চোখ

শুক্লা মালাকার on

গনগনে লাল আগুনের দরজা বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। চারপাশে সহানুভূতির মুখ, কাঁধে সান্ত্বনার হাত। ভিতরের কাঁপুনিটা তবুও যাচ্ছে না তমালের। এখনো হন্ট করে চলেছে সেই দৃশ্য। হাড্ডিসার চেহারাটাতে ছিল তো শুধু গভীর বড়বড় দুটো চোখ। ফুলের ভিড় ঠেলে সে দুটো সত্যিই তমালের দিকে তাকিয়ে ছিল? একবার নয়, বেশ কয়েকবার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে দাঁড়িয়ে আড়চোখে দেখেছেতমাল। তার দিকেই তাকিয়ে আছে ঝুমা। উফফ, মরেও শান্তি দেবে না মেয়েটা! চুল্লির দরজা বন্ধ হবার মুহুর্তেও দেখল চোখ দুটোশরীরথেকেবেরিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকে দেখছে। 

লাঞ্চ ব্রেকে চেতনা আগরওয়াল রোজ ফেসপাউডার ঘষে তরতাজা হত। বাঁশপাতার মতো হিলহিলে শরীর জুড়ে আগুণ। লুকিয়ে চুরিয়ে তমাল গিলত। একদিন ধরা পরে গেল। সেন্টার অফ গ্রাভিটির টানে গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়ল নতুন দেশে। উদ্দাম সময়। নীল খুশী, স্রোতের ডগায় সুখ। জীবন ঘুরপাক খেয়ে ক্লাইম্যাক্সে। তমালও বুঝতে পারেনি চেতনা তার মতো ল্যাংড়া ঘোড়ার পিঠে চড়ার বায়না করবে। শ্যাম্পেনের গ্লাসের পাশে খসে গেল স্যাঁতসেঁতে ধেনো।

একদিন জামার পকেটে হোটেলের বিল, একদিন পিঠে আঁচড়ের দাগ। ঝুমা কিছুই বলে না। তমাল চায় একটা বড়সড় ঝড় উঠুক। সাইক্লোনে ভেসে যাক পুরোনো বাড়ির দেয়াল। রোজই একবার করে ঘাই মেরে দেখে। খুঁজতে চেষ্টা করে ঝুমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা তার ভবিষ্যৎ। নির্বিকার ঝুমার কর্তব্যের খোলস কিছুতেই খোলে না।

একদিনই ঝুমার চোখে জল দেখেছিল তমাল। চেতনার বমি শুরু হতে অস্থির হয়ে ঝুমার শান্ত দরজায় জোরে ধাক্কা দিয়েছিল সে। গলার স্বর খাদে নামিয়ে ঝুমা বলেছিল- ‘দাঁড়াও, ভাতের হাঁড়িটা নামিয়ে আসি’

মা হতে চেয়েছিল ঝুমা। পুজো-আচ্ছা, মানত, মাদুলি এসবে বহুবারের সাক্ষী ছিল তমাল। তাইকিঝুমার চিকচিকে চোখ অল্প নরম করে দিয়েছিল তাকে?

কয়েকটাদিনমাত্র।চেতনার ‘ডরপোক’ শব্দেতমালআবারময়দানে।ডাক্তারিপরীক্ষায়ঝুমারসমস্যাবেরোল।যেবউসন্তানদিতেপারেনাতারজন্যবাইরেরদরজাখুলেযায়।তমালেরদয়ারশরীর, ঠিককরলচিকিৎসা করাবে ।ঝুমাকে নিয়মকরেঅসুধখাওয়াতেশুরুকরল।সঙ্গেটিটকিরিআরঅহেতুকগঞ্জনা।শরিকিবাড়িরতুতোকাকিমাজ্যেঠিমাদেরলেলিয়েদিলতমাল। শুরুহলঝুমারদিনরাতেযন্ত্রণারলম্বাসাফারি।

সাতমাসেরমাথায়ঘুষঘুষেজ্বর, অ্যানিমিয়াআরোনানাউপসর্গেজেরবারঝুমাএকদিনতমালকেবলল – “ভালোইহয়েছে!ওদিকেরসময়তোহয়েএল। এদিকেরঝামেলাযততাড়াতাড়িমিটেযায়ততইমঙ্গল”।  ভাতেরথালাথেকেমুখতুললতমাল, ঝুমারগর্তেঢুকেযাওয়াচোখদুটোতারভিতরটাফালাফালাকরেদিচ্ছে।

ঝুমামারাযাবারনয়দিনেরমাথায়ছেলেরমাহলচেতনা। এইকদিনেইতমালের কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে। চোখের তলায় কালশিটে। হবে নাই বা কেন? ঘরে ঢুকলেই একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস মুখ তুলে দেখে। গাদাগাদি করে রাখা সেকেলে ফার্নিচারগুলো ঝুমার চোখ কোলে বসে থাকে। ছিটকে বেরিয়ে যায় তমাল।

ওদিকে ছেলেকে নিয়ে থাকার জন্য চেতনার একটা ছাদ চাই, স্বামী চাই।

শ্রাদ্ধশান্তি শেষ হলে লোক লাগিয়ে ঝুমার স্মৃতি পরিস্কার করছে তমাল।

চারদিকে শুধু ঝুমা। শাক আলুপোস্তর সঙ্গে ঘর করা ঝুমা,সংসারের যাবতীয় ভৌতিক ঝামেলা থেকে মাথা তুলে বাঁচতে চাওয়া ঝুমা। পালঙ্কে ঠেস দিয়ে ধুকতে ধুকতে বসে থাকা ঝুমা। অপমানে পুড়ে যাওয়া ঝুমা। পেল্লায় আলমারির ভিতরে থরেথরে সাজানো ঝুমা, শাড়ির ভাঁজে মা হওয়ার ডাক্তারি ছাড়পত্র হাতে ঝুমা।ট্রাঙ্কবন্দী ঝুমার বগল ছেঁড়া নাইটি চাদরের তলায় গোপন প্রেস্কিপশনের জেরক্স, সঙ্গে বড় অক্ষরে লেখা – বুঝি সবই, ভালো থেকো।

যারা কাজ করছিল তারা দেখল বাবু নিজের চুল ছিঁড়ছে, পাগলের মতো এঘর ওঘর দৌড়ে বেড়াচ্ছে। পাঁশুটে হয়ে যাওয়া মুখ জুড়ে আতঙ্ক।

পালাচ্ছে তমাল। গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অন্ধকার, খসে যাচ্ছে ষড়যন্ত্র। ওষুধের পাতাগুলো অবিকল ঝুমার গলায় জানতে চাইছে – ভালো আছো তো তমাল?


শুক্লা মালাকার

নাম - শুক্লা মালাকার নিবাস - কলকাতা এমকম পাশ করে বিয়ে। কলেজে লেখালিখি করলেও বহুদিন পর ২০১৩ থেকে আবার লেখা শুরু করেন । বিভিন্ন ওয়েবজিন এবং লিটিল ম্যাগাজিনে লেখা বেরোচ্ছে ২০১৩ থেকে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।