সম্প্রদান

প্রলয় কুমার নাথ on

(১)
বিছানায় শায়িত সুপর্ণা দেবীর মাথার কাছে বসেছিলো তার একমাত্র ছেলে, বিভাস। ষাটোর্ধ্ব সুপর্ণা দেবীর আছে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা। তাই গতকাল সকালে হঠাৎ করেই জ্ঞান হারিয়ে ঘরের মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়েন গৃহকর্মরত সুপর্ণা দেবী। বাড়ির একমাত্র পুরোনো চাকর, শম্ভুর সহায়তায় তৎক্ষণাৎ নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানকার সেবা শুশ্রূষার পর এখন অনেকটাই শারীরিক ভাবে সুস্থ হয়েছেন তিনি।

কলকাতা থেকে দূরে অবস্থিত এই কুলডিহি গ্রামের নাম করা বনেদি পরিবারের গৃহকর্ত্রী হলেন সুপর্ণা দেবী। তাদের পারিবারিক পাট আর তাঁতের ব্যবসার উপার্জনের জন্য একসময় এই গ্রামের মধ্যে স্বচ্ছলতা আর আভিজাত্যের শিখরে ছিলো তাদের পরিবার। তবে এখন সেই সবই হল ইতিহাস। আস্তে আস্তে ব্যবসার আয় তলানিতে গিয়ে থেকেছিলো। আর তা সম্পূর্ণরূপে হাতবদল হল, যখন পাঁচ বছর আগে, স্বামীর মৃত্যুর পর তার একমাত্র ছেলে বিভাস ব্যবসার পাট চুকিয়ে কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলো চাকরির উদ্দেশ্যে।

বিভাস কলকাতার একটি নামী সংস্থায় এইচ.আর ম্যানেজার পদে কর্মরত। তাই গত কয়েক বছর ধরে এই বাড়িতে একাই থাকেন সুপর্ণা দেবী। বিভাস কলকাতাতেই নিজের বাসস্থান বেছে নিয়েছে, এখন এই গ্রামের সাথে বা পৈতৃক বাড়ির সাথে তার খুব একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নেই। মাকেও সে অনেকবার নিয়ে যেতে চেয়েছে তার কাছে, কিন্তু সুপর্ণা দেবী কিছুতেই তার স্বামীর ভিটের মোহ ত্যাগ করতে পারেননি। মায়ের অসুস্থ হওয়ার সংবাদ পেয়ে বিভাস আজই এসেছে তাকে দেখতে।

তবে সুপর্ণা দেবী জানেন, যে বিভাসের এই পৈতৃক বাড়িতে না থাকতে চাওয়ার পেছনে তার কর্মস্থল কলকাতায় হওয়াটাই একমাত্র কারণ নয়…এই গ্রামের সাথে যে তার একমাত্র সন্তানের অনেক বেদনা, অনেক হাহাকার ভরা না পাওয়ার জ্বালা লিপিবদ্ধ হয়ে আছে!

“এই বয়সেও বাড়ির সব কাজ নিজের হাতে কেন করতে যাও, মা? যদি তোমার কিছু একটা হয়ে যেত তাহলে…”
বিভাসের শশব্যস্ত কণ্ঠে করা এই প্রশ্নে যেন কানই দিলেন না সুপর্ণা দেবী, প্রত্যুত্তরে তিনি মৃদু হেসে নিজের শীর্ন হাতটি বিভাসের এলোমেলো চুলের মধ্যে চালনা করে বলে উঠলেন, “বড্ড রোগা হয়ে গিয়েছিস বাবা…ওখানে কি ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করিস না?”
বিভাস যেন বিরক্ত হয়ে কিছু একটা বলতে চলছিলো, ঠিক এমন সময় হঠাৎ কি মনে পড়ায়, সুপর্ণা দেবী ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “শোন বাবা, শম্ভুর বয়স হয়েছে তো, তাই এখন সে আর বাজারের ভারী ব্যাগ টেনে আনতে পারে না। যা না বাবা, তুই বাজারটা সেরে আয়…আজ একটু পাঁঠার মাংস আনিস, অনেকদিন তো আমার হাতের রান্না খাসনি…”
বিভাস উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলো, “সে কি মা! এই অবস্থায় তুমি রান্না করবে! ওসবের দরকার কি, আমি কোনো হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসি…”

কিন্তু তার মায়ের সেই এক জেদ, এতদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়েছেন। নিজের হাতে রান্না করে ছেলেকে পাত পেরে না খাইয়ে একেবারে শান্তি নেই তার। অগত্যা বিভাসকেই থলে হাতে বাড়ি থেকে বেরোতে হল বাজারের উদ্দেশ্যে।

(২)
এবার প্রায় বছর খানেক পর বিভাস এসেছে তার পৈতৃক বাড়িতে। বাজারটা এই বাড়ি থেকে অনেকটাই দূরে। চারিদিকের প্রাত্যহিক সতেজ সবুজ স্নিগ্ধতার মাঝে, গ্রামের মেঠো পথ ধরে এগিয়ে চলছিলো বিভাস। চারিদিকে দুচোখ মেলে চেয়ে সে একটা কথাই ভেবে চলেছিলো, যে ধীরে ধীরে কতটা বদলেছে তাদের এই গ্রাম? নাহ, তেমন খুব একটা নয়। সেই মাঠ, গাছপালা, পুকুরঘাট, বাঁশঝাড়, দূরের ঝোঁপের ভেতর থেকে আসা মোরগের ডাক, কিংবা জেলেপাড়ার গোয়ালঘরগুলো থেকে আসা গরুর হাম্বা রব…সব কিছু যেন আগের মতই আছে। কিন্তু এই চেনা পরিবেশের মাঝেও নিজেকে খুব অচেনা লাগে বিভাসের, কারণ তার জীবন যে আর আগের মত নেই!

হাঁটতে হাঁটতে পথের মাঝে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো বিভাস। তার অনতিদূরে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে একটি জরাজীর্ণ একতলা বাড়ি। এই কবছরের মধ্যেই বন্য গাছপালার আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে সেটার নানা জায়গা থেকে খসে পড়েছে সিমেন্ট বালির প্রলেপ। বিভাস একদৃষ্টে চেয়ে রইলো বাড়িটার দিকে। তার হাত থেকে বাজারের থলেটা কখন নীচে পড়ে গেল, তা খেয়ালই হল না তার। ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলো সে বাড়িটার দিকে, কিন্তু মনের ভেতর ফেলে আসা স্মৃতির সরণী বেয়ে সে যেন ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে লাগলো বেশ কয়েক বছর আগে!

এখনো তুলিকার মতই বিভাসের হৃদয়ের বেশ কিছুটা জায়গা অধিকার করে আছে তাদের এই ছোট্ট একতলা বাড়িটা। সেই তুলিকা, যাকে গ্রামের স্কুলে যাওয়ার পথে এক ঝলক দেখার জন্য কতদিন নিজের কলেজ কামাই করে তাকে ওই পথের ধারে অশ্বথগাছটির পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে! তেমন ডানা কাটা পরীর মত চেহারা ছিলো না তুলিকার, তবুও কি মোক্ষম আকর্ষণ ছিলো তার দুই কাজল কালো চোখের মধ্যে! এই উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা সাধারণ গ্রাম্য মেয়েটিই যে কখন প্রবেশ করেছিলো এই সুদর্শন যুবকটির হৃদয়ের গভীরে, তা নিজেও জানতো না সে। সকলের অজ্ঞাতে নিজের মনের অনুভূতিগুলো দিয়ে সাজিয়ে সেই প্রথম তার প্রেমপত্র লেখা তুলিকার উদ্দেশ্যে, আর হঠাৎ করে একদিন সেটা তার হাতে গুঁজে দিয়েই দুরদুর দৌড়! সেই সকল ছেলেমানুষির কথা এখনো সুস্পষ্ট বিভাসের মনে।

তুলিকার বাবা সোমেশ বাবু ছিলেন গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। নিতান্তই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার তার। এদিকে বিভাসের পরিবার বরাবরই গ্রামের গণ্যমান্য পরিবার হওয়ার মর্যাদা পেলেও, সেই সময় তাদের প্রাচুর্যে যথেষ্ট ভাঁটা পড়েছে। তাই দুই পরিবারের মধ্যে তেমন কোনো বিভেদ না থাকায় তুলিকাও সায় দিয়েছিলো বিভাসের ইশারায়। মুখে কিছু না বললেও, নিজের পড়ার বইয়ের মধ্যে সযত্নে গচ্ছিত রেখেছিলো বিভাসের দেওয়া প্রেমপত্রটিকে।

এরপর থেকেই এই বাড়িতে অবাধ আনাগোনা বিভাসের। এখনো তার মনে পড়ে, সেই বার কলেজের প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলে, তুলিকার মা, শীলা দেবী বিভাসকে গুনে গুনে পাঁচটা রসগোল্লা জোর করে খাইয়ে ছিলেন নিজের সামনে বসিয়ে। তারপর প্রসন্ন চিত্তে বিভাসের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠেছিলেন, “তোমার ভালো হোক, বাবা…জীবনে আরো উন্নতি করো, ভালো চাকরি পেয়ে মা বাবার মুখোজ্জ্বল করো!”
ওপাশ থেকে গদগদ গলায় সোমেশ বাবু বলে উঠেছিলেন, “বিভাস আমাদের হীরের টুকরো ছেলে, এ গাঁয়ের গর্ব!…শুনলি তুলি, এবার থেকে ওকে বলে রাখছি, এখানে নিয়ম করে এসে তোকে অঙ্ক আর ইংরাজিটা দেখিয়ে দিয়ে যাবে…আর তুমিও বাবা, এটাকে নিজের বাড়িই মনে করবে, কেমন!”

তুলিকা কোনো উত্তর দেয়নি সেই কথায়। শুধু বিভাস লক্ষ্য করেছিলো, যে সেই ঘরের দরজার পর্দার বাইরে থেকে গর্বে আর খুশিতে ভরা একজোড়া কাজল কালো চোখ যেন এতক্ষন পর লজ্জিত হয়ে নিচের দিকে চাইলো। সেই দিন থেকেই যেন তার তুলিকাকে আরো কাছ থেকে পাওয়া শুরু হল। কত শীতের দুপুরে এই বাড়ির ছাদেই মাদুরের ওপর সে পড়াতে বসেছে তুলিকাকে। পড়ার ফাঁকে, সকলের অলক্ষে, বিভাস মাঝে মাঝে তুলিকার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়তো। বাড়ির পেছনের নিমগাছটা থেকে ডেকে উঠতো সেই কোকিলটা, হীমেল হওয়ার স্রোতে ফরফর করে উড়ে যেত বীজগণিতে ঠাসা অঙ্ক বইয়ের পাতা। বিভাস আলতো করে জড়িয়ে ধরতো তুলিকার হাতটাকে, তারপর মৃদু স্বরে বলে উঠতো, “তুলি আমায় কথা দে, যে সারা জীবন এবাবেই আমার পাশে থাকবি…”
তুলিকা শুধু খিলখিল করে হেসে উঠতো, তার পাতলা ঠোঁটের দুইপাশ থেকে বেরিয়ে পড়তো মুক্তের মত গজদন্ত জোড়া…সেদিকে তাকিয়ে থেকে কেমন যেন ঘোর লেগে যেত বিভাসের দুই চোখে।

(৩)
হঠাৎ জামার বুকপকেটের ভেতর থেকে তারস্বরে মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠায় চিন্তায় ছেদ পড়লো বিভাসের। ফোনটা কানে দিয়েই সে বলে উঠলো, “হ্যাঁ শ্রী…বলো…”
ফোনের ওপার থেকে নারীকণ্ঠের আওয়াজ এল, “এই যে মশাই, বাড়ি পৌঁছে কি একটা ফোনও করতে নেই? মামণি কেমন আছেন সেই খবরটাও বুঝি জানাতে নেই?…কি ভাবো কি তুমি, হ্যাঁ? আমার বুঝি চিন্তা হয় না?”

শ্রী ওরফে শ্রীময়ীর সাথে বিভাসের আলাপ মাস্টার্স করার সময় থেকে। কলকাতার যে কলেজ থেকে বিভাস এম.বি.এ পাশ করে, আইনের স্নাতক শ্রীময়ীও সেখান থেকে এম.এস.ডাব্লু পাশ করে। সেই সূত্রে দুজনের আলাপ, তারপর বন্ধুত্ব। শ্রীময়ীর তরফ থেকে সেই বন্ধুত্ব কখন যে প্রণয়ের রূপ ধারণ করেছে, তা সে নিজেও জানে না। অসামান্য সুন্দরী সুশিক্ষিতা শহুরে মেয়ে শ্রীময়ী, এখন একটি বেশ বড় এন.জি.ও-তে উঁচু পদে কর্মরতা। তাই বিভাসও অসম্মতি প্রকাশ করেনি তার প্রণয় নিবেদনের প্রস্তাবে। এই বছরের শেষের দিকেই দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, এই কথা দুজনের পরিবারের সকলেরই অবগত।

“মা এখন অনেকটাই সুস্থ শ্রী, তোমার কোনো চিন্তা নেই…আর আমি একটু হলেই ফোন করতাম তোমাকে…”, শ্রীময়ীকে শান্ত করার জন্য বলে উঠলো বিভাস। কিন্তু তাতেও খুব একটা আশ্বস্ত হল না সে। আরো কত কি যে অনর্গল বলে গেল মেয়েটা, তা যেন বিভাসের কানেই গেল না। সে শুধু তার কথায় ক্রমাগত ‘হ্যাঁ’, ‘না’, ‘আচ্ছা’ ইত্যাদি বলে কিছুক্ষন পর কথা শেষ হলে মোবাইলটি পকেটে চালান করলো। তারপর পেছন ঘুরে, পথের ওপর থেকে থলেটি তুলে নিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেল বাজারের দিকে। বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে তার, কি জানি আবার মা চিন্তা করবে নাকি!

ভাত, মাংস সহ নিজের হাতে রাঁধা আরো নানাবিধ সুস্বাদু পদে ছেলের পাত সজ্জিত করে, বিভাসকে খেতে ডাকলেন সুপর্ণা দেবী। মেঝেতে আসনের ওপর বসে নিঃশব্দে ভাত খাচ্ছিলো বিভাস, পাশে বসে সুপর্ণা দেবী একটি হাতপাখা দিয়ে হালকা করে হাওয়া করে চলেছিলেন। হঠাৎ তাকে অবাক করে বিভাস বলে উঠলো, “তুলিকাদের বাড়িটায় আর কেউ থাকে না, না মা?”
ছেলের মুখে তুলিকার নামটা শুনে কেমন যেন চমকে উঠলেন সুপর্ণা দেবী, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “না, সোমেশ বাবুর মৃত্যুর পর আর কদিনই বা বেঁচে ছিলো শীলা, তুই বুঝি জানিস না?”
বিভাস চুপ করে রইলো, সুপর্ণা দেবী বলে চললেন, “কিন্তু আজ হঠাৎ ওই হতভাগীর নাম মুখে আনছিস কেন বাবা? ভুলে যা ওকে…শ্রীময়ী খুব ভালো মেয়ে…কবে যে তোকে আমি তার সাথে সংসারী হতে দেখবো, বাবা? তোদের চার হাত এক হওয়া না দেখা অবধি যে মরেও শান্তি পাবো না আমি…” শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের দুই চোখ চেপে ধরলেন সুপর্ণা দেবী।

সামনে রাখা মাংসের ঝোল দিয়ে মাখা ভাত সমেত কাঁসার থালাটার দৃশ্য যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো বিভাসের চোখে জমা জলের প্রলেপের ভেতর থেকে। স্মৃতির ছায়াপথ ধরে সে যেন আবার ক্রমশ পিছিয়ে যেতে লাগলো অতীতের সেই দুর্বিষহ দিনটার দিকে।

(৪)
“আমার জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, বিভাসদা!”, বিস্ফারিত দুই সজল চোখ মেলে উত্তেজিত কণ্ঠে সেদিন বলে উঠেছিলো তুলিকা, “ছেলেটা সরকারি চাকরি করে…মা বাবা কিছুতেই হাতছাড়া করতে চান না এই সম্বন্ধটাকে!”
তুলিকাদের বাড়ির পেছনের ঝোপ ঝাড়ে ভরা বাগানে বিভাসকে ডেকে, সে এই কথাই বলে উঠেছিলো আকুল কণ্ঠে। কিছুক্ষন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বিভাস, তুলিকা ছুটে এলো তার আরো কাছে। তারপর তার বুকে থাকা জামার অংশটাকে খামচে ধরে বলে উঠেছিলো, “কিছু করো, কিছু করো বিভাসদা…আমি যে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা!” তুলিকার চোখের জলে ভেসে গিয়েছিলো বিভাসের বুক।

আর দাঁড়িয়ে থাকেনি বিভাস। সেদিনই তুলিকার হাত ধরে সে সটান চলে গিয়েছিলো সোমেশ বাবু আর শীলা দেবীর সামনে। স্পষ্ট গলায় জানিয়ে দিয়েছিলো তার সাথে তুলিকার সম্পর্কের কথা। খুব অবাক হয়েছিলো সে এটা দেখে, যে এই কথা শুনে সেদিনকার সেই খুশি আর গর্বে ভরা সোমেশ বাবুর মুখে ধীরে ধীরে ফুটে উঠলো বিদ্বেষ আর ক্রোধের আভা! সম্পূর্ন অচেনা এক কণ্ঠে তিনি বলে উঠেছিলেন, “তোমার লজ্জা করেনা গুরুজনদের সামনে দাঁড়িয়ে এইসব কথা বলতে? কত টাকা উপার্জন করো তুমি, যে তুলিকে বিয়ে করতে চাও?”
তুলিকা কিছু বলতে চেয়েছিলো সেই সময়, কিন্তু সোমেশ বাবুর রক্তচক্ষুর সামনে কোন সাহস জোটাতে পারলো না সে। চোখের জল চেপে রেখে সে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিলো সেই ঘর থেকে। ঠিক সেই সময় শীলা দেবীও যেন অন্য রূপ ধরেছিলেন, চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, “ভেবেছিলাম তুমি ভদ্র ঘরের ছেলে, তাই তুলিকে কয়েকটা পড়ার বিষয় দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তোমাকে এই বাড়িতে আসতে বলতাম…কিন্তু তোমার পেটে পেটে এই বদ বুদ্ধি! শেষে মেয়েটাকে ফুঁসলিয়ে…”
স্ত্রীর কথা শেষ না হতেই আবার গর্জে উঠেছিলেন সোমেশ বাবু, “তোমরা গ্রামের গণ্যমান্য পরিবার হতে পারো.. কিন্তু এখন তোমাদের কি অবস্থা, তা আমরা জানিনা ভেবেছো? কি দেখে আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দেবো শুনি? যাও চলে যাও এখান থেকে…আর কখনো যেন তোমাকে এই বাড়িতে না দেখি আমি…”

নাহ, এরপর আর সত্যিই কখনো ওই বাড়িমুখো হয়নি বিভাস। না তো আর কখনো সে তুলিকার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু যেদিন তুলিকাদের বাড়ি থেকে সানাই-এর সুর ভেসে আসছিলো, সেই আওয়াজ যেন অসহ্য মনে হচ্ছিলো বিভাসের কানে। গোটা দিনটা নিজেকে ঘরের ভেতর বন্ধ করে রেখেছিলো বিভাস। মায়ের ডাকে সাড়া দিয়েও দরজা খোলেনি সে। চোখের জলে ভেসে গিয়েছিলো বিছানার চাদর। তবুও মনে মনে একটা কথাই সে বলে গিয়েছে, “তুলিকা যেন সুখী হয়…সে যেন আমাকে ভুলে নতুন স্বামী আর সংসার নিয়ে খুশি থাকে!”

এরপর থেকে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই তুলিকার সাথে। সে যে এখন কোথায় কিভাবে আছে, তাও জানে না সে। নিজের চেষ্টায় ভালো ফলাফল নিয়ে স্নাতক হবার পর, বিভাস কলকাতার একটি নামী কলেজে ভর্তি হয় এম.বি.এ কোর্সে। সেখান থেকেই ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে জুটে যায় এই চাকরিটা। নিজের সকল পিছুটান ফেলে সে দৌড়োতে থাকে নিজের কেরিয়ারের পেছনে, ছিন্ন করে দেয় এই গ্রামের সাথে তার সকল সম্পর্ক, কারণ এই স্থানের আকাশে বাতাসে যে শুধুই তুলিকার স্মৃতি জড়িয়ে আছে! তার আলাপ হয় শ্রীময়ীর সাথে, জীবনটা যেন এক অন্য মোড়ে ঘুরতে থাকে।

(৫)
শীতের দুপুরের মিঠে রোদ প্রবেশ করছে সুসজ্জিত কফি-শপটির জানলার কাঁচের সার্সির ভেতর থেকে। গতকাল দুপুরেই মাকে দেখে বিভাস কুলডিহি থেকে কলকাতা ফিরে এসেছে। আজকে শনিবার, বিভাস আর শ্রীময়ীর দুজনের অফিসেই আজ হাফ-ডে। তাই শ্রীময়ীর আব্দার রক্ষার্থে তার সাথে বিভাসের এই কফি-সপে দেখা করতে আসা।

গোলাপী টপ, জিন্স, খোলা চুল এবং যথাকিঞ্চিত প্রসাধনীতেও কি অপরূপ সুন্দরী লাগছে আজ শ্রীময়ীকে। এখানে উপস্থিত একাধিক সুদর্শন পুরুষেরই নজর যে তার দিকে রয়েছে, এই কথা বুঝতে পারে বিভাস। কিন্তু সেদিকে যেন শ্রীময়ীর কোনো খেয়ালই নেই। সরল, হাসিখুশি মেয়েটি যেন বিভাসকে একদিনও না দেখে থাকতে পারে না, তাই আজ তাকে পেয়ে নিজের স্বভাব অনুযায়ী আনন্দ এনং উচ্ছাসের সাথে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। শ্রীময়ীকে নিয়েই বিভাস এগিয়ে যেতে চায় ভবিষ্যতের পথে, তাই নিজের অতীত সম্পর্কে সে আজ অবধি তাকে কিছুই বলেনি।

কফিটা শেষ হতেই বিভাসকে নিয়ে তড়িঘড়ি উঠে পড়লো শ্রীময়ী। তারপর কফির বিল মিটিয়ে এসেই রাস্তা থেকে একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়লো দুজনে। তারপর যখন সে ট্যাক্সি-চালককে আলিপুরের উদ্দেশ্যে যেতে নির্দেশ দিলো, তখন বেশ অবাক হল বিভাস। তার কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বলে উঠলো শ্রীময়ী, “কি কান্ড বলো দেখি! তোমাকে কাছে পেয়ে অফিসের একটা ছোট্ট কাজের কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিলো গো!”
“কি কাজ?”, আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো বিভাস।
শ্রীময়ী মৃদু হেসে আলতো করে বিভাসের হাত ধরে বলে উঠলো, “চলো না…তুমিও তো আছো আমার সাথে…নিজেই দেখতে পাবে!”

আলিপুরের বেলভিডিয়ার রোড দিয়ে চলছিলো ওদের ট্যাক্সিটা। কিছুক্ষন পর চালককে থামতে বলে, নিজেই ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে বিভাসকে নিয়ে নেমে পড়লো শ্রীময়ী। এবার যেন আরো অবাক হওয়ার পালা বিভাসের, কারণ এখন সে বুঝতে পেরেছে, যে শ্রীময়ীর গন্তব্যস্থল হল সামনেই অবস্থিত আলিপুরের মহিলা সংশোধনাগার! সেখানকার গেটের সামনে এসে, দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলটিকে নিজের অফিসের পরিচয়পত্র দেখিয়ে অল্প কিছু কথা বলে উঠলো শ্রীময়ী। এরপরই কনস্টেবলটি তাদের বেশ খাতির করে এনে বসালো জেলার সাহেবের অফিস ঘরে। বোঝায় যাচ্ছে, যে শ্রীময়ীর আগে থেকেই জেলারের সাথে এপইন্টমেন্ট নেওয়া ছিলো।

বিভাস যেন এখনো বুঝতে পারছে না, যে শ্রীময়ী কোন প্রসঙ্গে এত কথা বলে চলেছে রাশভারী চেহারার জেলারটির সাথে। কথাপ্রসঙ্গে সে বলে উঠলো, “তাহলে স্যার, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমরা একবার দেখা করতে চাই ওই মেয়েটির সাথে..”
জেলারের সম্মতিতে একজন কনস্টেবল এসে বিভাস আর শ্রীময়ীকে নিয়ে চললো দুই পাশে জেলের কুঠুরির সারির মাঝ বরাবর একটি সরু রাস্তা দিয়ে। একটি জেলের কক্ষের সামনে এসে থামলো তারা, তারপর কনস্টেবলটি চলে গেল। সামনের লোহার গারদের ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে এক সাদা শাড়ি পরিহিতা নারীকে, যে সেই অন্ধকার ভরা জেলের কুঠুরির ভেতর মাথা নিচু করে হাঁটু মুড়ে বসে আছে।

“তুমি তো জানই, আমি যে এন.জি.ও-তে কাজ করি, তার মূল লক্ষ্যই হল সমাজের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের সামনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া…এই মেয়েটিও এমনই এক অভাগিনী। নিজের অত্যাচারী স্বামীকে হত্যা করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে তাকে। তাই ওকে আইনি সাহায্য দেওয়ার জন্যই আমাকে অফিস থেকে পাঠিয়েছে এখানে…ওহ, বাই দা ওয়ে, মেয়েটির তাম তুলিকা চৌধুরী…’, এক নাগাড়ে বিভাসের উদ্দেশ্যে বলে গেল শ্রীময়ী।

তাদের কথা শুনে, জেলের ভেতর বসা মেয়েটি মুখ তুলে তাদের দিকে চেয়ে দেখলো। ঠিক সেই সময় যেন একটি বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল বিভাসের সর্বশরীর দিয়ে। উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠলো তার দুই পা। দুই চোখের সামনে যেন নেমে এলো একরাশ কালো অন্ধকার। দ্রুত গতিতে নিশ্বাস নিতে নিতে, সে পেছনের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো অতি কষ্টে। এতদিন পর সে তুলিকাকে এখানে, এই পরিস্থিতিতে দেখবে…এটা যে সত্যিই ছিলো বিভাসের কল্পনাতীত!

(৬)
স্তম্ভিত হয়ে বিভাস শুধু চেয়ে রইলো তুলিকার দিকে। এ কি চেহারা হয়েছে তার! অনেকটাই রোগা হয়ে গিয়েছে তুলিকা, কতদিনের অবহেলায় এলোমেলো রুক্ষ একমাথা চুল ঢেকে রেখেছে তার মুখের অনেকটা অংশ, অযত্নে তার দুচোখের তলায় গাঢ় কালির প্রলেপ! তার আধ-ময়লা শাড়িতে আবৃত শীর্ণ দেহটি উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো জেলের দরজার কাছে। সেও একদৃষ্টে চেয়ে আছে বিভাসের দিকে, চোখে একরাশ লজ্জা এবং যন্ত্রণা। যেন কোন মন্ত্রবলে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে বিভাস, তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তুলিকার সাথে কাটানো অতীতের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিচ্ছবিগুলি! কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করে বিভাস…নিজের অজান্তেই কখন যে ভিজে গিয়েছে তার দুচোখের পাতা! শ্রীময়ী যেন কিছু বুঝতে না পারে!

শ্রীময়ীর সাথে কথোপকথনের মাঝেই তুলিকার জীবনের এক একটা দুর্বিষহ মুহূর্তের কথা পরিস্কার হয়ে উঠতে থাকে বিভাসের কাছে। বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যেই তুলিকার কাছে পরিস্কার হয়ে ওঠে, যে তার স্বামী সরকারি চাকুরে হওয়ার মিথ্যা পরিচয় দিয়েছিলো তাদের সকলের কাছে। আদপে সে ছিল এক সরকারী সংস্থায় কর্মরত ঠিকা-শ্রমিক মাত্র!
“কিন্তু তবুও আমি ওকে নিয়েই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলাম, কারণ আমি বিয়ে করেছিলাম একজন মানুষকে, তার চাকরিকে নয়!”, জেলের দরজার লোহার রডগুলোকে চেপে ধরে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠলো তুলিকা, “কিন্তু সেই সুযোগও ঈশ্বর দিলেন না আমায়! আমার প্রতি কোন অনুভুতি ছিলো না মানুষটার…মদ্যপ অবস্থায় পণের পয়সা চেয়ে প্রতিনিয়ত ওর হাতে অত্যাচারিত হতে হতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিলো আমার!…সেদিন যখন রান্নাঘরে আমার চুলের মুঠি ধরে আমার মাথাটা দেওয়ালের অপর সজোরে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হল সে, নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না আমি…কাছেই রাখা লোহার সাঁড়াশিটা দিয়ে সজোরে আঘাত করলাম ওর মাথায়!”

শেষ কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো তুলিকা। বিভাসের মনে হল, যেন এখনই ছুটে যায় তার কাছে, তাকে বুকে জরিয়ে ধরে যেন বলে ওঠে, “তুই কোন অপরাধ করিসনি তুলি, উচিৎ শাস্তি দিয়েছিস তুই লম্পটটাকে!” কিন্তু শ্রীময়ীর সামনে কিছুই বলতে পারলো না সে! যেন তার হয়েই শ্রীময়ী বলে উঠলো, “তুমি কোন চিন্তা করো না, তুলিকা…একবার যখন আমাদের সংস্থা তোমার সম্বন্ধে জানতে পরেছে, আমরা আপ্রান চেষ্টা করবো যাতে তুমি খুব তাড়াতাড়ি এখান ঠেকে মুক্তি পাও। ওহ, আমার সম্বন্ধে তো আগেই জেনেছো, তাই তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই…উনি হলেন বিভাস মজুমাদার, আমার হবু স্বামী…” শেষের কথাগুলো সে বললো বিভাসকে উদ্দেশ্য করে।

তুলিকা নিস্প্রভ চোখে শুধু চেয়ে রইলো বিভাসের দিকে, তারপর ম্লান হেসে তাকে নমস্কার জানালো। বিভাস বুঝতে পারলো, যে তার সাথে অতীতের সম্পর্কের কথা বলে তুলিকাও আঘাত করতে চায় না শ্রীময়ীকে। সেদিনের পরেও আরও বেশ কিছুদিন বিভাস একান্তে গিয়েছিলো আলিপুরের এই মহিলা সংশোধনাগারে, তুলিকার সাথে দেখা করতে। জেলের লোহার গারদের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে, তুলিকার দুই হাত চেপে ধরে সে চিৎকার করে বলেছিলো, “তুই শুধু একবার নিজে মুখে বল তুলি, সারা জীবনভর আমি অপেক্ষা করবো তোর এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য…আমি শ্রীকে সব কথা খুলে বলবো…ওকে বলবো, যে তোকে ছাড়া আর কাউকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়…”
বিভাসের কথা শেষ হওয়ার আগেই বিভাসের ঠোঁটে আঙ্গুল রাখে তুলিকা, “না বিভাসদা, না…আমার মত একজন অভাগীর জন্য শ্রীময়ীর জীবনটা নষ্ট হতে পারে না, কিছুতেই না…আমারা মেয়েরা মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারি, বিভাসদা, সে তোমাকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালবাসে! তুমি ওকেই গ্রহন করো বিভাসদা, সুখে থেকো ওর সাথে…” সজল চোখে হাস্যজ্জল মুখে বলে ওঠে তুলিকা।

বিভাসের মনে হয়, যেন একটা পাথর ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে তার বুকের ওপর! দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রতিবারই বিভাসকে ধরতে হয়েছে জেলখানা থেকে ফিরতি পথ।

(৭)
আর মাসখানেক পরেই বিভাসের সাথে শ্রীময়ীর বিয়ের দিন স্থির হয়ে গিয়েছে। দুই পরিবারের মধ্যেই সুরু হয়েছে আনন্দ উৎসব এবং সুভেচ্ছা নিবেদন। সকলের আনন্দের মধ্যেই বিগত কয়েকদিন সম্পূর্ণরূপে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে বিভাস। একবার তার মনে হয়েছে নিজের সুখ শান্তির কথা, তুলিকার কথা…আবার পরমুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে শ্রীময়ীর সরল সুন্দর মুখের প্রতিচ্ছবি। এই দোদুল্যমান টানাপোড়েনের মধ্যে জর্জরিত হয়ে, সে সুধু একটা কথাই ভেবেছে, এরপর যদি শ্রী কখনো জানতে পারে তার সাথে তুলিকার সম্পর্কের কথা, তখন সে তাকে ক্ষমা করবে তো? সাময়িক ভাবে শ্রীকে আঘাত না দেওয়ার তার এই অভিসন্ধি শেষ মুহূর্তে তিনটে জীবনকেই ছারখার করে দেবে না তো? নিজের মনেই এই কথা ভেবে শিউরে উঠেছিলো বিভাস!

ইদানিং সে বেশ কয়েকবার শ্রীময়ীর সাথে দেখা করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে, শ্রীময়ী তাকে ফোনে জানিয়েছে যে সম্প্রতি অফিসের একটি কাজে তাকে কলকাতার বাইরে বেরতে হয়েছে। এক বুক জ্বালা নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করেছে বিভাস। নিজের অফিসের কাজেও মন বসাতে পারেনি সে। বার বার ইচ্ছা করেছে তুলিকার সাথে দেখা করার। কিন্তু সেও যেন আর চায়না বিভাসের সাথে দেখা করতে, শ্রীময়ীর জন্য সে নিজের স্বার্থত্যাগ করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু এমনই একদিন সকালে অবাক হল বিভাস যখন শ্রীময়ী তাকে নিজে থেকেই ফোন করে ডেকে পাঠালো সেই পূর্বপরিচিত কফি-সপে।

তুলিকার অমতেই তার সাথে অতীতের সম্পর্কের কথা আজ খুলে বলতে হবে শ্রীময়ীকে, মনে মনে এই অভিসন্ধি নিয়েই উদ্ভ্রান্তের মত কফি-সপে পৌঁছয় বিভাস। আজ শ্রীময়ী শাড়ি পড়ে এসেছে, তার সাজপোশাকে আজ যেন এক অন্য রকম শান্ত স্নিগ্ধ আবেশ। কম্পিত হাতে চেয়ারটা সরিয়ে শ্রীময়ীর সামনে বসতে বসতে বিভাস দুরু দুরু বুকে ভাবতে থাকে কিভাবে সে সুরু করবে সব কথা। সব কিছু ঠিক ঠাক হওয়ার পর, হয়তো এতে কতটা আঘাত পাবে শ্রী! কিন্তু আজ যেন কেমন অদ্ভুত লাগছে শ্রীময়ীকে, সেই হাসি খুশি ভাবটা, সেই উচ্ছাসে ভরা অনর্গল কথা বলে যাওয়ার স্বভাবটা যেন উধাও হয়েছে তার ভেতর থেকে। যেন তার প্রতিমূর্তি জুড়ে আজ এক অনন্য বুদ্ধিদীপ্ত রাশভারী ব্যাক্তিত্ব ছড়িয়ে আছে। তাকে সব কথা বলতে চেয়েও বলতে পারে না বিভাস, তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।

বিভাসকে অবাক করে বলে ওঠে শ্রীময়ী, “আমি জানি, তুমি কি বলতে চেয়েও পারছো না, বিভাস!”
বিস্ফারিত চোখে তার দিকে চেয়ে থাকে বিভাস, শ্রীময়ী বলতে থাকে, “পুরুষের মন বোঝা আমাদের মেয়েদের কাছে তেমন কঠিন কাজ নয় বিভাস। সেদিন তুলিকার উপস্থিতিতে তোমার চোখের দিকে তাকিয়েই আমি অর্ধেক আন্দাজ করে ফেলেছিলাম তোমার মনের কথা। আর বাকি ইতিহাসটা জানতে পারলাম গতকাল, তোমার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে…মামণির কাছ থেকে! হ্যাঁ বিভাস, আমি মিথ্যা কথা বলেছিলাম তোমাকে যে গত দুই আমি অফিসের কাজে কলকাতার বাইরে গিয়েছিলাম, আসলে এই সময় আমি গিয়েছিলাম তোমার গ্রামে, তোমার ফেলে আসা অতীতের সমস্ত অজানা কথার অনুসন্ধানে…”

এক ফোঁটা জল গরিয়ে পড়লো শ্রীময়ীর চোখ থেকে, সে বিভাসের হাতদুটোকে আঁকড়ে ধরে আস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলো, “ছি! বিভাস, তুমি এতটা নীচ, এতটা স্বার্থপর মনে করেছিলে আমায়! শুধুমাত্র তোমাকে পাওয়ার জন্য তোমার আর তুলিকার জীবনটা নষ্ট করে দেব আমি! না, আমি কিন্তু এতটা খারাপ নই, বিভাস!” কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো শ্রীময়ী, বিভাসের সমস্ত শরীর যেন অবস বলে মনে হল!
চোখের জল মুছে, হাসিমুখে বলে উঠলো শ্রীময়ী, “আমি কথা দিচ্ছি বিভাস, বিচারকের সামনে তুলিকার পক্ষের উকিল হয়ে আমি নিজে লড়বো, ওকে বের করে আনবোই জেলের ওই অন্ধকার কুঠুরি থেকে…তাহলেই স্বার্থক হবে আমার ওকালতির পড়াশোনা, আমার মনুষ্যত্ব!”

বিভাস এখনো স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো, তার মনে হল যেন স্বয়ং ধরিত্রী দুই ভাগ হয়ে গিয়ে তার বুকের ওপর থেকে ভারী পাথরটিকে নিজের গর্ভে টেনে নিচ্ছে ধীরে ধীরে..

(৮)
এর পর বেশ কিছু মাস কেটে গিয়েছে। শ্রীময়ী উকিল হিসাবে সত্যিই সাফল্য অর্জন করেছে। সে আদালতে প্রমান করতে সক্ষম হয়েছে, যে তুলিকা যা করেছে তা কোন অপরাধ নয়। সে পরিকল্পিত ভাবে তার স্বামীকে খুন করেনি। যা করেছে, পরিস্থিতির চাপের শিকার হয়ে করেছে, নিজেকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানোর জন্য করেছে। তাই বিচারক যথেষ্ট দয়াপরবশ হয়েই তুলিকাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

বিচারালয়ের গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বিভাস আর শ্রীময়ী। তাদের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো তুলিকা। বিভাসের বুকে খুশি আর মিলনের সুর বেজে উঠলো। শ্রীময়ী হাসি মুখে তুলিকার হাতটি ধরে রাখলো বিভাসের হাতের ওপর, তারপর আবার সেই আগের উচ্ছাসে ভরা গলায় বলে উঠলো, “আজ আমার কর্তব্য শেষ হল, বিভাস…তুলিকাকে ফিরিয়ে দিলাম তোমার কাছে…তুলিকার মা বাবা বেঁচে নেই, তাই ধরে নাও ওর নিজের দিদি হিসাবে আমিই ওকে ‘সম্প্রদান’ করলাম তোমার কাছে…সুখে রেখো আমার বোনকে, কেমন?”

বিভাস আর তুলিকা তাকিয়ে দেখলো শ্রীময়ীর দিকে, দুজনেরই চোখে বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা। শ্রীময়ী আলতো হাতে তুলিকাকে ঠেলে দিলো বিভাসের দিকে, বিভাস নিজের প্রসারিত দুই বাহুর মাঝে জরিয়ে ধরলো তুলিকাকে। তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে শ্রীময়ী পেছন ঘুরে ফিরতি পথ ধরলো। এতক্ষণ ধরে অনেক কষ্টে নিজের চোখের জল চেপে রেখেছিলো সে, এখন আর তার অশ্রুধারা মানলো না কোন বাধা। তবুও মনে মনে বলে উঠলো সে, “ভালবাসা যে শুধু নিজের সুখ খোঁজার নাম নয়…সেটা যে অন্যকে সুখে রাখারও আরেক নাম…ভালবাসার আরেক নামই যে ত্যাগ!”

(সমাপ্ত)


প্রলয় কুমার নাথ

জন্ম ১৫ অক্টোবর, ১৯৮৭ সালে হুগলির ত্রিবেণীতে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.বি.এ পাশ করার পর বর্তমানে কলকাতার একটি ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থায় মানব সম্পদ উন্নয়ন আধিকারিক (HR Officer) পদে কর্মরত। পৈতৃক নিবাস নদীয়ার কৃষ্ণনগরে, তবে চাকরিসূত্রে কলকাতার বাসিন্দা। মূলত ভৌতিক, গোয়েন্দা এবং কল্প-বিজ্ঞানের গল্প লিখতে পছন্দ করেন। ইতিমধ্যেই কয়েকটি ওয়েব-ম্যাগ এবং মুদ্রিত লিটল ম্যাগাজিনের তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।