কালপুরুষ

অঞ্জন রক্ষিত on

–রাস্তায় কোথাও দাঁড়াতে পারিসনি,ভিজতে গেলি কেন?
–এখনই তো আসতে বলেছিলি, পরে নাকি তোর টাইম হবে না।
–শালা, মর না।তাই এত্ত আগে !!!!
বৃষ্টিটা রাস্তাতেই ধরেছিল।দিওয়ালির আগে থেকেই আকাশটা মেঘলা মেঘলা ছিল।আজ ঝমঝম করে নেমে গেল। ডেইলি বলে ফুলন পারমিশন দিয়েছে নাহলে ধনতেরাস আর দিওয়ালিতে ওর মতো মালেদের ঘরে ঢুকতে দেয়! কিন্তু এখন তো আরেক ঝামেলা, কাপড়চোপড় সব ভিজিয়ে এসে উঠেছে। পাছে অন্যদের টাইম দিয়ে না দেয় তাই আর সবুর হয়নি রণবীরের,ভিজতে ভিজতেই ছুটে এসেছে। রণবীর চল্লিশ ছুঁই ছুঁই যুবক।একসময় এলাকায় টায়ার কারখানার শিফ্ট ম্যানেজার হিসেবে আসে। এখন কারখানা বন্ধ হলেও মালিক পুষে রেখেছে মালপত্র দেখাশোনার জন্য।আর ফুলনের কাছে আসে প্রায় ন–দশ মাস আগে, ওর দোস্ত কামানের হাত ধরে।
প্রথম যখন রণ ফুলনের কাছে এসেছিল তখন ভাবেইনি যে এই আসাটা এতদিন ধরে চলবে।আর কামানও ভাবেনি মুখচোরা রণবীর তার হাত ছেড়ে এমন চোস্ত খিলাড়ি হয়ে উঠবে। বরং রণবীর যে ফুলনের ঘরে ওর আড়ালে আসে তা দু–একদিন বুঝতে পেরে নিজেই ফুলনের কাছে আসা ছেড়ে দেয়।এরকম অনেক আয়ারাম গয়ারামেদের দেখে দেখে ফুলন অভ্যস্থ। ওসব নিয়ে আর ভাবনার কিছু নেই। কিন্তু হালে রণবীরের দিকে কেমন একটু টান অনুভূত হয়। কিছু বলতে পারে না ওকে। কত্তদিন তো ‘শালা’, ‘খানকির ছেলে’ এসবও মুখের ওপর শুনিয়ে দিয়েছে,কিন্তু রণর অদ্ভুত নিরবতায় যেন বারবার ফুলন পরাস্ত হয়ে গেছে। তবুও পুরুষে আর বিশ্বাস নেই। কখনো মনে হয়েছিলো দিওয়ালির রাতটা শুধু রনবীরের সাথেই কাটাবে কিন্তু আবার মনে হয়েছে–‘ কি লাভ। ও শালাও তো একটা পুরুষ..’ গতর না খাটালে কোন হারামিই ভাত দেয় না। এখন ফুলনের কাছে পুরুষ মানে ‘মুরগী’ বা ‘পয়সা’ ।কারখানা বন্ধ হবার পর লোহালক্কড় চুরি করে বেচত ফুলন আর ওর ভাই মিলে।একদিন সেটাও বন্ধ হয়ে গেল।বাপ মরার পর ভাইটাও কোথায় যেন চলে যায়।বস্তিতে পরে থাকলে তো ভাত জোটাও মুশকিল।ফুলন দুটো বাড়িতে ঠিকে ঝি–র কাজ নেয়। তবুও একা একটা মেয়েকে কি বস্তির লোক শান্তিতে থাকতে দেয়!মাঝরাতে এসে দরজায় টোকা মারে।মদ খেয়ে চুর হয়ে হাত ধরে টানাটানি করে। মালকিনকে রাতে থাকতে দিতে বলেছিল কিন্তু মালকিনেরও ভরসা হয়নি অমন জোয়ান মেয়েকে নিজের ঘরে থাকতে দেবার।ফুলনও নিজের অজান্তে কখন যেন বাইরের মেয়েছেলে হয়ে উঠল।এখন কলোনির লোকজন সব বোঝে,কেউ কিছু আর কানাকানি করে না।মাঝে মাঝে রাতের ঘুম ভেঙ্গে যায় ফুলনের,মদ খেয়ে এসে পাশের বাড়ির লোকগুলো চিৎকার করে বউদের পেটায়,
–মাগি,নিজের গতর খাটিয়ে খা না।আমার ঘর থেকে বের হ।
পরিত্যক্ত কারখানার অলিগলিগুলো নেশাখোরদের আস্তানা।আর এখন তো দিনেদুপুরেই সব এসে পরে থাকে।কেউ কেউ রণকে এদিক দিয়ে আসতে দেখলে টিটকিরিও করে তাই কারখানার ভেতরের শর্টকার্ট রাস্তাটি ত্যাগ করেছে।ঘুরে আসতে গিয়ে ভিজেছেও বেশি।আজ অনেকক্ষণ হল এসেছে।ভিজে জামাটাকে দড়িতে ঝুলিয়ে ফ্যানটাকে শেষ অবধি ঘুরিয়ে দেয় ফুলন।একটু শীত শীত লাগছে কিন্তু শার্টটা শুকোনো দরকার।তারপর রণকে চা করে দিল।বাইরের সবকিছুই ভিজে,অসময়ের বৃষ্টিতে সবাই বেশ বিরক্ত কিন্তু রণ–র তেমন কিছু মনে হচ্ছে না।রণ যে ভালবেসে বারবার ফুলনের কাছে আসে এমনটা নয়।যেদিন কামানের সাথে প্রথম এসেছিল সেদিনও এমনই বৃষ্টি ছিল।
আসলে রণবীর এখনো জয়াকে ভুলতে পারেনি।জয়ার সেদিনের সেই কথাটা,
–এরকম কাপুরুষের তো মরাও ভাল।আমার দরকার নেই।
জয়াকে রণবীর মনে প্রাণে ভালোবাসতো ।যতটা বাসত ততটা হয়ত বলতে পারত না জয়া সেটা বুঝতও,
–তুই বুঝি আমাকে খুব ভালবাসিস? অন্যকোন মেয়ের দিকে তাকাসও না।তাই না?
যাইহোক ওদের সম্পর্কটা শেষ অবধি আর দানা বাঁধেনি।জয়া চাইত যে রণবীর সানি দেওল বা শাহরুখ খানের মতো ওর কাছে আসুক। রণ–র নিখাদ ভালবাসা এই চাওয়াগুলোর কাছে তুচ্ছতায় পরে থাকত। জয়া চাইত রণবীর এই মিনমিনানি থেকে বেরিয়ে আসুক। রণ সৎ কিন্তু জয়া চাইত ও যেন সাহসী হয়,বস্তির কেউ টিটকিরি না করে। লোহাকে কাটার জন্য আরও শক্ত লোহার দরকার। কথায় কথায় রণকে কাপুরুষ বলে সে চাইতো ওর ভেতরের পুরুষটা জাগুক।কিন্তু রণ কখনো লজ্জা কাটিয়ে রাস্তা দিয়ে একই ছাতার তলায় বা জয়ার হাত ধরে একসঙ্গে যেতে পারেনি। এই দূরত্ব ধীরে ধীরে আরও বড় হতে হতে শেষে বিচ্ছেদ। রণবীর জয়ার চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেনি কিছুতেই।কাপুরুষত্ব ঘোচানোর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। শেষে কামানের সঙ্গে এসে ওঠে এই পুরুষ প্রমাণের ঠিকানায়।
যখন ফুলনের ব্রা–র হুক খোলে,মেদহীন নাভিটার চারপাশে চুমু খায়,লজ্জাস্থানগুলো স্পর্শ করে,বিছানায় ওর শরীরের সাথে একীভূত হয়ে যায় তখন ফুলনের শরীরে রণবীর জয়াকেই খোঁজে।ফুলনের শরীরেই যেন মুক্ত করে নিজের সব রাগ,দুঃখ,অভিমান,ঘৃণা। আবার কখনো ফুলনের শরীরটাকে ছুঁলে মনে হয় একতাল কাঁচামাটি,যদি কুমোরের মতো ফুলনকে জয়া বানিয়ে নেওয়া যেত! রণকে ফুলন জড়িয়ে ধরলে জয়ার ঐ কথাটাই মনে পড়ে,
–এরকম কাপুরুষের মরাই ভালো।
রণও প্রতিটি গোঙানিতেই জয়ার উদ্দেশ্যেই বলতে চাইত,
–দেখ,আমি কাপুরুষ নই। তোকে পুজো করতাম।

আজকাল আবার ফুলনশালীর রেলা বেড়েছে।গায়ে নতুন নতুন পোশাক উঠেছে। কোনটার সামনে হুক,কোনটা হুকছাড়া,কোনটা আবার কাপের মতো–রণ মনে মনে ভাবছে। এত কেন রে হারামজাদী? তুই কি আমার বৌ?ওই তো দু ঘন্টা তারপর তো গুণে গুণে নোট নিবি।অতো আবার শাসন কিসের।দিওয়ালি টা যাক না কত কে আসবে এদ্দিনে বোঝা হয়ে গেছে,শালী।রণ–র চা খাওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ।ওদিকে ফুলন ভেতরে কি নিয়ে ব্যস্ত বোঝা যাচ্ছে না।কোন লোক ঢুকেছে নাকি আবার,কি বিশ্বাস আছে। ফুলনের কাছে এসেছিলো পুরুষত্ব প্রমাণ করতে আর এখন আসে জয়াকে ভুলতে। কিন্তু জয়া কিভাবে যেন চলে আসে।ফুলনের যতো দেরী হচ্ছে ভেতরটা যেন ততই গজগজ করছে।জয়া যেন চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে বলছে,
–এরকম কাপুরুষের মরাও ভালো।
কয়েকবার তো ফুলনকে হাঁক ও পেরেছে আর প্রতিবারই বলেছে,
–বস না।আসছি।
কিন্তু আসছে না। জয়াকে থামানো যাচ্ছে না।মাথার প্রতিটা চুল যেন ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। তুই ও কি ফুলন…..।মেজাজটা খিঁচড়ে আছে।দু–ঘন্টা তো প্রায় হয়েই এলো।আর কি সময় তো শেষ।চিৎকার করে তো কথা বলেনি কোনদিন, আজ মনে হচ্ছে বলবে কিছু। এমন সময় পর্দাটা সরিয়ে ফুলন ঘরে ঢুকলো।রণ অমনি ঝাঁপিয়ে পরলো ফুলনের ওপর।নিজের মুখটাকে ফুলনের ঘাড়ের কাছে রেখে যেন ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিতে চাইলো সবকিছু। ফুলনের হাত থেকে ঝন ঝনাৎ করে মেঝেতে পরে গেল বাটিটা। গোটা ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো গরম পায়েস। তার ধোঁয়ায় ভেসে আসছে ম–ম করা গন্ধ। একমুহূর্ত মূর্তির মতো একে অপরকে দেখল রণ আর ফুলন।রণ– র মুখে শব্দ নেই। মুখ লাল। ফুলন রেগে গিয়ে বললো,
— শালা, পুরুষ।
রণ স্তব্ধ। জামাটা পরে ঘরে ফিরলো সেই অন্ধকার শর্টকাট গলি টা দিয়েই।
পরেরদিন সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ। রণ তো আসতে এত দেরি করে না। কামান বাধ্য হয়ে রণ–র বাড়ি গেল।রণকে ডাকলো,কিন্তু কোনো সাড়া নেই। দরজা খোলা।মেঝেতে পরে আছে রণবীর।উলঙ্গ শরীর।গোটা ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পাশে ছুরিটা পরে আছে, টাটকা রক্তে ভেজা। রণ নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলেছে। কথা বলতে পারছে না।কামান গিয়ে তুলে ধরলো।ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা স্বর বোঝার চেষ্টা করছে কামান,
–আর আমি মর্দ না জয়া।আমি কাপুরুষ।
বিড়বিড় করে জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে শব্দগুলো।কামানের চিৎকারে আরও দুজন এল। হাসপাতালে যাবার পথে মিনমিন শব্দ করতে করতে একসময় শেষ হয়ে গেল রণবীর।
–আর আমি মর্দ না………..।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


অঞ্জন রক্ষিত

জন্মঃ ০২/০৩/৮৬, ডালখোলায়। প্রকাশিত কাব্যঃ "হেলেনাকাশ" নভেম্বর, ২০১৬। পেশা- শিক্ষকতা, চূড়ামণ প্রহ্লাদচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।