শ্রীপর্ণা

বর্ণালি বসাক বোস on

আজ মহালয়াভোর থেকেই টিভিতে নানারকম অনুষ্ঠান হচ্ছে । বেদান্তিকার টিভির মহালয়া দেখতে ভালো লাগেনা শুধু নাচানাচি লাফালাফি মহালয়ার মাতৃ আরাধনার সেই মুগ্ধতাই নেই । তার মনে হয় ছোটো বেলায় বাবা যখন ভোরবেলা রেডিওতে মহালয়া শুনতেন , বীরেন্দ্র কিশোর ভদ্রের কণ্ঠে সেই মহালয়ার চণ্ডীপাঠ চারিদিকে যেন সেই দিন থেকেই পূজোর হাওয়া শুরু । সেইরকম আনন্দ এখন আর সে পায় না । কিন্তু ছোটোবেলার অভ্যেস মহালয়ার দিন ভোরবেলা উঠতেই হবে ।তারপর একটু বেলা হলে সকালের জলখাবার লুচি তরকারি , দুপুরের মেনুটাও অন্যদিনের থেকে একটু আলাদা । এক কথায় মহালয়া মানেই পূজোর শুরু । জলখাবার খেতে খেতে বেদান্তিকা দেবব্রতকে বলল – জানত ছোটবেলায় ভাবতাম কেন যে মহালয়া থেকেই স্কুলটা ছুটি হয়ে যায় না ? মহালয়া মানেই তো পূজো শুরু চারিদিকে পূজো-পূজো ভাব। পড়াশুনা থেকে মনটাই উঠে যেত ।

     তাহলে তুমি মহালয়ার পরে আর পড়াশুনা করতে না মা ? পাশ থেকে ছোট্ট ছোট্ট হাতে লুচি ছিঁড়ে খেতে খেতে বলল চার বছরের তাতাই । তাহলে আমিও আর পড়ব না । একদম দুর্গা ঠাকুর যখন শিব ঠাকুরের কাছে চলে যাবে তখন পড়ব ।

    ওরে দুষ্টু । দাঁড়া দেখাচ্ছি , পড়ব না ।

এবার বেদান্তিকা দেবব্রতকে বলল – দেব চল না এবার পূজোয় কোথাও ঘুরে আসি । কতদিন আমরা বের হই না । জীবনটা কেমন একঘেয়ামি হয়ে গেছে । 

    কোথায় আর যাবে বল ? EMI তে টাকা কাটার পর কটা টাকাই বা হাতে পাই । ঐ কটা টাকায় সখ সৌখিনতা কেমন করে হবে ? তারপর লক্ষ্মী পূজোর পরে তাতাইয়ের স্কুল খুলে যাবে । আমিও তো বেশী দিন ছুটি পাব না । বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি ছুটি কোথায় ?

    না না এবার আমি কোন বাহানাই শুনব না । চল না প্লিজ দু-চারদিনের জন্যই চল । প্রমিজ করছি ঘুরতে গিয়ে কোন শপিং করব না । চল না । চল না….

    আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়াও একটু ভেবে দেখি । তিন জনের তাও কম করে হাজার তিরিশেক টাকা খরচ হবে ।

    তা হোক । শোন না আমিও অল্প কিছু টাকা জমিয়েছি । তোমায় বলিনি তাও হাজার দশেক হবে ।

    বাবা দশ হাজার ? কি আমার পকেট মেরে ?

    তোমার পকেট মেরে ? কত টাকা বাবু নিজের পকেটে রাখেন তা মেরে আমি দশ হাজার টাকা জমাব । বাবা আমায় যে হাত খরচের টাকা দিতেন তা থেকেই জমিয়ে রেখেছি ।

    আচ্ছা বাবা দেখছি কি করা যায় ।

    না দেখছি বললে হবে না এবার যাবই ।

              ঠিক হল ওরা গ্যাংটক যাবে । পূজোর চারটা দিন এবার ওরা পাহাড়ে কাটাবে । টিকিট কাটা হয়ে গেল । পঞ্চমীতে ওরা বেরোবে আর একাদশিতে ফিরবে । বেদান্তিকা ওদের জামাকাপড় , শীতের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিল । পঞ্চমীতে ওরা বেড়িয়ে পড়ল । সপ্তমীর দিন ভোরে ওরা গ্যাংটক পৌঁছে গেল । ভীষণ ঠাণ্ডা ওখানে স্নো ফল হচ্ছে । বেদান্তিকারা হোটেলে পৌঁছেই ফ্রেস হয়ে ওরে চলল নাথুলা পাসে । চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ । তুলোর মত বরফ পড়ছে ওপর থেকে সে যেন এক স্বপ্ন রাজ্য । কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ওরা হোটেলে ফিরে এল । সারাদিনের ক্লান্তিতে ওরা ঘুমিয়ে পড়ল । ঘুম ভাঙল হোটেলের বয়ের ডাকে । সে গরম চা আর পকোরা এনেছে । এমন শীতে কম্বলে বসে গরম চা আর পকোরা আহা আমেজটাই আলাদা ভাবছে দেবব্রত ।এবার সে বেদান্তিকাকে ডাকল – ওঠো চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে ।

    হোটেলের ছেলেটা দিয়ে গেল না ?

    হ্যাঁ

    আমিই ঢোকার সময় বলে এসেছিলাম ।

    বেশ করেছ মনটা একদম চনমনে হয়ে গেল (চা শেষ করে দেবব্রত বলল) চল একটু ঘুরে আসি ।

    না এখন আর ইচ্ছে করছে না ।আমি ঘরেই একটু রেস্ট নেব । তুমি আর তাতাই যাও না ।

    তোমার একা ভয় লাগবে না ? আচেনা জায়গা !

    না । তোমরা তাড়াতাড়ি চলে এসো ।

    আচ্ছা বেশ । দরজা বন্ধ করে থাকবে কেউ এলে খুলবে না কেমন ?

    আচ্ছা বাবা আচ্ছা ।

দেবব্রত তাতাইকে নিয়ে বেড়িয়ে গেল বেদান্তিকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। ভেতরে ঢুকতে যাবে এমন সময় দরজার কাছে একটি অল্প বয়সী সুন্দরী মহিলা এসে দাঁড়াল । পরনে লাল জামদানী ,চোখ দুটো সুন্দর করে আঁকা , কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ , সিঁদুরটা কপালে ত্রিভুজের মত বাড়ানো ,হালকা লাল লিপস্টিক ঠিক দুর্গা প্রতিমার মত মুখটা । বয়স পঁচিশ ছাব্বিশ হবে । প্রথমটায় বেদান্তিকা ওকে দেখে চমকে যায় । মেয়েটি বলে – ভয় পেয়ে গেলেন ?

    না মানে হঠাৎ করে দেখলাম তো ।

    আপনি ঐ দিকে তাকিয়ে ছিলেন তো তাই আমায় দেখতে পান নি । আমরা পাশের ঘরে আছি । বেড়িয়ে আপনাকে দেখলাম তাই এলাম । আপনি গেলেন না ওদের সাথে ?

    না ঘরে একটু রেস্ট করব ।

    হ্যাঁ ঠিক বলেছেন বাড়ীতে তো একদম রেস্ট হয় না শুধু কাজ আর কাজ ।

    হ্যাঁ ঠিক তাই । এসো না । এই যাঃ তোমায় তুমি বলে ফেললাম । যদিও তুমি আমার থেকে ছোটোই হবে ।

    তাতে কি হয়েছে । আমিও আপনি বলতে পারি না ।

    বেশ তো তুমিও আমায় তুমিই বলল না ।

       বেশ কিছুক্ষন ওরা গল্প করল । কত গল্প দুজনের মনের কথা প্রানের কথা । কখন যেন ওরা দুজন দুজনের মনের খুব কাছাকাছি চলে এল । হঠাৎ মেয়েটি যাবার জন্য ব্যাস্ত হয়ে উঠল বলল- “আসি হ্যাঁ । ডিনারের অর্ডার দিতে যাব ।” মেয়েটি চলে গেল । বেদান্তিকা দরজা বন্ধ করে দিল । কিছুক্ষনের মধ্যেই দেবব্রতরা এল । বেদান্তিকাকে খুব খুশী দেখে দেবব্রত বলল

    কি ব্যাপার এত খুশি ?

    হ্যাঁ একটি মেয়ে এসেছিল । অনেক গল্প করল । ওরা এই পাশের ঘরেই আছে। তোমরা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় নিশ্চই দেখা হয়েছে ? একটা লাল জামদানী পরে ছিল নিচেই তো গেল ডিনারের অর্ডার দিতে ।

    কই না তো । সে রকম তো কাউকে দেখলাম না । যাই হোক আমরা খাবার নিয়েই এসেছি । তাতাই বাবু বললেন ফ্রাইডরাইস আর চিলি চিকেন খাবে । অতঃপর তাই আনলাম ।

    বেশ করেছ । যাক বাবা আর নীচে নামতে হবে না ।

    মা কাল কিন্তু আমরা ঘুরতে যাব ।

    নিশ্চই যাব বাবা । এখন তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পর । আর কিন্তু কার্টুন দেখতে বোস না কেমন ? তাহলে কিন্তু সকালে উঠতে পারবে না ।

    জানো মা বাবা বলেছে কাল আমরা হনুমান টকে যাব । হনুমানজি নাকি সঞ্জীবনী নিয়ে যাবার সময় এখানে রেস্ট নিয়েছিল ।তারপরে আমরা সারামসা গার্ডেনে যাব ওখানে নাকি অনেক রকম অর্কিড আছে । তারপর নেহেরু বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাব ওখানে জান ওক গাছ আছে তারপর ছাঙ্গু…..

    ওরে বাবা থাম থাম তুই তো সব মুখস্থ করে ফেলেছিস দেখছি ।

পরদিন সকালে বেদান্তিকা তাড়াতাড়ি উঠে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিল ওরা একটু ব্রেকফাস্ট করে বেড়িয়ে পড়ল । অনেক ঘুরল ওরা । অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে যেন মনই ভরে না। দুপুরে বাইরে লাঞ্চ সেরে ওরা ঘরে ঢুকল। একটু রেস্ট নিয়ে দেবব্রত সন্ধ্যেবেলা আবার ঘুরতে যেতে চাইল। বেদান্তিকা আর বের হল না। তাতাই আর দেবব্রত বেড়িয়ে পরল। ঠিক তখনই মেয়েটি আবার হাজির। বেদান্তিকা অবাকই হল। মনে মনে ভাবল, “ আশ্চর্য ! মেয়েটি কি ওদের বের হওয়ার অপেক্ষাতেই ছিল ?” যাই হোক, বিদেশে একটি বাঙালী লোক পাওয়া গেলে গল্প করতে অসুবিধে কোথায়।

                 কিন্তু আজকে ওদের গল্পগুলো ছিল অন্যরকম। যেমন, জীবনের না পাওয়া, বিরক্তি, অন্যদের জন্য নিজেকে উজার করে দিতে গিয়ে নিজেকে সময় না দেওয়া। ছোট ছোট ভুলের জন্য কিভাবে অন্যরা বার বার অপমান করে। গল্প করতে করতে বেদান্তিকার মনেও যে সব অভিমান ছিল, রাগ ছিল সব বেড়িয়ে এলো। কিছুক্ষন গল্প করার পর, মেয়েটি আবার ব্যাস্ত হয়ে উঠল যাওয়ার জন্য। ঠিক তার একটু পরেই তাতাই আর দেবব্রত এলো। আজ বেদান্তিকার মুখে সেই খুশি নেই। কেমন কথায় কথায় বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। কোন কথার ঠিক মত উত্তর দিচ্ছে না। দিলেও বাঁকা বাঁকা উত্তর দিচ্ছে। দেবব্রত একটু অবাক হল। বাইরে যাওয়ার আগেও তো সব স্বাভাবিক ছিল। এইটুকু সময়ে কি আবার হল ? তাতাই মা-কে জড়িয়ে ধরে আদর করতে গেলে ওকেও বেদান্তিকা সরিয়ে দিল। আগে সে কোনদিন এরকম করেনি। কিছুক্ষন দেখে দেবব্রত বলেই ফেলল, “বেদান্তিকা ? কি হয়েছে তোমার ? এরকম ব্যাবহার করছ কেন ?”

    কেন আমি কি দাসখত দিয়ে এসেছি ? নাকি আমি নিজের মত বাঁচতেও পারব না ?

    ওভাবে কথা বলছ কেন ? তুমি যাতে ভালো থাকো আমি তো সেই চেষ্টাই করি।

    হ্যাঁ, আর আমি বুঝি কিছু করি না ।

    এখানে আমরা আনন্দ করতে এসেছি। ঝগড়া করতে নয়। তুমি তো বাড়িতেও এভাবে কখন কথা বল না। হাজার ক্লান্তিতেও তুমি তাতাই-এর ওপর তো কখন রাগ করো না।  কি এমন হল যে তুমি ছেলেটাকে ওই ভাবে সরিয়ে দিলে ? দেখত ও কেমন ভয় পেয়ে গেছে।

    আমার কিছু ভালো লাগছে না। আমি শুতে গেলাম।

    ডিনার করবে না ?

    না। তোমরা খেয়ে নাও। আমি পরে খাবো

দেবব্রত অবাক হয়ে গেল। ও তাতাইকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে নিল। রাতে দেবব্রতর ঘুম আসে না। বেদান্তিকার এই ব্যাবহারের কোন কারণ খুঁজে পায়না। পরের দিন ওরা রোপওয়ে – তে উঠবে বলে ঠিক করেছিল। কিন্তু বেদান্তিকার এরকম আচরনের পর সব আনন্দই মাটি হয়ে যায়। দেবব্রত বেদান্তিকা দুজনেই আজ দেরী করে ঘুম থেকে উঠল। দেবব্রত ঠিক করল আজ আর কথাও যাবে না। ঘরে বসে বেদান্তিকার সঙ্গে সময় কাটাবে। কিন্তু বেদান্তিকা পুরপুরি স্বাভাবিক হল না। বিকেলের দিকে দেবব্রত তাতাইকে নিয়ে বাইরে গেল। বেদান্তিকাকে বার বার অনুরোধ করল। বেদান্তিকা কিছুতেই যেতে চাইল না। দেবব্রত বলল, “ঘরে সুয়ে থাকার জন্য ঘুরতে এসেছ ? তুমিই তো পাহাড়ে আসতে চাইলে। এখন নিজেই ঘরে পরে থাকছ ! কাল রাতে ফেরার ট্রেন। কাল অন্তত একটু ঘুরতে যেও।

    ভেবে দেখব।

ওরা বের হতেই মেয়েটি আবার এলো। বেদান্তিকা মনে মনে ভেবে রেখেছিল আজ ওর বাড়ীর ঠিকানা শুনবে। এতো গল্প করল দু – দিন ধরে, কিন্তু মেয়েটির নামই শোনা হয়নি। মেয়েটি ঘরে এসে বসল ও বলল, “তোমরা কালই চলে যাবে ?”

    হ্যাঁ। তুমি কি করে জানলে ?

    আমরাও কাল যাব। আবার গিয়ে ওই একঘেয়ামী জীবন।

    হ্যাঁ। ঠিক বলেছ।

    মনে হয়না যদি শুধু নিজের জন্য বাঁচতে পারতাম ! কেউ না থাকত। একা নিজের ইচ্ছে মত চলতে পারলে কত ভালো হত, তাই না ?

কথা গুলো বেদান্তিকার কেমন যেন লাগল। ভাবল সত্যি তো ! এতদিন তো সে শুধু সংসারের অন্যদের জন্যই সময় নষ্ট করে গেছে। নিজের জন্য কিছুই ভাবেনি। এখন নিজের জন্য বাঁচা দরকার। এদের সবার থেকে দূরে থাকলেই সেটা একমাত্র সম্ভব। কিন্তু তাতাই ? ও তো কিছুতেই আমাকে ছাড়বে না ! যাবার সময় মেয়েটি বলল, “ভালো থেকো। আবার দেখা হবে। একা বাঁচ, ভালো ভাবে বাঁচ।”    

    মেয়েটির কথায় বেদান্তিকা কেমন সম্মোহিত হয়ে গেল। ওর মনের মধ্যে তখন শুধু মেয়েটির কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে। ওর কথাগুলোই বেদান্তিকার ধ্রুবসত্য বলে মনে হল। ওকেই ওর একমাত্র বন্ধু বলে মনে হল। ওর মাথায় তখন তাতাইকে পিছু ছারাবার চিন্তা। একবার ভাবে ভোরে নিজে ওদের ছেড়ে পালিয়ে যাবে। আবার ভাবে দেবব্রত ঠিক ওকে খুঁজে বার করে নেবে। বাড়ি গিয়ে তাতাই-এর স্কুল, দেবব্রতর অফিস, টিফিন করা, রান্না করা, ঘর গোছান, উফ্‌ ! আর না। পরদিন ভোরবেলা সবে আলো ফুটেছে। বেদান্তিকা তাতাইকে ঘুম থেকে তুলে হাত ধরে হাঁটতে থাকে। দেবব্রত কিছুই টের পায়না। তাতাই অর্ধঘুমন্ত। ভালো করে হাঁটতে পারছে না। বেদান্তিকা এক প্রকার ওকে টেনে ছেঁচরে নিয়ে চলেছে। হাঁটতে হাঁটতে বেদান্তিকা ও তাতাই একদম পাহারের ধারে চলে আসে। তাতাইয়ের ঘুম ভেঙে যায়। দেখে ওরা খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। তাতাই বলে, “মা ! আমরা যে পরে যাব। ওই দিকে চল। আমার ভীষণ ভয় করছে।” তাতাই বেদান্তিকাকে জড়িয়ে ধরে। পেছন থেকে একজন ডাকছে, “মেমসাব যাবেন না। পরে যাবেন। খাদে তলিয়ে যাবেন। দাঁড়ান। যাবেন না। যাবেন না মেমসাব।” বেদান্তিকা যেন কিছুই সুন্তে পারছেনা। তার কানের কাছে কেউ যেন বলছে “চলে এসো।” বেদান্তিকা আরও একটি পা বাড়াতেই যাবে। এমন সময়ে একজন ভদ্রলোক ও একজন ভদ্রমহিলা তাতাই আর বেদান্তিকাকে টেনে ধরে। বেদান্তিকার চেতনা ফিরে আসে। লোকটি বলল, “আপনি কি করতে যাচ্ছিলেন ? এতো সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা নিয়ে কেউ মরতে যায় ?” বেদান্তিকা ভাবল সে মরতে যাচ্ছিল ! কিন্তু কেন ? সঙ্গে সঙ্গে সে তাতাইকে চেপে ধরে। বলে, “তাতাই তুই ঠিক আছিস তো বাবা !”

    হ্যাঁ মা। কিন্তু তোমার কি হয়েছিল ? তুমি আমাকে খাদের ধারে কেন নিয়ে গেছিলে ?

    ও কিছু না। এমনি। চল আমরা হোটেলে ফিরে যাই।

বেদান্তিকা আর হটেলের রাস্তা খুঁজে পায়না। াঁটতে হাঁটতে সে অনেক দূর চলে এসেছে। বেদান্তিকার অবস্থা দেখে ওই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা বললেন, “আপনি হোটেলে যেতে পারবেন তো ? নাহলে চলুন। আমরা আপনাকে পৌছে দেই।” বেদান্তিকা আর আপত্তি করল না। সে বুঝল হোটেলে সে একা পৌছোতে পারবেনা। এক সঙ্গে তারা হোটেলে পৌছাল। বেদান্তিকা ওনাদের ঘরে আসতে বললে ওনারা এলেন না। এদিকে দেবব্রত উঠে বেদান্তিকা ও তাতাইকে খুঁজতে শুরু করেছে। বিদ্ধস্ত অবস্থায় বেদান্তিকা তাতাইকে নিয়ে ঘরে এসে বসল। রিসেপশানে বেদান্তিকার আসার খবর পেয়ে দেবব্রত ঘরে এলো। বেদান্তিকা দেবব্রতকে ধরে কাঁদতে শুরু করল। দেবব্রত বুঝতে পারলনা কি হয়েছে। বেদান্তিকা একটু স্বাভাবিক হলে সে নিজেই বলতে শুরু করে, “দেব ! আমি আজকে সর্বনাশ করে ফেলতাম। আমি তাতাইকে নিয়ে পাহাড় থেকে লাফ দিচ্ছিলাম।”

    কি !? কি বলছ এসব !? এই কাজ করার মত কি হয়েছে !? বেদান্তিকা, আমি কি করেছি ? গতদুদিন তোমার আচরণের কোন কারন খুঁজে পাইনি আমি আর আজ………

    না না তুমি কিছু করনি। ঐ, ঐ মেয়েটাই তো আমায় বলল একা বাঁচার কথা। ওর কথায় যেন জাদু ছিল। সব ভুলে ওর কথাগুলোই আমাকে সবসময়ই তাড়া করে বেড়াত।

    একা কি বাঁচা যায় বেদান্তিকা ? তুমি ভাবতো তোমাকে ও তাতাইকে ছাড়াকি আমি বাঁচতে পারব ? তুমি কি আমাদের ছাড়া বাঁচতে পারবে ? আর তোমার বাবা-মা ! তাদের কথা তুমি একবারও ভাবলে না ?

    অত কিছু ভাবার অবস্থায় আমি ছিলাম না।

    কে বলতো মেয়েটা ? আমি দেখি কেন ও আমাদের এতো বড় সর্বনাশ করতে চেয়েছিল ?

    এইতো পাশের ঘরেই ওরা উঠেছে।

    পাশের ঘর মানে ? ২০৩ নম্বর রুম ?

    হ্যাঁ।

দেবব্রত সোজা রিসেপশানে চলে যায়। সবকিছু বলে। কিন্তু রিসেপশানে ও যা শোনে তাতে সে আরও অবাক হয়ে যায়। ও জানতে পারে হোটেলের ২০৩ নম্বর রুমটি দু-বছর ধরে বন্ধ। সেখানে কাউকে থাকতে দেওয়া হয়না। এর থেকে বেশি ওরা কিছু বলতে চাইল না। ঘরে এসে দেবব্রত বেদান্তিকাকে বলল, “মেয়েটির বাড়ি কোথায় বলতো ?”

    বর্ধমান।

মনে মনে বেদান্তিকা ভাবল, “ভাগ্যিস কাল ওর বাড়িটা শুনেছিলাম।”

দেবব্রত বলল, “আমরা কলকাতায় নামব না। বর্ধমানে যাব। ঐ মেয়েটিকে ধরতেই হবে। আমি থানায় ওর নামে এফ.আই.আর [FIR] করব। এতো ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারবে। না না। এরকম খতরনাক মেয়েকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবেনা।”

               ওরা সোজা বর্ধমান এলো। বর্ধমান হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজের পাশে বাড়ী। নাম শ্রীপর্ণা ঘোষ। স্টেশনে নেমে অটো করে মেডিকেল কলেজের সামনে নামল ওরা। সামনেই একটা দোকান। দোকানে গিয়ে দেবব্রত দোকানদারকে জিজ্ঞেশ করল, “দাদা। এখানে শ্রীপর্ণা ঘোষের বাড়ী কোনটা জানেন ?” দোকানদার একটু অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন দেবনব্রতর দিকে। তারপর বললেন, “ঐ যে হলুদ বাড়ীটা দেখছেন। ওটা।” ওরা বাড়ীর ভেতরে ঢোকে। দরজায় কোন তালা নেই। ঘরবাড়ি ধুলোয় ভর্তি। উঠোনে পাতা পরে নোংরা হয়ে আছে। যেন কতদিন কারও হাত পরেনি ঐ বাড়িতে। বেদান্তিকা ডাকতে ডাকতে ঢুকল, “শ্রীপর্ণা ! শ্রীপর্ণা ! কোথায় তুমি ? বাইরে এসো। তুমি বন্ধু সেজে আমার অনেক বড় ক্ষতি করতে চেয়েছিলে। আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি ? বাইরে এসো। উত্তর দাও !”

                      কথা বলতে বলতে ওরা শ্রীপর্ণাদের বাড়ীর একদম ভেতরে ঢুকে পরল। ভেতরে ঢুকে বেদান্তিকা একদম বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পরল। একি এটা কার ছবি ? কিন্তু ছবিতে মালা কেন ? এযে শ্রীপর্ণার ছবি। তাহলে কি শ্রীপর্ণা বেঁচে নেই ? কিন্তু ওযে গত পরশুও আমার সঙ্গে কথা বলল। কিন্তু ছবিটাতো দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিনের। কেমন ধুলো জমে গেছে। বেদান্তিকার গায়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল । পাশের ঘরে চোখ যেতেই ড্রেসিং টেবিলের ওপরে রাখা আর একটা ছবির ওপরে চোখ পড়ল । কাছে গিয়ে ফ্রেমে বন্দি মানুষ গুলোকে দেখে আঁতকে ওঠে বেদান্তিকা । আরে এঁরা তো সেই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা যারা তাতাই আর বেদান্তিকাকে বাঁচিয়ে ছিল । বেদান্তিকা ভাবল ওনারা হয়তো এখন গ্যাংটকে থাকেন । বেদান্তিকা দেবব্রতকে শ্রীপর্ণার ছবিটি দেখিয়ে বলল , “ এই যে শ্রীপর্ণা যে প্রতিদিন তোমরা বেড়িয়ে যাবার পর আমার সঙ্গে গল্প করতে আসত । প্রথমে ভালো গল্প তারপর নিরাশ করে দেওয়ার গল্প তারপর নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্ররোচনা । ” কোন হিসেব মেলে না বেদান্তিকার । এক রহস্যের সমাধান খুঁজতে এসে আরও গভীর রহস্যে ঢুকে যায় ওরা । দিগ্‌বিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে ওরা ঐ বাড়ী থেকে বেড়িয়ে এলো। সামনেই একটা চায়ের দোকান দেবব্রত ওদের নিয়ে চা খেতে যায় । হঠাৎ দেবব্রতর মনে হল এই চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে দেখা যাক যদি কিছু জানা যায় । দেবব্রত দু কাপ চা ও তাতাইয়ের জন্য দুটো বিস্কুট অর্ডার দিল । চায়ের দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে দেবব্রত দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, “ দাদা ঐ হলুদ রংয়ের বাড়ীটা কাদের ? আপনি কি ওঁদের চেনেন ?”

    আপনি কি প্রতাপ বাবুর কথা জিজ্ঞেস করছেন ?

    ওনার নাম তো জানি না । ওনাদের সম্পর্কে একটু জানতে পারলে ভালো হত।

    হ্যাঁ খুব ভালভাবে চিনি । খুব ভালো লোক ছিলেন জানেন ! এমন লোকের এরকম পরিণতি ভাবা যায় না ।

    দয়া করে একটু খুলে বলবেন ?

    কেন বলুন তো ?

    আগে আপনি বলুন ।তারপর আমি সব বলছি ।

    কি আর বলব দাদা । প্রতাপবাবু ডাক্তার ছিলেন । বড় ভালো মানুষ । ভীষণ পরপোকারি লোক ছিলেন । সকলের দুঃখ কষ্টে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন । ওনার একটাই মেয়ে শ্রী । শ্রীপর্ণা । খুব ভালো মেয়ে ছিল । বাবা মায়ের খুব আদরের মেয়ে । মেয়েটি যেন রুপে লক্ষ্মী গুনে সরস্বতী । যেমন পড়াশুনায় তেমনি গানের গলা । প্রতাপ বাবু মেয়েকে বিয়ে দিলেন তারই জুনিয়র এক ডাক্তারের সঙ্গে । প্রথম দিকে ভালো থাকলেও কিছুদিন পর থেকেই শ্রীর ওপর শুরু হয় অকথ্য অত্যাচার । শুনেছি শ্রীকে নাকি ওরা মারধরও করত , ঠিক মত খেতে দিত না । ভাবুন তো বাবার বাড়ীতে যে নাকি এক গ্লাস জল ভরে খায় নি সে মেয়ে কি করে এত কষ্ট সহ্য করবে ? দু বছর আগে শ্রী ওর শশুরবাড়ীর লোকেদের সঙ্গে সিকিম গ্যাংটক ঘুরতে যায় । শুনেছি ওখানে গিয়ে শ্রী নাকি পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে । প্রতাপবাবু ও তার স্ত্রী মেয়ের দেহ শনাক্ত করে মেয়েকে নিয়ে আসে । মেয়ের কাজ ওনারা দুজনে মিলে করেন । তারপরের দিন ওনাদের ঝুলন্ত দেহ ওঁদের বাড়ী থেকে উদ্ধার হয় ।

    তার মানে ওনারাও বেঁচে নেই ?

    না । কিন্তু কি ব্যাপার বলুন তো ? ঠিক এক বছর আগে এ রকম সময় আপনাদের মত দুজন এসেছিলেন ।তারাও এসে শ্রীর কথা জিজ্ঞেস করেছিল। আমি ভেবেছিলাম শ্রীর কোন বন্ধু হবে হয়তো । হয়তো শ্রীর মৃত্যুর খবর জানেনা ।

বেদান্তিকা চায়ের দোকানদারকে সব খুলে বলল । সব শুনে ভদ্রলোক একেবারে অবাক হয়ে গেলেন তিনি বুঝতে পারলেন কেন তালা লাগান না থাকলেও এই বাড়ীতে চুরি হয় না ।

            সব শুনে বেদান্তিকা ও দেবব্রতর মনটা খারাপ হয়ে গেল । ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তাড়া বাড়ী ফিরে গেলএবারের পাহাড়ের ঘোরাটা ওদের চিরস্মরণীয় হয়ে থাকল।

 

 

সমাপ্ত 

Categories: গল্প

বর্ণালি বসাক বোস

বর্ণালি বসাক বোস একজন পুরপুরি গৃহবধূ । রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাষ্টার ডিগ্রি করেছেন বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে । ছাত্রজীবন থেকেই লিখতে ভালোবাসেন । স্বামীর উতসাহে, ছেলের উদ্দীপনায় ও ভাগ্নির আব্দারে আবার লেখার জীবনে ফিরে আশা । সংসারের কাজের ফাঁকে গান আর লেখা তার সঙ্গী । সমাজের চারিপাশের বিভিন্ন রকম চরিত্র যেটা তার মনকে নাড়া দেয়, তাই নিয়েই তিনি লিখতে ভালোবাসেন । এসবের পাশাপাশি সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন । এতদিন স্বামীই ছিলেন তার লেখার একমাত্র পাঠক তারই অনুপ্রেরণায় আজ এই লেখা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রকাশিত । বাবা, মা এবং শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদকে ও ছোট বোনের ভালোবাসাকে জীবনের পাথেয় করে চলতে চান ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।