যতীন ও তার ভীতু বন্ধুরা

বরুণ তালুকদার on

ছোটবেলা থেকে যতীন পড়াশোনায় খুব একটা দড় ছিলনা । প্রাইমারি স্কুল থেকেই স্যারেরা কান মলে দিয়ে বলতেন তোর দ্বারা কিস্যু হবে না । তারপর যতদিন গিয়েছে , মানে মাধ্যমিক আর কি … যতীন এই ডায়লগ শুনে শুনে এমন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে তার মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণাই হয়ে গিয়েছিল যে তার দ্বারা কিস্যু হবে না । প্রথম প্রথম মনটা খারাপ হলেও পরের দিকে যখন শুনত তখন একগাল হাসি উপহার দিত ভবিষৎবক্তাকে । ইংরেজি প্রাইভেটে , তখন যতীন ক্লাস ইলেভেন পড়ে , রনজিত স্যার একঘর ছেলেমেয়ের সামনে যতীনকে ট্রান্সলেশন ধরলেন , মহাত্মা গান্ধি সত্যের সেবক ছিলেন । যতীন বেশ খানিকটা মাথা চুলকে বলল , মহাত্মা গান্ধি ট্রুথ সার্ভিস পাস্ট । রনজিত মাস্টার সেই ট্রান্সলেশান শুনে যেই বলেছেন , যতীন তোর দ্বারা পড়শোনা হবে না । তুই ব্যবসা কর । তোর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আছে । তোর উন্নতি হবে – কথাটা যতীনের মনে ধরল ।

যতীন প্রথমে স্থানীয় দাদাদের ধরে একটা স্টক বিজ়নেসের লাইসেন্স বের করে নিল । তারপরে শুরু করল ধান চালের ব্যবসা । প্রাইমারি লেভেল থেকে সে যতজন স্যারের কাছে পড়েছে সে স্কুল হোক আর হাই স্কুল , সব স্যারের বাড়িতে গিয়ে সে হাসিমুখে উপস্থিত হত । ছেলেবেলা থেকে তার মাথায় পড়াশোনার বুদ্ধি না থাকলেও একগাল হাসি ছিল একেবারে পেটেন্ট । স্যারেরা কান মলে দিলেও সে কানে হাত বোলাতে বোলাতে হাসত । সেই হাসিমুখে সে স্যারেদের কাছে দাবী করে বসল , স্যার জানেনই তো আমার দ্বারা কিস্যু হবে না । আপনিই হাজার বার বলেছেন । আর গুরুবাক্য মিথ্যে তো হয় না স্যার । তাই আমার সত্যিই কিছুই হয়নি । এখন আমি কি করি বলুন ! স্যার তো মহা ফাঁপড়ে পড়ে যান । শিক্ষক হিসেবে নিজের ব্যর্থতা যে এভাবে দোড়গোড়ায় এসে উপস্থিত হবে তা কে চিন্তা করেছিল । যেন সব অপরাধ তাঁরই । তা মুশকিল আসান যতীনই করে দেয় । দেখুন স্যার , আমার ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে । স্যার তো আঁৎকে ওঠেন । একি রে বাবা । আর. টি. ই. তে মামলা করবে নাকি । শিক্ষার অধিকার আইনে তো এমন কতই ধারা রয়েছে । ফাঁকিবাজি প্রমান করতে পারলে রাষ্ট্রেরই জেল খাটার জোগাড় , মাস্টার কোন ছাড় ।

-দ্যাখ বাবা , রিটায়ারমেন্টের আর কটা দিন বাকি আছে । এখন কি করতে পারি বল । এখন তো তোর নতুন করে পড়াশোনা করার ধৈর্যও নেই বাবা । আমারও দম নেই আর ।

– না না স্যার আমাকে আর পড়িয়ে ধন্য করতে হবে আপনার । আপনি শুধু আমার কাছ থেকে মাসে মাসে চালটা নেবেন । একটু গুরুসেবাও হবে আবার আমার ভবিষ্যতটা যাহোক একটা খাতে বইবে ।

স্যার হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন । এ আর এমন কি কথা হল । যতীন চাল দেবে । চালে কাঁকড় থাকলে তার কান মুলে দেবেন আবার । এই সম্ভাবনায় তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন । সে দিস না হয় । বাড়ি বয়ে দিয়ে যাবি তো বাবা । দাম বেশি নিবি না তো ।

– কি যে বলেন স্যার কোন বেগড়বাই দেখলেই কান ধরে ওঠবস করাবেন স্যার আমাকে । এই দোরগোড়ায় । কথা দিলাম । তা এই করেই যতীনের প্রথমেই চালের ব্যবসা জমে গেল । তারপর স্যার , স্যারেদের শালা , শালাদের ভাই । ভাইএদের শালা , তাদের ভাই…. যতীনের কাস্টোমার বাড়তেই থাকে । যতীন প্রথমে একটা ছোট ভ্যান গাড়ি কিনল । তাতে বেশিদিন পোষালো না । তাকে ম্যাটাডোর কিনতে হল । এর মধ্যে টুক করে তার একটা বিয়েও ঠিক হয়ে গেল । কেননা যতীনের বাড়ির বয়স্করা যতীনের এমন ঊর্ধগতি আর ধরে রাখতে পারছিল না । আরেকটা লাগাম খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল  । ষোল বছর বয়েসে যে ম্যাটাডোর ভ্যান কেনে সে ত্রিশ বছর বয়েসে কি করবে কে জানে ।  একদিন চিতল মাছের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খেতে খেতে যতীন মাকে বলল , এই চালের ব্যবসা ছেড়ে দেব মা । খিদিরপুর চলে যাব । দেখি যদি একটা জাহাজ কিনতে পারি । বেশ আমাদের একটা জাহাজ থাকবে । তুমি জাহাজের ডেকে বসে উল বুনবে । যতীনের মা প্রমাদ গুনলেন । তিনি কচি বয়েসে টাইটানিক সিনেমাটা দেখেছিলেন স্বামীর সাথে সিনেমা হলে গিয়ে । তলা ফুটো হয়ে মরে গিয়েছিল প্রায় সবকটা । যেদিন যতীনের বন্ধুরা কপালে চন্দন ফন্দন মেখে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে যতীন সেদিন ঠাকুমা , মা , বাবা এদেরকে নিয়ে মেয়ে দেখতে চলেছে কোন গ্রামের দিকে ।

বয়েস বাড়িয়ে যতীনের বিয়েটা হয়েও গেল । তার বউ এমন সুন্দরি হল যে যতীন তার শরীর থেকে কেবলই তুলাইপাঞ্জি চালের গন্ধ পেতে লাগল । তুলাইপাঞ্জি চালের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে যতীনের একটা ছেলেও হয়ে গেল । যতীন তার শরীর থেকে বাসমতি চালের গন্ধ পেতে লাগল । তা এই চালের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে যতীনের মনে ভয় এল । কি যে , এই চালের গন্ধ অটুট থাকবে তো ! পোকা লাগবে না তো । যতীন মাঝরাতে আর বিন্দাস ঘুম দিত না । মাঝে মাঝে চমকে চমকে জেগে উঠত । আলগোছে ছেলে আর বউএর গায়ে হাত বুলিয়ে দিত । আর ভাবত এদের আভাঙা দানা হিসেবে সে কি করে রক্ষা করবে । একটা কাঁকড় মেশানো চলবে না । যতীন আলতো করে বাচ্চাকে পাশ ফিরিয়ে দিত । পঁচিশ বছর বয়েসে আমরা দেখতে পাচ্ছি যতীনের যা যা সম্পত্তি হয়েছে তার তালিকা বেশ দীর্ঘ । যেমন-

১. পাঁচটা লড়ি । বাইরে থেকে চাল আনার জন্য ।

২. পাঁচটা ম্যাটাডোর ভ্যান । বাড়ি বাড়ি চাল পৌঁছানোর জন্য ।

৩. তিনতলা একটি বাড়ি । একতলায় মা থাকে । দোতলায় যতীন থাকে বৌ ছেলে নিয়ে । তিনতলায় ফাঁকা ঘর । ________ দফতরের অফিসারেরা এলে তাদের আপ্যায়নের নানা ব্যবস্থা সেখানে করে রাখা আছে ।

৪. একটা বড় গুদাম । সেখানে বিভিন্ন জাতের চাল থাকে । তুলাইপাঞ্জি , বাসমতি তো আছেই । তাছাড়া নানা জাতের চাল সে মজুত করেছে । তাদের নাম সে নিজেই দিয়েছে । যেমন  হাই স্কুল টিচার চয়েস ।প্যারা টিচার চয়েস । প্রাইমারি মাস্টার চয়েস । অফিসার চয়েস । প্রফেসর চয়েস । রিটায়ার চয়েস । সেন্ট্রাল ডিএ চয়েস । স্টেট ডিএ চয়েস । মিড ডে মিল চয়েস । খাপে খাপ – পল্টুর বাপ ।

৫. শ্বশুর বাড়ি সংলগ্ন ধানি জমি আছে কয়েক বিঘা । সেখানে জৈব উপায়ে ধান চাষ হচ্ছে । তা দেখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লোকজন মাঝে মাঝে আসে । পেপারে লেখালিখি হয় । তারা আসলে যতীনের ঐ সেখানেই থাকেন ।

৬. ইত্যাদি । …… ব্যাংক ও লকার ।  

যতীনের ছেলেটা সামনের বছর প্রাইমারি স্কুল থেকে হাই স্কুলে যাবে । যতীনের বৌ আজ পর্যন্ত ঘর ঝাড় দেয়নি । ঘর মোছা বা বাসন মাজা তো দূরের কথা । তার বাড়িতে বেশ কয়েকটা কাজের লোক আছে । তাছাড়া চাল ঢোলাই করা কর্মচারিগুলো তো আছেই । কাজেই যতীনের বৌএর গায়ের তুলাইপাঞ্জি গন্ধ আজও অটুট আছে । ছেলের গায়ের বাসমতির গন্ধ শোঁকার জন্য যতীন এখনও উদ্গ্রীব । তাই মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যায় । তার ভীষণ ভয় হয় । কি করে ছেলের গায়ের সুগন্ধ , স্ত্রীর গায়ের সুগন্ধ অটুট থাকবে । তাকে আরো উচ্চতায় উঠতে হবে । সে এখনও জাহাজ কেনার কথা ভাবে । তবে এইসব ছেড়ে সে আর বেশিদূর যেতে পারে না । ছেলেটা নড়ে ওঠে । বা বৌটা তার গভীর ঘুমের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । যতীনের কান খাড়া হয়ে যায় । তার আর স্বপ্ন দেখা হয় না ।

Categories: গল্প

বরুণ তালুকদার

জন্মঃ ১৪-০৬-১৯৭২ নিবাসঃ বালুরঘাট , দক্ষিণ দিনাজপুর পেশাঃ শিক্ষকতা নেশাঃ পালটে পালটে যায় । তবে গপ্পো বানানোটা স্থায়ী নেশার মত জাঁকিয়েই বসেছে । প্রথম গল্পঃ মনে নেই ।জেলা গ্রন্থাগার থেকে প্রকাশিত একটা লিটল ম্যাগ থেকে বেরিয়েছিল । তবে বিষয়বস্তু মনে আছে । একটা কাগজকুড়ুনি ছেলেকে নিয়ে লিখেছিলাম । বর্তমানে প্রকাশিত গল্পঃ ১০- ১৫ টা হবে । লিখিত পুস্তকঃ নেই ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।