মেকআপ

চন্দ্রানী গোস্বামী on

রাত যত গভীরতার দিকে গড়ায় ততোই যেন একটা ভয় চেপে বসতে থাকে বুকের ভেতর ইদানিং। এখন ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা মতো বাজে। খাওয়া শেষে মিনতি দৈনন্দিন টুকিটাকি রান্নাঘরের কাজ সারছে। এখুনি ই ডাক দেবে সে। কই গো,,, তোমার সুখটান শেষ হলো! শুনলেই বুকের ভেতর যেন লক্ষ হাতুড়ি ঘা মারতে থাকে। আজকাল রাতে ঘরে শুতে যেতে একটা ভীষন ভয় তার। এমনি করে যদি সারারাতটা কেটে যেত বাইরে তবে বেঁচে যেত। বহুবার জীবনে নানা বিপদের সম্মুখীন হয়েছে পেশাগত কারণে, অল্পবিস্তর ভয়ও হয়তো পেয়েছে। কিন্তু সাময়িক সেই ভয় কাটিয়ে শক্ত মনে পরিস্থিতির মোকাবিলা করে বেরিয়ে এসেছে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে। কখনো এমন ভয় সে পায় নি আজ পর্যন্ত। বর্তমানের এই পরিস্থিতির কাছে সেই সব ভয়ানক ভয়গুলোকে অনেক তুচ্ছ মনে হয় তার।

মিনতি কে দেখলেই এক বিষম অস্বস্তি বুকের ভেতর … এই কদিন দিনের বেলা কাজে কর্মে বাইরে কেটে গেলেও রাত নেমে এলেই একটা অদ্ভুত ভয় চেপে বসে। শত চেষ্টা করেও কিছুতেই ভয় মুক্ত হতে পারছে না সে। বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে এভাবে আর চলতেও পারবে না বেশীদিন। অথচ পালিয়েও যেতে পারছে না, কারণ বেশ মূল্যবান কিছু দরকারি কাগজ আর কিছু টাকা পয়সাও আছে তার ঘরের ভেতর। মিনতির চোখ এড়িয়ে সেগুলো বের করে নিতে পারছে না। শুধুমাত্র সুযোগের অপেক্ষায় শিকারী বেড়ালের মতো ওৎ পেতে আছে।

মিনতি তার বাঁধা কাজ সেরে দেখে মানুষটা এখনও বাইরের একচিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে। শহরতলীর এই শিল্পাঞ্চলে এককামরার ভাড়ার ফ্ল্যাটে তাদের বাস। একটা শোবার ঘর, একফালি রান্নাঘর, আর একচিলতে বারান্দা… তাতেই তাদের ঘর গেরস্থালি। সার সার আশে পাশের একই রকম সব ফ্ল্যাট গুলোতেই বিভিন্ন পেশার নিম্নবিত্ত মানুষদের বাস। সকলেরই মোটামুটি মুখ চেনে মিনতি। কিন্তু দু একটি পরিবার ছাড়া কারুর সাথেই তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই তার। মিনতির স্বামী নিমাই স্থানীয় একটি কারখানায় কাজ করে। যা আয় তাতে ঠাকুরের কৃপায় খুব স্বচ্ছল না হলেও সংসার চলে যায় মোটামুটি ভাবে। দোজবরে বিয়ে হওয়াতে মিনতির কোনো দুঃখ নেই। গরিব বাপ মা কি আর করবে। তারা চলে গেলে দাদাদের সংসারে গলগ্রহ হয়ে থাকার চেয়ে নিজের সংসারে দিব্যি আছে সে। সত্যি বলতে কি নিমাইকে দেখতে শুনতে খারাপ না। মুখে পুরু গোঁফ, চাপ দাড়ি আর মাজা গায়ের রঙে মিনতির নিজের বরকে বেশ পাঞ্জাবি লোকেদের মতো মনে হয়। যদিও বয়সে সে নিমাইয়ের চেয়ে বেশ অনেকটাই ছোট, তবুও বরের ভালোবাসায় সে সব দুঃখ সে অনেক আগেই ভুলেছে। বরং উচা লম্বা স্বামীকে দেখে মনে মনে বেশ গর্ব বোধ করে সে।

নিমাই সকালে খেয়ে দেয়ে কারখানায় চলে গেলে মিনতি একা হাতে দিব্যি সব কাজ সারে। নিমাইকে সে সংসারের কোনো কাজেই পায় না, আর এই তুমি আমির সংসার মিনতি একাই সবদিক দিব্য সামলে নিতে পারে। শুধু দিনমানে এক আধবার তার দরকার পড়ে নিমাইকে। মুখপোড়া বাড়িওয়ালাটা রান্নাঘরের তাকগুলো বড্ডো উঁচুতে লাগিয়েছে। মিনতির হাত পৌছয় না সেখানে, ভীষন রাগ হয় মনে মনে। তাই সকালে আর রাতে নিমাই তাক থেকে মশলার কৌটোগুলো নামা তোলার কাজটুকুই শুধু করে দেয়।

এছাড়া মিনতির বেশ ভাব পাশের ঘরের সদাশিব কাকার সাথে। অবিবাহিত কিন্তু বেশ হাসিখুশি ভালো মানুষ তিনি। বয়সে নিমাইয়ের চেয়ে বড়জোর বছর পাঁচ ছয়ের বেশী বড়ো হবে বলে মনে হয় না মিনতির। মিনতিকে কাকা বেটি বলে ডাকে, বেশ স্নেহ টেহ ও করে। মিনতি শুনেছে কাকা নাকি ভালো মেকআপ ম্যান। অনেক যাত্রা থিয়েটারে মেকআপ করে। আর কাকার একটা অদ্ভুত গুন আছে। ভীষন সহজেই মানুষের গলা নকল করতে পারে। এতোই নিখুঁত হয় সেই নকলনবিশি যে আসল মানুষেরও ধন্দ লেগে যায়। নিমাই অবশ্য পছন্দ করে না কাকার সাথে মিনতির মেলামেশা। বলে কাকা নাকি পাক্কা শয়তান, লোককে ব্ল্যাকমেইল করাই নাকি ধান্দা। মুখ দেখলে কই মনে তো হয় না মিনতির। দেখতে শুনতে কাকাকে ভালোই , চোখ নাক বেশ সুন্দর, মাজা গায়ের রঙ খানিক তার বরের মতোই, উচ্চতায় একটু খাটোই হবে হয়তো নিমাইয়ের চেয়ে, তবে কাকার মুখে কোনো দাড়ি গোঁফ নেই। মিনতি বেশ বোঝে আসলে তার আর নিমাইয়ের বয়সের ফারাকটা অনেকখানি তো, তাই নিমাই হয়তো সহ্য করতে পারে না কোনো পুরুষ মানুষের সাথে তার মেলামেশা।

এদিকে সেদিন এক ভয়ানক কান্ড ঘটে গেল নিমাইয়ের জীবনে। কোনদিনও তার বিড়ি ছাড়া আর কোনো বদ নেশা নেই। সেদিন কারখানায় একটু উপরি অর্থ পাওনা হতেই বন্ধুরা ঠিক করলো সকলে মিলে গুলাবির কাছে গান শুনতে যাবে ওই পাড়ায়। নিমাইকে প্রায় একরকম ধরে বেঁধেই তারা নিয়ে গেল তাদের সাথে। মা কালীর দিব্যি নিমাই যেতে চায় নি তাদের সাথে, কিন্তু শেষে তারা এমন পুরুষত্ব নিয়ে খোঁটা দিল যে নিমাই বাধ্য হয়েই একপ্রকার নিজের মান রাখতে অনিচ্ছায় তাদের সঙ্গী হলো। আর কেলোটা হলো সেখানেই। নিমাই যখন সব শেষে বেরিয়ে আসছে একেবারে গেটের মুখোমুখি হাড়ে বজ্জাত সদাশিবটার সাথে দেখা। ব্যাস,, আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গেই মিচকি শয়তানি হাসি। দেখে গা পিত্তি জ্বলে গেল নিমাইয়ের। যেন কতো আপন জন,,, সেই সুরে বলে উঠলো ‘কি জামাই এদিকে কোথা থেকে’!

পরদিনই হাত কচলে হাজির নিমাইয়ের অফিসে। কড়কড়ে পাঁচশো টাকা গুনে নিয়ে তবে বেরোলো অফিস থেকে। তারপর এটা সপ্তাহে সপ্তাহে নিয়ম হয়ে দাঁড়ালো। নিমাই বেগড়বাই করলেই সেই একই কথা ‘তাহলে আজ একটু বেটির সাথে আলাপ করতে হবে’,, ,,,ব্যাস, নিমাই চুপ এক্কেবারে।

নিমাই রোজই ভাবে এর থেকে একটা স্থায়ী নিষ্কৃতির প্রয়োজন। আর সমাধান তাকেই করতে হবে। এই বাস্তুঘুঘুকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। বরং তাতে হিতে বিপরীতই হবে। চেঁচিয়ে লোক জানিয়ে ভয়ানক কেলেঙ্কারি করে ছাড়বে মিচকেটা। তাই দীর্ঘদিন চিন্তা করে এক্কেবারে আপদের স্থায়ী নির্মূলের ছক সে কষে ফেলল। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। রাতে মিহিসুরে সদাশিবকে ডাক দিল বারান্দায়। একথা সেকথার পর সে সদাশিবকে বললো যে ডায়মন্ড হারবারের দিকে এক বন্ধুর বাড়িতে সে যাচ্ছে কাল মাছ ধরতে। বন্ধুর বাড়িতে নিজস্ব পুকুরে মাছ চাষ করে তারা। সদাশিব যদি যেতে চায় তো নিমাইয়ের সাথে যেতে পারে। নিমাই খুব ভালো করে জানতো যে সদাশিবের মাছ ধরার খুব নেশা। ফাঁক পেলেই সে যে ছিপ হাতে বসে পড়ে সেকথা বেশ জাহির করেই গল্প করেছে মিনতির সাথে। তাই এ প্রস্তাব সে কখনোই ফেলতে পারবে না এই বিশ্বাস নিমাইয়ের ছিল।

যা হোক পরদিন সক্কাল সক্কাল রওয়ানা হয়ে গেল দুজন। শিয়ালদহ থেকে ডায়মন্ড হারবারের ট্রেন ধরলো দুজনে। পরিকল্পনা মাফিক গল্পের ছলে নিমাই সদাশিবকে একবারে দরজার পাশে নিয়ে চলে এলো। শুধু সময়ের অপেক্ষা। একবার হটাৎ করে নিমাইয়ের মনে হলো কাকা কি তার মতলব বুঝতে পেরেছে! এতো সহজে নিমাইকে বিশ্বাস করার মতো ভালো মানুষ তো সদাশিব নয়। পরক্ষণেই নিজের মনকে বুঝ দিলো নিমাই। যাহ , কাকা বুঝবে কি করে!

গল্প করতে করতে দরজার কাছে মুখোমুখি দুজন। দুরন্ত বেগে ট্রেন চলছে। হটাৎ করে একটা ধাক্কা। টাল সামলাতে পারলো না একজন। হাত ধরতে চাইলো প্রাণপনে সামনের জনের কিন্তু ….

ডায়মন্ড হারবার থেকে ফেরা ইস্তক মিনতি দেখছে নিমাই যেন কেমন ধারা বদলে গেছে। ঠিক করে কথা বলছে না তার সাথে,গলার স্বরটা একটু চেরা চেরা লাগছে, মিনতি ভাবলো হয়তো ঠান্ডা লেগেছে নিমাইয়ের, কিন্তু বাড়িতেও খুব কম থাকছে সে, রাতেও আজ কদিন চৌকিতে শুচ্ছে না তার সাথে, নিচেই বিছানা করে ঘুমোচ্ছে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা কদিন ধরে বলছে নাকি তার পায়ে ব্যথা। তাই সেই প্রথম দিনই নীচু জলচৌকির ওপর দাঁড়িয়ে মশলার কৌটাগুলো নামিয়ে দিয়েছে আর তুলেও দেয় নি। অথচ ব্যথার কথা তো এই ক’দিন আগেও শোনেনি মিনতি। তবে কি বন্ধুর বাড়ি গিয়ে ব্যাথা পেল! এদিকে আজ চারদিন সদাশিবকাকার ঘরও তালা বন্ধ। এমন তো কখনো হয় নি আজ অবধি। তবে কাকা গেল কোথায়! একা মানুষ ,,, হে ভগবান, কাকার কোনও বিপদ হয় নি তো!



চন্দ্রানী গোস্বামী

জন্মঃ মে, ১৯৭৭, দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর অঞ্চলে।ছোটবেলায় বেড়ে ওঠা একান্নবর্তী পরিবারের উদারপন্থী খোলা বাতাসে। অত্যন্ত মধ্যবর্তী পরিবার, তাই জীবন খানিক সংগ্রামের রূপ। ছোট থেকেই বই পড়ার নিয়মিত অভ্যাস ছিল। পড়াশুনোঃ প্রথমে যাদবপুর সম্মিলিত বিদ্যালয় তারপর দক্ষিণ কলকাতার নামকরা অভিজাত কমলা গার্লস স্কুলে।যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক তারপর কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। কর্মজীবনঃ দক্ষিণ কলকাতার একটি কলেজে একাউন্টস ডিপার্টমেন্টে করনিকের পদে চাকরি করি আর অফুরন্ত লেখার স্বপ্ন দেখেন। বিশেষ আগ্রহ: ছোটবেলায় উপহার পাওয়া ডাইরিতে কবিতা,গল্প লেখা।বই পড়ার খুব নেশা ,বিশেষত কবিতার বই। রবি ঠাকুরের শিশু ভোলানাথ জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।আবোলতাবলে আজও বেঁচে থাকার হাসি খুঁজে পান। সুনীল সাগরে ভেসে শঙ্খর শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলাই প্রেরণা। ছেলে সবচেয়ে বড়ো সমালোচক। প্রথম "উত্তরভূমিকা" পত্রিকায় শ্রদ্ধেয় গৌরাঙ্গ সিনহার উৎসাহে আত্মপ্রকাশ।লেখা ছাড়া মনের খুশিতে গান শুনতে আর পাহাড় ঘুরতে ভালোবাসেন।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।