এক পশলা বৃষ্টি

বর্ণালি বসাক বোস on

ঋজু এবার ক্লাসে প্রথম হয়েছে । মেঘা ভীষণ খুশি খুব ইচ্ছে করছে ছেলেকে একটা
খেলনা কিনে দিতে । মেঘা ঋজুকে নিয়ে শপিংমলে গেল । মেঘা বলল, “বাবা তোমার যে
খেলনাটা পছন্দ হচ্ছে তুমি নাও এটা তোমার ফার্স্ট হবার প্রাইজ । ” ঋজু তো ভীষণ
খুশী । নিজের পছন্দ মত খেলনা বেছে নেওয়ার এমন সুযোগ মা তাকে আগে কক্ষনো দেয়
নি । ও বুঝল মা খুব খুশি হয়েছে । মনে মনে ভাবল এবারও ও ভালভাবে পড়াশুনা করবে ।
দেখতে দেখতে ক্রিকেট কিটটা ওর খুব পছন্দ হল । মেঘা দেরি না করে তক্ষুনি ঋজুকে
ওটা কিনে দিল ।
মেঘা বলল, “ ঋজু আইস্ক্রিম খাবে ? না অন্য কিছু ?”
ঋজু বলল , “মা চল ফুচকা খাই । তোমারও তো ফুচকা খুব পছন্দ । ”
মেঘার খুব একটা অনিচ্ছা ছিল না । তাই ঋজু বলার সাথে সাথেই সে রাজি হয়ে গেল ।
মলের সামনেই একটা ফুচকার দোকান রোজ বসে ওরা সেখানেই গেল ।
ঋজু বলল – মা চল দেখি আজকে তুমি বেশি খেতে পার না আমি ।
– না বাবা । বেশি ভালো না । শেষে যদি তোমার শরীর খারাপ করে ।আমরা দুজনেই
দশটা করে খাব কেমন ?
– আচ্ছা মা ।
মেঘা আর ঋজু ফুচকা খাচ্ছে এমন সময় সামনে একটা মারুতি থেকে একজন সুন্দরী
মহিলা নেমে এলেন । সেও ফুচকা খাবে । মেঘার হঠাৎই চোখ পড়ে মারুতির ভেতরের
দিকটায়, একি ভেতরে কে ? মেঘার বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল । এযে অমিত ! মেঘা নিজের
চোখকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না । অমিতের পাশে ছোট্ট একটি মেয়ে ঠিক যেন
পুতুলের মত । দেখে মনে হচ্ছে বছর পাঁচেকের হবে । মেঘার মনে অনেক কথা ভিড়
করে আসছে । ভেতর থেকে মেয়েটি বলে উঠল , “ পাপা আমিও ফুচকা খাব । মাম্মি
আমাকেও দাও না প্লিজ ।” মা বলে উঠল – না না এসব স্ট্রিট ফুড । তুমি খাবে না ।

– তুমি যে খাচ্ছ ?
– না সোনা তুমি খেও না ।
ভেতর থেকে অমিত বলল – দাও না রুপ । ও যখন এত করে বলছে । একটা দাও না
ওকে।
কথা বলতে বলতে আমিত গাড়ীর জানালা দিয়ে মুখ বের করতেই ওর চোখ পড়ে মেঘার
উপর । ভুত দেখার মত চমকে ওঠে অমিত । মুখটি কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায় । কি
করবে বুঝতে পারে না । ততক্ষণে মেঘা আর ঋজুর দশটি করে ফুচকা খাওয়া শেষ ।
মেঘা ও অমিত দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে । কত প্রশ্ন মেঘার দৃষ্টিতে । অমিতের
দৃষ্টিতে ভয় মাখানো লজ্জা । মেঘার চোখে চোখ রাখতে পারে না অমিত । রুপ এসবের
কিছুই খেয়াল করে না । ও ফুচকা খাওয়া নিয়ে ব্যাস্ত । ফুচকাওয়ালা মেঘাকে ডাকে ,
“বৌদি আর ফুচকা দেব ?” মেঘা যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না । ওর প্রতিটা ইন্দ্রিয়
যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে । শুধু চোখ দুটো কি যেন দেখছে । আমিতের দিকে
তাকিয়ে থাকলেও মন যেন কোথায় হারিয়ে গেছে । তাই সে যে এক দৃষ্টিতে অমিতের
দিকে চেয়ে আছে তা সে নিজেই বোঝেনি । ওর মন ওর কাছে ফিরে এল ঋজুর ডাকে ।
– ওমা তুমি কি আর ফুচকা নেবে ? কাকু তো কখন থেকে তোমায় ডাকছে তুমি শুনতে
পাচ্ছ না কেন ?
– ও নাঃ । না বাবা আর নেব না । দাদা আপনার টাকাটা । চল ঋজু আমরা বাড়ী যাই ।
ব্যাস্ত হয়ে উঠল মেঘা । ঋজুর হাত ধরে সে বাড়ীর পথে চলল । পা দুটো যেন চলছে না।
খুব ইচ্ছে হচ্ছে পেছন ফিরে তাকাতে । অমিতও কি তাকিয়ে আছে ? না হয়তো । সবই
তো শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু ও যে দেশে এসেছে একবারও তো জানায় নি । মেঘাতো
আজ পর্যন্ত ওর জন্য অপেক্ষা করে ছিল । মেঘা বাড়ী ফিরে আসে । কোন কাজে
ওর মন লাগেনা । সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । ভাবতে ভাবতে ওর সামনে ভেসে
ওঠে সেই দিন গুলো । মনে হচ্ছে এই তো সে দিন কলেজে দুজনে এক সঙ্গে পড়ত ।
কলেজের মাঠটায় বসে কত গল্প করেছে । কলেজ শেষ করে ইউনিভারসিটি । এক জন
চলে গেল শান্তিনিকেতন আর এক জন যাদবপুরে থেকে গেল । কিন্তু তখনও তো
রোজ ফোনে কথা হত । এরপর মেঘা বর্ধমানে একটি হাইস্কুলে চাকরি পেয়ে যায় ।
অমিত পি এইচ ডি করে । তখনও ওদের সম্পর্ক ছিল কত পবিত্র । রোজ ফোনে
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হত । কত স্বপ্ন , কত ইচ্ছে , ঘর বাঁধার গল্প কত কি।

এরপর অমিত ঠিক করে সে পোস্ট ডক্টরেট করবে । মেঘাও ওকে উৎসাহ দেয় ।
আসলে মেঘাই ছিল আমিতের প্রেরণা । মেঘা নিজেও ছাত্রী হিসেবে খুব ভালো ছিল ।
ওরও বিদেশে পড়ার শখ ছিল । কিন্তু চাকরি পাবার পর আর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে
পারল না । অমিত অ্যামেরিকা যাবে বলে ঠিক করে ।সব তো ঠিকঠাকই চলছিল । এ
সব কথা ভাবতে ভাবতে মেঘা চলে যায় সেই দিনটিতে যে দিন অমিত মেঘার
বর্ধমানের ফ্ল্যাটে যায় । মেঘা সেদিন একা । যদিও মেঘার মা ওর সঙ্গেই থাকত ।
মেয়ে বাইরে চাকরি করতে গেলে বাবা মায়েদের দুঃশ্চিন্তার অন্ত থাকে না । মেঘার
ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয় নি । মেঘার মা ওকে নিয়ে বর্ধমানে থাকতেন আর ওর
বাবা বাড়ীতে । একদিন সকালে ওদের এক প্রতিবেশী ফোন করে জানাল মেঘার বাবা
ভীষণ অসুস্থ । তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান হয়েছে । মেঘার স্কুলে পরীক্ষা চলার
ফলে ও ছুটি পায় না । রেবা দেবী মেঘাকে একাই রেখে চলে যান । বড় দুঃশ্চিন্তা নিয়ে
রেবাদেবী বাড়ী যান । মেয়েকে একা রেখে সে কোন দিন যায় নি । ওদিকে স্বামী
অসুস্থ । বার বার মেয়েকে সাবধানে থাকতে বলে গেলেন । পরের দিন মেঘা স্কুল
যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে । মা নেই একাই খেতে হবে । ভাবল সে শাড়ি পরবে না চুড়িদার
পড়ে যাবে । আলমারি খুলতেই অমিতের দেওয়া চুড়িদারটা মেঘার নজরে পড়ে । ওটা
পরবে বলে হাতে নিয়ে সে অমিতের চিন্তায় বিভোর হয়ে যায় । হঠাৎ কলিং বেলটা
বেজে ওঠে মেঘা বিরক্ত হয় । এমন সময় আবার কে এল ,নিশ্চয় দুধওয়ালা । রাগ
করে দরজা খুলতে যাচ্ছে আর বলছে কতদিন আপনাকে বলেছি একটু সকাল সকাল
আসতে ।এই বলে যেই দরজা খুলেছে দ্যাখে সামনে অমিত । মেঘা তো অবাক । ভাবছে
এতক্ষণ অমিতের কথা ভাবছিল বলে কি দুধওয়ালার কেই অমিত দেখতে পাচ্ছে ?
অমিত মেঘার চোখের সামনে হাতটা নাড়িয়ে বলল, “ কি হল ? আমি সত্যি এসেছি ।
মেঘা ব্যাস্ত হয়ে পড়ল । ” আজও ওই কথা গুলো যেন কান পাতলেই মেঘা শুনতে পায়

মেঘা বলল – আরে তুমি ? এসো এসো । এমন সময় এলে, আমায় যে স্কুলে যেতেই
হবে ।
– আচ্ছা তোমাকে ব্যাস্ত হতে হবে না । তুমি স্কুলে যাও । আন্টি কোথায় ? আমি
আন্টির সাথেই গল্প করব ।
– মা তো নেই । বাবার খুব শরীর খারাপ কালই মা বাড়ী গেছে ।

– তাই নাকি ? তাহলে তুমি একা আছ ? আমিও তো তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে
ফোন করে এলাম না ।
– আচ্ছা ঠিক আছে । তুমি থাক রেস্ট নাও আমি স্কুল থেকে এসে তোমার সাথে
গল্প করব। এখন আসি ?
যাবার সময় টাওয়ালটা বাথরুমে রেখে গেল । আর দুপুরে সামনের হোটেল থেকে খেয়ে
নিতে বলল । সারাদিন মেঘার মন বর্ষার ময়ূরের মত পেখম তুলে নাচছিল । স্কুলে
কাউকে বলতেও পারছে না । শুধু ঘড়ি দেখছে কখন পরীক্ষা শেষ হবে ও ঘরে যাবে ।
এদিকে অমিত স্নান খাওয়া সেরে মেঘার ফ্ল্যাটে ঘুমিয়ে পড়ল । ওর ঘুম ভাঙল মেঘার
কলিং বেলে । মেঘা এসে ফ্রেস হয়ে চা নিয়ে এল । দুজনে চা খেতে খেতে অনেক গল্প
করল । মাঝে রেবাদেবী একবার ফোন করেছিল মেঘা অমিতের আসার কথাটা মাকে
জানাল না । আস্তে আস্তে বেলা গড়িয়ে এল । আমিত বলল
– মেঘা আমি পরশু অ্যামেরিকা রওনা হচ্ছি । তাই তোমার সাথে দেখা করতে এলাম ।
তুমি ভাল থেকো ।
– ওখানে কোন বিদেশিনীর প্রেমে পড়ে আমাকে ভুলে যাবে না তো ?
– তোমাকে ভুলে গেলে যে নিজেকেই ভুলে যেতে হবে । তুমি ছাড়া আমি যে অসম্পূর্ণ ।
তুমিই তো আমার প্রেরণা । তুমি ছাড়া আজ কি আমি বিদেশে যেতে পারতাম ?
– না না আমি আর কি করেছি ? তুমি যাচ্ছ তোমার কোয়ালিটিতে ।
– কোয়ালিটি তো তোমারও ছিল মেঘা । ইনফ্যাক্ট তুমি আমার থেকে পড়াশুনায়
অনেক ভালো।
– আসলে চাকরি পাবার পর ছেড়ে দিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার সাহস হল না ।
ভেবেছিলাম চাকরি করতে করতে পড়াশুনা করব । কিন্তু এমন জায়গায় পোস্টিং
যাতায়াতের ধকলের পর আর পড়াশুনা হয় না । আমি তোমার মধ্যেই আমার
সাফল্য খুঁজে পাই । আর মনে প্রানে চাই তুমি অনেক উন্নতি কর ।
গল্প করতে করতে সন্ধ্যা গড়িয়ে এলো। মেঘা একবার বারান্দার দিকে এসে দেখল
আকাশ কালো হয়ে গেছে এখনই ভীষণ বৃষ্টি নামবে । মেঘা দৌড়ে ঘরে এল ।
– অমিত তাড়াতাড়ি কর ভীষণ মেঘ করেছে । এক্ষুনি বৃষ্টি নামবে । তুমি স্টেশন
পর্যন্ত পৌছাতেই পারবে না ।

– ট্রেন তো রাত দশটায় । সবে তো আটটা বাজে । একটু পরে বের হচ্ছি । তোমার
বাড়ী থেকে স্টেশন তো মাত্র পনের মিনিটের দূরত্ব । আমি আসার সময় দেখেছি

– তা হোক । তুমি ষ্টেশনে গিয়ে বসে থাক । না হলে যদি বের হতে না পার । যাওয়ার
সময় কিছু খাবার নিয়ে নিও ।
মেঘা এক প্রকার অমিতকে জোর করতে থাকে বের হবার জন্য । অমিতও তৈরি হতে
যায় । এর মধ্যেই শুরু হয় প্রচণ্ড বজ্র বিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি । আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে
। তার সঙ্গে প্রচণ্ড ঝড় । ওরা দুজনেই অস্থির হয়ে ওঠে । এখন কি হবে ? কি করে
বাড়ী ফিরবে অমিত ? মেঘার বুক ভয়ে কাঁপতে থাকে । অমিত যদি ফিরতে না পারে
তাহলে ও থাকবে কোথায়? ঘড়িতে নটা বাজল মেঘা বাইরে গিয়ে দেখল না তখনও
বৃষ্টি কমেনি । বিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে হঠাৎ করে চারিদিকটা আলোকিত হয়ে
উঠছে তারি একটু করে আলো আসছে ঘরের ভেতরে । অমিত দেখল সাড়ে নটা বেজে
গেছে এখন না বের হলে ট্রেন আর ধরা যাবে না । মেঘার টেনশনে মুখ শুকিয়ে গেছে ও
সমানে ঘরের মধ্যে পাইচারি করে যাচ্ছে । ঘরের ভেতর থেকে ঝড়ের শোঁ শোঁ আওয়াজ
শোনা যাচ্ছে । মেঘা বুঝতে পারল আজ আর অমিতের ফেরা হবে না । এমন ঝড় বৃষ্টির
রাতে ষ্টেশনে যাবার কোন যানবাহনও পাওয়া যাবে না । কিছুক্ষন আগে শিলাবৃষ্টি
হয়ে গেছে কোন রিক্সওয়ালাও হয়তো বাইরে নেই। ঘরের মোমবাতিটা যে আর
কতক্ষন আলো দেবে ? ঘণ্টা খানেক ধরে লোডশেডিং চলছে । মেঘা মনে মনে এরকম
সাত পাঁচ ভেবে যাচ্ছে । ও অমিতকে বলল , “এখন কি করবে ?”
অমিত বলল – আজ আর ফেরা যাবে না মেঘা । এখানেই থাকতে হবে ।
– না না তা কি করে সম্ভব । ফিরতে না পার ঝড় থামলে সামনে একটা লজ আছে
ওখানে চলে যেও ।
– আচ্ছা বেশ ।
মোমবাতির হালকা আলোয় মেঘার মুখটা অমিত যে টুকু দেখতে পাচ্ছে তাতে মেঘার
মনের চিন্তাটা সে বেশ বুঝতে পারছে । বাইরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে প্রচণ্ড মেঘের
গর্জনে যেন চারি দিক কেঁপে কেঁপে উঠছে । অমিত মেঘার হাতটা টেনে পাশে বসাল ।
– কি করছ কি ?

– আরে বসো তো ।
– কি তখন থেকে পাইচারি করে যাচ্ছ ? একটাও কথা নেই । পাশে বসো গল্প করি ।
ওরা দুজনে পাশাপাশি বসে গল্প করছে । জানালার কাঁচ দিয়ে বিদ্যুতের আলো ঢুকছে
ঘরে । তা আবার কখনও কখনও গিয়ে পড়ছে মেঘার মুখের ওপর । কেমন একটা
মায়াবি পরিবেশ। নিজেদের যেন রূপকথা গল্পের রাজা রানির মত লাগছে । মেঘা বলছে
– কবে যে আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে ? আবার কবে পাশাপাশি বসে তোমার
সঙ্গে গল্প করতে পারব ?
– মেঘা অ্যামেরিকা থেকে এসেই কিন্তু আমরা বিয়ে করব । অনেক দিন হল আর না
। আর তোমায় ছেড়ে থাকতে পারব না ।
– বেশ তো ।
দুজনের হাতে হাত চোখে চোখ যেন কত আপনার । ওদের মনে হচ্ছে ওরা ছাড়া যেন
পৃথিবীতে আর কেউ নেই । হঠাৎ জোরে একটা বাজ পড়ল তার সঙ্গে কান ফাটানো
আওয়াজ মেঘা অকস্মাৎ জড়িয়ে ধরে অমিতকে । অমিতও তার দুই বাহুর মধ্যে
আগলে রাখে মেঘাকে। আরও অনেক কাছাকাছি চলে আসে তারা । তারপর ……..।
পরের দিন সকালে মেঘার ঘুম ভাঙে জানালা দিয়ে যখন সকালের রোদ ওর চোখে এসে
পড়ে । জানালা খুলে দেয় মেঘা । দ্যাখে চারিদিকে ঝকঝকে রোদ উঠেছে । দেখে মনেই
হছে না কাল এত দুর্যোগ হয়েছে । গাছের পাতাগুলো যেন বৃষ্টির জলে স্নান করে
আরও সবুজ হয়ে উঠেছে । রোজকার পরিচিত পরিবেশটা আজ যেন কেমন নতুন লাগছে
মেঘার চোখে । বাইরে লোকজনকে বলতে শোনা যাচ্ছে কাল ঝড়ে স্টেশনের পাশের
বটগাছটা উপড়ে পড়েছে । স্টেশনের রাস্তা বন্ধ । অনেকটা ঘুরে ষ্টেশনে যেতে হচ্ছে
। মেঘা চা নিয়ে আসে । অমিতকে ডেকে দেয় । দুজনে চা খায় । দুজনের চোখে মুখে
একটা খুসির ছোঁয়া । একটা অন্য রকম অনুভুতি । মেঘা বলল
– চা খেয়ে তৈরি হয়ে নাও । বাড়ী যেতে হবে না ? আমারও তো স্কুল আছে ।
– তোমায় ছেড়ে আর যেতে ইচ্ছে করছে না মেঘা ।
– আমারও তোমায় যেতে দিতে মন চাইছে না ।
– কি করব বল কালকেই যে ফ্লাইট ।
– আবার কবে আসবে ?

– কি জানি গো । আগে তো যাই ।
সব ঘটনা গুলো মেঘার সামনে ছবির মত ভেসে ওঠে । যে ঘটনাটা অতি কষ্টে এতদিন
চেষ্টা করে ভুলতে চেয়েছিল আজ অমিতকে দেখার পর সব আবার কেমন জ্যান্ত হয়ে
ওঠে । মেঘার মনে পড়ে যায় ঋজু আসার সেই দিন গুলোর কথা । তার জীবনের সেই
দুর্বিসহ সময়টা । যে সময় মেঘাকে একা লড়তে হয়েছে । মনে পড়ে প্রথম প্রথম
আমিত যোগাযোগ রাখলেও সব কিছু জানার পর অমিত কেমন যেন মেঘার ফোন
এড়িয়ে যেত । মেঘা প্রথম দিকে ভাবত ও হয়তো ব্যাস্ত আছে । কিন্তু পরের দিকে
হাজার চেষ্টা করেও ও যখন অমিতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারল না তখন রাগে
অভিমানে প্রতিজ্ঞা করে আর কক্ষনও ওকে ফোন করবে না । বাবা মাও সে সময়
তার পাশ থেকে সরে যায় । তার জন্য অবশ্য সে বাবা মাকে দোষ দেয় না। আজও ওর
বাবা মা ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না । কিছুদিন আগে সে খোঁজ নিয়েছিল । বাবা মা
দুজনেই খুব অসুস্থ । এই সময় হয়তো মেঘার ওনাদের পাশে থাকার দরকার ছিল ।
কিন্তু ওনারা মেঘার মুখও দেখতে চান না । তখন থেকেই মেঘার বাবা মা নিজেদের
ঘর বন্দি করে ফেলেছেন । খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া ওনারা বাড়ী থেকে বের হন না ।
প্রতিবেশিদের সাথেও খুব একটা মেশেন না । মেঘা চির জীবন বাবা মার কাছে
অপরাধী হয়ে রইল । কিন্তু ওনারাও তো ওকে বুঝলেন না । মেঘা অবশ্য একজনের
উপকার কোনোদিন ভুলতে পারবে না তিনি হলেন মেঘার সুছন্দাদি । মেঘার আগের
স্কুলের সহকর্মী । উনি ওই সময়টা একজন অভিভাবকের মত মেঘার পাশে ছিলেন ।
ওর খেয়াল রেখেছে । ওর যত্ন নিয়েছে । আজও সে প্রায়ই ফোন করে ঋজুর খোঁজ
নেয় । আজ তার কথা মেঘার খুব মনে পড়ছে । মনে হচ্ছে তার কাছে ছুটে গিয়ে
কিছুক্ষন তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে হালকা হবে । ঋজু জন্ম নেবার পর মেঘা
কলকাতার একটি স্কুলে বদলি হয়ে আসে । এখানে কেউ তাকে চেনে না । তাই কাউকে
আজ অবধি কোন কৈফিয়ত দিতে হয় নি মেঘাকে । এতদিন পর্যন্ত মেঘা ও ঋজু খুব
ভালো ছিল । ওদের দুজনের ছোট্ট সংসার । হাসি আর আনন্দে ভরা । মেঘা ঋজুকে
ভালো রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে । বাবা মা দুজনের দ্বায়িত্বই পালন করে মেঘা ।
একদিন অবশ্য ঋজু বাবার কথা জানতে চেয়েছিল । মেঘা বলেছিল ওর বাবা নেই ।
আর কক্ষনও ও বাবার কথা বলে নি কারন বাবার কোনও প্রয়োজনীয়তা ও অনুভব
করে না মা তাকে বাবার অভাব বুঝতেই দেয় না ।

কিন্তু আজ কেন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । তাহলে কি এই মেয়েটার জন্যই
অমিত তার সঙ্গে পরে কোন যোগাযোগ করে নি । মেঘার খুব জানতে ইচ্ছে করছে
অমিত কি করে পারল ওই কঠিন পরিস্থিতিতে মেঘাকে একা রেখে পালিয়ে যেতে ?
তাহলে কি সব ওর অভিনয় ছিল ? ওকি তাহলে কোন দিন মেঘাকে ভালইবাসে নি ?
নাকি তার মত ও ওই মেয়েটার সঙ্গেও ……..। ওর ওই ভালো মানুষের মুখশের
আড়ালে কি একটা নোংরা কাপুরুষ লুকিয়ে ছিল ? অনেক প্রশ্ন মেঘার মনে । এর
উত্তর গুলি জানা খুব দরকার না হলে মেঘার নিজের জীবনটাই ওর কাছে অজানা
থেকে যাবে । কিন্তু পরে ক্ষনেই ঘেন্নায় অমিতের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছেটাই নষ্ট
হয়ে যাচ্ছে । সব কিছু অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দিয়ে মেঘা ঋজুকে জড়িয়ে ধরে বলে –
“বাবা তুই আমাকে ছেড়ে যাবি না তো ?”ঋজু কিছুই বুঝল না শুধু বলল –না মা ।


বর্ণালি বসাক বোস

বর্ণালি বসাক বোস একজন পুরপুরি গৃহবধূ । রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাষ্টার ডিগ্রি করেছেন বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে । ছাত্রজীবন থেকেই লিখতে ভালোবাসেন । স্বামীর উতসাহে, ছেলের উদ্দীপনায় ও ভাগ্নির আব্দারে আবার লেখার জীবনে ফিরে আশা । সংসারের কাজের ফাঁকে গান আর লেখা তার সঙ্গী । সমাজের চারিপাশের বিভিন্ন রকম চরিত্র যেটা তার মনকে নাড়া দেয়, তাই নিয়েই তিনি লিখতে ভালোবাসেন । এসবের পাশাপাশি সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন । এতদিন স্বামীই ছিলেন তার লেখার একমাত্র পাঠক তারই অনুপ্রেরণায় আজ এই লেখা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রকাশিত । বাবা, মা এবং শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদকে ও ছোট বোনের ভালোবাসাকে জীবনের পাথেয় করে চলতে চান ।

1 Comment

Piyali Basak Roy · নভেম্বর 21, 2018 at 12:31 অপরাহ্ন

Outstanding hoyeche re didi

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।