শেষ থেকে শুরু

কৌশিক দে on

চরম কল্পনা বিলাসীর সংজ্ঞা যদি প্রস্তুত করা হয় তবে তা করা উচিত আমাদের গল্পের নায়ক রাজদীপ দাস কে দেখে। পার্থিব কোনও চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ,টানাপোরান কোনো ভাবেই তার মনে সামান্যতম আঁচড় কাটতে পারেনা।সে থাকতো তার নিজের কল্পনার জগতে।সুদর্শন আর মিষ্টভাষী রাজদীপকে প্রায়ই রমনীরা মন দিয়ে ফেলতো।তবে টিকত না কেউই।এর কারণ ছিল রাজদীপের চরম উদাসীনতা।

রাজদীপ তার সেই কল্পনার জগৎটা নিজের মনের মতো সাজিয়েছিল।সেই জগৎ ছিল অতিব সুন্দর।চারিদিকে শুধু বসন্ত আর বসন্ত।হাজার রকমের রঙ বেরঙের ফুল,পাখি আরও কত কি ছিল সেখানে।আর এ সব কিছুর মাঝে জ্বল জ্বল করতো তার মনের মাধুরী -‘চন্দ্রিমা’।যাকে সে অনেক সময় নিয়ে এঁকেছিল।দেবদারু আর কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়াল থেকে তার চন্দ্রিমা তাকে ডাকতো।দুজনে গল্প করতো,খেলতো, মাঝেমাঝে মান অভিমানের পালাও চলতো।এই নিয়েই বেশ ছিল রাজদীপ।তবে মাঝে মাঝেই এক প্রকান্ড বাজ পড়তো তার সেই স্বপ্নের দুনিয়ায়।সব কিছু ছাড়খার হয়ে যেত চারিদিকে।আবার শুরু হতো তার স্বপ্ন বোনা।

স্বপ্নের সেই চন্দ্রিমা – যাকে দেখে সে এঁকেছিল তার নাম ছিল ‘অনুরিমা’।যদিও বয়সে অনুরিমা বছর পাঁচেকের বড় ছিল রাজদীপের থেকে কিন্তু তাতে ক্ষতি কি!ভালোবাসা বয়স দেখে হয় নাকি!আসলে অনুরিমা আর রাজদীপের বাবারা ছিলেন ছোট বেলার বন্ধু।তাই দু বাড়ির মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়।আর তাদের বাবারা ছিলেন দাবা খেলার ভক্ত।রোজ রাতে বসত দাবার আসর অনুরিমার বাড়িতে।দু বাড়ির মধ্যে খুব একটা দূরত্ব ছিলোনা।প্রায় দিন রাজদীপ কে রাতে যেতে হতো তার বাবা কে ডাকতে অনুরিমাদের বাড়িতে।

অনুরিমার প্রতি রাজদীপের প্রেম শুরু হয় এক মহালয়ার সকালে।রাজদীপ তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে।তার যৌবনের লাভা যেন একটা গোটা গ্রহকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে তখন।যাইহোক,সকালের পুজোর প্রসাদ দিতে আসে রাজদীপ , অনুরিমার বাড়িতে।একতলা বাড়ির এক জানালার সামনে সেদিন অনুরিমা মাথার চুল বাঁধছিল আর গুন গুন করে কি যেন একটা গাইছিল।গায়ের রঙ চাপা।চোখ দুটি তার হরিনের মত চঞ্চল।কখনও স্থির থাকেনা।তবে তার শরীরের সব চেয়ে আকর্ষণের বস্তু ছিল তার মাথার কালো ঘন চুল।যা রাজদীপের সব চেয়ে ভাললাগত।অমন মায়াবী ঘন চুল সে আর দেখেনি।যেন মনে হতো প্রকান্ড কোনো এক গিরি শিখরের চূড়া থেকে বয়ে আসা এক ঝর্ণা,যা পাথরের ঘায়ে আছড়ে পড়েছে তার কোমরের নিচ পর্যন্ত।

রাজদীপ তার চন্দ্রিমাকেও বলেছিল এমন চুল রাখতে কিন্তু জানা নেই সে তাতে সম্মতি দিয়েছিল কিনা।এরপর থেকে সে অনুরিমাদের বাড়িতে প্রায় যেত।সকাল বিকেল রাত যখনই সময় পেত গিয়ে গল্প জুড়তো তার স্বাদের অনুরিমার সাথে।মনে মনে সে এটাও জানতো যে ওই মানুষটাকে সে কোনোদিন পাবেনা।একেই বয়সে বড়, তার উপর দু বাড়ির সম্পর্ক।তাই চুপচাপ ভালোবেসে চললো তার অনুরিমাকে। এদিকে তার স্বপ্নের জগৎ অনেকটাই স্ফিত হয়ে উঠেছিল।কিছু গাছ কেটে সে একটা প্রকান্ড বাড়ি বানায় সেখানে।যার রঙ দেয় সাদা।ধপ ধপে সাদা।তার চন্দ্রিমা কে নিয়ে সে থাকতো সেখানে।

দিন যতই এগোলো অনুরিমার প্রতি আসক্তি তার বেড়েই চললো।এখন সে একদিনও তাকে না দেখে থাকতেই পারেনা।তাই রোজ যেত তাদের বাড়িতে।মনে মনে সে ঠিক করে ফেলে যে ভাবেই হোক মনের কথা তার অনুরিমাকে জানবেই।ফল যাই হোক না কেন।এভাবেই একদিন পুজোর ঠিক পরে পরেই ঠিক হয় অনুরিমাদের বাড়িতে পিকনিক হবে।দুই বাড়ির লোক জড়ো হয় অনুরিমাদের বাড়িতে।রাজদীপ ভাবে এই সুযোগ,আজকেই সে বলবে তার মনের কথা।এর পর যদি দেরি হয়ে যায়।রাজদীপের সাথে কথা বলতে বলতে অনেক সময় অনুরিমা তাকিয়ে থাকতো তার দিকে।কি যেন ভাবতো।কে জানে!তবে ওইটুকু সময় তার হরিনের চঞ্চল চোখ পুরো স্থির হয়ে থাকতো।যদিও রাজদীপের নজরে সেটাও পড়েছিল।তাই ধীরে ধীরে তারও সাহস বাড়তে থাকে।

পিকনিকের দিন ঠিক হয়েছিল লক্ষ্মী পুজোর ঠিক পরের দিন অনুরিমাদের বাড়ির ছাদে।খুব আনন্দে কাটে গোটা দিন দু জনের।অনেক গল্প হয়,হাসাহাসি হয় আর হয় চোখাচুখি।পিকনিক শেষ হয় বিকেলের দিকে।দুজনের বাড়ির লোক নিচে চলে আসে আর আড্ডায় জমে ওঠে।রাজদীপ দেখে ছাদের সিঁড়ির কোন থেকে অনুরিমা তাকে ডাকছে-নিঃশব্দে,হাত নাড়িয়ে।মুহূর্তে বিদ্যুৎ খেলে যায় রাজদীপের গোটা শরীরে।চুপিসারে তারা ওঠে সিঁড়ি বেয়ে।ছাদের দরজার সামনে আসতেই অনুরিমা হাত চেপে ধরে রাজদীপের আর বলে -” কি রে আমায় ভালোবাসিস?বিয়ে করবি নাকি আমায়?”
উত্তরে রাজদীপ কি বলেছিলো তা অপসঙ্গিক তবে তার ঠিক পরেই ধীরে ধীরে সে হাত বাড়ায় অনুরিমার কোমরের দিকে।আর তখনই-
প্রকান্ড এক বাজ পরে তার মাথায়।চিৎকার করে ওঠে রাজদীপ –

” না না আমায় ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও।ওই যন্ত্রটা আমায় মাথায় লাগিও না, আমার খুব কষ্ট হয়, খুব কষ্ট হয় –”
বলতে বলতে আর একটা ইলেকট্রিক শক।নিস্তেজ হয়ে পরে রাজদীপ।কোনোরকমে একটু চোখ খুলে দেখে সামনেটা ঝাপসা,অস্পষ্ট।পাশে বসে চন্দ্রিমা অঝোরে কাঁদছে আর শক্ত করে তার হাত ধরে বলে চলেছে –
“কি রে চোখটা খোল, দেখ আমি এসেছি তোর চন্দ্রিমা এসেছে।আমি সব ছেড়ে এসেছি।কি রে শুনতে পাচ্ছিস,চোখ খুলে দেখ আমায়।শুনতে পাচ্ছিস।না না, না রাজদীপ ঘুমোস না,রাজদীপ ঘুমোস না,রাজদীপ,রাজদীপ ….”

ঘুমের কোলে ঢোলে পরে রাজদীপ।আবার স্বপ্ন বোনা শুরু হয় তার।তবে এবারে তার ‘অনুরিমা’ চরিত্রের নাম দেয় – ‘ মধুরিমা ‘।।



কৌশিক দে

কবি ও সাহিত্যিক কৌশিক দে'র জন্ম কলিকাতার দূর্গানগর নামক স্থানে।কিশোর বয়সেই কবিতা ও গল্প লেখা শুরু করেন। প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর স্বনামধন্য বেশ কিছু পত্রিকায় গল্প ও কবিতা প্রকাশ হয়ে চলেছে। বর্তমানে ইনি কলিকাতার একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে মানবাধিকার বিভাগে কর্মরত।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।