তুনাইয়ের আয়না

রুমকি রায় দত্ত on

এক

পর্দার আড়ালে থাকা ভিতরের ঘর থেকে ঝনঝন আওয়াজ ভেসে এল,আর ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই তুনাই শুনতে পেল মা’র গলা। চিৎকার করছে মা। প্রচন্ড ঝগড়া হচ্ছে বাপির সাথে। তুনাই শুনতে পেল মা চিৎকার করে বলছে ‘ মরণ হলে বাঁচি। আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। এত লোকের মরণ হয়, আমার হয়না কেন?’

বাপিও চিৎকার করে কি যেন বলল, বুঝতে পারল না তুনাই। এই সুযোগ।এখন ও যা খুশি করলেও কেউ কিচ্ছু বলবে না। কেউ জানতেই পারবে না ও কি করছে। টেবিলের উপরে রাখা দেশলাই বাক্সটার দিকে লোভাতুর চোখে তাকাল। কবে থেকে ওর ইচ্ছা ঐ দেশলাইয়ের কাঠি নিয়ে খেলার। সেদিন মা’র হাত ধরে রেলকলোনির পাশ দিয়ে অ্যাবাকাস ক্লাসে যাওয়ার সময় ও দেখেছিল ওর মতই দুটি মেয়ে দেশলাইয়ের কাঠি নিয়ে খেলতে খেলতে আগুন জ্বালাচ্ছিল। ওর কী ভীষণ ইচ্ছা করছিল ওদের সাথে খেলতে! ভালো লাগে না অ্যাবাকাসে যেতে,কিন্তু যেতেই হবে। মা বলেছে, ‘ বড় হয়ে অনেক প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় বসতে হবে ওকে। যত দিন যাচ্ছে তত নাকি চাকরি পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে। একটা ছোট্ট ভুল নাকি জীবনকে একশ বছর পিছিয়ে দিতে পারে। বড় হয়ে যাতে ও এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পিছনে ফেলে জয়ী হতে পারে,সেইজন্যই ওকে অ্যাবাকাসে ভর্তি করা হয়েছে’।

তুনাই একদিন সাহস করে ওর মা’কে বলেছিল ওর মনের কথা, অ্যাবাকাসে যেতে চাই না। ঐ অতক্ষণ ক্লাসে বসে থাকতে ওর একদম ভালো লাগে না। বাড়িতে বসে খেলতে ইচ্ছা করে ওর।

মা প্রথমে ভীষণ বকা দিয়েছিল।তারপর কী হল কে জানে? আদর করে বলেছিল, ‘ এমন কথা বলে না মা। তুমি এখন বুঝতে পারছ না। মানছি এটা তোমার খেলার বয়স। আমরাও এই বয়সে খুব খেলেছি। কিন্তু মা, আমাদের সময় আর  তোমাদের সময়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এখন থেকে যদি যুগের সাথে চলতে না পারো, তবে বড় হয়ে হারিয়ে যাবে মা’।

হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে সেদিন তুনাইয়ের খুব ভয় লেগেছিল। হারিয়ে গিয়ে বাবা-মা’কে ছেড়ে ও একা একা থাকবে কি করে? তার থেকে এই ভালো অ্যাবাকাসে যাওয়া। এরপর থেকে তুনাই আর কখনও বলেনি অ্যাবাকাসে যাব না। শুধু মনের মধ্যে যা ইচ্ছা করার একটা লোভ লুকিয়ে বাসা বেঁধে আছে। আজ দারুণ একটা সুযোগ পেয়েছে। বাপি আর মা ঝগড়া করছে। যদিও মনখারাপ লাগছে, তবু এটা ওর কাছে একটা সুযোগ। মা আর বাপি ঝগড়া করলে ওর ভীষণ মন খারাপ হয়, কিচ্ছু ভালো লাগে না। কতবার বাপিকে বলেছে ‘ তোমরা ঝগড়া করো কেন? আমার মনখারাপ করেনা বুঝি?’ বাপি কোনো উত্তর না দেয় না, বসে বসে মোবাইল ঘাটে। মা’র দিকে তাকাতেই মা চোখ পাকিয়ে বলেছিল—

‘ তুনাই, তুমি বড্ড বেশি পাকা পাকা কথা বলছ আজকাল। বাড়িতে ঘটি-বাটি একসাথে থাকলে শব্দ তো হবেই’।মাঝে মাঝে মা ভীষণ শক্ত শক্ত কথা বলে। অর্ধেক কথার মানেই বোঝেনা তুনাই। যাক অনেকদিন পর হঠাৎ পাওয়া সুযোগটাকে কাজে লাগাতে খাট থেকে নেমে তুনাই সোজা বড় ঘরের দরজার কাছে চলে যায়। পর্দার আড়াল থেকে টুকি মারে। মা, বাপির দিকে তাকিয়ে তখনও বকে চলেছে-‘ এখনও আমার মাথায় আগুন জ্বলছে। জ্বলে যাচ্ছে ভিতরটা’।

মাথার ভিতরে আগুন কি ভাবে জ্বলতে পারে? তুনাই টেবিলের উপর রাখা দেশলাই বাক্সটা হাতে নিয়ে সোজা সামনের ব্যালকনিতে চলে যায়। সব কাঠিগুলো ঢেলে ফ্যালে মাটিতে। কি মজা কত্ত কাঠি! একটা একটা কাঠি সাজিয়ে ফুল বানানোর চেষ্টা করে, কিন্তু হয়না। রেগে গিয়ে সব ঘেঁটে দেয়। গালে হাত দিয়ে ভাবে, কী করবে? না, কোনো আইডিয়া আসছেই না। একটা কাঠি তুলে নিয়ে বারুদের গায়ে ঘষতে থাকে। হঠাৎ ফস্‌ করে জ্বলে উঠে কাঠিটা। আগুনের ছ্যাঁকায় লাল হয়ে যায় আঙুল। ব্যথায় চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে তুনাইয়ের। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যায় তুনাই বাবা-মা’র কাছে। আবার নতুন করে তর্কাতর্কি শুরু হয়েছে বাব-মা’র মধ্যে। তুনাই ব্যথা লাগা হাতটা তুলে ধরে দুজনকেই দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে, তারপর মাথা নিচু করে ফিরে আসে বসার ঘরে। বেসিনের তলায় হাত রেখে ঠান্ডা জলে ধুয়ে নেয় হাতটা। একটু বোরোলীন লাগিয়ে গুটিয়ে শুয়ে পড়ে সোফাতেই। মনে মনে ভাবতে থাকে কেউ আদর করে না। কেউ ভালোবাসে না। বন্ধ দু’চোখের কোল বেয়ে নিঃশব্দে নেমে আসে স্বচ্ছ জলের ধারা।

দুই

ঘড়িতে এ্যলার্ম বাজছে। তুনাইয়ের ঘুম ভেঙে যায়। প্রতিদিন এই সময় এ্যলার্মের শব্দ শুনেই ঘুম ভাঙ্গে তুনাইয়ের, তবু ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে। পিট পিট তাকায়, মা অথবা বাপি কেউ এসে ওকে বলবে, ‘ তুনাই সোনা, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো।স্কুল যেতে হবে না?’ আজও ঘুমের অচেতন অবস্থা কাটার আগে পর্যন্ত ক্ষণিক অপেক্ষা করল তুনাই। কেউ এল না ওর কাছে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে ওর। একরাশ অভিমান নিয়ে তুনাই নিজেই স্নান করতে ঢুকে গেল বাথরুমে। মা’র মুখটা তখনও থমথমে। একবাটি কর্ণফ্লেক্স নিয়ে টেবিলে রেখে মা বলল-

নাও, খেয়ে উদ্ধার করো আমায়।

তুনাই কোনো কথা না বলেই চুপ করে খেতে বসে গেল। একবার আড়চোখে দেখে নিল বাপি ঠিক কোথায়। এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পাড়ছে না, কে আজ ওকে স্কুলে নিয়ে যাবে, মা না বাপি!

ও হো, বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে। তুনাই নাকে মুখে খাবার ঢুকিয়ে ছুটে গেল বই গোছাতে। কাল রাতে রুটিন দেখে বই গোছানোর কথাটা একদম মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। ব্যাগটা হাতে নিতেই ছোঁ মেরে টেনে নিল বিশাখা। তুনাই অপরাধীর মতো হাত দুটো সামনে জড়ো করে দাঁড়িয়ে রইল। বিশাখার হাতের সাথে মুখও চলছে। একটা করে বই রাখছে আর অদৃশ্য কারোর উদ্দেশ্যে যেন বাক্যবাণ ছুঁড়ে মারছে। তুনাইয়ের চোখের কোল ছাপিয়ে জল যেন গড়িয়ে আসছে। বারবার চোখ ঝাপটে জলটা আটকানোর চেষ্টা করে চলেছে তুনাই। হঠাৎ বইয়ের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বিশাখা খপ করে তুনাইয়ের হাতটা চেপে ধরল—

‘ চলুন মাহারানি, আপনাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসি। সব দায়িত্ব তো আমারই। জন্ম যখন আমি দিয়েছি, তখন দায় তো নিতেই হবে’।

‘দায়’, কথাটা যেন বুকের মধ্যে ধাক্কা মারল তুনাইকে। তবে কি ও সত্যি সত্যিই বাব-মা’র দায়! কেউ ওকে ভালোবাসে না? উফ্‌! কি যে দুঃখ হচ্ছে এখন ওর মনের মধ্যে।যখন ওকে কেউ ভালোই বাসে না, তখন আর ওর বেঁচে থেকে কি হবে? ও মরে গেলেই ভালো হয়।

বিশাখা রাস্তা পার হওয়ার আগে শক্ত করে তুনাইয়ের ডানহাতটা চেপে ধরতেই, প্রচন্ড ব্যথা পেল তুনাই। আঃ! করে চিৎকার করতে গিয়েও চেপে নিল গলার আওয়াজ। মা’র যখন মন ভালো থেকে, তখন ফোনে কথা বলতে বলতে মা মাঝে মাঝেই কথাটা বলে, ‘ মেয়েটা ঠিক আমার মতো হয়েছে। কি অসীম ধৈর্য্য আর সহ্যশক্তি’।

একরাশ অভিমান দলা পাকাচ্ছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই,যতই ব্যথা লাগুক কিছুতেই বলবেনা মা আর বাপিকে। ওরা শুধু ঝগড়া করুক সারাদিন। একদিন ও চলে যাবে বাড়ি থেকে। একফোঁটা জল তুনাইয়ের গাল বেয়ে নেমে এল। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুছে নিল জলটা। মা’র হাত ছেড়ে তুনাই ঢুকে যায় স্কুলে।

তিন

তুনাই বাপির বাইক থেকে নেমে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ। কি করবে? ছুটে গিয়ে অন্যদিনের মতো জড়িয়ে ধরবে কি মা’কে! ছুটির পর ক্লাস থেকে বাইরে এসেই গেটের বাইরে বাপিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুব আনন্দ হয়েছিল ওর মনে। কিন্তু বাপির মুখ দেখে ঠিক আন্দাজ করতে পারেনি, মা-আর বাপির মধ্যে আবার ভাব হয়েছে কিনা! দরজার পর্দা সরিয়ে টুকি মারে ঘরের ভিতরে। নাহ্‌, মা তো নেই! মা কোথায়!

পিছন থেকে বাপির গলার আওয়াজ- ‘ তুনাই, তুমি ঘরে ঢুকে যাও। ভিতরে সদু পিসি আছেন,তুমি কিছুক্ষণ সদু পিসির সঙ্গেই থাকো।আমি মা’কে আনতে যাচ্ছি’।

তুনাই একটা বড় করে নিঃশ্বাস নেই।যাক, ভাব হয়েছে তাহলে। মনে একসাথে দুটো আনন্দ।এক মা-বাপির ভাব হয়ে গিয়েছে আর দুই, এখন ও যা খুশি করলেও সদুপিসি নিষেধ করবে না। স্কুলের জামা-কাপড় ছেড়ে,হাত-মুখ ধুয়ে, খাবার খেয়ে সোজা নিজের ঘরে। টেনে নামায় ওর পুতুলের সংসার। বিছানা জুড়ে ছড়ানো ওর পুতুল পরিবার।একটা বাবপুতুল,একটা মাপুতুল আর একটা ছোট্ট বাচ্ছা। কত্ত দিন পর এভাবে বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুতুল খেলছে তুনাই। হঠাৎ কি যেন হল, মা পুতুলকে হাতে নিয়ে চিৎকার করে উঠল তুনাই ‘ আমার মাথার ভিতরে আগুন জ্বলছে। কত লোকের মরণ হয়,আমার হয়না কেন?’ মেয়ে পুতুলটার মাথাটা দেওয়ালে ঠুকতে ঠুকতে বলতে থাকে’ আমি মরে গেলেই ভালো হয়’। চিৎকার করছে তুনাই। হঠাৎ সব ফেলে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে সদুপিসিকে। পুড়ে যাওয়া আঙুলটা দেখিয়ে বলে, ‘ মা- বাপি আমাকে একটুও ভালোবাসে না, আমারও মরে যেতে ইচ্ছা করে’।

পিছনে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে তুনাইয়ের বাবা-মা। বিস্মিত হয়ে দেখছে ওরা তুনাইয়ের আয়নায়,নিজেদের ব্যর্থতার ছবি।


রুমকি রায় দত্ত

জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার ফরাক্কায়। বর্তমান বাসস্থান, হুগলী জেলার সিমলাগড়। শিক্ষাঃ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বহরমপুর গার্লস কলেজ থেকে সেরিকালচার (রেশমচাষ) বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানে স্নাতক। এরপর বাংলা বিষয় নিয়ে স্নাতক ও মাস্টার ডিগ্রি। বিগত দশ বছর ধরে গদ্যসাহিত্য চর্চার সাথে, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ছোটো পত্রিকা ও বাণিজ্যিক পত্রিকাতে প্রকাশিত গল্প সংখ্যা প্রায় সত্তরের অধিক। এছাড়াও আছে বেশ কিছু ছোটো উপন্যাস ও ভ্রমণ। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘যাপ্যযাত্রা’ আত্মপ্রকাশ করে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে। গ্রন্থটি নবকমল সাহিত্য কতৃক প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ সম্মান ২০১৮, “ ব্রজগোবিন্দ সাহা স্মৃতি পুরস্কারে” ভূষিত হয়। ২০১৮ সালে তিনটি উপন্যাসিকা সংকলিত দ্বিতীয় গ্রন্থ “আমি বৃক্ষপুরুষের প্রেমিকা” প্রকাশিত হয় বার্ণিক প্রকাশন থেকে। একনিষ্ঠ সাহিত্য চর্চার স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্তি “আত্মার স্পন্দন সম্মান”।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।