মধ্যে রাস্তার দু ধার ঘেঁষে অনেক কল-কারখানা। আসবাব ঘর, লেদ ঘর, গ্রিল কারখানা, প্লাস্টিক কারখানা অনেক কিছু আছে। একটু পরে সব এক-এক করে খুলে যাবে। সুখেন, বিজন, বাচ্চু, এরা সব কাছাকাছি বয়সের। পেটের দায়ে, পড়াশোনার পাট চুকিয়ে যে যার মত কোথাও না কোথাও ঢুকে পড়েছে। যাতায়াতের পথে নিজেদের মধ্যে দেখা হয়। সংসারের জোয়ালের তলায় সবাই চাপা পড়েছে। বিজনও একটু পরে লেদ ঘরে কাজ করতে বেরোবে। বাচ্চু যাবে গ্রিল কারখানায়। সুখেনের এই বন্ধু বেশ চাপা স্বভাবের। কারও পিছনে লাগে না। তার পিছনেও কেউ লাগে না। আধ ঘন্টা পরে, সুখেনের সঙ্গে তারও দেখা হবে। দোকানের সামনে দিয়ে সাইকেল নিয়ে যাবে। একটু দাঁড়াবে। কথা হবে। তারপর যে যার কাজের মধ্যে ঢুকে পড়বে।

     সুখেনকে ধরে দোকানে থাকে তিনজন। সব থেকে বেশি দিন কাজ করছে সুখেন। বাকি দুজনের একজনের কাঁধে এখন বাজার করার দায়িত্ব। তৃতীয় জন করে রান্না। দোকান থেকে দুটো বাড়ি ছেড়ে থাকে মালিক রতন মণ্ডল। তার আসতে দেরি হয়। ন’টার আগে সে প্রায় কোন দিন দোকানে ঢোকে না। এই সময়টুকু দোকানের সব দায়িত্ব সুখেনের ওপর।

বিজনের দাঁত মাজা শেষ। ফিরে এসে, সুখেনের সামনে দাঁড়ায়। কিছু না বলে চুপ করে থাকে। সুখেন হেসে ফেলে। জানতে চায়

     ভাল আছিস?

            আছি একরকম। তুই কেমন আছিস?

            চলছে মোটামুটি।

     মেসোমশাইকে ডাক্তার দেখিয়েছিস?

            সুজয় কুণ্ডু বাইরে আছে। চেম্বার করছে না। ফিরল কি না, আজ একবার খোঁজ নেবো।

     আমি চলি। কারখানার দেরি হয়ে যাবে।

     বিজন পিছন ফিরতে, সুখেন বলে ওঠে

     দু-দিন পরে বাসন্তী পুজো।

     হ্যাঁ, তার এক দিন পরে রাম নবমী।

     এ বছর সব বন্ধ।

     বন্ধ ঠিক নয়, হবে। তবে নমো নমো করে…লোকজনকে ভিড় করতে দেবে না।

     কি একটা দিন এলো! কোন দিন ভেবেছিলি, মুখোশ পরে ঘুরতে হবে।

     বড় একটা শ্বাস ফেলল বিজন।

     চার পাশ তো আগেই বদলে ছিল আর জীবনটাও অনেক আগে খরচার খাতায় উঠে গেছিল! বিকালে ফুটবল, সরস্বতী-দুর্গা-কালি পুজোতে হৈ-চই…সেসব এখন ইতিহাস। স্কুল ছাড়ার পরে জীবনটা হলুদ পাতার মত হয়ে গেছে! এবার এসেছে মুখোশ। এভাবে আর বাঁচা যাবে না।

     চোখে পড়ল, মোটর সাইকেল চড়ে অবনীদা আসছে। ওয়ার্ডের পৌরপিতা। মুখে মুখোশ নেই দেখলে এখনই বকাবকি শুরু করে দেবে। পকেট থেকে চট করে মুখোশ বার করে পরে নিয়ে বিজন বলল

     সাবধানে থাকিস রে সুখেন! আমি যাই।

     এক পা এগোতে পিছন থেকে সুখেন জানতে চায়

হ্যাঁরে, তোর মালিক হপ্তা দিয়েছে?

            সবে তো শনিবারের সকাল। বিকেল হোক। দেখি, হপ্তা দেয় কি না!

     গত শনিবার আমাদের মাইনে হয়নি। কারবারের অবস্থা খারাপ। রতন হাত তুলে দিয়েছে। বলছে, বাজারে অনেক পেমেন্ট বাকি। বেশ কিছু মালও ডেলিভারি হয়নি। ফি হপ্তায় বাবার ওষুধ কিনতে শ’ চারেক টাকা খরচ হয়। কি করব, ভেবে পাচ্ছি না।

     আমার কারখানার অবস্থাও ভাল নয়। গত হপ্তায় বকেয়া দিয়েছে বটে, তবে টাকা দেওয়ার সময় অনেক কথা শোনাচ্ছিল। আমি যদিও কানে তুলিনি।

     বলতে বলতে মাইক লাগানো টোটো নিয়ে, পৌরসভার প্রচার গাড়ি দোকান পার হল।

     “সবাই সাবধানে থাকবেন। প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেরোবেন না। বাড়িতে থাকুন। সরকারি নির্দেশ পালন করুন।“

     ঘাড় ঘুরিয়ে বিজন বলল

     শুনলি?  তোদের দোকানে হুজ্জুতি হয়নি?

            থানা থেকে এসেছিল। ছোট শাটার অর্ধেক খোলা রেখে কাজ করছি দেখে বেশি কিছু বলেনি। তবে শুনছি, এটুকুও খুলে রাখতে দেবে না। তোর কারখানা খুলছে?

            ওই কোনরকম! ওখানেও হাফ শাটার নামিয়ে কাজ হচ্ছে। লোকজন আসছে না। কিছু দিন পরে পাকাপাকি না সব বন্ধ হয়ে যায়।

     খুব খারাপ অবস্থা। লকডাউন কবে উঠবে, কেউ বলতে পারছে না।

     যাই রে, সুখেন। দেরি হয়ে যাচ্ছে। খামোকা কথা শুনতে হবে।

     হ্যাঁ, আয়।

     বলতে বলতে বাচ্চু এসে দাঁড়াল।

     ওষুধ দোকানে কি বলল?

            কি আর বলবে?  দু সপ্তাহের ওষুধ দিয়ে বলেছে, আর ধার দিতে পারবে না!

            কো-অপারেটিভ খুললে, দেখি, অ্যাকাউন্ট থেকে কত টাকা তোলা যায়? কি যে করব?

            ওষুধগুলো কি তোর বাড়িতে পৌঁছে দেবো?

            হ্যাঁরে, বাচ্চু, যাওয়ার পথে বাড়িতে দিয়ে দে।

     মেসোমশাই তোর কথা জানতে চাইলে, কি বলব?

            গুম মেরে কিছুক্ষণ বসে থাকল সুখেন। কাজ থামিয়ে মুখ নীচু করে ভাবতে শুরু করল।

     ফোনে তো যোগাযোগ আছে। বলিস, খোঁজ নেবো। বাড়িতে না খেলে, রেশন একটু বাঁচে। যাই হোক দোকানে তো কিছু জুটছে! বলিস, বাবাকে, সব বুঝিয়ে…

     ঠিক আছে। আসি। সাবধানে থাকিস।

     ডান কানের ওপরে মুখোশটা ঢিলে আছে। ঠিক করে পরে নে। ফেরার সময় দেখা করিস। তোর বাড়ির সবাই ভাল আছে তো?

            আছে মোটামুটি…যতটা থাকা যায় আর কি!

II ২ II

কয়েক দিন হল বিজনকে দেখা যাচ্ছে না। টুকরো ফিচকেমি দিয়ে যার দিন শুরু, হঠাৎ করে তাকে দেখা না গেলে মনে সন্দেহ জাগে। চারদিকে পরিবেশ থমথম করছে। জন্মাবধি, সুখেন এমন শুনশান রাস্তা দেখেনি। অজানা ভয় প্রতি মুহূর্তে বুকের ওপর চেপে বসছে। দোকানের রসদও দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। রতন হাত উপুড় করতে চাইছে না। একটি কর্মচারী, লকডাউন উপেক্ষা করে সাইকেলের ভরসায় তিন ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়েছে বাড়ির উদ্দেশ্যে। রয়ে যাওয়া দ্বিতীয় কর্মচারীটি কথা বলে কম। হেঁসেল সামলাতে হয় বলে বেশির ভাক সময় থাকে দোকানের ভিতরে। সুখেনের সাথে কথা বলার লোক নেই। কাজ করে করে হাঁপিয়ে উঠেছে সুখেন। আজ যদি বাচ্চু আসে, ওর সাথে বাড়ি ফেরার কথা আলোচনা করবে।

     কারখানা বন্ধ হয়ে গেল রে সুখেন!

            কি বলছিস?

            বকেয়া আদায় হচ্ছে না, নতুন অর্ডার নেই। মালিক জবাব দিয়েছে।

     এবার তাহলে চলবে কি করে?

            জানি না, কি হবে?

            সাইকেল নিয়ে কোথায় বেরিয়েছিস?

            ছিট কাজ আছে একটা। ইছাপুরে একটা বাড়িতে ভাল করে গেট খুলছে না। ঠুকেঠাকে গ্রিস দিয়ে ঢিল দিতে হবে। লোকটা অনেক দিন ধরে বলছে। যাই, দেখি যদি কিছু আয় হয়!

     তোকে একটা কথা বলব, ভাবছিলাম।

     বাচ্চু সাইকেল ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। দাঁড়িয়ে পড়ে, জানতে চাইল

     বল, কি বলবি?

     না, থাক, পরে বলব।

     আমারও তোকে একটা কথা বলার ছিল। ভুলে গেছিলাম বলতে।

     কি কথা?

            পল্টুদার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তোর কথা খুব বলছিল।

     কেমন আছে পল্টুদা?  

মাসখানেক আগেও, মাঝে মধ্যে বিকালে মাঠে গেলে পল্টুদার সঙ্গে দেখা হত। মাঠে এখন ফুটবল বন্ধ। পল্টুদার সঙ্গে দেখা হওয়ার পথও বন্ধ।

     ক্লাব থেকে নারায়ণপল্লীর গরিব মানুষদের জন্য এক মাসের রেশনের ব্যবস্থা করেছে। ওখানে দুজন আক্রান্ত। ভিন রাজ্য থেকে এসেছে। প্রশাসন থেকে এলাকা ঘিরে দিয়েছে। মুদি-সবজি, কোন দোকান খুলছে না। ভ্যানদোকানিককেও ঘেঁষতে দিচ্ছে না। পল্টুদা বলছিল আমাকে, তুই যদি আসিস, হাত লাগাস। উপকার হয়!

     একটু আগে পর্যন্ত ঝিমিয়ে পড়া সুখেন, বাচ্চুর প্রস্তাবে মুহূর্তে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠল। সেবাব্রতের জন্য চোখেমুখে উপচে উঠেছে সদিচ্ছার ঝিলিক। অসুস্থ বাবা আর নিজের বন্ধ হতে চলা জীবিকার জন্য আশঙ্কা কয়েক লহমার মধ্যে চোখমুখ থেকে বিদায় নিয়েছে।

     পল্টুদাকে বলিস আমি আসছি। বিকালে মাঠে দেখা করছি।

II ৩ II

ফুটবল একদম ছেড়ে দিলি, সুখেন? তোর বাঁ পায়ে খুব ভাল শট ছিল। তোর জন্য চিন্তা হয়।

     আর কি!  ওসব পাট চুকেবুকে গেছে। থাক, আর মনে করিও দিও না। আমি সব ভুলতে চাই।

     আজ এককথায় চলে এলি?

            আর পারছিলাম না। দোকান যে আজ নয় কাল বন্ধ হবে, সেটা রতনের হাবভাব দেখে বেশ বুঝতে পারছি।

     মেসোমশাইয়ের ওষুধের খরচ? বাড়ির খরচ? কি করে চালাবি এসব?

     সুখেনের মুখে কুলুপ। একবার পল্টুদার দিকে তো একবার বাচ্চুর দিকে তাকিয়ে, সে মুখ নীচু করে থাকে। শেষে তার হয়ে মুখ খোলে বাচ্চু।

     সখের মোটরসাইকেল, ওষুধ দোকানে বাঁধা দিয়েছে। দোকানিকে বলেছে যেদিন পারবে, ধার শোধ করে বাইক ছাড়াবে। সে যেন ওষুধ দেওয়া বন্ধ না করে।

     পিঠে একটা চাপড় দিয়ে সোল্লাসে ফেটে পড়ে পল্টুদা।

     বাঘের বাচ্চার মত কাজ করেছিস। এই না হলে আমার সেন্টার ফরোয়ার্ড। সাবাশ সুখেন, সাবাশ! স্পোর্টসম্যান স্পিরিট তা কোন দিন বিসর্জন দিস না।

     ঘাড় নুয়ে পড়া একটা মানুষের ভিতর থেকে তার খেলোয়াড়ি সত্তা যে প্রচণ্ড গতিতে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সেটা বাচ্চু বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিল।

     এবার বল পল্টুদা, সুখেন যে একাই একশো, সেটা তুমি নিশ্চয় স্বীকার করবে!

     ওরে, সেবার নেপালের ভূমিকম্পে আর কেরালার বন্যায়, সুখেনের চারদিকে ছুটে বেড়ানো কি ভুলে যাওয়ার। ও যে ক্লাবে ফিরে এসেছে, সেটা আমাদের ভাগ্য। ওর মত একটা ছেলে পাশে থাকা মানে আমি পৃথিবীর সব থেকে বড় সমাজসেবী।

     ওসব থাক, সুখেনদা! গরিব মানুষের হাতে রেশন তুলে দিতে পেরে আমি দারুন খুশী।

     কথার মাঝখানে, বাচ্চুর হঠাৎ চোখে পড়ল, উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে আসছে বাবলু।

     ওই দ্যাখো, পল্টুদা। বাবলু…

     সব্বোনাশ হয়ে গেছে পল্টুদা, খিচুড়ি বিতরণ নিয়ে দুই পার্টির মধ্যে ধুন্ধুমার লেগেছে। টপাটপ বোম পড়ছে। যে যেদিকে পারছে, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পাগলের মত ছুটে পালাচ্ছে।

     কি বলছিস? এই তো এক ঘন্টা হল, আমরা রেশন দিয়ে ফিরলাম।

     তোমরা ফিরে আসার পর ওরা ঢুকেছে।

     ওরা মানে?  কারা ঢুকেছে?

            বাচ্চু বলে উঠল

     নিশ্চয় অবনীদার দল আর বীরেন সামন্তের লোকজনের মধ্যে মারপিট লেগেছে।

     পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে?

     সেসব কিছু জানি না।

     সুখেন বলে ওঠে

     পল্টুদা, এটা এলাকা দখলের লড়াই। ওদের বিশ্বাস নেই। ওরা বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে!

            বলতে বলতে চারজন লক্ষ্য করল, দূরে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। পল্টু আঁতকে উঠে বলে

     কি করবি?

            শিগগির চল। ওদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। দেরি করলে অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে।

     ওদের হাতে অস্ত্র থাকতে পারে!

     দেখি চল।  তাই বলে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে তো দেখতে পারি না!

II ৪ II

ডুমুরজলা কোয়ারান্টাইন সেন্টারের বাইরে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ ভ্যান। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে নেতা-মন্ত্রীদের গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা হুটারের আওয়াজ। দরজার বাইরে একটু দূরে মাথা নীচু করে উবু হয়ে বসে আছে পল্টুদা। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে, বাবলু বলে ওঠে

     হাওড়া হাসপাতালে নিয়ে গেলে হত না? এখানে কি আদৌ চিকিৎসা হবে?

            চাতকের মত, সেন্টারের গেটের দিকে তাকিয়ে আছে বাচ্চু। পল্টুদা চিৎকার করে ওঠে

     ভিতরে গিয়ে একবার দ্যাখ না, বাচ্চু। কি হল ছেলেটার?

            বাবলু আবার বলে ওঠে

     বাড়ির লোককে খবর দেওয়া বাকি। ওর বাবার ফোন নাম্বার আছে তোমার কাছে?

     পল্টুদা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বাচ্চুর দিকে তাকায়।

     আমি জানি না। আমার কাছে নেই।

     গেটের মুখে দাঁড়িয়ে একজন নার্স ইঙ্গিত করছে। সবাই গেটের দিকে এগিয়ে যায়।

     আপনারা বাঁ দিকের ঘরে বসুন। ভিতরে ঢুকবেন না।

     আমাদের কথা ছেড়ে দিন সিস্টার। আমাদের কিছু হবে না। ওর কি হল বলুন!

     ডক্টর বাগচী দেখছেন। যা ইকুইপমেন্ট আছে, তাই দিয়ে ফার্স্ট-এড দেওয়া চলছে।

     বাচ্চু প্রাণপণে কিছু বলতে চায়

     সিস্টার! আমাদের বন্ধুর কিছু হবে…

            এখানে তো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এটা কোয়ারান্টাইন সেন্টার! অ্যাম্বুলেন্স আসলে, হাওড়া হাসপাতালে শিফট করে দেবে। আপনারা আসুন। আপনাদেরও ফার্স্ট এড দরকার।

     বাচ্চুর হাত আর পায়ের ক্ষতগুলো পরিস্কার করতে করতে সিস্টার বললেন

আপনাদের কপাল ভাল। ডক্টর বাগচী, বস্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আর পুলিশও এসে পড়েছিল। নাহলে যে কি হত!


     অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে, সুখেনের জ্ঞান ফিরল। চোখ দুটো সামান্য খুলে পল্টুদাকে দেখে বলে ওঠে

     বস্তির লোকজন ভাল আছে, পল্টুদা?

     বরাবর চটপট কথা বলার জন্য পরিচিত যে পল্টুদার, সুখেনের প্রশ্লের উত্তরে তার মুখেও কোন উত্তর নেই।

     বাচ্চু বলে ওঠে

     কি করে পারিস সুখেন?  চার দিকে বোমার স্প্লিন্টার ছুটছে, তার মধ্যে বস্তিতে ঢুকে পড়লি?

     কি করব? চুপ করে যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ভিতর থেকে কেউ এগিয়ে দিল।

     পল্টুদা আর চুপ করে থাকতে পারল না। চোখে জল নিয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে বলল,

            ওরে তুই একজন জাত স্ট্রাইকার। ফার্নিচার দোকানে হাতুড়ি, বাটালি ধরার কাজ তোর জন্য নয়। এই মৃত্যু আতঙ্ক তোর জন্মান্তর ঘটিয়েছে। আমরা আর তোকে হারাতে চাই না।



অরূপম মাইতি

জন্ম তারিখঃ ০১।০১।১৯৬৫, জন্ম স্থানঃ কলকাতা। বাবাঃ স্বর্গত নারায়ণ চন্দ্র মাইতি। মাঃ স্বর্গত পুষ্প রাণী মাইতি । শিক্ষাঃ স্নাতক (বিজ্ঞান)। পেশাঃ আধিকারিক, ভারত সরকার, রেলওয়ে মন্ত্রক। প্রকাশিত গ্রন্থাদিঃ ১। শূন্য থেকে ফিরে (একক কা্ব্যগ্রন্থ), ২। রুদ্ধ স্রোত (একক গল্প সঙ্কলন), ৩। একবিংশের কবিতা সংকলন (সমবেত কাব্যগ্রন্থ), ৪। সপ্তর্ষির আলো (সমবেত কাব্যগ্রন্থ), ৫। নির্বাচিত কবিতা-শতক (সমবেত কাব্যগ্রন্থ), ৬। এ প্রজন্মের ৩২ জন কবির কবিতা (সমবেত কাব্যগ্রন্থ), ৭। আখ্যানমঞ্জরী (সমবেত গল্পগ্রন্থ), ৮। নির্বাচিত প্রেমের গল্প (সমবেত গল্পগ্রন্থ), অনুবাদ গ্রন্থঃ ১। স্মরণিকা (প্রয়াস সাহিত্য উৎসব ২০১৮ - বিশিষ্ট কবিদের ২২টি কবিতার অনুবাদ), ২। বিস্মৃত যুগের শব্দ (কাব্যগ্রন্থ-কবি সৌমেন চট্টোপাধ্যায়ের ২৯টি কবিতার অনুবাদ), সম্পাদনাঃ ১। দশমীর চাঁদ, (দশ কবির কাব্যগ্রন্থ), ২। সং অফ দি সোল (বিশিষ্ট কবি আবদুস শুকুর খানের নব্বইটি কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ), ৩। সমকাল (একটি ধারাবাহিক সাহিত্য পত্র্‌)।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।