অন্ধকার

শুভাশিস চক্রবর্তী on

সাথী ঠিক বুঝতে পারল একটা হাত তার কোমড়ের কাছে ঘোড়াঘুরি করছে। ঠিক যেমন রমেনকে ছোবল মারার আগে সাপটা রমেনকে পেঁচিয়ে ধরেছিল। রমেন বুঝতে পেরেছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু সাথী বুঝতে পারছে। পিঠের শাড়িটাকে সামান্য সরিয়েও ফেলেছে হাতটা। এটা বাসের ভিড়ে অসুবিধার কারণে নয়, বরং ভিড়ের সুবিধা নিয়েছে হাতটি। যেমম সুবিধা নিয়েছিল অনুপ ঘোষ, একলা খাঁ খাঁ বাড়িটাতে জি.আর দিতে এসে। পিঠের ব্লাউজের ভিতর দিয়ে ব্রায়ের স্ট্রিপের কাছে মাঝে মাঝে পৌঁছে যাচ্ছে হাতটা। সাথী ঠোঁট চিপে ধরছে দাঁত দিয়ে। এরকম কেন হচ্ছে? অনুপ ঘোষ যখন রাতের বেলা করে তার কাছে আসে, অন্ধকারে কতটা উপভোগ করতে পারে সাথী তা ওই সময়টুকুই জানে। সে চাইলেই পিছন ঘুরে মানুষটাকে দেখতে পাবে, কিন্তু পেছন ঘুরছে না। যেমনটা অনুপ ঘোষের ক্ষেত্রেও করে। পেছন ঘুরে তাকায় না কখনো। বোঝা যাচ্ছে মানুষটি ভিড় ঠেলে এখন যথেষ্ট কাছে চলে এসেছে। হাতে বেশ আবেদন রয়েছে, এই ভিড়েও অনুভূতি দেবার চেষ্টা করছে। বাসের মধ্যেই ব্রায়ের স্ট্রিপ খুলে দেবে নাকি? সাথী মনে প্রাণে চাইছে বাস যেন এই মুহূর্তে কোথাও না দাঁড়ায়। সাথীর এটা ভাল লাগছে এবং সেটা সবকিছুর উর্দ্ধে। এটা সে বুঝেছে। ইদানিং সে বেশিক্ষণ থেমে থাকতে পারে না। অনুপ ঘোষ বলে, শালা এই লাইনে কেউ বেশিদিন নিজের ইচ্ছায় নিজেকে তুলতে পারে না। দুচারটে কাস্টমার হ্যান্ডেল করতে না করতেই সব খটখটে জমি হয়ে যায়। যা পড়ে থাকে তা হল ওই ছিবড়া।আর তুই কোথাকার মেয়ে এসেছিস বলত? দিন দিন শালা আনারস হয়ে উঠছিস।

সাথীর অন্ধকার পছন্দ। অন্ধকারে সামনের জনকে যেমন খুশি মনে করে নেওয়া যায়। আবার চোখের জলটাকেও লুকিয়ে ফেলা যায়। এখন কাস্টমারকে শুরুতেই সে বলে দেয়, শোনেন, সব করে দিব। কিন্তু বেশি মজা নিতে গেলে বেশি টাকা না, ঘর অন্ধকার দরকার। অন্ধকার ছাড়া আমার ওঠে না।

চার বছর আগে শহরতলির ভয়াবহ বন্যায় বাড়িঘর ভেসে গেল। অনুপ ঘোষ ওর ব্যবসায় নামাতে চাইত সাথীকে। সাথীর প্রতি নজর ছিল প্রথম থেকেই। এম.এল.এ মামার দয়ায় ঘটি বাটি গুছিয়ে নেওয়া অনুপ ঘোষ শহরতলির ভেসে যাওয়া মানুষের তালিকায় জোর করে রমেনের নাম ঢোকালো। সাথী সব জানে। সাপের কামড়ে মৃত স্বামী রাতের বেলায় যখন ভেসে গেল, সাথী সাঁতরে গোটা পাড়া ঘুরল এক বছরের ফুলকিকে নিয়ে। চিৎকার করে ডাকল সাহায্যের জন্য। কেউ উত্তর করল না। সাথীর বোধহয় দুঃখ কষ্টও একটু কম। সময় লাগল না। এই অনুপ ঘোষই যেত জি.আর নিয়ে শ্মশানের মত বাড়িটায়। মেডিক্যাল ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে একদিন সাথীকে ধরল অন্ধকারে। প্রাইমারী স্কুলের বাথরুমের মধ্যে ঢুকিয়ে চেপে ধরেছিল সাথীর মুখ। বলেছিল, এর পরেও যদি না করিস, মেয়েটাক কি মেরে ফেলাবি? ফুলকি কোলের মধ্যে থেকেই চিলচিৎকার দিয়ে উঠল। বাইরে প্রচুর লোক। ফুলকির মুখ সেদিন চেপে ধরেছিল সাথী। টিউবওয়েলটা ধরে পা ফাঁক করে ফুলকিকে কোলে নিয়ে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়ালো। অনুপ বিশ্রী রকম হেসে বলল, এইত শালি তৈরি। সব কায়দা শিখে গেছিস। চোখের জল চোখেই রয়ে গেছিল সাথীর।

হাতটি ব্রায়ের স্ট্রিপ খুলে ফেলেছে সাথীর বুকের ভেতরটা হটাৎ ছ্যাৎ করে উঠল। রমেনও ব্রায়ের ফিতা এক হাতে খুলে দিতে পারত। বলত, কোনটা কোন রঙ, কোনটা কোন ডিজাইনে খোলে লাগে সব আমার মুখস্থ। ফুলকিকে একদিন রাতে সাথীর কোল থেকে নিয়ে পাশের ঘরে রেখে আসতে আসতে অনুপ ঘোষ বলেছিল, যে লোক না দেখে এক হাতে ব্রায়ের ফিতা খুলতে পারে মনে রাখবি সেই লোক তোকে অনেক জানে, তার সাথে সম্পর্কটা আলাদাই হয়ে যায়, এই যেমন আমি।

হাতটা ব্লাউজের বাইরে চলে এল। সাথী কিছু একটা ভাবতে যাওয়ার আগেই একটা কন্ঠ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, মরিনি, এটাতে হাত দাও। সাথীর বুকটা কেঁপে উঠল। হাত দিয়ে স্পর্শ করল একটা ধারালো কোনো অস্ত্রকে। কন্ঠটা বলল, কোনো চিন্তা নেই। আজ রাতেই ফয়শালা হবে অনুপ ঘোষের।

সাথীর ঘর অন্ধকার। ফুলকি পাশের ঘরে নিজের মত খেলছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে উপস্থিত হবে অনুপ ঘোষ। রমেন অস্ত্রটা নিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। অপেক্ষার প্রহর কাটতেই চায় না এটাই নিয়ম। যেমন ছিল সাথীর অপেক্ষা। অন্ধকারে তার চোখে জল এসেছে। সাথীর অন্ধকার ভাল লাগে। কিন্তু আজকের অন্ধকার তার মধ্যে ভাল খারাপের সীমারেখার মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে।



শুভাশিস চক্রবর্তী

জন্ম আশির দশকের গোড়ার দিকে। জন্ম দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কাঁজিয়ালসী গ্রামে হলেও স্থায়ী বসবাস বালুরঘাটে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক। পেশায় ও নেশায় চিত্রশিল্পী, কর্মসূত্রে দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও মাটির টানে আবার আত্রেয়ীর পাড়ে। মূলত ছোটগল্প লেখায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নাটকের দলের সাথেও জড়িত। দধীচি, আয়নানগর, আত্রেয়ীর পাড়া সহ কিছু পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।