আমরা দেখব না স্বপ্ন? (দ্বিতীয় পর্ব)

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় on

amra_dekhbona_swapno_2

চিৎ হয়ে শুয়ে আছে খুঁড়ো, বেঞ্চের ওপর টানটান করে পা ছড়িয়ে। আজ একটু হাওয়া দিচ্ছে, মশাও কম। কুকুরগুলো গোলমাল করছে না। একটা হালকা ঝিমুনির তুলতুলে গদিতে ডুবে যাচ্ছে মাথাটা। এমন নিশ্চিন্ত ঘুম অনেকদিন আসেনি খুঁড়োর। কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ, কোন ফুল নাম মনে পড়ছে না। আরো মাথা ভারী হয়ে আসছে। হঠাৎ সেই বুড়োটা ঝপ করে কোথা থেকে সামনে এসে পড়ল। আর একদম মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে মিটিমিটি হাসতে লাগল। সেই বুড়োটা, যে ভাসতে ভাসতে এ-বাড়ি ও-বাড়ি করছিল। খুঁড়োকে আবার বোবায় ধরেছে! কিছুতেই উঠতে পারল না বেঞ্চ থেকে। বুড়োটা মুখের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। চোখের তারা ঘোলাটে, মাথার সামনের দিকে টাক, মোটা থ্যাবড়া নাক, গালে আর কপালে ফুটো ফুটো বসন্তের দাগ। থুতু–ভেজা জিভটা বার করে খুঁড়োর কপালে ঠেকাচ্ছে। চেটে চেটে মুছে দিচ্ছে খুঁড়োকে। পায়ের পাতা… হাতের চেটো… হাঁটু… থাই… কোমর… সব এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে!

পুলিশের ভ্যান যাওয়ার শব্দে চমকে উঠে পড়ল খুঁড়ো। ঘামে ভিজে গেছে সারা শরীর। কুকুরগুলো ডাকছে হুটারের আওয়াজ শুনে। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ-টহল চলছে। হুটার বাজিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়িগুলো আধঘন্টা অন্তর। কুকুরগুলোকে চারপাশে দেখলে মনে বল পাওয়া যায়। সাদা-কালোটা অবাক হয়ে খুঁড়োকে দেখছে। খুঁড়ো লাফিয়ে নেমে পড়েছে বেঞ্চ থেকে। হাঁফাচ্ছে, জলের বোতলটা খুঁজছে অস্থির হয়ে। পাচ্ছে না। চারদিকটা দেখে বুঝতে পারল, স্বপ্ন দেখছিল। বুড়োটা আশেপাশে কোথাও নেই। সেদিন বুড়োটার মুখ চিনতে পারেনি… কিন্তু স্বপ্নে বুড়োটাকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে খুঁড়ো। ওই মুখ খুঁড়ো এর আগে দেখেছে… বুড়োটাকে দেখেছে খুঁড়ো এর আগে, বেশ কয়েকবার দেখেছে! 

     সে-রাতের পর থেকে সহজে ঘুম আসতে চায় না খুঁড়োর। দুচোখের পাতা এক করলেই মনে হয় – পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে! পা টিপে টিপে দোকানের পেছন থেকে কেউ এগিয়ে আসছে! এই বুঝি মুখ টিপে ধরল! অপেক্ষা করে ভোর-রাতের… ওই তিন ঘন্টাই যা ঘুম হয়। যতক্ষণ জেগে থাকে, ওই বুড়োর মুখটা মনে পড়ে… খুব চেনা। মুখটাকে কতবার দেখেছে মনে নেই… ঠিক কবে প্রথম দেখেছিল, তাও মনে নেই। তবে কিছু কিছু মুহূর্ত আর ঘটনা মনে পড়ে। কিছুটা স্পষ্ট, কিছুটা আবছা। যখনই খুঁড়ো কোনো অসুবিধের মধ্যে পড়েছে… তখনই বুড়োটাকে দেখেছে। কিন্তু, কোনো না কোনো ভাবে খুঁড়ো ঠিক সরে আসতে পেরেছে সেই সঙ্কট-পরিস্থিতি থেকে। 

সে বছর তুমুল বৃষ্টি। নদীর পার ভাঙল, গাঁয়ের পর গাঁ ভাসিয়ে দুদিনের মধ্যে বন্যার জল ধেয়ে এলো খুঁড়োদের এলাকায়। খুঁড়োর তখন বয়স ছ-সাত বছর। পায়ের অবস্থা দেখে বাড়ির লোক হাল ছেড়ে দিয়েছে… কিন্তু ফেলে দিতে পারছে না। ঐ বন্যার জল ভেঙেই মায়ের কোলে বোন, আর বাপের কাঁধে খুঁড়ো চেপে ইস্কুল–বাড়িতে গিয়ে উঠল। ঘরের মায়া কী জিনিস, খুঁড়ো বুঝতো না। জলে ভিজতে ভিজতে চলে যাচ্ছে। আশেপাশে কেউ হইহই করছে, কেউ কাঁদছে; গোরুগুলো ডাকছে। জলের ওপর দিয়ে সাপ চলে যাচ্ছে; কুকুরগুলো একগলা-জলে খাবি খাচ্ছে… এই দেখতে দেখতে ইস্কুল-বাড়ি চলে গেল… যতজন পারল। সেই ইস্কুল-বাড়িতেই প্রথম দেখেছিল বুড়োটাকে। সেই ঘোলাটে চোখ, সাদা দাড়ি, বড় থ্যাবড়া মত নাক, মুখ ভরা বসন্তের দাগ। লোকটা এক কোণে উবু হয়ে বসে থাকত, আর জুলজুল করে দেখত সবাইকে। মাঝে মাঝে খুঁড়ো দেখত – রাতে ঐ ক্লাসঘরের দরজার পাশে বসে বুড়ো দুলতে দুলতে হাতের আঙুল গুণছে, আর বিড়বিড় করে যাচ্ছে চারদিকে দেখতে দেখতে। হ্যারিকেনের আলোয় হলুদ দেওয়াল জুড়ে কাঁপত তার ছায়া। হাওয়ায় দিলে দুলে দুলে উঠত ছায়া-শরীর। 

ইস্কুল-বাড়িতে থাকার সময়েই অনেকের পেট-খারাপ হল, জ্বর হল। দু-তিন দিনের মধ্যেই চার জন মারা গেল। অনেককে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দেওয়া হল অন্য জায়গায়। কোথায়, খুঁড়ো জানতে পারেনি। লোকগুলো মরে যাওয়ার পর থেকে, বুড়োটাকেও আর দেখতে পায়নি খুঁড়ো। ভাবেওনি সেই নিয়ে। 

ইস্কুল বাড়ির বিপদ, জল নামার পরের বিপদ… তার পরের বিপদ… বুড়োর কথা ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু পরে যখন তাকে আবার দেখেছে… ঠিক চিনতে পেরেছে খুঁড়ো। মুখটা চেনা লেগেছে প্রতিবার… মানুষটাকেও। 

 সেই বার ট্রেনে করে শহরে আসছিল, বাপের সঙ্গে। তখন খুঁড়োর বয়স বছর দশেক হবে। বাপ নেশা করে মাকে রোজ রাতে মারে; মা বোনকে নিয়ে আর একজনের সঙ্গে পালিয়ে গেছে – এইসব কিছু বোঝার বুদ্ধি হয়ে গেছে। মা চলে যাওয়ার পর খুঁড়োকে বাপের সঙ্গেই থাকতে হত। বোনের পোলিও নেই, মা ওকে নিয়ে গেল। খুঁড়ো পড়ে থাকল বাপের কাছে। বাপ নেশা করত। খুঁড়ো ঘুমোত দেওয়ালের দিকে মুখ করে। খাবার চাওয়ার সাহস হত না। তারপর একদিন বাপকে কে কী বোঝাল, ঘরে তালা ঝুলিয়ে সোজা খুঁড়োর ঘাড় ধরে টাউনের স্টেশনে চলে এল। দূর-পাল্লার স্লীপারে উঠে শহরে আসছিল… টিকিট ছাড়া। খুঁড়োকে দেখলে কেউ ভাবে ভিক্ষে করতে উঠেছে, কেউ আবার বসার জায়গা দেয়। বাচ্চা ছেলে, তার ওপর ল্যাংড়া… আহা বসুক একটু। তবে নিজেরা একটু দূরে সরে যায়। ওর বাপ ইচ্ছে করেই এই চালাকিটা ধরত… সারা জীবন এই চালাকি দিয়েই চালিয়েছে। শুধু বউকে ধরে রাখতে পারেনি। সেদিনও খুঁড়ো স্লীপারে উঠে উবু হয়ে বসেছিল সিটে… দেখল একটু দূরে একটা বুড়ো একই ভাবে উবু হয়ে বসে খুঁড়োর দিকে তাকিয়ে আছে। ঘোলাটে চোখ, থ্যাবড়া নাক, মুখে বসন্তের দাগ… সাদা দাড়ি – সেই বুড়োটা! বিড়বিড় করা আর কর-গোণা দেখেই সেই বন্যার রাতে ইস্কুল-বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। বাবাকে দেখিয়েছিল… বাবা চিনতে পারেনি। পাত্তাই দেয়নি। বুড়োটা একই ভাবে উবু হয়ে বসে দুলে গেল ট্রেনের তালে তালে। একটা ফাঁকা-ফাঁকা স্টেশনে খুঁড়ো আর ওর বাপ নামল। কিছুটা এগিয়েও গেছিল, কিন্তু ট্রেন ছাড়তেই খুঁড়োর হাত ছাড়িয়ে ওর বাপ ছুটে গিয়ে চলন্ত ট্রেনের একটা কামড়ায় উঠে পড়ল। খুঁড়ো যেতে পারল না। বুড়োটাকে আবার দেখতে পেল। ট্রেনের জানলা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে একটা আমের আঁটি চুষে ছুঁড়ে দিল বুড়োটা। বাপ চলে গেল, ট্রেন চলে গেল, বুড়ো চলে গেল। খুঁড়োকে স্টেশনের সিঁড়িতে একা বসে থাকতে দেখে ঠক করে এক টাকার কয়েন ফেলে চলে গেল কেউ। 

     এরপরেও অনেকবার ওই বুড়োটাকে দেখেছে খুঁড়ো। কখনো ভিড়ে, কখনো ফাঁকা রাস্তায়, কখনো দোকানের সামনে, কখনো মন্দিরের চাতালে, কখনো ভোটের মিছিলে। কখনো কথা হয় না। বেশি কিছু মনে পড়েনা চট করে। শেষবার দেখেছিল শ্মশানের পাশে একটা মন্দিরে। তখন খুঁড়ো একা। বয়স বারো পার হয়েছে, অনেক কিছু বুঝতে পারে… ভিক্ষের অভ্যেসটাও রপ্ত হয়ে গেছে। মন্দিরের সামনে ভিক্ষে করত। দিনের শেষে একজনকে সব টাকা তুলে দিয়ে, নিজের ভাগটা বুঝে নিত। একদিন বডি নিয়ে আসা একটা ম্যাটাডোর মন্দিরের কাছে দাঁড়ালো। কাছা-গলায় দেওয়া লোকটাকে নিয়ে দুজন গেল মিষ্টির দোকানে। কচুরি-মিষ্টি কিনে মন্দিরের সামনের ভিখিরীদের দিচ্ছিল শাল-পাতায়। খুঁড়োকেও দিলো। এরকম লরি-ভ্যান রোজই আসে, অনেক আসে। কিন্তু সবাই ভিখিরীদের খাওয়ায় না। কেন খাওয়াচ্ছিল কে জানে? সেই দিন ওই বুড়োটাকে আবার দেখতে পেলো। মন্দিরের অন্য দিকে দুটো ভিখিরীর মাঝে বসে শালপাতা থেকে কচুরি তুলে মুখে ঠুসছে। চোখে যম খিদে। খুঁড়ো স্পষ্ট চিনতে পারল – সেই ঘোলাটে চোখ, মুখে বসন্তের দাগ, সাদা দাড়ি আগের থেকে লম্বা হয়েছে। বুড়োটা শালপাতা দিয়ে হাত মুছে এক কোণে ছুঁড়ে দিল… তারপর দেওয়াল ধরে উঠে টলতে টলতে চলে গেল ম্যাটাডোরের দিকে। সেখানে হলদেটে দাঁত বার করে হেসে হেসে মাথা নেড়ে নেড়ে কীসব বলল, তারপর চলে গেল। যেতে যেতে দু-তিনবার পেছন ফিরে খুঁড়োকে দেখল। হ্যাঁ, খুঁড়োকেই দেখছিল সে। খুঁড়ো তখন চিনত না মড়া-পোড়াতে আসা লোকগুলোকে… চিনত না, তাদের মধ্যে একজন হরিদা। দুদিন পর হরিদা কেন হঠাৎ ওকে শ্মশান থেকে তুলে এখানে নিয়ে এলো… ভেবে কুল পায় না খুঁড়ো। জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয় না। আবার তাড়িয়ে দিলে? 

     দিনের বেলা এসব মাথায় আসে না, অথচ রাত বাড়লেই এক এক করে ভেসে ওঠে – ইস্কুল-বাড়ির রাতগুলো। মায়ের বুকের ওপর উঠে বাপ পেটাচ্ছে। কুকুরদের সঙ্গে শুয়ে মালগাড়ি দেখছে। ভিখিরী-দলের পাণ্ডা ফেলে ক্যালাচ্ছে খুঁড়োকে… টাকা ওঠেনি বলে। সেই রাতের পর থেকে হঠাৎই যেন বেশি করে মনে পড়ছে। বোনকে এখন কেমন দেখতে… মা এখন কোথায়… জানতে ইচ্ছে হয়। অবাক লাগে। “বুড়োটা কি আমাকেও কিছু করে গেলো?”, ভেবে বেঞ্চের ওপর আড়ষ্ট হয়ে শুয়ে থাকে খুঁড়ো। ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করে। দেখে, কাছাকাছি কুকুরগুলো আছে কি না। 


ক্রমশ…


পূর্ববর্তী পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

বর্তমানে হায়দ্রাবাদ নিবাসী  হলেও, জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের শৈশব থেকে যৌবন সবটাই কলকাতার শহরতলী জুড়ে। জন্ম ২০শে আগস্ট, ১৯৮৬। বায়োটেকনলজিতে বি টেক শেষ করেই কর্মসূত্রে ২০০৮ সালে কলকাতা ছেড়ে বেঙ্গালুরু চলে যান, এবং তারপর হায়দ্রাবাদ।প্রায় দশ বছর হয়ে গেল, কলকাতার বাইরেই জীবন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি নিবিড় ভালবাসা থেকেই একসময় লেখার ইচ্ছে জন্মায়। প্রায় সাত-আট বছর উনি একাধিক আন্তর্জাল পত্রিকা এবং মুদ্রিত পত্রিকায় লিখে চলেছেন গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য এবং কবিতা। ২০১৩ সালে 'আদরের নৌকা' প্রকাশনা থেকে প্রকাশ পায় ওনার প্রথম গল্প সংকলন 'প্রতিবিম্ব'। এর পর ২০১৫ সালে  'হাওয়াকল' প্রকশনা থেকে প্রকাশ পায় ওনার প্রথম উপন্যাস 'কৃষ্ণঘন যাম'। ২০১৭ সালে 'হাওয়াকল' প্রকশনা  থেকেই প্রকাশিত হয় প্রথম অণুগল্প সংকলন 'টিনিটাস'। ২০১৮ সালের কলকাতা বইমেলায় 'তবুও প্রয়াস' প্রকাশনা থেকে জয়দীপের প্রথম গদ্য সংকলন 'হৃদয়পুর কত দূর?' প্রকাশ পায়। এই লেখার মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। আর প্রতিযোগিতামূলক এই জীবনে এই লেখাই তাঁর কাছে একটা রিফিউজ। লেখার প্রতি ভালবাসার টানেই উনি লিখতে চান... যতদিন পারেন।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।