নাম তার ইংলে

শুভ্রদীপ চৌধুরী on


এক
==

পাঁচটা পিঁপড়ের একটা দল যুদ্ধে চলেছে।আজ সকাল থেকে তারা হাঁটছে তো হাঁটছেই। এভাবে সকাল, দুপুর তারপর বিকেল হয়ে এল। তাদের এবার থামতে হল, সামনে একটা নদী।নদীতে খুব স্রোত দেখে তাদের মুখ শুকিয়ে গেল।

এই দলের সবচেয়ে ছোট পিঁপড়ের নাম হল, লিকু।সে কখনো জলে নামেনি,এ নদী আরও ভয়ংকর।লিকু নদীর দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল,’আমি পারবো না, আমি ভেসে যাবো বাবা।’
লিকুর বাবার নাম ইংলে।সে এই দলটির সেনাপতি।তাদের যুদ্ধে যাবার যথেষ্ট কারণ আছে।খবর পাওয়া গেছে নদীর ওপারের পিঁপড়েরা বড় বড় সুরঙ্গ বানিয়ে অস্ত্রসস্ত্র মজুত করেছে।যে কোনো সময় আক্রমন করতে পারে ইংলেদের এলাকা।
রওনা দেবার আগে গর্ত থেকে বেরিয়ে আজ সকালে ইংলে ভাষণ দিয়েছে, ‘বন্ধুরা, আমরা পিঁপড়েরা আজ আর সুরক্ষিত নয়। যে কোন সময় একসময়ের বন্ধু বর্তমানে শত্রু পিঁপড়েরা আমাদের আক্রমণ করতে পারে।আপনারা জানেন না, নিজ মুখে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমি নিজেকে এই এলাকার সেনাপতি মনে করি।আশাকরি আপনারা আমাকে  মাননীয় সেনাপতি হিসেবে এইমাত্র মেনে নিলেন।আমি  চাই চলুন, সব্বাই মিলে মন দিয়ে যুদ্ধ করে আসি।’
বয়স্ক পিঁপড়ের একজন মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে বলল,’ধ্যুস, ইংলে হবে সেনাপতি! ও তো ভালো করে হাঁটতেই পারে না।’
ইংলে’র কানে এল কথা গুলো তবু না শোনার ভান করে সে বলতে লাগল, ‘আপনারা জানেন,ডিসেম্বর মাসে আমাদের জঙ্গলে ইস্কুলে’র ছেলে মেয়েরা পিকনিক করতে আসে।এবারও এসেছিল।তাদের ফেলে দেওয়া রুটির টুকরো,সন্দেশ,বিস্কুটের গুড়ো, ডিমের কুচি,আমরা সারা বছরের জন্য সংগ্রহ করি। নদীর ওপারের ওরাও এসে তা সংগ্রহ করে।এবার, বন্ধুগন খেয়াল করে দেখুন এবার  আসেনি।এর মানে ওরা আর আমাদের ভালবাসে না। তাই আমি ওদের শিক্ষা দিতে চাই। 
সেই বয়স্ক পিঁপড়েটা ভ্রু কুঁচকে বলল,’ওরা আসেনি বলে লাভ আমাদের হয়েছে।আমরা বেশি খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছি।তাই ওদের কেন শিক্ষা কেন দেব আমরা?’
ইংলে বলল,’ ওরা আমাদের সংগে যোগাযোগ রাখে না তাই সহজেই বোঝা যায় ওরা আমাদের শত্রু। পিঁপড়ে ভাই, বোনেরা, কাকুরা, জেঠুরা,পিসি ও পিসেমশায়রা আমার সংগে আসুন। আজ আমাদের যুদ্ধ।’
ইংলে এসব বলতে বলতে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বুঝল, তার পেছনে কেউ নেই, কেউ আসছে না।মন খারাপ হল তার।সে মাথা উঁচু করে চেঁচিয়ে উঠল,আমাদের এখানে একজনও  সাহসী পিঁপড়ে নেই ? 
তবু কেউ এল না।
ইংলে এবার হাঁক দিল, লিকু, লি- কু- উ।
লিকু কী করবে!বাবা ডাকছে বলে সে এল।পুচকে লিকু যাচ্ছে বলে লিকুর মা, লিকুর বড় ভাই, বোন এসে দাঁড়াল ইংলের পেছনে। আর সব্বাই যে যার গর্তে ঢুকে খিকখিক করে হাসতে লাগল।
এসব ইংলে পাত্তা দিল না। সে বলল, ‘চলো সৈনিকেরা আমরা যুদ্ধের জন্য হাঁটতে থাকি।’ সেই থেকে ওরা হাঁটছে। মাঝ দুপুর থেকে পেট চিনচিন করছে লিকুর।সে সাহস করে বলতে পারছে না তার খিদে পেয়েছে।

নদীর কাছে গিয়ে ইংলে চেঁচিয়ে উঠল,’কে আছ জলে? নদী পার হব।’
একটা কুমির ভেসে উঠল। তার খেজুর গাছের মত পিঠে উঠে পড়ল তারা।
কুমিরটা সাঁতার কাটতে-কাটতে বলল,’ তা তোমরা চললে কোথায়?’
ইংলে বলল, যুদ্ধ করতে।
কুমিরটা মাথা ঘুরিয়ে বলল, কোথায় বললে?
ইংলে বিরক্ত হল,বললাম তো যুদ্ধে যাচ্ছি। কানের মাথা খেয়েছ নাকি?
কুমিরটা হাসল, ‘না, না, কান ঠিক আছে।আসলে বিশ্বাস হচ্ছিল না।’
লিকুর মা বলল,’ কেন বিশ্বাস হচ্ছিল না?
কুমির উত্তর দিল,তোমাদের সংগে তো কোনো অস্ত্রসস্ত্র নেই।’
ইংলে কুমিরের কথা শুনে খুব হাসল, আমারা সত্যি কারের যোদ্ধা, হাত পা, দাঁতই আমাদের অস্ত্র।আমাদের যুদ্ধ কখনো দ্যাখোনি?দরকারে কিছু অস্ত্র আমরা সংগ্রহ করে নেব।’
কুমির চোখ পিটপিট করে বলল,’দেখবো কেমন করে! কেউ কখনো নেমন্তন্ন করে ডেকে যুদ্ধ দেখিয়েছে?  আমি বাপু নেমন্তন্ন না করলে আগ বাড়িয়ে কোথাও যাই না।তা তোমরা যদি খুব জোরজারি করো তবে যেতে পারি।’
লিকুর মা ইংলে’র কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,বলোই না, বেচারি নিজে থেকে যেতে চাইছে যখন।
ইংলে একটু কেশে নিয়ে বলল, ‘শোন তবে কুমির, আমি সেনাপতি ইংলে। আমি তোমায় যুদ্ধ দেখার নেমন্তন্ন করছি।শর্ত হল,  আমি যা বলবো তুমি তা পালন করবে। ধরে নাও তুমিও একজন সৈনিক।’
কুমির আনন্দে লাফিয়ে উঠতেই ইংলে অল্পের জন্য জলে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল।নিজের ভুল ঢাকতে সে বলল, ‘দেখলে তোমরা কেমন করে পিঠে কামড়ে থাকাটা দেখালাম। এটা একটা ক্লাস হিসেবে নেবে।এমন কিছু আমি মাঝে মধ্যেই করে দেখাব।’
লিকুর মা বলল, আমরা তো পিঠ কামড়েই বসে আছি, তুমিই তো বকবক করতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলে প্রায়!
ইংলে গম্ভীর গলায় বলল,’ এটা তোমার বাড়ি না পিংলের মা।সব সময় ভুল ধরবে না।মনে রাখবে আমরা যুদ্ধে চলেছি আর আমি সেনাপতি।এখানে আমার কথাই শেষ কথা।’
লিকুর মা মুখ ঘুরিয়ে বলল, বয়েই গেছে আমার বুঝতে। কেউ মানে না, উনি নিজে থেকে সেনাপতি হয়েছেন!
ইংলে বলল, ‘এমন করে আঘাত দিয়ে কথা বলবে না।তুমি জানো আমি এসব কথায় রাগ করি।আর কখনো এসব শুনলে যুদ্ধ বন্ধ করে এলাকায় ফিরে যাবো।’
কুমিরটা বলল,’ দুম করে যুদ্ধ থামানোর কথা বলবেন না।মনে রাখবেন আপনি আমার নেমন্তন্ন করে নিয়ে যাচ্ছেন।’
সেনাপতি ইংলে বলল, ভয় নেই কুমির,দুম করে যুদ্ধ বিরোধী কথা বলে ফেলেছি। তোমরা সব্বাই মনে রাখবে এমন ভুল একমাত্র আমি করতে পারি। কারণ আমি সেনাপতি।  
কুমির বলল, তবে যুদ্ধ হচ্ছে?
ইংলে জবাব দিল, অবশ্যই হচ্ছে।

দুই
==
কানাই চ্যাপ্টা একটা তুলি দিয়ে পোস্টার লিখছে, ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই।’ এক কথা বার বার 
লিখতে লিখতে সে বিরক্ত। এখন অনেক রাত।তার ঘুম পেয়েছে। মাঝে মাঝেই চোখে জল দিয়ে ঘুম তাড়াচ্ছে।ঘুম তবু ফিরে ফিরে আসছে। তার কাজই এমন। এই কাজটা মোটেও ভাল লাগে না তার।সে ছবি আঁকতে চায়। সেই যে স্কুলে একবার এঁকেছিল আমদের গ্রাম। নিজের মত করে গ্রামটা সাজিয়েছিল।একটা লালমাটির রাস্তা,কুঁড়েঘরের চালে লাউ,দুপাশে ঘন সবুজ গাছ গাছালি,দূরে নদীতে ভাসছে পালতোলা নৌকা,আকাশে যেন কার্পাস তুলো মেঘ হয়ে ভাসছে। কতদিন সে এমন ছবি আঁকেনি! তার কাজটার সবটাই অন্যের পছন্দমত।ফুল আঁকলেও রঙ বলে দেবে। নিজের মত করে  একটা অক্ষর রাঙাতে পারেনি বহুদিন হল। এসব করেই তার পেট চলে।দুপুরে গরম ভাতে আধচিমটে নুন একটা ধানিলংকা  আর একটু খানি সরষে তেল ছড়িয়ে খায় তখন তার মনে হয় কাজটা ভালই। খিদে মিটে গেলেই কাজটা একদম ভাল লাগে না তার। আজও খারাপ মন নিয়েই সে লিখছিল।বসে লিখতে লিখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
লোকটা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল, এমন কী নাক ডাকছে দেখে নিতুবা বলল, শুনছেন, ও দাদা শুনছেন? দুম করে ঘুমিয়ে পড়লেন যে। কাজ ফেলে রেখে দুম করে ঘুমিয়ে পড়া একদম ঠিক না।
মনে হচ্ছে পায়ে কেউ সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সাপ? ঘুম ভেঙে কানাই স্পষ্ট শুনল কেউ বকবক করছে। অথচ কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
ভয় পেল কানাই, কে? কে কথা বলে?
–‘ আমি একজন পিঁপড়ে, নাম নিতুবা। আমার পরিবার ও  অন্য বন্ধুরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে এই ঘরে। তাই আস্তে কথা বলুন।’
–‘পিঁপড়ে কথা বলে? অসম্ভব!’
‘এই দেখুন আমাকে’ বলে কানাইয়ের সামনে রাখা লন্ঠনের গোল আলোর চার পাশে ঘুরতে লাগল।
কানাই দেখল একটা কাঠ পিঁপড়ে অবিকল মানুষের মত বলে উঠল,সবাই আমাদের কথা বুঝতে পারে না। কেউ কেউ পারে।
কানাই ভাবল, জেগে থেকে এমন উদ্ভট স্বপ্ন দেখা ঠিক না। তার কী খুব জ্বর আসছে? 
উঠোনে গিয়ে চোখে জল দিয়ে এল। মাথার উপরে কাঁসার থালার মত একটা চাঁদ। মিষ্টি আলো, যেন স্বপ্ন।  চাঁদের আলো গায়ে মেখে একটা লোক শুয়ে আছে, এমন একটা ছবি সে কখনো আঁকবে।
পাশ থেকে সেই অদ্ভুত পিঁপড়েটা বলল, চাঁদের আলো আমারও খুব ভাল লাগে।মনে হয় এই আলো গায়ে মেখে একটা ছবি আঁকি।
কানাই চমকে উঠল, সে তার ইচ্ছের কথা ভেবেছে মাত্র। উচ্চারণ করেনি তবু বুঝল কী করে?
‘সত্যি করে বলুন তো কে আপনি?’ কানাই বলল।
নিতুবা বলল, আমি আপনার না বলা কথা বুঝতে পারছি কারণ আমিও আপনার মত একজন শিল্পী। আমরা পিঁপড়েরা প্রতেক্যেই শিল্পী। ধুলোর উপরে আমরা দাগকাটি। আপনারা আঁকেন হাত দিয়ে , আমরা আঁকি পা দিয়ে।হেঁটে -হেঁটে, চলেফিরে।
কানাই বলল, আমি কী পাগল হয়ে যাচ্ছি?
— ‘ না, না, পাগল হবেন কেন? আমি আপনার কাছে খুব দরকারে এসেছি।কিন্তু দরকারটা বলতে পারছি না।এসব ব্যাপারে আমার লজ্জা খুব।কারোর কাছে কিছু চাইতে পারি না।’
— কী চাই?
— বাঁচালেন, নিজে থেকে বলতে পারছিলাম না। খবর পেয়েছি বেশ কিছু পিঁপড়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এগিয়ে আসছে।তারা নদী পেরিয়েছে।জঙ্গল তন্নতন্ন করে খুঁজে না পেয়ে আপনাদের এই পাড়ায় ঢুকেছে। আপনি যদি আমাদের ক’ দিন লুকিয়ে থাকতে দেন। 
—তা যতদিন খুশি থাকুন। কোনো ভয় নেই। আপনাদের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।
—সাহস পেলাম। বলছি,আমাদের একখানা ছবি এঁকে দেবেন?
কানাই বলল, অবশ্যই।
আঁকা শুরু হয়েছে। পিঁপড়েরা অবাক হয়ে দেখছে এই লোকটা নিশ্চয় ভগবান,নদীর জলে হুবহু এমনই দেখায় তাদের।


কানাই চ্যাপ্টা একটা তুলি দিয়ে পোস্টার লিখছে, ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই।’ এক কথা বার বার 
লিখতে লিখতে সে বিরক্ত। এখন অনেক রাত।তার ঘুম পেয়েছে। মাঝে মাঝেই চোখে জল দিয়ে ঘুম তাড়াচ্ছে।ঘুম তবু ফিরে ফিরে আসছে। তার কাজই এমন। এই কাজটা মোটেও ভাল লাগে না তার।সে ছবি আঁকতে চায়। সেই যে স্কুলে একবার এঁকেছিল আমদের গ্রাম। নিজের মত করে গ্রামটা সাজিয়েছিল।একটা লালমাটির রাস্তা,কুঁড়েঘরের চালে লাউ,দুপাশে ঘন সবুজ গাছ গাছালি,দূরে নদীতে ভাসছে পালতোলা নৌকা,আকাশে যেন কার্পাস তুলো মেঘ হয়ে ভাসছে। কতদিন সে এমন ছবি আঁকেনি! তার কাজটার সবটাই অন্যের পছন্দমত।ফুল আঁকলেও রঙ বলে দেবে। নিজের মত করে  একটা অক্ষর রাঙাতে পারেনি বহুদিন হল। এসব করেই তার পেট চলে।দুপুরে গরম ভাতে আধচিমটে নুন একটা ধানিলংকা  আর একটু খানি সরষে তেল ছড়িয়ে খায় তখন তার মনে হয় কাজটা ভালই। খিদে মিটে গেলেই কাজটা একদম ভাল লাগে না তার। আজও খারাপ মন নিয়েই সে লিখছিল।বসে লিখতে লিখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
লোকটা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল, এমন কী নাক ডাকছে দেখে নিতুবা বলল, শুনছেন, ও দাদা শুনছেন? দুম করে ঘুমিয়ে পড়লেন যে। কাজ ফেলে রেখে দুম করে ঘুমিয়ে পড়া একদম ঠিক না।
মনে হচ্ছে পায়ে কেউ সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সাপ? ঘুম ভেঙে কানাই স্পষ্ট শুনল কেউ বকবক করছে। অথচ কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
ভয় পেল কানাই, কে? কে কথা বলে?
–‘ আমি একজন পিঁপড়ে, নাম নিতুবা। আমার পরিবার ও  অন্য বন্ধুরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে এই ঘরে। তাই আস্তে কথা বলুন।’
–‘পিঁপড়ে কথা বলে? অসম্ভব!’
‘এই দেখুন আমাকে’ বলে কানাইয়ের সামনে রাখা লন্ঠনের গোল আলোর চার পাশে ঘুরতে লাগল।
কানাই দেখল একটা কাঠ পিঁপড়ে অবিকল মানুষের মত বলে উঠল,সবাই আমাদের কথা বুঝতে পারে না। কেউ কেউ পারে।
কানাই ভাবল, জেগে থেকে এমন উদ্ভট স্বপ্ন দেখা ঠিক না। তার কী খুব জ্বর আসছে? 
উঠোনে গিয়ে চোখে জল দিয়ে এল। মাথার উপরে কাঁসার থালার মত একটা চাঁদ। মিষ্টি আলো, যেন স্বপ্ন।  চাঁদের আলো গায়ে মেখে একটা লোক শুয়ে আছে, এমন একটা ছবি সে কখনো আঁকবে।
পাশ থেকে সেই অদ্ভুত পিঁপড়েটা বলল, চাঁদের আলো আমারও খুব ভাল লাগে।মনে হয় এই আলো গায়ে মেখে একটা ছবি আঁকি।
কানাই চমকে উঠল, সে তার ইচ্ছের কথা ভেবেছে মাত্র। উচ্চারণ করেনি তবু বুঝল কী করে?
‘সত্যি করে বলুন তো কে আপনি?’ কানাই বলল।
নিতুবা বলল, আমি আপনার না বলা কথা বুঝতে পারছি কারণ আমিও আপনার মত একজন শিল্পী। আমরা পিঁপড়েরা প্রতেক্যেই শিল্পী। ধুলোর উপরে আমরা দাগকাটি। আপনারা আঁকেন হাত দিয়ে , আমরা আঁকি পা দিয়ে।হেঁটে -হেঁটে, চলেফিরে।
কানাই বলল, আমি কী পাগল হয়ে যাচ্ছি?
— ‘ না, না, পাগল হবেন কেন? আমি আপনার কাছে খুব দরকারে এসেছি।কিন্তু দরকারটা বলতে পারছি না।এসব ব্যাপারে আমার লজ্জা খুব।কারোর কাছে কিছু চাইতে পারি না।’
— কী চাই?
— বাঁচালেন, নিজে থেকে বলতে পারছিলাম না। খবর পেয়েছি বেশ কিছু পিঁপড়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এগিয়ে আসছে।তারা নদী পেরিয়েছে।জঙ্গল তন্নতন্ন করে খুঁজে না পেয়ে আপনাদের এই পাড়ায় ঢুকেছে। আপনি যদি আমাদের ক’ দিন লুকিয়ে থাকতে দেন। 
—তা যতদিন খুশি থাকুন। কোনো ভয় নেই। আপনাদের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।
—সাহস পেলাম। বলছি,আমাদের একখানা ছবি এঁকে দেবেন?
কানাই বলল, অবশ্যই।
আঁকা শুরু হয়েছে। পিঁপড়েরা অবাক হয়ে দেখছে এই লোকটা নিশ্চয় ভগবান,নদীর জলে হুবহু এমনই দেখায় তাদের।

ঠিক সে সময় ঘরে ঢুকল যুদ্ধ ঘোষণা করা সেনাপতি ইংলে ও তার পরিবার।ঘরে ঢুকে সে এক্কেবারে সামনে শত্রুদল কে দেখে এতটুকু তর্ক করল না।পিঠের উপরে রাখা উলু খাগড়ার পাতা’র তরবারি গুলো বের করল না।একমনে তারা ছবি আঁকা দেখতে লাগল।
লিকু বলল, বাবা তুমি বলেছিলে ভাষণ দিয়ে ওদের অজ্ঞান করে দেবে। ওই সময় কান বন্ধ করে থাকতে বলেছিলে আমাদের।
ইংলে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ছবি আঁকা হচ্ছে সেটা দ্যাখ। অত যুদ্ধ- যুদ্ধ করা কেন? জানিস না আমি ছবি আঁকা কতটা পছন্দ করি।’
এই কথাগুলো কানে গেল কানাইয়ের। সে ঘুরে তাকাতেই নিতুবা তার পরিবার আর অন্য বন্ধুরা বাবা রে, মা রে বলে গর্তে লুকিয়ে পড়ল।
কানাই ধমকের সুরে বলল, কে রে তোরা? আমার ছবি আঁকার সময় ডিস্টার্ব করছিস? সাহস থাকলে সামনে আয়!
ইংলের একদম সাহস হচ্ছিল না মানুষটা সামনে যাওয়ার।না গেলে সেনাপতি হিসেবে মান সম্মান থাকবে না ভেবে সে এগিয়ে গেল, আমার নাম সেনাপতি ইংলে।
কানাই হাসল, তোমায় দেখে তো সেনাপতি মনে হচ্ছে না।
ইংলে মিনমিন করে বলল, আমি নিজে থেকে সেনাপতি হয়েছি বলে কিছু খামতি থাকতে পারে। আর তাড়াহুড়োয় সেনাপতির তেঁতুল পাতার পোষাক পরতে পারিনি।
কানাই বলল, যুদ্ধ চাইছেন কেন?
ইংলে অনেক ভেবে বলল, তেমন কোনো কারণ নেই।
কানাই কড়া গলায় বলল, এবার দেখুন আমি কী করি।
ইংলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, আমার মানে আমাদের ভুল হয়ে গেছে।এবারের মত মাফ করে দিন।
কানাই মিচকি হাসল, ‘তবে আপনারা নিতুবা দের দল একসাথে দাঁড়ান একসাথে ঘাড় ধরে দাঁড়ান।  আমি আঁকব। এই সময়টা চুপ করে  থাকতে পারবেন?
ইংলে বলল, পারবো,  খুব পারবো।
এসব শুনে,নিতুবারা সাহস করে গর্ত থেকে উঠে এল।
ভোররাত অব্দি চলল ছবি আঁকা।সেনাপতি ইংলে হাসিমুখে নিতুবার মাথার সাথে মাথা ঠুকে বলল,তোমায় বহুদিন না দেখে মাথাটা কেমন হয়ে গিয়েছিল।ওসব যুদ্ধ, টুদ্ধ কিছুই না।নিতুবার বৌ বলল চলুন সব্বাই আমাদের আসায়, যা মজুত আছে গালে মুখে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।দেখছেন কানাই বাবু কেমন সারা রাত এঁকে এখন ঘুমিয়ে পড়েছে।তারা নাচতে নাচতে লাইন দিয়ে গর্তে নামতে লাগল।

তিন
==
দরজায় ঢকঢক শব্দ হচ্ছে।ঘুম ভেংগে কানাই  দেখল পিঁপড়ে দের ছবিটা।উঠতে ইচ্ছে হলনা তবু সে দরজা খুলল।
সেই লোকগুলো এসেছে যারা ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই ‘ লেখার অর্ডার দিয়েছিল। ওদের মধ্যে একজন মাতব্বর  কানাই কে বলল, সব রেডি তো?
— কিছু কম আছে।
— ও কোনো ব্যাপার না। যান নিয়ে আসুন।পোস্টার হাতে নিয়ে একজন চেঁচিয়ে উঠল, ওটা কী?আপনার বানানো ভাস্কর্য?
কানাইয়ের চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে পড়তে চাইছে। সে বলল, কুমির!
লোকগুলো বলল, এই জন্যেই সব সময় সাবধান থাকতে হয়।দেখেছ, কেমন করছে কুমিরটা? মনে হচ্ছে গুলি করে দিই।বন্দুকের ব্যবস্থা কর?
কুমির ভয় পেয়ে বলল, আমি কী করেছি যে বন্দুকের ভয় দ্যাখাচ্চ?শুধু শুধু নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে এসব করা ঠিক নয় বাপু।
ছুটোছুটিতে ‘ যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’  পোস্টার গুলো সারা উঠোনময় ছড়িয়ে আছে।কুমিরটা তার উপর দিয়ে চলে গেল অনেকদূর। 
কানাইয়ের উঠোনে এখন ছবি আঁকা চলছে। আঁকছে ইংলে আর নিতুবার দলবল।
ধুলোর মধ্যে ধীরেধীরে ফুটে উঠছে কানাই। 


শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।