অন্য মা

বর্ণালি বসাক বোস on

এই গল্পটি আমি শুভ্রদীপ চৌধুরী কে উৎসর্গ করলাম । যে আমার কাছে ছোটো ভাইয়ের মত। লেখার জীবনে সেই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে । সে সব সময় আমার পাশে থেকেছে আমাকে পথ দেখিয়েছে। তার মত এতো বড় মনের মানুষ সমাজে খুব কম দেখা যায়। ঈশ্বর ওর মঙ্গল করুন । 

বর্ণালি বসাক বোস

সকাল সাড়ে ছটায় কাজের মাসি কলিং বেল বাজায় প্রতিদিনের মত ঋক চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খোলে । ঘুম ঘুম চোখে মাসিকে সে মাসিকে গুড মর্নিং জানায় মাসিও এখন শিখে গেছে মাসিও হেসে ওকে বলে , “গুড মর্নিং সোনা ”। এরপর যে যার কাজে চলে যায় । মাসি তার কাজ শুরু করে আর ঐ দিকে ঋক ব্রাশ করে বই নিয়ে বসে পরে । এরপর টিউটর আসে সকাল সাতটায় তারপর আটটা তিরিশ মিনিটে স্নান সেরে নটা দশ মিনিটে স্কুলের বাস ধরা । এত এখন সব বাচ্চাদেরই রোজকার রুটিন ।ঋকের বেলাতেও তার অন্যথা হয় না । তাদের না আছে খেলার সময় ,না আছে উদাসীন ভাবে শৈশব কাটানোর উপায় । তারা যেন এখন এক একটা রক্ত মাংসের রোবট । যেমন ভাবে প্রোগ্রামিং করা থাকে তেমন ভাবেই চলে ।
তবে ঋকের ব্যাপারটা আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে একটু আলাদা । ঋক বই নিয়ে বসে আছে ঘড়িতে সাতটা বেজে তিরিশ মিনিট ।মিস তো এখন এল না । ঋক যতটুকু পারল হোম ওয়ার্ক নিজে নিজে করল ,সবটা পারল না । এদিকে মাসি ঘর ঝাড় দেবার জন্য এসে বলছে , “ সোনা আজ মনে হয় তোমার মিস আসবে না ।তুমি একটু কিছু খেয়ে নাও । ”
— থাক । মা উঠুক ,মা দেবে ।
— তবেই হয়েছে তোমার খাওয়া ।
দেখতে দেখতে সাড়ে আটটা বাজল ঋক স্নানে চলে গেল । এবার মাসির কাজ শেষ । যাবার সময় সে মহুয়াকে ডাকে , “ বউদি ওঠো ,দরজাটা লাগিয়ে দাও ।” কাজের মাসি বেরিয়ে যাচ্ছে আর বলছে , “ কেমন মা জানিনা বাপু ।” ঋকের স্নান শেষ স্কুল ড্রেস পড়া হয়ে গেছে। এবার সে ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছে। মহুয়া ফ্রিজ থেকে ভাত বের করে মাইক্রো-ওভেনে গরম করে দেয়। ঋক ভাতটা খেতে গিয়ে বলে , “মা ভাতটা কেমন গন্ধ লাগছে । আমি খেতে পারছি না ।” মহুয়া কোন উত্তর করে না ।কি আর বলবে ভাতটা দু দিনের বাসি গন্ধ তো হবেই । এরপর প্রতিদিনের মত একটা গুড ডে বিস্কুটের প্যাকেট টিফিনে দিয়ে দেয় । ঋক দু-এক বার ভাতটা মুখে দিয়ে মা কে টা টা করে বাসে চেপে স্কুলে চলে যায় । এরপর মহুয়া নিজে ফ্রেস হয় ।সুভাষবাবু ও ঘুম থেকে উঠে পড়েন । তিনিও কোর্টে যাবার জন্য তৈরি হতে থাকেন । মহুয়াকে ডেকে বলেন , “ মহুয়া আমায় খেতে দাও । আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে ।”
— গ্লাসে ছাতু গুলে খেয়ে যাও । আমি একটু শোবো । আমার ঘুম পাচ্ছে ।
— আমার রুমালটাও তো খুঁজে পাচ্ছি না । একটু খুঁজে দাও না প্লিজ ।
মহুয়া যেন শুনতেই পেল না । সুভাষবাবু একটা বিস্কুট খেয়ে কোর্টে বেরিয়ে পড়লেন ।
আজ ঋক হোম ওয়ার্ক শেষ করে আসতে পারেনি । স্কুলে টিচার ভীষণ বকাবকি করলেন । ঋক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল । অঙ্ক ক্লাসে সে বোর্ড ওয়ার্ক করতে পারেনি। আজ বাড়ীতে সে তার চশমাটা ছেড়ে এসেছে । চশমা ছাড়া সে প্রায় কিছুই দেখতে পায় না । টিচার সারা ক্লাস তাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখল । ঋকের দু গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ঋক আর মনে মনে নিজের উপর রাগ করে কেন আজ চশমাটা আনতে ভুলে গেল । এরপর টিফিন পিরিয়ড ঋকের খুব ক্ষিদে পেয়েছে । সকালে ভাতটা ও একদম খেতে পারেনি । কেমন একটা বাজে গন্ধ ওর বমি আসছিল । ঋক এসে সৌরভের পাশে বসল । সৌরভ ঋকের বেস্ট ফ্রেন্ড । সৌরভ আজ টিফিনে আলুভাজা দিয়ে মুড়ি এনেছে । ঋক বলল , “ সৌরভ আমায় একটু দিবি । তোর টিফিনে কি সুন্দর মা মা গন্ধ । তুই আমার থেকে বিস্কুট নে ।”সৌরভ তাই করল । সৌরভের গুড ডে বিস্কুট খুব ভালো লাগে । দুজনে দুজনের টিফিন ভাগাভাগি করে খেল । ঋক বলে , “ সৌরভ আন্টিকে বলিস না একটু বেশি করে টিফিন পাঠাতে । তোর টিফিনটা খেতে আমার খুব ভালো লাগে রে।” সৌরভ বাড়ী গিয়ে মাকে বলে , “ মা কাল থেকে একটু বেশি করে টিফিন দিয়ো । ঋকের জন্য নিয়ে যাব । ” প্রমিলা বললে, “ রোজ কি বেশি করে দেওয়া সম্ভব বাবা । আমাদের তো অত পয়সা নেই যে রোজ ভালো ভালো টিফিন করে পাঠাবো । এরকম আলু ভাজা মুড়ি কি কাউকে পাঠানো যায় । ”
— খুব যায় মা । ও তো বলে তোমার দেওয়া টিফিনে নাকি মা মা গন্ধ থাকে । মা মা গন্ধ কেমন মা ? ও পায় আমি তো পাই না ।
সৌরভের কথাটা প্রমিলার বুকে গিয়ে বাজল । ওর মনে হল ঋকের বাড়ীতে কি কোন সমস্যা আছে ? কি করে জানবে ? অন্য পরিবারের প্রতি অযথা কৌতূহল ভালো না ভেবে সে তার অর্ডারি সেলাইয়ের দিকে মন দেয় । সৌরভের বাবা দেবাশিষ বাবুর আসার সময় হয়ে গেল । প্রমিলা তার জন্য একটু রুটি আলুভাজা বানিয়ে রাখল । মনে মনে ভাবল আহা সারাদিন খাটাখাটনির পর এসে এই খাবার খাবে কি করে ! কিন্তু কিছু তো করার নেই সংসার চালানোর জন্য দুজনে রাত দিন পরিশ্রম করছে । খুব কষ্ট করে ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছে । রোজগার কম হলেও ওরা ভালো থাকার চেষ্টা করে । হাজার কষ্টেও প্রমিলা সৌরভকে কোন কষ্ট পেতে দেয় না। রাত জেগে সেলাই করে পরেরদিন ডেলিভারি দিয়ে যা পয়সা পায় সংসারের কাজে লাগায় । কোন কোন দিন দেবাশিষবাবুও প্রমিলাকে সাহায্য করে ।
এ দিকে ঋক স্কুল থেকে বাড়ী ফিরে আসে । মা ফোনে কথা বলছে দেখে সে ঘরে গিয়ে ড্রেস ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে এসে বসে , “ মা খুব ক্ষিদে পেয়েছে একটু কিছু খেতে দাও না ।” ফোন করতে করতেই মহুয়া বলে, “ রান্না ঘরে দেখ দুধ বিস্কুট আছে খেয়ে নাও ।” দুধ বিস্কুট খেতে খেতে ঋক টিভিতে টম অ্যান্ড জেরি দেখতে থাকে । এরপর সন্ধ্যে বেলায় যখন সে পড়তে বসে ওর মনে পড়ে আজকে সারাদিন ওর সঙ্গে কি কি হয়েছে । তাই তাড়াতাড়ি ও হোম ওয়ার্কটা নিয়ে বসে । যদি কাল সকালেও মিস না আসে । মহুয়াকে সে বলে , “মা আমায় একটু হোম ওয়ার্ক করিয়ে দাও না । আজ স্কুলে টিচার খুব বকেছে ।”
— মিসের কাছে কেন করে নাও নি ? আমি পারব না । আমি এখন ব্যাস্ত ।
— মা মিস তো আজকে আসেই নি ।কাল ও যদি না আসে ?
— তাহলে নিজে করবে । (বলে সে ফোন নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে গেল )
— জান মা আজ আমি স্কুলে চশমা ছেড়ে চলে গেছি । কোন বোর্ড ওয়ার্ক করতে পারিনি ।
মহুয়া কোন উত্তর করে না । জানতেও চায় না তাহলে সারা দিন ও স্কুল করল কি ভাবে ? কাউকে ফোন করে ক্লাস ওয়ার্ক জেনে নেওয়ার কোন তাগিদ ও বোধ করে না । ঋক কিন্তু আট বছর বয়সেই বেশ স্বাবলম্বী । সৌরভের দুটো খাতা সে চেয়ে এনেছে । ভেবেছিল বাড়ীতে এসে বাঁকিটা ফোন করে শুনে নেবে কিন্তু ফোনে তো মা কথা বলছে চাইলেই বকবে । এদিকে ওর খুব ক্ষিদেও পেয়েছে । আস্তে আস্তে মার কাছে গিয়ে বলল, “ মা খুব ক্ষিদে পেয়েছে আমায় একটু খেতে দেবে ?” মহুয়া সুভাষবাবুকে ফোন করে রাতের খাবার আনার জন্য । সুভাষবাবুর খুব রাগ হয় । বললেন, “ আজ কোন ক্লাইন্ড আসে নি পকেটে যা ছিল তা প্রায় শেষ । দুপুরে হোটেলে মাছ ভাত খেয়েছি । তুমি তো রোজ দুপুরে বাপের বাড়ী চলে যাচ্ছ । রাতে অন্তন্ত একটু রান্না করো । ফেসবুক না হয় পরে করো । ছেলেটা অনেকদিন থেকে রঙ পেনসিল আনতে বলছে , রোজ স্কুলে বকুনি খাচ্ছে । আজ ভেবেছিলাম ওর রঙ পেনসিলটা কিনব । ” “ সেটা তোমার সমস্যা ” বলে মহুয়া ফোনটা কেটে দিল ।
সুভাষবাবু বাধ্য হয়ে হোটেলে গেলেন খাবার নিতে । অর্ডার দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন আজকাল শুনি মায়েরা নাকি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খুব ব্যাস্ত । কিন্তু মহুয়া তো সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এতো ব্যাস্ত যে ছেলেটির দিকে এতটুকু নজর দেয় না । ওর বাবা মাকে জানিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না । মহুয়া বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ওনারা ওর কোন দোষই দেখতে পান না । উল্টো অশান্তি আরো বাড়ে । সুভাষবাবু ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মহুয়াকে কিন্তু সব যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে ধিরে ধিরে । সুভাষবাবু খাবার নিয়ে ঢুকলেন । মহুয়া ওদের খেতে দিয়ে নিজেও খেয়ে নিল । ঋক খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল । মহুয়ার ফেসবুক করতে করতে রাত তিনটা বেজে গেল । মহুয়াও এবার ঘুমিয়ে পড়ল । আবার পরের দিনের লড়াইয়ের জন্য ঋক প্রস্তুত ।
ঋকের শৈশবটা কেমন যেন নিষ্ঠুর ভাবে কাটছে । বন্ধুদের কাছে তাদের মায়েদের যত্নের কথা তার কেমন গল্পের মত শোনায় । সে ভাবে কোনটা সত্যি তার জীবনটা নাকি বন্ধুদের গল্পটা । দুটোই যে সত্যি তা সে জানে না । সে জানে না স্কুলে যাবার সময় তার বন্ধুদের যে ওদের মা খাইয়ে দেয় সেটা যেমন সত্যি তেমন আবার তাদের পড়াশুনার জন্য তাদের মায়েরা চিন্তা করে তাদেরকে পড়ায় সেটাও সত্যি । কোনটাই গল্প নয় । তাও ও ভাবে ওরা হয়তো মিথ্যে কথা বলে । মা কি এতো বড় ছেলেদের কখনো খাইয়ে দেয় নাকি ?


বর্ণালি বসাক বোস

বর্ণালি বসাক বোস একজন পুরপুরি গৃহবধূ । রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাষ্টার ডিগ্রি করেছেন বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে । ছাত্রজীবন থেকেই লিখতে ভালোবাসেন । স্বামীর উতসাহে, ছেলের উদ্দীপনায় ও ভাগ্নির আব্দারে আবার লেখার জীবনে ফিরে আশা । সংসারের কাজের ফাঁকে গান আর লেখা তার সঙ্গী । সমাজের চারিপাশের বিভিন্ন রকম চরিত্র যেটা তার মনকে নাড়া দেয়, তাই নিয়েই তিনি লিখতে ভালোবাসেন । এসবের পাশাপাশি সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন । এতদিন স্বামীই ছিলেন তার লেখার একমাত্র পাঠক তারই অনুপ্রেরণায় আজ এই লেখা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রকাশিত । বাবা, মা এবং শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদকে ও ছোট বোনের ভালোবাসাকে জীবনের পাথেয় করে চলতে চান ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।