রবীন্দ্রনাথের একটি অপ্রকাশিত মিটিং

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

সম্পূর্ণ নাটকটা একটানা পড়লেন রবীন্দ্রনাথ।এখন অনেক রাত।তার এই লেখার ঘরে এসেছে নন্দিনী,কিশোর,অধ্যাপক,বিশু,ফাগুলাল
,সর্দার,চন্দ্রা,মোড়ল, রঞ্জন !

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে রবীন্দ্র নাথ বললেন, আমি দুঃখিত, তোমাদের আবার এখানে ডাকবার জন্য। এই নাটকটার উপরে ক্ষণে ক্ষণে আমি তুলি বুলাচ্ছি। এতে তার রঙ ফুটছে বলেই বোধ হচ্ছে। তাইতো?
— আমার তা মনে হয় না, বেশ জোরের সংগে বলল রঞ্জন।
সকলে রঞ্জনের দিকে তাকাল। রঞ্জন এইটুকু বলতে পেরে খুব খুশি। আজ সাত নম্বর মিটিং, অবশেষে সে বলতে পেরেছে!
রবীন্দ্রনাথ আগের মতই শান্ত, তার মুখে লেগে আছে অদ্ভুত প্রশান্ত ভাব। আর কেউ কিছু বলতে চাও।
রঞ্জন বাদে সব্বাই একসংগে বলল, আমরা খুশি। আমাদের কিছু বলবার নেই!

রঞ্জন বলল আমার বলবার আছে,আমায় কেন ডাকা হল বুঝতে পারলাম না। যেখানে নাটকে আমার একটা ডায়লগ নেই… আমি নেই আমার ডেডবডি আছে।বারবার পাল্টানো সত্বেও আপনি রঞ্জনকে বাঁচালেন না।
রবীন্দ্রনাথ হাসি মুখে উত্তর দিলেন, রঞ্জন তুমি আছ, সবটা জুড়ে আছ।

— আপনি যক্ষপুরী থেকে নন্দিনী এক, দুই করে আজ বলছেন নাটকের নাম রক্তকরবী। এত কিছু যখন ভাবছেন ঠিক তখন আমি বার বার কেন মৃত!

নন্দিনী অবাক চোখে তাকিয়েছিল রঞ্জনের দিকে,সে বলল, তার ছেঁড়া লোকের মত কথা বলছ কেন রঞ্জন? এটা নাটক!এটা পরিণতি।

রঞ্জন বলল,বাহ্, অসাধারণ! তুমি বারবার আমায় বলেছ, রঞ্জন তুমি বেঁচে উঠবে।তুমি মরতে পার না। সব মিথ্যে ছিল!

নন্দিনী ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,মিথ্যে নয় সব সত্যি, আমি চাই সকলের মধ্যে আমার বীর রঞ্জন কে ফিরিয়ে আনতে।তোমার মধ্যেও।

চেয়ারের হাতলে চাপড়ে রঞ্জন বলল, ঢপ দেবে না নন্দিনী,একদম ঢপ দেবে না। আমি বীর হতে চাই না, তোমায় চাই। আর তুমি সেই লোকটার পক্ষ নিচ্ছ যে আমাদের এক হতে বাধা দিচ্ছে। আমার মেরে ফেলছে!ওনাকে কিছু করতে বলো।দুটো সিন দিক, দুটো গান দিক।

রবীন্দ্রনাথ শান্ত গলায় বললেন, তা হয় না রঞ্জন।যেটা গূঢ় তাকে প্রকাশ করলেই তার সার্থকতা চলে যায়।হৃৎপিন্ডটা পাঁজরের আড়ালে থেকেই কাজ করে।

রঞ্জন মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি, সে উঠে দাঁড়ায়।বলে, আমার বন্ধুরা আপনাকে বুর্জুয়া কবি বলে, ঠিক বলে।যাবার আগে আমি নন্দিনীর কাছে জানতে চাই সে কী চায়। রাজার কাছে থাকবে না রঞ্জনের পাশে?
নন্দিনী অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, এত দিন তোমায় খুঁজছি, আজ সামনে পেয়ে মনে হচ্ছে তুমি অচেনা।যেন তুমিই রাজা!
রঞ্জন কঠিন স্বরে বলে,এখনো অনেক ভাঙা বাকি। এই নাট্যকার আসলে রাজা, সে আমাদের ডাকে রাজাকে ডাকে না কখনো।তুমি আমার সংগে চল নন্দিনী।
— না। তুমি যাও।
— কাজটা ভাল করলেন না রবীন্দ্রনাথ! সরল মেয়েটার মাথা দখল করেছেন। আপনার জন্য মায়া হয়।
রবীন্দ্রনাথ মনে মনে হাসছেন, হায়! যা ভেবেছিলেন তাই হচ্ছে, পালা শেষ হলে ভিখ মিলবে না,কুত্তা লেলিয়ে দেবে। পালাটিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করবে। ভরসা একটাই, তিনি জানেন কেউ কোথাও দাঁত ফোটাতে পারবে না।
রঞ্জন বলেই চলে,রবীন্দ্রনাথ আপনি আমায় ভুলে যাবেন, আমি আপনাকে ভুলছি না।হেরে যাবার যন্ত্রনা নিয়ে বার বার মনে করিয়ে দেব আমি কে? দেখবেন, যুগে যুগে রঞ্জন আসবে।সাবধান।রঞ্জন হইতে সাবধান।
রঞ্জন চলে যায়।

নন্দিনী বলে, এবার তবে বিদায় দিন কবি।আমাদের যক্ষপুরীতে ফিরতে হবে। জানি রঞ্জন আসবে না তাই আমাদেরই আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে। যাই।
সব্বাই উঠে পড়ল।
রবীন্দ্রনাথের চোখ ঝাপসা হয়ে এল, বললেন, চলেই যাবে…..যাও।


শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।