হলুদ ট্যাক্সির ডানা

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

আমার মুখের সামনে বুম ধরে প্রশ্ন করছে একজন, অন্যজন ক্যামেরা ধরেছে।
এসময় কাজ করতে হয়। ধরুন, প্রতিমার চোখ আঁকছি, রঙ করছি… অন্তত হাতে তুলি কিংবা কায়েমকাঠি মাস্ট!
মানে আপনি টিভি তে দেখবেন একজন শিল্পী তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে কিছু বলছেন।কাজ বাদ দিয়ে নয়।
আসলে ঢপ। এই ঢপেই নাকি জমে ওঠে। এমন কী দু একজন কে পাশ থেকে খটখট আওয়াজ করতে হয়, দরকার নেই তবু মাটি মাখতে হয়। যে প্রতিমা আমি বানাইনি সেই রেডিমেড প্রতিমার সামনে গিয়ে কাজের ভান করতে হয়!
এইরকম একটা সাক্ষাতকার দিতে থাকা দুপুরে লোকটা ঢুকে পড়ে আমাদের মন্ডপে। একটা ক্ষয়াটে বছর চল্লিশ পঁয়তাল্লিশের মানুষ।হয়ত সাংবাদিক আসবার সময় ফাঁকতালে গেট খোলা পেয়ে কৌতুহল মেটাতে ঢুকে পড়েছে। অন্য সময় হলে বের করে দিতাম।
আশ্চর্য, লোকটা চারদিকে ছড়িয়ে থাকা হাফডান কাজ দেখছে না সে দেখছে আমায়।হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
সাংবাদিক: থিম হিসেবে ‘হারিয়ে যাওয়া পোস্টকার্ড’আপনার প্রথম কাজ যেটা খুব নাম করেছিল… তাইতো!
আমি: ঠিক তাই। সেরা থিম এশিয়ান পেইন্টস পুরস্কার, সেরা প্রতিমা নিউজ টুয়েলভ, আর বোরোলিন সেরা ভাবনা পুরস্কার পেয়েছিল ।সারা কোলকাতায় আমাদের থিমের ক্যাচলাইন মুখে মুখে ফিরেছিল, ‘স্নেহের দাদুভাই’, শ্রী চরনেষু মা, প্রিয়তম…
সাংবাদিক: পরের বছর আপনার দুটো কাজ,
আমি: ‘শেষ ট্রাম’ আর ‘বাবুই পাখির বাসা’।দুটোই অনেক পুরস্কার পেয়েছে। বিশেষ করে শেষট্রামে ধরেছিলাম,একসময়ের কলকাতার ঘুমভাঙা।ভোরের প্রথম ট্রামে কীর্তন করতে করতে অনেকেই যেতেন গঙ্গাস্নানে। ট্রামটা স্ট্যান্ডরোড থেকে এখনকার নতুন অর্ডন্যান্স বিল্ডিং – এর সামনে দাঁড়াত। সেটাই মূল মন্ডপে ধরেছিলাম।ভোরের গঙ্গাস্নান সে সময়ের নিত্যকর্ম। দলবেঁধে স্নান করতে গিয়ে গড়ে উঠত মহিলাদের মধ্যে সখ্য। সেটাতেই জোর দিয়েছি, আর টিমটিম করে টিকে থাকা ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করতে আমার ভাল লাগে। বাবুই পাখির বাসাও সেই জন্যই বেছে নিয়েছিলাম।
সাংবাদিক: এবার এই মন্ডপে হলুদ ট্যাক্সির ডানা নিয়ে কিছু বলুন।
আমি দেখছিলাম ঐ লোকটার চোখ চকচক করছিল।যেন জ্বলছিল। চোখের পাতা স্থির। আমার বহু বার বহু চ্যানেলে বলা কথা গুলো বলবার আগে এমন মহৎ শ্রোতা তার দিকে টেনে নিচ্ছিল আমার চোখ! সে যেন আমার সমস্ত কথা কাড়াকাড়ি করে পড়বে বলে কিংবা ছোঁ মেরে তুলে নেবে বলে অনেক কাছে এসে দাঁড়িয়েছে!
এসব কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা পেরিয়ে দেয়ালে মস্ত হলুদ ট্যাক্সির ডানা আঁকতে আঁকতে তোতাপাখির মত বলতে থাকি,অ্যাপ-নির্ভর ক্যাবের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে শহরের হলুদ ট্যাক্সি। সেই কারণেই এবারের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছি ট্যাক্সি, হলুদ ট্যাক্সি। ট্যাক্সিচালকদেরই এবার ভিআইপি’র মর্যাদা দিতে চলেছে এই যোধপুর আমরা সবাই ক্লাব।এই মণ্ডপে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখালেই তাঁরা ভিআইপি-মর্যাদায় প্রতিমা দর্শন করতে পারবেন।
ঠিক এই সময় আমি থেমে পড়ি, থামতে বাধ্য করে সেই লোকটা। আমি, সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান সহ অন্যরা কাজ ফেলে লোকটার দিকে তাকাই।
আমাদের ওভাবে তাকানোর ফলে লোকটা হাততালি থামায় এবং মাথা নীচু করে ফিসফিস করে বলতে থাকে স্যরি,স্যরি, আমি আসলে….এটা করা আমার উচিত একদম উচিত হয়নি, স্যরি।

আমি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আবার বলতে থাকি,কলকাতার রাস্তা মানেই হলুদ ট্যাক্সি। কিছুদিন আগে পর্যন্তও এটাই ছিল পরিচিত ছবি। বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাব সংস্থার ভিড়ে ক্রমেই কমছে হলুদ ট্যাক্সির সংখ্যা।এই পুজো আসলে বাঙালীর কাছে হয়ে উঠবে ‘নস্টালজিয়া’। ট্যাক্সির আদলে মণ্ডপ সাজানো হবে। মণ্ডপে দশটি বাতিল হলুদ ট্যাক্সি থাকছে। একটি ট্যাক্সির উপরে থাকবে প্রতিমা। ট্যাক্সির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মণ্ডপ-শৈলিতে ব্যবহার করা হবে। এমনকী, আবহসংগীতেও থাকছে ট্যাক্সির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ব্যবহার। ট্যাক্সিচালকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই এই উদ্যোগ।বিভিন্ন সময়ে ট্যাক্সিচালকেরা যেভাবে যাত্রী প্রত্যাখ্যান করেন, তা-ও তুলে ধরা হবে। ট্যাক্সিচালকদের যেমন সচেতনতার বার্তা দেওয়া হবে, তেমনই দুর্ঘটনা রোধে মানুষের ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হবে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে।
ক্লাবের সম্পাদক ও তার কয়েকজন চ্যালা আসতেই বুম আমার মুখথেকে চলে যায় তাদের দিকে।

দেখি মূর্তির মত দাঁড়িয়ে লোকটা।কাছে ডাকি, ‘কিছু বলবেন?’
— আপনি ট্যাক্সি নিয়ে কাজ করছেন জেনে এমনিই এলাম। আমি এশহরে এগারো বছর ট্যাক্সি চালিয়েছি। ট্যাক্সিটা আমার জান ছিল।মার্ক ওয়ান অ্যাম্বাসাডর।
—– এখন কী করেন?
—-তেমন কিছু করিনা। এক অফিসে গাড়ি চালাতাম,মাঝে মাঝে বিগড়ে যেত। অফিস রাখল না। আমার মালিক বলল, ওরা অন্যগাড়ি চায়।বেচে দিল।খুব কমদামে কিনল এক গ্যারেজ মালিক। তিনি আমায় রাখলেন। চালালাম কিছুদিন।
—-তারপর…
—- এখন বসে আছে। ছ’ মাস হল। অন্যগাড়ি চালাতে বলেছিল আমি চালাইনি।মেসে থাকতাম ছেড়ে দিয়েছি। টুকটাক ওই গ্যারেজে কাজ করি আর বসে যাওয়া গাড়িটা একটু একটু করে সারাই।মালিক হাসে।ভালবাসে। কেউ বিশ্বাস না করলেও আমি জানি ও আবার চলবে। গাড়িতেই থাকি রাতে। মেস ছেড়েছি। বলতে পারেন ওটাই আমার ঘর।

এমন হয়, পেয়ে যাই। আগের কাজের সময় দেখেছি, যা চাইছি তা নিজেই এসে ধরা দিচ্ছে। আমি লোকটাকে ছাড়তে চাইছিলাম না। থিমের কাজের সময় যতই গুছিয়ে বলি, যতটা আত্মবিশ্বাসের সংগে বলি নিজের কাছে মনে হয় কিচ্ছু হচ্ছে না। আরও কিছু চাই। চমকে দেবার মত কিছু চাই।
লোকটা নিজে থেকেই বলল, আসলে কাজের জন্য ঘুরি। যে কোনো কাজ দিন করে দেব।এখানেও সেই জন্যই আসা। কাজ থাকলে বলবেন। কথা শেষ করে আমার দিকে একটুকরো কাগজ বাড়িয়ে দেয়….
সেই কাগজ থেকে জানতে পারি তার নাম ‘শম্ভু নাথ মন্ডল’ আর তার সেই গ্যারেজের নাম, ফোন নম্বর।

শম্ভু নাথ চলেই যাচ্ছিল। আমি থামালাম, ‘কাজ আছে, আজ থেকেই। করবে?
আনন্দে তার চোখমুখ কাঁচা হরিতকির মত চকচকে হয়ে উঠল।
হাসি মুখে বলল, আমার বাঁচালেন।

দুই

থিমের কাজের প্রথম দিকটা জ্যাজ মিউজিকের মত ঢিমেতালে চলে।যত দিন যায় কাজ বাড়তে থাকে আর দিন রাত ছোট হয়ে যায়।দিনের পর দিন ঘুম কমে আসে, নিজেকে বড্ড একা আর সব্বাইকে মনে হয় বিচারক। নিজেকেই মনে হয় অচেনা ও একা।
এই কাজটির ক্ষেত্রে তা হল না। কেমন যেন ফুরফুরে হালকা হয়ে এল। যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও ভাল কিছু করার কথা আমায় মনে করে দিতে থাকল শম্ভুলাল।
প্রথমে ভেবেছিলাম অজস্র রাতজাগা ড্রাইভার থাকবে, অভিব্যক্তি ছাড়া বেশ কিছু মানুষের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম ট্যাক্সির স্ট্রিয়ারিং হাতে যারা গুন্ডা, বেশ্যা, অফিসার,সাধু, চোর, ডাকাত, ভালোমানুষ সওয়ার করছে রাত- বিরেতে। যেন পেছনের সিটে পুরো একটা সমাজ।
শম্ভুলাল বলল, আসলে সবাই একা। একা একটা স্ট্রিয়ারিং হাতে মানুষ।যার কাছে একটাই প্রশ্ন আসে বারবার, তোমার ড্রাইভিং রেকর্ড কেমন?
ধীরেধীরে আমি শম্ভুলালের কাছে আমার সমস্ত ভাবনা উগরে যেতে লাগলাম। ফলস্বরূপ পেতে থাকলাম একটার পর একটা অসাধারণ আইডিয়া। একে একে বলি….

এক,প্রতিমা ভেবেছিলাম ফাইবারের ডানা লাগানো হলুদ ট্যাক্সির মাথায় রাখব।
পরে ঠিক হল বিশাল একটা উইন্ডস্ক্রিনে ডাইনে – বাঁয়ের শহর দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে প্রতিমা। যেন ট্যাক্সির ভেতর থেকে মাতৃ দর্শন।
দুই,শুধু গাড়ির যন্ত্রাংশ দিয়ে ডিজাইন নয় তার বদলে থাকবে একটা পর একটা ট্যাক্সির জানালা।যার ভেতরে নেতা, মন্ত্রী, আমলা, সিনেমার ভিলেন।
তিন, টায়ার, টিউব, ইঞ্জিন, বডি পার্টস দিয়ে হবে গেট।থাকবে দৈত্যদের চোখের মতো গাড়ির দু’টি হেডলাইট।তারা ঝলসে উঠবে বারবার।
চার,অজস্র স্ট্রিয়ারিং এর একটি ফোয়ারা ।
পাঁচ, আলোর খেলায় থাকবে মিটার ঘুরছে।
ছয়, শুধু চারটে চাকার উপরে ঝকমকে হলদে খোল নয় অজস্র মোহিনী শরীর থাকবে। সেই ট্যাক্সির ছাদের উপরে উড়বে অজস্র ফিনিক্স পাখি,যা পুরো মন্ডপের ছাদ জুড়ে থাকবে।
সাত, মন্ডপ ছেড়ে যাবার সময় দর্শক দেখবে ট্যাক্সির পেছনকার লাল আলো জ্বলতে জ্বলতে মিলিয়ে যাচ্ছে।আর ওই গোঁ গোঁ আওয়াজ মিলিয়ে আসছে। যেন বলছে বিদায়, বিদায়।

তিন

কাজ শেষের দিকে,সাতদিন পর চতুর্থীতে উদ্বোধন। অন্যবারের মত একদিনও জাগতে হয়নি। ঠিক টাইমে স্নান,খাওয়া হয়েছে। প্রতিমা দেখে ক্লাবের অনেকের চোখ ঝলসে গেছে। নতুন নতুন আবদার নেই দেখে বুঝেছি যে কাজটা ক্লাবের পছন্দ হয়েছে।

বহুবার শম্ভু নাথ ওর ট্যাক্সিটা দেখতে নিয়ে যাবে বলেছে। আজ যাব, কাল যাব করে হয় নি। একদিন কাজের শেষে ও খুব জোর করল, চলুন দাদা দেখবেন, আপনার কাজে লাগবে….
গেলাম সে রাতেই। রাত তখন দশটা তেমন কাজ নেই বলে ঘুমিয়ে পড়েছে কালচে গ্যারেজটা। শম্ভুনাথের ট্যাক্সিটার স্প্রে রঙ দিয়ে লেখা ‘ট্যাক্সিপাগলা’। সেটা আড়াল করার চেষ্টা করল, পারল না।’ বুঝলেন দাদা,বাইরে কাজে গেলেই আমার পেছনে লাগে ওরা। ভয় পায়।’
–কেন?
— ওরা নিজেদের মধ্যে বাজী ধরে। আমি কবে পালাব।আর একহপ্তা, অন্যজন বলে দু’দিন, কেউ বলে পঞ্চাশ টাকা কেউ বলে একটা তিনশো পঁচাত্তর রাম!
— কোথায় যাবে তুমি?
— গাঁ থেকে মাঝে মাঝেই লোক আসে তো!বাড়ি থেকে পাঠায়।আমি তখন ডুব দিই।
— কে কে আছে গ্রামের তোমার বাড়িতে?
— মা আছে, দাদা, বৌদি, ভাই সব আছে।
—গাঁয়ে ফিরব না দাদা। ওখানে যাই যখন রাজার মত যাই। এখন নিজের চলে না। নি:স্ব হয়ে ঘরে ফেরা যায় না। মা আর বৌদির জন্য শাড়ি, দাদা আর ভাইয়ের জন্য জামা প্যান্টের ছিট, নিয়ে যেতাম। একবার কী কান্ড করলাম, বাবার জন্য একটা খদ্দরের পাঞ্জাবী কিনে নিয়ে গেলাম। সব্বাই হাসল। মা শুধু চুপ করে থাকল। বলল, এমন ভুল এমন ভুল আমারও হয় শম্ভু।দাদা বলল রাখ আমি পড়ব।তাছাড়া প্রতিমাসে মানিঅর্ডার করতাম। সেই মানুষ খালি হাতে গেলে সংসার মেনে নেবে কেন?
আমি চুপকরে যাই। মনে মনে দিন গুনি, ওর দিনমত প্রাপ্য টাকার সংগে দিন দিয়ে গুন করি। একটু বাড়াই। সে কত কী করেছে। যখন যা বলেছি, না করেনি। যাতায়াত আর খাবার ছাড়া বাকী টাকা ফেরত দিয়ে বলেছে, একবারে দিবেন।আমার গাড়ির কাজে লাগবে।
সে গাড়ির ভেতরের অন্ধকার থেকে বের করে আনে, টুপিপরা উচ্ছল সুচিত্রা সেন পাশে উত্তম কুমার,ট্যাক্সি চলছে। কালিঝুলি মাখা তেলচিটচিতে গ্যারেজটায় সে গুন গুন করে গায়, ‘এই এত আলো… এত আকাশ..’
গান থামিয়ে আবার একটা পেপার কাটিং তুলে ধরে,’চুপকে চুপকে’, ধর্মেন্দ্র।
আর একটা দেখুন, এটা ‘আকাশ কুসুম’ সিনেমার। সেই যে সৌমিত্র ধার করা ট্যাক্সিতে প্রেম করতে যেত, অপর্ণা সেন ছিল নায়িকা মনে পড়ছে? যখন যা পেয়েছি কেটে রেখেছি।
আমি চুপ করে থাকি।মধ্যবিত্তের একসময়ের সামান্য সুখের আস্বাদটিকে এখন মনে হয় কফিন। শম্ভুলালের উজ্জ্বল মুখের উপরে ভরসা করে আছে এই হাড় জিরজিরে হলুদ ট্যাক্সি!
চোখের সামনে ভেসে ওঠে বোরোলিন আর বসন্তমালতীর গন্ধ মাখা দিন।

শম্ভুলালের গাড়ি দেখে আসবার পর আরও কয়েকটি বিষয় জুড়ে দিয়েছি,
এক,এই এত আলো.. এত আকাশ… সহ আরও কিছু ট্যাক্সির সংগে জুড়ে থাকা কিছু পুরনো গান বাজবে।
দুই,চারটে চাকা লাগানো একটা কফিন থাকবে এক্কেবারে শেষে।
তিন, সাদা শার্ট আর খাঁকি প্যান্ট পরা ড্রাইভার দরজা খুলে দিচ্ছে, ট্যাক্সি থেকে নামছেন লালমোহন বাবু।দূর থেকে তা দেখছে চারমিনার হাতে ফেলুদা আর তোপসে।
চার, একজায়গায় একটা ট্যাক্সির খোলা ডিকিতে আধশোয়া হয়ে থাকবেন সত্যজিৎ রায়, সামনে তাঁর অ্যরিফ্লেক্স ক্যামেরা। শুটিং চলছে। সবটাই ফাইবার।

তিন
আজ পঞ্চমী। শ্রেষ্ঠ মন্ডপ, সেরা ভাবনা, সেরা আবহ সহ মোট চার খানা পুরস্কার পাবার পর আনন্দে উচ্ছাসে ভুলেই গেলাম শম্ভুলালের কথা। কাজ শেষ হলে আমি আর সে মন্ডপে যাই না। আমার সহকারীরা যায়। প্রেমেণ্ট হয়ে গেছে। ক্লাব খুব খুশি। এমন কী আগামী বারের জন্য ভাবতে বলেছে। চাইলে সই সাবুদ করে রাখতে চায়। দুটো দিন ঘুমিয়ে কাটাব ভেবে বললাম সময় চাই।কিছুদিন সময় দিন। ফোন আসলেই বুঝতাম প্রশংসা এসেছে। শুধু প্রশংসা!
সাংবাদিকদের হরেক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে মনে পড়ল,যেন ভুস করে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল শম্ভুনাথ।
সাংবাদিকটি জানতে চাইছিল, ট্যাক্সির এত খুঁটিনাটি বিষয় জানলেন কী করে? মন্ডপটা মনে হচ্ছিল একটা সত্যি কারের গ্যারেজ। কেমন করে পারলেন?
আমি চুপ করে থাকলাম। আর মনে মনে বলতে লাগলাম। শম্ভুনাথ, শম্ভুনাথ।
পারডে চারশো করে ধরে বত্রিশ দিনের টাকা হয় বারো হাজার আটশো আমি ওকে পনের হাজার দিয়েছি।
খামটা হাতে দিয়ে বললাম, গুনে নাও।
— আপনি ঠকানোর মানুষ না।যা দিবেন তাই অনেক।
অন্যদের প্রেমেন্ট করার পরও দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললাম, কিছু বলবে?
তার যেন কথা হারিয়ে গেছে, বহু ক্ষণ পর বলল,আমার গাড়িটা সারানো হলে ফাস্ট আপনাকে নিয়ে ঘুরবো। উঠবেন তো আমার গাড়িতে!
অবশ্যই,অবশ্যই,সে আর বলতে। এসব বলে আমি থামলাম।
ও চলে গেল হাসিমুখে।
আজ অষ্টমী দুটো ক্লাব চায় আমাকে আগামী বছর। সে দেখা যাবে সময় আসুক বলেও কাটাতে পারছি না। এর মধ্যে একটা নামকরা মন্ত্রীর ক্লাব। এসবে দুম করে না করলে পরে সমস্যা হতে পারে ভেবে চুপ করে আছি।
সহকারীদের একজন বলল, শম্ভুলাল আপনাকে পাগলের মত খুঁজছে?
— কেন?
— বলেছে, আপনাকে ছাড়া কাউকে বলবে না।
—- এবার ফোন করলে বলবে আজ রাত্রি আটটার সময় আমি ‘নিউজ টুয়েলভ’- এর ষ্টুডিও থেকে বেরুব। বাইরে যেন থাকে।
সেদিন আরও কিছু প্রশংসা মাখা ফোন এল।

সোয়া আটটার সময় নিউজ চ্যানেলের স্টুডিও থেকে বেরুবো দেখি এবারের ক্লাবের কয়েকজন দাঁড়িয়ে। তাদের একজন বলল, এসব কী শুনছি? আপনি অন্য ক্লাবে কথা বলছেন। আমরা অবাক হচ্ছি!
ওনারা আরো কিছু বলেই যাচ্ছেন। আমি শুনছি না। আমার চোখ আটকে গেছে আরো সামনে। যেখানে একটা হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে একজন ট্যাক্সিপাগল দাঁড়িয়ে আছে। শম্ভুনাথ হাত নাড়ছে।
— এ আপনি করতে পারেন না।
— আমরা আপনার উপরে ভরসা করে আছি।
— আমরা শুধু সন্মানিত হইনি আপনিও কম কিছু পেয়েছেন।
— যখন যা বলেছেন মেনে নিয়েছি।
ওনারা বলেই চলেছেন।
হাত নাড়ছে শম্ভুনাথ।
একপ্রকার জোর করেই উঠতে হল ওদের অডিতে।
ফাউন্টেনপেন, তুলসী মঞ্চ,সুলেখা কালি, পেতলের কলের গান…. এবার কোনটা থিম ভাবছেন দাদা…..ওদের একজন বলছে, বলেই যাচ্ছে।

অডিতে বসে ঘাড় কাত করে পেছনে তাকালাম, শম্ভুলাল তার ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করল। যেন আমার কিংবা সারা পৃথিবীর মুখের উপরে। স্পষ্ট শুনলাম,দড়াম।



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।