আমার ভাল খাওয়ার দিন

কমল সরকার on

হেমন্তের এক সকাল । পাকা ধান উঠেছে বাড়িতে । ধান মাড়ানোর জন্যে চারজন লোক (কামলা ) ঠিক করেছেন ছোটমামা । তারা সকাল সকাল এসে কাজ শুরু করেছেন । তাদের এবং আমাদের সকলের খাবার জন্যে রুটি বেলছেন মাসি । আমি চুলোতে গুঁজে দিচ্ছি শুকনো লতাপাতা, ডালখড়ি । একটা ক’রে রুটি বেলে তাওয়ায় ফেলছেন মাসি , আমি বাঁ হাতে কমবেশি ক’রে পাতা ডাল গুঁজে জ্বাল নিয়ন্ত্রণ করছি , ডান হাতে একটা কাঁচা ডালখড়ি দিয়ে তপ্ত তাওয়ার রুটি উলটে পালটে ভেজে নামাচ্ছি । ছ্যাঁকাও খেয়েছি বারকতক । মুখের ফু-টুকু ছাড়া আর কোন চিকিৎসা — সে বড় অন্যায় আবদার । রুটি বানানো শেষ হয়ে গেলে মাসি গুড় বা চিনি কিছু আনার জন্যে বেরিয়ে গেলেন রান্নাঘর থেকে । যাবার সময় বলে গেলেন , ‘দেহিস, বিলাই মুখ দ্যায় না য্যান । যাইস না কুনুহানে ।’
মাসি বেরিয়ে গেলেন । আমি রুটি পাহারা দিচ্ছি বসে বসে আর আকাশ পাতাল ভাবছি । ভাবতে ভাবতে কোন্‌ দেশে যে চলে গেলাম ! পড়ে রইল রান্নাঘরে আঢাকা রুটি , আমি বেরিয়ে গেছি রান্নাঘর থেকে । কোথায় গিয়েছি , কেন গিয়েছি জানি না । একটু পরে ফিরে এলাম । ততক্ষণে বিলাই বাবাজী নিঃশব্দচরণে রান্নাঘরে ঢুকে তার পুণ্যকর্মটি সেরে গেছেন । কোথা থেকে যে উদয় হলেন তিনি ! আমি বেরিয়ে যাওয়ার সময় আশেপাশে কোথাও দেখা পাইনি বেড়ালের ।
ফিরে এসে ঢুকছি রান্নাঘরে । বারান্দায় সবে পা দিয়েছি , আমার ঘাড়ে এসে পড়ল দুটি শক্ত হাতের পাঞ্জা । মাথাটা দম দেওয়া পুতুলের মত আগেপিছে ঝাঁকুনি খেল দু-তিনবার । তারপর বাড়ির পোষা কুকুর বা বিড়ালকে হঠাৎ ক’রে লাথি মারলে যেমন শুধু একটা ঘোঁৎ শব্দ ছাড়া আর কোন প্রতিবাদ না ক’রে ছিটকে পড়ে , আমিও সেভাবে সঘোঁৎ ছিটকে পড়লাম , বারান্দা থেকে উঠোনে । এই অতর্কিত আক্রমণের হেতুটা আমি প্রথমটায় বুঝতে পারলাম না । পড়ে আছি উঠোনে । ডান হাঁটুটা শক্ত মাটিতে ছ্যাচড়ে যাওয়ার দরুন ছড়ে গেছে । পা দুটো ‘দ’-এর মত ভাঁজ হয়ে আছে , দুই হাতের তালু মাটিতে , কনুই ভাঁজ হয়ে উপরে । যেন একটা আজব দৌড় প্রতিযোগিতার স্টার্টিং পজিসন ।
আমি তাকালাম দুটো রক্তচক্ষুর দিকে । সেই চোখজোড়া বলছে , ‘তরে কয়া গ্যাছে না ঘরে থাকতো , কুন আক্কেলে বাইরয়া গেচস তুই ?’
মাসি যেহেতু রুটি পাহারার গুরুদায়িত্ব দিয়ে গেছেন আমার উপরে , একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলের উপরে , ছোটমামার রাগ এবার তাই মাসির উপরে গিয়ে পড়ল । গালমন্দ শুরু করলেন । মাসি কোন কথা না বলে চুপচাপ ঢুকে গেলেন রান্নাঘরে । বেরিয়ে এলেন বেলনিটা হাতে নিয়ে , ‘অ রে কুত্তার বাইচ্চা , আইজ দেহাইতাচি তরে মজা ’।
ছোটমামার কল্যাণে আমি তো জেট সেট হয়েই ছিলাম , এবার গোওওওওওও………… তেড়ি কেটে ধা ধা । উঠোন পেরিয়ে ছুটছি রাস্তা দিয়ে । মাসিও ছুটছেন পেছন পেছন । যখন আর দৌড়ে পারলেন না , হাতের বেলনিটা ছুঁড়ে মারলেন আমার দিকে । আমি যেহেতু তেড়ি কেটে ছুটছিলাম, সেটা আমার গায়ে এসে লাগল না, আমার পাশ দিয়ে সাঁই ক’রে বেরিয়ে গেল । কিছুটা সামনে
গিয়ে মাটিতে পড়ে বারকয়েক গোঁত্তা খেয়ে , ধুলোমাটিতে অর্ধবৃত্তাকার ছাপ রেখে গড়িয়ে থেমে গেল । আমি তুলে নিলাম বেলনিটা হাতে । ফিরে তাকালাম মাসির দিকে ।
মাসি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন । এবার কি পালটা আক্রমণ ??
মারপিট লাগলে আমাকে এক চড়ে ধরাশায়ী ক’রে দিতে পারবেন , ঘাড় ধরে আছাড় দিয়ে কোমরটা ভেঙে দিতে পারবেন , সে বিশ্বাস মাসির আছে । কিন্তু আমার হাতে তো এখন অস্ত্র । অন্ধের মত এলোপাথাড়ি মারতে থাকলে !!
মাসি এগোচ্ছেন না । আমি বেলনিটা আবার যথাস্থানে রেখে দিলাম । একটু সরে দাঁড়ালাম । অস্ত্রটা হাতে তুলে নেওয়ার পরও প্রত্যাশিত আক্রমণটা দেখতে না পেয়ে অবাক হলেন মাসি । খুব ধীরে এগিয়ে এলেন । হাতে তুলে নিলেন বেলনিটা । আমি দাঁড়িয়েই আছি সেইভাবে । মাসি আর এগোলেন না । শুধু বললেন , ‘খাইবে কী আইজ ? দেখবাম , ক্যাডা তরে খাওনের দ্যায় । থাক সারাদিন না খায়া । ’
উঁহু , পালটা আক্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে বেলনিটা হাতে তুলে নিইনি আমি । ইচ্ছে ছিল সেটা নিয়ে চম্পট দেবো । ‘আমারে খাওনের দিবি না ? দেহি , তরা কিবায় খাস ?’ আমার যেকোন অপরাধে হত সশ্রম কারাদন্ড — চড় থাপ্পড় কিল ঘুষির পর ‘খাওন নাই ’। আজো যে তার ব্যতিক্রম হবে না সেটা আমি ভাল ক’রেই জানি । তাই বেলনি নিয়ে পালানোর কথা ভাবা । কিন্তু পরে খেয়াল হল , আজ চারজন কামলা আছেন বাড়িতে । তাদেরও খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে । এর পরিণতি হবে মারাত্মক । চরম ভোগান্তি কপালে । অতএব পরিকল্পনা বাতিল । যথাস্থানে বেলনি স্থাপন ।
মাসি চলে গেলেন বাড়ির ভেতর । আমি এবাড়ি সেবাড়ি ঘুরে বেরালাম কিছুক্ষণ । খিদে পেল । পেট চুঁইচুঁই করতে লাগল । ধীর পায়ে ঢুকলাম বাড়ির ভেতর । মেজমামার ঘরের বারান্দায় বসলাম মাথা নিচু ক’রে । উঠোনে কাজ ক’রে চলছেন চারজন কামলা আর ছোটমামা । মাসি আবার রুটি বানাচ্ছেন । ছোটমামা আমাকে স্মরণ করালেন , ‘খাওন নাই’।
বেলা গড়াল । খাওন নাই । কান্না পেতে লাগল । চেপে রাখলাম । ঘটনাটা বড়মামারাও জানলেন । এক দাদা ডাকল । গেলাম । ওদের রান্নাঘরে । পেতে রাখা পিঁড়িতে বসলাম । একটা থালায় দুটো রুটি আর আলুভাজা । খুব নরম সেই রুটি । আলুভাজাও খুব সুস্বাদু । ওদের ঘরে বরাবরই ভাল খাবার রান্না হয় । ছোটমামার ঘরে এমন খাবার হয় না কখনো । সকালের খাবার বেশিরভাগ দিন পান্তা ভাত, পোড়া শুকনো লংকা ডলে , কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে কিংবা শুকনো রুটি , কখনো একটু চিনি , কখনো একটু গুড় । তাই বড়মামার ঘরে খাওয়া পাওয়াটা আমার এক পরম প্রাপ্তি ।
একটা রুটির টুকরো আলুভাজা সমেত মুখে তুলতে যাচ্ছি , এমন সময় বড়মামি বললেন, ‘এমন ছোট ছেলেরে না খাওয়ায়া রাখার কথা ভাবে কেউ ! কী পাষন্ড !’ বড়মামির মুখে কখনোই না-শুনতে পাওয়া এমন আহ্লাদি কথা শুনে আমার মন গলে গেল, এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কান্না বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল । তবু কাঁদলাম না । আলুভাজা আর রুটির টুকরো মুখে পুড়ে , চোয়াল শক্ত ক’রে এক-দুবার চিবিয়ে , কাঁসার গ্লাস থেকে দুই ঢোক জল মুখে নিয়ে প্রায় না-চিবানো সেই রুটি আলুভাজা আর গলা পর্যন্ত উঠে আসা দলা পাকানো কান্না গিলে খেলাম । এর পর একবাটি দুধ আর একটা বড় মালভোগ কলা ।
এর আগে এবং পরে বারকতক খেয়েছি বড়মামার ঘরে । কাজের বিনিময়ে খাদ্য পলিসিতে । কাজের মধ্যে গাছে জল দেওয়া আর ‘মুট্‌ঠা’ দেওয়া । কাঁচা গোবরে ধানের তুষ বা কুঁড়ো মিশিয়ে হাতের মুঠোয় সেই মিশ্রণ নিয়ে পাটকাঠিতে সাঁটা , সেটা শুকোলে এক ভাল জ্বালানি । এই কাজের দিনগুলোতে মামাতো দাদারা বা দিদি সাংকেতিক ভাষায় আমার খাওয়ার অনুমতি নিত তাদের মায়ের থেকে , ‘মিটা , ইটো ইটাজকে ইটামিটাদের ঘিটরে খিটাবে ।’
তাদের মা বললেন , ‘ইটাচ্ছা ’।
অর্থাৎ, ‘মা, ও আজকে আমাদের ঘরে খাবে ।’ —‘আচ্ছা’ ।
আমি জানতাম না , বুঝতাম না এই সাংকেতিক ভাষা । পরে শিখেছিলাম ছোট দাদার থেকে । এই ‘ট’ দিয়ে কথা বলা । শব্দের অক্ষরের সঙ্গে ‘ই’ যোগ ক’রে , তারপর ‘ট’ , মূল অক্ষরের সঙ্গে যে স্বরধ্বনি সেটা যোগ হবে ‘ট’-এর সঙ্গে । অন্ত্যবর্ণ অবিকৃত থাকবে ।
যেমন , আমি — ইটামি , তোমার — তিটোমিটার , তাকে — তিটাকে ।
এই ভাষা যখন আমি শিখে গেলাম , স্বভাবতই তখন আর তারা এই ভাষা আমার উপস্থিতিতে ব্যবহার করল না । তখন আরেক সাংকেতিক ভাষা । ‘র্ফ’ দিয়ে ।
এমনি আরেকদিন মুট্‌ঠা দেওয়ার দিনে , ছোট দাদা ও দিদির সঙ্গে , দাদা বলল , ‘দেখি তো , কে কত তাড়াতাড়ি কতগুলা দিতে পারে ।’
শুরু হল প্রতিযোগিতা । আমি ফার্স্ট হলাম ।
দাদা তার মাকে বলল , ‘মির্ফা , ইর্ফো ইর্ফাজকে ইর্ফামির্ফাদের ঘির্ফরে খির্ফাবে ।’
— ইর্ফাচ্ছা ।
আমি বুঝলাম না ।
খাওয়া পেলাম । ভাল খাওয়ার ।
এমনি আরেক দিন শুরু হল প্রতিযোগিতা । আমি দ্রুত মুট্‌ঠা দিচ্ছি আর দেখছি দাদা দিদির হাত স্বাভাবিকের থেকে অনেক ধীর । নড়ে কি নড়ে না । আমি ওদের চালাকিটা বুঝলাম । তবু দিয়ে গেলাম মুট্‌ঠা । দ্রুত । কারণ আমার নাকে তখন কাঁচা গোবরের গন্ধ ছাপিয়ে নরম রুটি , সুস্বাদু আলুভাজা আর দুধ কলার গন্ধ ।
আবার সেই সাংকেতিক ভাষা । আমি বুঝি না । কিন্তু বুঝতে হবে । একদিন দাদাকে বললাম শিখিয়ে দিতে । সে বলল, ‘ ট-দিয়ে ত পারস-ই । এইটা আর শিখতে লাগবে না । ’ কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না । খুব মনযোগ দিয়ে দেখলাম ‘ট’-ভাষার সঙ্গে এর কোন তফাৎ নেই , শুধু ‘ট’-এর স্থলে ‘র্ফ’ , বাকি সব একই নিয়ম । অতএব আমি শিখে গেলাম , সব বুঝলাম । কিন্তু কাউকে সেটা জানালাম না গর্ব করে । এতদিন ধরে চলে আসা অপমানগুলো হজম করলাম ।
এরপর আরো কাজ করে দিয়েছি ওদের । খেতে বলেছে । কিন্তু লোভটা আর ছিল না । খেতে চাইনি । ‘নিমন্তন’ ক’রে খাওয়াতে চাইলেও যাইনি ।
মুট্‌ঠা দিয়ে গেছি । কলতলার বড় বালতিটায় জল ভরে , কোমরটাকে সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে , দুহাতের পেশি টান ক’রে বালতি তুলে ধরে , পেট ও হাঁটুর মাঝে বালতির ভারসাম্য রেখে , কোলা ব্যাঙের মত দু-পা ছড়িয়ে হেঁটে গিয়েছি তেমাথার জমিটায় , যেখানে ওরা ওদের বাড়ি গড়বে , জল দিয়েছি আম , কাঁঠাল , শিশু , শিরীষ গাছের চারায় । ফেরার পথে দাদা তার মা-কে বলেছে , ‘মির্ফা , ইর্ফো ইর্ফাজকে ইর্ফামির্ফাদের ঘির্ফরে খির্ফাবে ।’
আমি শুনেছি । বুঝেছি । নিঃশব্দে চলে এসেছি রোজকার সেই স্যাঁতস্যাঁতে রান্নাঘরটায় । সেখানে ছোটমামা নামক কেউ খেতে বসেছেন , মাসি বা দিদিমা নামক কেউ বসে আছেন । আমি ঘরে ঢুকেছি । কিন্তু কী আশ্চর্য , এখানে আমার খাওয়ার জন্যে কেউ কারুর থেকে সাংকেতিক ভাষায় কোন অনুমতি নিচ্ছে না । ঘটি থেকে নিজে হাতে গ্লাসে জল ভরে , নিজে হাতে পিঁড়ি বিছিয়ে বসেছি আসন ক’রে । বাঁ ঊরুতে বাঁ হাতের কনুই রেখে , শরীরটাকে যতটা সম্ভব সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে , ছোট গামলাটার উপর মুখ নিয়ে , জলজলা পান্তা ভাত , এক ছটাক নুন , সর্ষের তেল, পোড়া শুকনো লংকা , একফালি পেঁয়াজ — বড় ভাল , বড় তৃপ্তিকর সেই খাবার ।

...........................

কমল সরকার

জন্ম ১৬-০৫-১৯৮৩। বাড়ি বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলা ও অসম সীমান্তের গ্রাম বারোবিশায়। শৈশব কেটেছে কোচবিহার জেলার ভোগডাবরি কেশরিবাড়ি নামক গ্রামে মামার বাড়িতে। প্রাথমিক শিক্ষা সেখান থেকেই। এরপর বারোবিশা থেকে মাধ্যমিক। অতঃপর ফালাকাটা, জলপাইগুড়ি এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরবর্তী শিক্ষা । পেশায় রসায়নের শিক্ষক । বর্তমানে শিলিগুড়ির কাছে কর্মরত । ছোটবেলায় মামারবাড়িতে থেকেই একটি ছোট্ট অভিমান থেকে লেখালেখির শুরু । শখ সাহিত্যচর্চা, ভ্রমণ ও লেখালেখি ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।