অসুখ-যাপন

হৈমন্তী ভট্টাচার্য on

asukh_japon

সাওয়ারের জলের ধারায় ভিজতে ভিজতে একটা বৃষ্টিস্নানের অনুভূতি হয় কাজরীর। গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে  সিক্ত নিরাবরণ ত্বকের ওপর সাবানের ফেনার পিচ্ছিল আদুরে স্পর্শ এই বৈশাখের দুপুরে সব চেয়ে আরামের মনে হয়। দামি সাবানের সুগন্ধে পরিচ্ছন্নতার সুবাস  নিঃশ্বাস নেবার সাথে সাথে বুকের অলি গলিতে পৌঁছে নিদাঘতপ্ত চেতনাকেও শান্ত করে দেয়।

  সাবানে পিচ্ছিল হাতটা সুগোল স্তনযুগলের উপর বৃত্তাকার ঘোরাতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ভয়ের স্রোত নেমে গেল। বামদিকের স্তনে বৃন্তের কিছুটা উপরে হাত দিতেই একটা শক্ত দলার মত হাতে ঠেকল মনে হল। হাতে আরও কিছুটা সাবান নিয়ে আরো বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করল সে। একটা শক্ত দলা, ছোটবেলায় মাটির পুতুল তৈরির সময়ে মাটির মধ্যে শক্ত ঢিল থাকলে যেমন হাতে লাগতো তেমন করে একটা শক্ত কিছুতে যেন হাতটা বারবার বেধে যাচ্ছে।

কাজরী দ্রুত স্নান সেরে বেরিয়ে এলো তোয়ালে জড়িয়ে। বুকের মধ্যে হৃদস্পন্দনের শব্দটা বড় বেশি মনে হচ্ছে। ঘরে এসে নাইটি, হাউসকোট পরার আগে আরও দুবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্তনের প্রতিবিম্ব দেখলে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে। কোন বদল তো চোখে পড়ছে না।  আজই অয়নকে বলতে হবে। 

   মনের মধ্যে একটা অশুভ চিন্তা, একটা ভয় খচখচ করতে লাগলো  সারা দিন।  অনেকবার সে বোঝার চেষ্টা করলো কোনো ব্যথা হচ্ছে কি! একবার মনে হল হালকা একটা ব্যথা যেন অনুভূত হল যেন। উফফ! অয়ন ফিরতে ফিরতে সেই রাত দশটা। 

দুপুরে খেতে বসে সব খাবারই মুখে বিস্বাদ লাগলো কাজরীর।

_”বৌদি মাছটা খেলে না ?” মানদা প্রশ্ন করল।

-“নারে, পেটটা ভারী লাগছে। খিদে নেই ঠিক, গ্যাস হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।” হাত ধুতে ধুতে বলল কাজরী।

দুপুরে দোতলার শোবার ঘরে পাখা ফুল স্পিডে চালিয়ে চুলটা ছড়িয়ে বিছানার ওপর শুলো সে। পুরনো আমলের বাড়ি, ঘর গুলো বেশ বড় বড়, আর মোটা গাঁথনির দেওয়াল পরিবেশের গরমকে এক পরত কমিয়ে দেয় ঘরের ভেতরে।

        দশ মাস আগে তার বিয়ে হলেও  আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে অনেক আগে। বিনতা, তার মামাতো দিদি যখন এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছিল তখন থেকে। প্রথম প্রথম একটু লজ্জাই করত তার, কিন্তু বিনতা ফোন করে রোজ ডেকে পাঠাতো, না এলে খুব অভিমান করতো।

     বিছানার মাথার দিকে দেয়ালে একটা নতুন পেরেক লাগানো হয়েছে। অয়ন কাজরীর সিঁথি রাঙিয়ে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছে, ফটোগ্রাফারের সঠিক এঙ্গেলে নিপুণ দক্ষতায়  তোলা ছবি দোকানে বাঁধাতে দেওয়া হয়েছে। সেটা ওখানে টাঙ্গানো হবে। নতুন পোঁতা পেরেকটার পাশে অবশ্য একটা ছবি ঝুলছে। ছবিটায় অয়ন এক হাতে জড়িয়ে আছে বিনতাকে, মাঝে ছোট্ট এক বছরের সাক্ষী। এক বছরের মেয়েকে সাথে  নিয়ে ওরা দীঘা গিয়েছিল, তখন তোলা।  দীঘা থেকে সেবার বিনতা পিসতুতো বোন কাজরীর জন্য একটা ঝিনুকের আয়না নিয়ে এসেছিল, কাজরীর কাছে এখনো আছে সেটা। 

        ছবিতে সবাই কী সুন্দর হাসছে। এই ছবিটা তোলার দুমাস পরেই বিনতার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পরল। ওরও তো প্রথমে স্তনে একটা ব্যথাহীন মাংসের দলা তৈরি হয়েছিল। বিনতা সেটা কাজরীকে বলেওছিল, তবে প্রথমে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। 

       বিনতার ছবিটার দিকে সে আবার তাকালো। কে বলবে যে ওর শরীরে তখন আস্তে আস্তে অসুস্থ অস্বাভাবিক কোষ নীরবে পদ্মার ভাঙনের মত ভেতর থেকে ক্ষয় শুরু করে দিয়েছে!! দিব্যি স্বামী সন্তানে পরিপূর্ণ হয়ে শীতকালের রোদের নরম আঁচে সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে।

      কাজরীরও ওরকম  অসুখ করেনি তো! ক্যান্সারই নয় তো!!যদি হয়!!কাজরী ভীষণ অস্বস্তিতে এপাশ ওপাশ করতে লাগল। প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছে। তলপেটে একটা চাপ অনুভূত হচ্ছে। একবার কি বাথরুম থেকে ঘুরে আসবে।

***************************

        বেশ বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে কাজরী। এবাড়িতে তার কাজ বিশেষ কিছুই নেই। উত্তরপাড়ার গঙ্গার ধারে এই পুরনো আমলের তিনতলাবাড়ির একতলাটা পুরোটাই বিভিন্ন দোকান আর গাড়ির শোরুমকে ভাড়া দেওয়া আছে। অয়নদের তিন পুরুষের ওষুধের দোকান আছে উত্তরপাড়ার কাছেই ভদ্রকালীতে। দুপুরে চারবাটির স্টিলের টিফিন কৌটায় ভাত, তরকারি, মাছ গুছিয়ে দোকানে পাঠিয়ে দেয় কাজরী। কর্মচারী নিয়ে যায়। ব্যাস, সারাদিনে এটুকুই তার কাজ। বাকি সময়টা বিছানায় শুয়ে, বা টিভিতে একই সিরিয়ালের একাধিক পুনঃপ্রচার দেখেও সময় যেন তার কাটতেই চায় না। ইদানিং বই পড়তেও বড্ড আলস্য লাগে।

অয়ন আগে বিকেল বেলাতেই ফিরত। বিনতা বই দেখে নানা রকম নতুন নতুন রান্না করত। লাল সিমেন্টের চকচকে মেঝের ওপর ছোট্ট সাক্ষী হামা দিয়ে বেড়াত।  কাজরীতে সাক্ষী রেখে দুজনের চলত ছদ্ম দাম্পত্য খুনসুটি। অয়নের  মা বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন।  বিকেলে ওদের গল্পগাছা জমে উঠত। 

এখন বাড়িটা একদম শুনসান লাগে। কাজরী নিজের ঘরেই শুয়ে থাকে। বাকি ঘরগুলোতে বিকেল হলে কাজের লোকেরাই আলো জ্বেলে দেয়। সব দিন একা একা চা খেতেও ইচ্ছে করে না।

    অয়ন কি তার সাথে কথা বলে আনন্দ পায় না তেমন? কাজরী অনুভব করে কথা বলার বা কথা চালিয়ে নিয়ে যাবার বিষয়ই যেন তারা খুঁজে পায় না। বিনতা নতুন বিয়ের পর অনেক নিমন্ত্রণ পেত, কাজরী জানে। কাজরীর মাও ওদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু কাজরীর ক্ষেত্রে তেমন হয় নি। বিনতা চলে যাবার এক বছরের মধ্যে ওদের বিয়ে এবং কাজরী বিনতার বোন বলেই হয়ত আত্মীয়রা  একটু দুরত্ব রচনা করেছে। কিম্বা কাজরী নিজেই হয়ত একটু আড়ষ্ট থাকে। তাই যে আত্মীয়দের সাথে আগে বিনতার বোন হয়ে অনেক কথাবার্তা চলত, এ বাড়ির নতুন বউ হয়ে এসে তাদের সাথেই সহজ মেলামেশার পথে একটা সংকোচের পাঁচিল তৈরি হয়ে গেছে। 

      বিনতা মারা যাবার পর সাক্ষীকে ওর দাদু দিদা নিয়ে গেছেন। বাচ্চাটা থাকলে তবু সময় কেটে যেত। মাসীর বেশ নেওটাও ছিল খুদেটা।

    গত রাতে অয়ন ফেরার পরই কাজরী ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে বলেছিল, ” আমার বুকের বাঁ দিকে একটা লাম্প মনে হচ্ছে।”

-“সে কি!! ” অয়ন চমকে উঠেছিল।

-“কই দেখি”, দ্রুত হাতে বাম স্তনটা পরীক্ষা করে হাতে দলা অনুভূত হয়নি,” কই, কোথায় ?কিছু তো নেই!”

কাজরীও খুঁজে পেল না। কিন্তু সে তো হাত দিয়ে পেয়েছিল! 

    ক্যান্সার ধরা পড়ার পর খুব বেশিদিন ভোগেনি বিনতা। অনেকটা ছড়িয়ে পড়ার পর ধরা পড়েছিল। তবে কী বিনতার হাতেও আর কয়েকটা মাত্র দিন আছে! বিনতার মত তাকেও সব ফেলে চলে যেতে হবে!  উপুড় হয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল কাজরী।

***************************

গাইনোকোলজিস্টের চেম্বারে সাদা পর্দার আড়ালে সরু সাদা বিছানার ওপর আড়ষ্ঠ কাজরী বসে আছে। ডক্টর কুশল রায় স্তনের ওপর বৃত্তাকারে হাত ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “দেখুন মিসেস বোস আমি হাতে পরীক্ষা করে কিছু পাচ্ছি না। আপনার কি কোন ব্যথা হয়?”

কাজরী একটু ভেবে বলল,”হ্যাঁ মাঝে মাঝে”।

ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন,”আপনি কি হাত দিয়ে বারবার পরীক্ষা করেন?”

কাজরী চুপ করে রইল।

ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে নিজের চেয়ারে বসে অয়নকে বললেন,”দেখুন আমি কিছু পেলাম না। একটা  ম্যামোগ্রাম লিখে দিলাম, দেখা যাক। তবে মনে হয় না কিছু পাওয়া যাবে।”

গতকাল রাতে যখন আদর সোহাগে কাজরীর শরীরটাকে প্রস্তুত করে নিচ্ছিল অয়ন তখন হঠাৎ একটা হালকা আর্তনাদ করে উঠেছিল কাজরী।

-“কি হলো?” অয়ন শিউরে উঠে বলেছিল। 

-“একটা ব্যথা হল”, কাজরী উঠে বসে বলেছিল। তারপর অয়নের হাতটা টেনে নিয়ে স্তনের একটা জায়গায় রেখে বলেছিল, “এই জায়গাটায়। দেখো ত একটু আলো জ্বেলে।”

দ্রুত পোশাক পরে আলো জ্বালিয়ে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করেও কিছু খুঁজে পাইনি অয়ন ।কাজরী তখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে।

একটু অপ্রত্যাশিত কড়া গলায় অয়ন বলেছিল, “কাজরী, একটা কথা বলবে? তুমি আমার ঘরের কম্পিউটারে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সিম্পটম এগুলো সার্চ করে দেখেছো না?”

কাজরী ভয়ে ভয়ে অয়নের দিকে তাকিয়ে ছিল। অয়ন গলার স্বরে বিরক্তি হতাশা মিশিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ে বলেছিল,” তুমি এত কেন প্যানিক করছো অকারণে? এরকম রোগ রোগ বাই তোমার কীকরে হল বল তো?”

কাজরীও হঠাৎ ফুঁসে উঠেছিল, ”এটা বাই? খুব বিরক্ত লাগছে , তাই না? যত ক্ষণ তোমায় শরীর মন দিয়ে সেবা করতে পারব, ততদিন সোহাগ করবে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে? তারপর যখনই বুঝবে ঘুন ধরে গেছে তখনই ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্য নৌকা খুঁজবে? ছি, লজ্জা করে না?”

-“কী বলছ এসব?” অসহায় শুনিয়েছিল অয়নের গলা।

কাজরী সাপের মত হিসহিস করে বলেছিল, ” তুমি মেজদিকেও নিশ্চয় প্রথম দিকে ভালো ভালো কথা বলতে।তারপর অসুখ হল যখন তখন ভাবলে ও মরলে তুমি বাঁচো। কি তাই না?”

  সারা রাত অয়ন জেগে কপালের ওপর হাত রেখে শুয়ে ছিল। আরেকপাশে নীরবে বালিশ ভিজিয়ে কেঁদেছিল বিনিদ্র কাজরী।

ঝুঁকি না নিয়ে পরের দিনই ওরা এসেছে ডাক্তারের কাছে। কাজরী ডাক্তার বেরিয়ে যাওয়ার পর পোশাক ঠিক করে নিতে নিতে  ভাবল বিনতার ক্ষেত্রেও কি  ডাক্তার  প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি!! এ কদিনে বার বার হাত চলে গেছে , সন্ধানী হাত পরখ করে দেখতে চেয়েছে কোনো অস্বাভাবিক কিছু বোধ হচ্ছে কিনা। কখনো মনে হয়েছে কিছু আছে, ব্যথা হচ্ছে। আবার কখনো মনে হয়েছে কোথাও কিছু তো নেই!

***************************

         ম্যামোগ্রামে কিছু পাওয়া যায়নি। কাজরী যখন আধো অন্ধকার পরীক্ষা কক্ষে ঢুকছিল, ওর হাত-পা অসম্ভব কাঁপছিল। ঘেমে বরফের মত শীতল হয়ে গেছিল সারা শরীর। যতক্ষন পরীক্ষা চলছিল সারা শরীরে যেন অসংখ্য ছুঁচ বিঁধছিল। অয়ন বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেও বিনা কারণে ‘আহ, থামো না’ বলে ধমকে উঠেছিল কাজরী। 

        পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে যখন অয়ন বাড়ি ফিরেছিল, তখন দেখেছিল কাজরী  বার বার বাথরুমে যাচ্ছে, ওয়াক তুলে বমি করার নিস্ফল চেষ্টা করছে। চুল খোলা, উন্মাদিনীর মত কাজরীর দিকে রিপোর্টটা ছুঁড়ে দিয়ে বিরক্তি উগরে দিয়ে বলেছিল, “কিচ্ছু হয়নি। এবার শান্তি?”

    রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে শুনে পাগলের মত কাঁদতে আরম্ভ করল কাজরী। সে কান্না থামতেই চায় না। শরীর মনের ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত অয়ন “শোনো লক্ষ্মীটি” বলে বার বার চেষ্টা করছিল থামানোর। শেষে সপাট

এক চড় সে বসিয়ে দিয়েছিল বাধ্য হয়ে।  

    ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখানোর পর তিনি সব শুনে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট রেফার করেছিলেন। পরেরদিনই যাওয়া হল সেখানে। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া কাজরীকে ডাক্তার বলেছিলেন ,”আরে ম্যাডাম, ক্যান্সার আপনার শরীরে নেই, এই মগজে রয়েছে ভয় হয়ে”।

তারপর অয়নের দিকে ফিরে বলেছিলেন, “শুনুন এটা একটা ডিপ্রেশনের পর্যায়। সাইকোসমাটিক ডিজঅর্ডার। ওষুধ খেতে হবে বেশ কিছুদিন।”

কাজরীকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে বলেছিলেন,”আপনার প্রথম স্ত্রীরও ক্যান্সার হয়েছিল বললেন না? সেটাও কোন ভাবে মনের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করতে পারে। সব কিছু হারিয়ে ফেলার ভয়”।

***************************

      কাজরীর ঘুমটা অসম্ভব বেড়েছে। ওকে এখন যে ওষুধ গুলো খেতে হয় সেগুলো খেলে চোখ টেনে আসে ঘুমে। চাইলেও কেন যেন চোখ খুলে রাখা যায় না।

আড়াই মাস ধরে ওষুধ এবং কিছু হালকা প্রাণায়াম চলছে। কয়েক সিটিং কাউন্সিলিং হয়েছে। আজ দুপুরে ঘুমিয়ে উঠার পর একটু তাজা লাগছে কাজরীর। এখন একটু ঠাণ্ডা মাথায় বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করতে পারছে আবার। কাজরী নিজেই অনুভব করছে সে অনেকটা ভালো আছে।

        বিকেলে একটু গা ধুতে গেল সে। পোশাক খুলে নিজেকে নিরাবরণ করার পর একবার তার মনে হল হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখবে নাকি আরেকবার, তার কিছু হয়েছে কিনা। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা আগের মত তীব্র মনে হচ্ছে না, থাক বরং। হাতের ভাঁজে, হাঁটুর নীচে বেশ ময়লা জমে আছে।  ‘ইস’!! ঘষে ঘষে নিজেকে মলিনতা থেকে মুক্ত করতে লাগল কাজরী। 

     ঘরে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে দেখল দামি পছন্দের লিপস্টিক গুলো অগোছালো হয়ে পড়ে আছে। আস্তে আস্তে গুছিয়ে ফেলল সেগুলো।

     ঘরটাও একটু গোছাতে ইচ্ছে করছে। রুম ফ্রেশনারের তরতাজা গন্ধে ঘরের গুমোট ভ্যাপসা গন্ধটা একটু কমল। একটা খয়েরি রঙের টেডি বিয়ার একটা কোনে পড়ে আছে, অনেক বার কাচার ফলে রঙটা অনুজ্জ্বল হয়ে গেছে। বাচ্চা মেয়েটা এই খেলনাটা নিয়ে যায়নি। কাজরী সেটা কোলে নিয়ে নরম পশমের ওপর দুচারবার হাত বোলালো। দুটো নরম হাতের স্পর্শ লেগে আছে। ও যদি আসে কাজরী ওকে অনেক এরকম খেলনা বানিয়ে দেবে। ও এক সময়ে সফট-টয়েস তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছে। 

     কাজরী পুরোনো কথা ভাববার চেষ্টা করল। ততদিনে ক্যান্সারের বিষ ছড়িয়ে গেছে বিনতার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে। যাকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলে মেটাস্টাটিক স্টেজ। আর বিশেষ কিছুই করার নেই, কষ্টকর রোগ, যন্ত্রণাদায়ক চিকিত্সা পদ্ধতি, প্রিয়জনকে চোখের সামনে একটু একটু করে শেষ হতে দেখা ছাড়া।  সেদিন অন্ধকারে বসার ঘরে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে ছিল অয়ন। জর্জেটের হালকা সাদা পর্দাগুলো হাওয়ায় অল্প অল্প নড়ছিল। কাজরী ঘরে ঢুকে চায়ের কাপটা সামনে রেখে নরম গলায় বলেছিল ,”অয়নদা, চা টা খেয়ে নাও।”

অয়ন নিঃশব্দে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে ছিল।

-” আমি আর পারছিনা ওর এত কষ্ট দেখতে । এদিকে জমানো টাকা প্রায় শেষের পথে। কি করবো আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। বাচ্চাটার কি হবে!” অয়ন ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল।

কাজরী সেদিন কিছু না ভেবেই অয়নের মুখটা দুটো হাতে ধরে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। সেটা হয়তো নেহাত ক্ষণিক আবেগের প্রকাশ। তবু সেদিন অয়নের ভেঙে পড়া মুখটাকে বড্ড বেশি মমতা দিয়ে আগলে রাখতে ইচ্ছে হয়েছিল তার।

আজও মনে মনে অয়নের মুখটা আবার বুকে চেপে ধরল কাজরী।

***************************

         শ্রাবণের ঘন কালোমেঘ গঙ্গার ওপর  ঘনিয়ে উঠছে। জল আর আকাশের মাঝবরাবর আকাশটা উজ্জ্বল সাদাটে।ছাদে দাঁড়িয়ে দেখতে খুব ভালো লাগছিল কাজরীর। টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হতেই তাড়াতাড়ি ছাদের দরজা বন্ধ করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল সে। 

     এখন সে অনেকটাই ভালো আছে। ওষুধ চলছে, তবে ডোজ কমেছে। বেশ অনেকগুলো নরম কাপড়ের পুতুল কাজরী বানিয়ে ফেলেছে। সেগুলো কাঁচের আলমারিতে যত্ন করে সাজিয়ে রাখল।

অনেকদিন বাদে বিকেলে পরিপাটি করে চুল বাঁধলো। একটু চা খেতে ইচ্ছে করছে।  রান্নার লোককে ডেকে কী রান্না করতে হবে সে সম্পর্কে ভালোমতো নির্দেশ দিল। অন্যদিন রান্নার লোক নিজেই ফ্রিজ খুলে আনাজ দেখে নিয়ে নিজের  মতো করে কিছু করে দিয়ে যায়।

বসার ঘরে এসে দেখল অয়ন ফিরে এসেছে। মানদাকে ডেকে কাজরী বলল,” দু’কাপ চা বসার ঘরে দে।”  চায়ের সাথে একটু তেলেভাজা হলে বেশ হত। কিন্তু অয়নকে এই বৃষ্টির মধ্যে বেরোতে বলা ঠিক হবে না।

           অনেকদিন বাদে বিকেলে একসঙ্গে চা খাচ্ছে ওরা। অয়নকে একটু যেন উদাস দেখাচ্ছে। আলগোছে বলল,” ওষুধ খেয়েছো?”

-“হ্যাঁ ”  বলল কাজরী।

অয়ন চশমাটা খুলে চোখ মুছে বলল, “আমার মনে একটা  প্রশ্ন আছে, জানো, বেশ কিছুদিন ধরে মাথায় ঘুরছে”।

কাজরী আস্তে আস্তে বলল ,”কি?”

অয়ন বলতে লাগলো,” কোথাও কি তোমার আমাকে অবিশ্বাস হয়? তোমার কি এটাই মনে হয় যে বিনতার অসুস্থতার সময় আমরা কাছাকাছি এসেছি, একটা কোথাও ওকে আমি প্রতারণা করেছি?

-“মেজদি হয়তো শেষের দিকে কিছু একটা বুঝতে পেরেছিল”।

-” তাই ? কিকরে বুঝলে?”

কাজরীর মনে পড়ে গেল শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হবার পর যখন কাজরী ওকে দেখতে গিয়েছিল সাদা বিছানার সঙ্গে বিনতার ফ্যাকাসে শরীরটা যেন মিশে গিয়েছিল। চুলহীন মুণ্ডিতমস্তক সহ কপালের নিচে চোখ দুটো বড্ড বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিলো। একদৃষ্টে তাকিয়েছিল কাজরীর দিকে। তারপর আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল। এক ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়েছিল বন্ধ চোখ থেকে।

অয়নকে সে কথা  বলতে গিয়েও আটকে গেল কাজরী, ” না এমনিই মনে হলো।”

অয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে  বলল ,”আমরা সেদিন যেটা করেছিলাম পরিস্থিতি সেদিন সেটাই দাবি করেছিল। আমি সেদিন মনের সব জোর হারিয়ে ফেলেছিলাম। তুমি এসে হাতটা না ধরলে আমি দাঁড়াতে পারতাম না। একের পর এক ডাক্তারের কাছে যাওয়া, বিভিন্ন টেস্ট করানো, রিপোর্ট কেমন হবে সেই টেনশন নেওয়া ,বারবার অ্যাডমিট করা আমি পারতাম না কাজরী।”

-“কিন্তু যে মনের চিন্তায় আমাদের হাত পৌঁছয় না সেখানে হয়তো একটা অপরাধবোধ বাসা বেধে আছে আমার মনে। ” কাজরী নিবিড়ভাবে স্পর্শ করল অয়নকে, “আমি এখন নিজেকে অনেকটা চিনেছি।”

        অয়ন কাজরীকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বিভাজিকায় মুখটা নামিয়ে  বলল, “শেষের দিকে মনে হতো বিনতা এবার চলে যাক, আমি মুক্তি পাই। কিন্তু আমি ওকেও… বিশ্বাস করো। …আমরা কোনো অন্যায় করিনি।”

-“আমারও সত্যি ভীষন ভয় করছিল , বার বার মনে হচ্ছিল দিদি হয়ত সবটা বুঝতে পেরেছিল। সেই পাপেই হয়ত আমিও শেষ হতে বসেছি, তোমাকেও অনেক কষ্ট দিয়েছি হয়ত”।

অয়ন নীরবে কাজরীর ঘন চুলের মধ্যে আঙ্গুল ডুবিয়ে ওর মাথাটা আরো একবার বুকের মধ্যে টেনে নিল। কাজরী দুহাতে অয়নকে আঁকড়ে ধরে সেই বুকের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে লাগল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ দুটো মানুষের নীরবতার শূন্যতা পূরণ করে চলেছে। অনেকদিন পর তাদের দুজনেরই সর্বাঙ্গ আবেগে কণ্টকিত হয়ে উঠল। দুটো তৃষিত ওষ্ঠ এগিয়ে আসল পরষ্পরের দিকে। মনের উত্তাপ শান্ত করে দিল আশ্লেষে ভরা চুম্বন। নিদাঘ তপ্ত মাটিতে বর্ষার জলধারা শান্তির আল্পনা এঁকে দিল।

      কাজরী এবার একটু আদুরে গলায় বলল, “এবার থেকে তুমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবে। আমার এই রোগ রোগ বাতিক করে বেশ কটা দিন শুধু শুধু নষ্ট হল । অসুখ সত্যি সত্যি হলে তখন না হয় কি করে বাকি সুখটুকু ধরে রাখা যাবে সেটা নিয়ে ভাববো। ” তারপর বড় বড় টানা টানা চোখ দুটো অয়নের চোখে রেখে বলল,”আর আপাতত সব থেকে জরুরি কাজ হল….”

-“কী?”

অয়নকে হাত দিয়ে একটা খোঁচা মেরে কাজরী বললো, “এই, কাল মামাদের ওখানে যাবো ভাবছি। আমাদের মেয়েটা আর কতদিন মামাবাড়ি পড়ে থাকবে?”

চোখ বুজে মনে মনে দুটো নরম কচি হাতের স্পর্শ অনুভব করতে করতে অয়ন বলল, “যদি ওরা পাঠাতে না চায়!”

-“আবার যাব, বারবার যাব। তারপরও পাঠাবে না? কতদিন আর অভিমান করে থাকবে?”

   এই প্রশ্নের উত্তর অয়ন কাজরীর প্রত্যয়ী চোখে খুঁজতে লাগল। কথা ঢাকা পড়ে গেল দমকা হাওয়ার তালবাদ্যে। বৃষ্টির জলতরঙ্গ দুটো মনের মিলনসঙ্গীতের সহচর হয়ে বাজতে লাগল আশাবরী রাগিনীতে।

***************************



হৈমন্তী ভট্টাচার্য

পেশা: শিক্ষিকা। নিবাস: দমদম।

1 Comment

Via Artiam · আগস্ট 16, 2020 at 6:06 অপরাহ্ন

ভালো লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।