আত্রেয়ীর আলেয়া

গগন ঘোষ on

atreyeer_aleya

জয়ন্তদাকে ফোনটা করতেই হল।

দু’বার রিং হতেই ধরলেন। সব বুঝিয়ে বলাতে আসতে রাজি হলেন। হৈমন্তী বউদিও আসবেন বললেন।

         বাইরে তখন পঞ্চাশ-ষাট জনের ভিড়। সবাই চাপা গলায় কথা বললেও মাঝে মাঝে দু-একটা গলা উচ্চগ্রামে তাদের ভয়,উত্তেজনাকে জানান দিচ্ছিল। বাইরে আত্রেয়ীর হাওয়া তাদের গুনগুনকে ভাসিয়ে দিয়ে কিছুটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। ব্যাপারটা বেশ কয়েকদিন ধরে আমারও নজরে এসেছে। চোখের ভুল মনে করে অতটা পাত্তা দিইনি। আজ জেলেপাড়ার সবাই ছুটে আসায় বুঝতে পারলাম সবটা আমার চোখের ভুল ছিলনা। সীমাও দেখেছে গতকাল। রাতের খাবার পর ছাদে পায়চারী করা আমার বরাবরের অভ্যেস। ছাদ থেকে আত্রেয়ী নদীর সুন্দর একটা বাঁক দেখা যায়। পূর্ণিমা রাতে সে দৃশ্য অসাধারন। কতরাত আত্রেয়ীর রুপে মুগ্ধ হয়ে মাঝরাত পর্যন্ত ছাদে কাটিয়েছি!অন্ধকার রাতে সেই আত্রেয়ীকে রহস্যময় মনে হয়। যেন মনে হয় একটা বিরাট সরীসৃপ এঁকেবেঁকে অন্ধকার পাহাড়ি গুহায় ঢুকে গেছে। ভরা বর্ষায় আত্রেয়ীর সব গিলে নেওয়া ভয়ঙ্কর রুপের সামনে মাথা নত হয়ে যায় এমনি থেকেই। আত্রেয়ীর হাওয়ায় আমি আমার মায়ের গন্ধ পাই। কবিতা লেখার মত বিরল ক্ষমতার অধিকারী হলে আমার কবি হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। সীমাকেও  বিয়ের পর এবাড়িতে এসে আত্রেয়ীতে পেয়েছে। রাতে ও আমার সঙ্গে আত্রেয়ী দেখে। তারপর ঘুম পেলে আমাকে না ডেকে নিচে ঘুমতে যায়। আমি কাঠের চেয়ারটায় বসে আত্রেয়ী দেখি। আত্রেয়ীর পাড়ে জেলেপাড়া,চকভৃগু ব্রিজ। এই আত্রেয়ী চলে গেছে ডাঙ্গি বর্ডার হয়ে বাংলাদেশ।

        দিন কয়েক আগে আমি রাতে ছাদে বসেছিলাম। সামনে অমাবস্যার আত্রেয়ী। হঠাৎ দেখলাম একটা আগুনের গোলা আত্রেয়ীর ওপর দিয়ে ছুটে গেল। বেশ অবাক হয়েছিলাম। ডিঙ্গি নৌকার আলো এত জোরে ছুটবে কেন!আর এত রাতে!তাছারা সে আলো হলুদ হয়। এ আলো অনেকটা সবুজাভ নীল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলাম। আর দেখতে পাইনি। মনের ভুল মনে হয়েছিল। আরও একদিন যেন দেখতে পেলাম। সীমাও যে দেখেছে তা ও আমাকে আগে বলেনি। জেলেপাড়ার ওরা আসার পর বলল যে কাল ও সেরকম একটা আলো দেখেছে। জেলেপাড়ার সবার মুখে অনেকটা একই কথা শুনলাম। তবে ওদের ছুটে আসার কারণ শুধু রহস্যময় আলো নয়। গত সাত-আটদিন ধরে নাকি নদীতে কোন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। না ট্যাংরা,পাবদা। না রাইখর। কোন মাছ কারও জালে উঠছে না। এভাবে চললে তো না খেতে পেয়ে সবাই মারা যাবে। “একটা কিছু করেন মাস্টারবাবু”-জেলেপাড়ার সবাই আমার কাছে এসেছে। আত্রেয়ীর টাটকা মাছের লোভে আমার জেলে পাড়ায় যাতায়াত। তাছাড়া ওখানকার কিছু ছেলেমেয়েকে বিনেপয়সায় পড়াই বলে সবাই আমাকে খুব ভালবাসে,শ্রদ্ধা করে। কোন বিপদে পড়লে আমার কাছে ছুটে আসে। আমিও যতটা পারি তাদেরকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এবারের সমস্যার সমাধান করা আমার বুদ্ধির বাইরে।

           ওদের কথা শুনে প্রথমেই জয়ন্তদার কথা মনে আসে। বিশিষ্ট সাংবাদিক,একটি বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকার সহ-সম্পাদক। তবে ওনার আর একটি পরিচয় হল,উনি একজন শখের গোয়েন্দা। বলতে পারেন ফেলুদা,ব্যোমকেশের পর আমার সবচেয়ে প্রিয় গোয়েন্দা উনিই। মাঝে মাঝে ওনার প্রখর বিশ্লেষণী ক্ষমতায় মুগ্ধ হই। আমার নিজের দাদা নন। পিসতুতো দাদার বন্ধু। দাদা বিদেশ চলে যাবার পরও জয়ন্তদার সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। কলকাতায় গেলে একবার ওনার ওখানে দেখা করে আসি। বউদির হাতের ফিসফ্রাই অসাধরন। তবে গোয়েন্দাগিরিতেও বউদি কম যাননা। জয়ন্তদার সুযোগ্য সহকারিণী,অনেকটা ফেলুদার তোপসের মত। তবে আমাকে জটায়ু ভাববেন না। লেখার খমতা আমার নেই। থাকলে হয়ত লিখে ফেলতাম “আত্রেয়ীর আলেয়া”। তবে জয়ন্তদা বললেন হাতে অনেক কাজ। দু’দিনের বেশি থাকতে পারবেননা। যা করার দু’দিনেই করবেন।

          বেলা এগারোটার সময় আপ গৌড় এক্সপ্রেস বালুরঘাট স্টেশনে এসে পৌছায়। সদ্য এসি কামরা চালু হয়েছে,তাও শুধুমাত্র থ্রি-টায়ার। জয়ন্তদা তারই একটা কামরা থেকে নামলেন। আমি আজ ছুটি নিয়েছি জয়ন্তদাকে স্টেশনে রিসিভ করবো বলে। স্টেশনের চারিদিকে অসাধারন নৈসর্গিক দৃশ্য। রেলের জমিতে প্রচুর আমগাছ,পুকুর। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লাগানো শিশু,ইউক্যালিপটাস,অর্জুন গাছের সারি। জয়ন্তদার সঙ্গে শুধুমাত্র একটা ছোট ট্রলিব্যাগ,আর কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা। বউদির কাছে একটা হ্যান্ডব্যাগ আর বিগসপার। একটা টোটো বলা ছিল আগে থেকেই। জয়ন্তদা ট্রলিটা নিতে দিলেননা। অসম্ভব আত্মসম্মানী মানুষ,নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করেন। আমি স্বভাবটা জানি বলে আর জোর করলামনা। টোটো করে দশমিনিটে সোজা বাড়ি। সীমা বোধহয় দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। কলিংবেল টেপার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে দিল। মেয়েদের মধ্যে বন্ধুত্ব বোধহয় তাড়াতাড়ি হয়। দেখলাম বউদিকে প্রথম দেখাতেই সীমা প্রায় জড়িয়ে ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। আমি আর জয়ন্তদা লিভিংরুমেই বসলাম। তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে একসঙ্গে সবাই লাঞ্চ করবো। ওদেরও একটু বিশ্রাম দরকার। লম্বা ট্রেন জার্নি। সীমা কাল রাত থেকে রান্নার প্রস্তুতি নিয়েছে। বউদির ফিসফ্রাইকে টেক্কা দিতে চায় বোধহয়।

         সন্ধ্যের চায়ের ব্যবস্থাটা ছাদেই করা হয়েছিল। কোন তাড়া নেই। যতক্ষণ খুশি বসা যাবে। সামনে আত্রেয়ীর জলে ডুবন্ত সূর্যের লাল রঙ ধরেছে। সব শোনার পর হৈমন্তীবউদিই প্রথম কথা বললেন-“অ্যালগ্যাল ব্লুম নয় তো ?অনেকক্ষেত্রে রাত্রিবেলা এরা আলো বিকিরন করে। তাছাড়া কোন সামুদ্রিক প্রাণী বা ইলমাছ জাতীয় কিছু হতে পারে। ”

-না না,তাহলে জলের একজায়গায় দেখা যেত। সেখানে স্টে করত। অ্যালগ্যাল ব্লুম নদীর স্রোতে কী করে হবে?আর আলো বিকিরণকারী মাছ গভীর সমুদ্রের হয়। এই আত্রেয়ী নদীতে এসব মাছ কোথায় থেকে আসবে? তাছাড়া নদীর মাছগুলোর কী হল?অন্য ব্যাপার হৈম। ,জয়ন্তদা বললেন। যদি একবার দেখতে পেতাম!

“এখন তো প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। একটু বেশি রাতে ছাদে উঠলেই দেখা যায়”। ,সীমা বলল।

-উঁহু,এভাবে দেখলে হবে না। নদীর ধারে গিয়ে দেখতে হবে। আজ রাতেই যাব।

আমি,জয়ন্তদা আর বউদি ছাদে আড্ডা দিতে থাকি। সীমা রাতের রান্নার জন্যে নিচে যায়। কিছুক্ষণ পর বউদিও নিচে যায় সীমাকে সাহায্য করার জন্যে। রাতের রান্না অসাধারন হয়েছিল।

           রাতে খাবার পর সীমা আর বউদি শুতে চলে যায়। রান্নার প্রশংসার ভাগ কিছুটা বউদিকেও দিয়েছি বলে আমার ওপর কিছুটা রাগ করেছে বোধহয়। যাক গে,কাল সকালেই সব ভুলে যাবে। আমি আর জয়ন্তদা এখন শোব না। রাত একটু বাড়লে আত্রেয়ীর পাড়ে যাব। দুজনের সঙ্গেই একটা করে জোরাল টর্চ।

          জেলেপাড়ার ধার ঘেঁসেই নদীর চরা শুরু হয়েছে। শুধু বালি। তারপর আত্রেয়ীর ধারা। খুব স্বচ্ছ জল। বালুরঘাট বাদে আর কোন বড় শহর আত্রেয়ীর গতিপথে নেই বলে জলে দূষণ অনেক কম।

-একটা লুকোনোর জায়গা খুঁজতে হবে। ,জয়ন্তদা বললেন।

বালির চরাতে কোন গাছ নেই। শুধু তরমুজের খেত আছে বেশ কয়েকটা। আমি বললাম-“খেতের মধ্যে লুকোনো যায়না জয়ন্তদা?দুটো সারির মধ্যে দিব্যি শুয়ে থাকা যায়”। কথাটা বোধহয় মনে ধরেছে জয়ন্তদার। দেখলাম তরমুজের খেতের দিকে হাঁটছেন। আমিও পিছু নিলাম। খেতের পাশে খড়ের ঘর আছে একটা। পাহারা দেবার জন্যে। পাহারাদার হেঁকে উঠল-“কে উদিক”। তারপর একটা টর্চের আলো মুখে এসে পড়ল। “ও মাস্টারবাবু,আপনি!অ্যাত রাতে!”

-পড়ে তোমাকে বুঝিয়ে বলব। ,আমি বলি। জয়ন্তদা তখন খেতে ঢুকে পড়েছেন। আমিও পেছন পেছন ঢুকে পড়ি। জয়ন্তদা নির্দ্বিধায় বালির মধ্যে শুয়ে পড়েন,দেখাদেখি আমিও। তরমুজগাছের ফাঁক দিয়ে চমৎকার আত্রেয়ী দেখা যাচ্ছে। নিস্পাপ আত্রেয়ী। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর সেই মুহূর্ত আসে। একটা আলোর গোলা ছুটে যায় আত্রেয়ী বরাবর ডাঙ্গি বর্ডারের দিকে। নীল সবুজ আলো। মুহূর্তে জয়ন্তদার টর্চ জ্বলে ওঠে। দেখাদেখি আমিও টর্চ জ্বালাই। আলো দ্রুতবেগে দূরে গিয়ে মিলিয়ে যায়। আমি কিছু দেখতে পাই না। জয়ন্তদা জিজ্ঞেস করলে বলে-“গভীর ষড়যন্ত্র,চোরেরাও আজকাল বিজ্ঞানী হয়ে উঠছে। চলো,বাড়ি যাওয়া যাক”। বাড়ি ফেরার পথে আর কোন কথা বলে না জয়ন্তদা। গোয়েন্দাগল্প পড়ে আমিও জেনেছি,এসময় বেশি প্রশ্ন করতে নেই। এসময়টা তাদের নিজেদের ভাববার সময়। এও জানি জয়ন্তদা আজ আর ঘুমবেননা।

           সকালে ঘুম থেকে উঠতে আমার একটু বেলা হয়ে গেল। দেখি জয়ন্তদা লিভিংরুমে বসে আছেন। আমাকে দেখতেই বললেন-“তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও। একটু বেরতে হবে। লোকাল থানাতেও একটু যেতে হবে। জয়ন্তদার মুখে রাতজাগার ছাপ স্পষ্ট। চা খেয়েই আমরা বেরিয়ে গেলাম। প্রথমে জেলেপাড়া। জয়ন্তদা সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেন। তারপর একজনের মোবাইল নম্বর নিলেন। এখন সবার কাছেই মোবাইল থাকে। এরপর থানায় গেলাম আমরা। থানার ওসি বিশ্বজিৎবাবু আমাকে চেনেন। জয়ন্তদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। জয়ন্তদার পত্রিকা বিশ্বজিৎবাবুও পড়েন তখনি জানলাম। এমনকি টেবিলে এমাসের সংখ্যাটাও দেখলাম। খুব খুশি হলেন জয়ন্তদার সঙ্গে আলাপ করে। জয়ন্তদা সব খুলে বললেন বিশ্বজিৎবাবুকে। তিনি কেন এসেছেন তাও বললেন। বিশ্বজিৎবাবু বললেন যে তিনি জয়ন্তদাকে সবরকম ভাবে সাহায্য করবেন,তবে তা আনঅফিসিয়ালি। কোন অভিযোগ না জমা পড়লে তিনি কিছু করতে পারবেন না।

-আপনি ভালো বন্দুক ছুঁড়তে পারেন?,জয়ন্তদা প্রশ্ন করেন।

-পুলিশ যখন,নিশ্চয়ই পারি। আমাদের ব্যাচে শুটিং টপার ছিলাম মশাই।

-না,আসলে আমিও একটু-আধটু পারি। কিন্তু আমার রাইফেলটা কলকাতায় থেকে গেছে। কে জানত এখানে বুদ্ধির সঙ্গে অস্ত্রও ব্যবহার করতে হবে। তবে মানুষ মারার কোন ব্যাপার নেই বিশ্বজিৎবাবু। মেঘনাদের তীরটাকে শুধু ঘায়েল করতে হবে। মেঘনাদকে ধরা আন্তর্জাতিক অনুমতি সাপেক্ষ।

-দেখুন সার্ভিস রিভাল্ভার তো ব্যবহার করতে পারব না। তবে আমার একটা লাইসেন্সড্ রাইফেল আছে। আমার বাবার আমলের। এখনও রিনিউ করানো হয়। বেশ ভালো কন্ডিশনে আছে। চলবে।

-অবশ্যই চলবে। তাহলে আজ রাতে চলে আসুন। শার্প বারোটায়।

            “আজ আবার!”-আমি বলি। খেতে বসতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। প্রায় সাড়ে-তিনটে বাজে। সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছি। জয়ন্তদা বললেন খাবার পর একটু ঘুমবেন। আমাকেও ঘুমতে হবে। রাতে আবার মেঘনাদের তীর ……।

            রাত বারোটার অনেক আগেই বিশ্বজিৎবাবু এসে হাজির। আমরা তখন লিভিংরুমে বসে। সীমা আর বউদিও ঘুমোয়নি। বিশ্বজিৎবাবু তাঁর রাইফেলটা নিয়ে এসেছেন। বাক্সটা বাড়িতে রেখে খোলা রাইফেল নিয়ে আমরা রওনা হলাম। সীমা খুব ভয় পেয়েছিল। “গোলাগুলির ব্যাপার”। জয়ন্তদা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বললেন-“কোন ভয় নেই। ধরো,আমরা পাখি শিকার করতে যাচ্ছি। নেহাত গুলতিতেও কাজ চলে যেত। কিন্তু রাইফেল আছে যখন”।

            সেই আবার তরমুজের খেতে আমরা তিনজন শুয়ে পড়লাম। আমার আর জয়ন্তদার মাঝে বিশ্বজিৎবাবু। জয়ন্তদা বললেন তিনি বললেই যেন আলো লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। আজ আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। মিনিট পনেরো বাদেই একটা আলো ছুটে আসে আত্রেয়ীর জল প্রায় ছুঁয়ে। আমাদের রেঞ্জের মধ্যে আসতেই জয়ন্তদার নির্দেশ-ফায়ার। মুহূর্তে বিশ্বজিৎবাবু ট্রিগার টেনে দেন। জলের মধ্যে ঝুপ করে শব্দ হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জল জাল ফেলার শব্দ। একজন জেলে জালে করে তুলে আনে “মেঘনাদের তীর”। তখনও সবুজ-নীল আলোটা জ্বলছিল। জয়ন্তদা জিনিসটা হাতে নেন। “যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই”।

             বাড়ি ফিরে দেখি সীমা আর বউদি তখনও জেগে। বউদিই বললেন-“তোমাদের পাখি শিকার হল?”

-হ্যাঁ। যা ভেবেছিলে। ,জয়ন্তদা বললেন।

তার মানে!“বউদি কি জানতেন সবকিছু’-আমি বলি।

-হ্যাঁ। বলতে গেলে বেশিরভাগ ক্রেডিট কিন্তু হৈমর পাওনা। আলোর ব্যাপারটা আমি ধরতে পেরেছিলাম কাল রাতেই। কিন্তু মাছ অন্তর্ধানের ব্যাপারে কিছু বুঝতে পারিনি। কাল বাড়ি ফেরার পর লিভিংরুমেই বসেছিলাম। তোমরা ঘুমিয়ে পড়ার পর হৈম আসে। ওকে বলি আমার সন্দেহর কথা। তারপর হৈম মোবাইলে ইন্টারনেট থেকে খুঁজে বের করে এর কারণ। এক বিশাল চক্রান্ত আছে এর পেছনে।

-আমি তো কিছু বুঝতে পারছিনা জয়ন্তদা। একটু বুঝিয়ে বললে ভাল হত।

-আচ্ছা বেশ। তাহলে প্রথম থেকেই বলছি। কাল রাতে তোমার সঙ্গে গিয়ে টর্চের আলোতে আমি পাখা দেখতে পেয়েছি। ঘুরন্ত পাখা। তাও চার চারটে। তখনি বুঝতে পারি তোমার আত্রেয়ীর আগুনের গোলা হল একটা ড্রোন। ছোট চার পাখাওয়ালা হেলিকপ্টারও বলতে পারো। নিচে আলো লাগানো,সবুজাভ-নীল। এই দেখ।

এবার জিনিসটাকে ভালো করে দেখলাম। চৌকো,চারটে গোল খোপওয়ালা যন্ত্র। প্রতিটাতে একটাকরে পাখা। একটা ভাঙ্গা। বোধহয় গুলির আঘাতে ভেঙ্গেছে। আর আলো বেরোচ্ছে না।

-ড্রোনের ব্যাপারটা আমি হৈমকে বলি। কিন্তু মাছের ব্যাপারটা তখনও বুঝতে পারিনি। হৈম ইন্টারনেট ঘেঁটে জানায় যে তাইওয়ানে এই ধরনের মাছ ধরা চালু আছে। একে “সালফিউরিক ফায়ার ফিশিং”বলে। এতে অ্যাসিটিলিন গ্যাস পুড়িয়ে তার সবুজাভ-নীল আলোয় মাছদের আকৃষ্ট করা হয়। এখানে ড্রোনের নিচে একই কম্পাঙ্কের আলো জ্বালিয়ে মাছদের টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সীমান্তের ওপারে,বাংলাদেশে।

-তা তো বুঝতে পারলাম। কিন্তু দুটো প্রশ্ন আছে জয়ন্তদা। দ্বিতীয় দিনেও আমরা তরমুজ খেতে লুকোলাম কেন?ওরা সীমান্তের ওপার থেকে কিভাবে আমাদের দেখবে?আর জেলেরা ওখানে কীকরে এল?

-ছোট্ট করে উত্তর দিচ্ছি। ড্রোনে ক্যামেরা থাকে। আর আজ সকালে নেওয়া ওদের একজনের মোবাইলে ফোন করে ওদের জাল নিয়ে থাকতে বলি। ওরা পাশের তরমুজের খেতে লুকিয়ে ছিল।

জয়ন্তদা এবার বিশ্বজিৎবাবুকে বলেন-“দেখুন,অফিসিয়ালি আর কিছু করতে পারেন কিনা। ব্যাপারটা তো আন্তর্জাতিক। তবে যতদিন না ব্যবস্থা হচ্ছে,আপনার রাইফেল তো আছেই। না হয় কিছু যান্ত্রিক পাখি শিকার করলেন। কালই কলকাতায় ফিরছি। প্রথম শিকারের নিদর্শন হিসেবে ড্রোনটা আপনিই রাখুন”।

বাড়ির সামনে টোটো এসেছে।  এবারও জয়ন্তদা নিজেই ট্রলিটা তুললেন। বেরোবার মুখে সীমা বলল-“আর একটা দিন থেকে গেলে হত দিদি। আমাদের এখানের ফিসফ্রাইও দারুন।  মানে আত্রেয়ীর ভাজা রাইখর”।



গগন ঘোষ

পেশা শিক্ষকতা।পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, পরবর্তীতে জার্নালিজম ও মাস কমিউনিকেশন নিয়ে পড়াশুনো। প্রথম কর্মজীবন শুরু হয় ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামস্-এর বি.আই.টি.এম- এ,তারপর ঢেঙ্কানল সায়েন্স সেন্টার,ওড়িশা ।কিন্তু ভাষা ও মাটির টানে সব ছেড়ে বালুরঘাটে চলে আসেন। সেখানে কিছুদিন শ্রমদপ্তরে কর্মরত ছিলেন, তারপর শিক্ষকতায় আসেন।এরপর কৃষি দপ্তরে চাকরি পেলেও যাননি।প্রথমে কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু হলেও এখন মূলত গল্প লেখেন। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার পাশাপাশি কিছু দৈনিক সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়ে চলেছে তাঁর গল্প। সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাঁর কলমের গতি অবাধ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।