মুলাক্করম

হিল্লোল ভট্টাচার্য on

আজ থেকে দু’শ বছরেরও বেশি আগের কথা, সন ১৮০৩। কেরালার আলাপ্পুঝা জেলার চারথালা গ্রাম, সে সময় ওই অঞ্চলটা ত্রিবাঙ্কুর স্টেটের অধীনস্থ ছিল। কেরালার সব গ্রামের মতই নদী, খাল, বিলে ঘেরা চারথালার যে দিকেই তাকানো যায়, একেবারে সবুজে সবুজ; চোখ জুড়োনো প্রাকৃতিক শোভা ঈশ্বরের এই নিজের দেশে। বর্ষাকালের এক বিকেল; একরাশ নারকেল গাছে ছাওয়া, মেঠো পায়ে চলা পথ বেয়ে পুকুরের দিকে হেঁটে আসছে শিবাম্মা আর রেবতী, বেলা পড়ে আসছে, এবার গা ধোবে তারা। সম্পর্কে রেবতীর পিসি হয় শিবাম্মা, বয়স তার ত্রিশের কোঠায়, কম বয়সে বিধবা হয়ে ভাইয়ের সংসারেই আছে সেই কবে থেকে। গ্রামের যে অঞ্চলে একদম অন্ত্যজ শ্রেণীর বাস, সেখানেই থাকে এই নিম্ন বর্গের ‘এজাভা’ পরিবার। তৎকালীন কেরালার বর্ণপ্রথা অনুযায়ী ‘এজাভা’ সম্প্রদায়ের মানুষ রা ছিল অচ্ছুৎ, নীচু জাত; সমাজের উপরতলার মানুষ অর্থাৎ উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের সাথে তাদের সংস্পর্শ নিষিদ্ধ ছিল। 

পিসি-ভাইঝি পুকুরের জলে নামতেই পেছনের খেজুর গাছটার দিক থেকে কতগুলো পুরুষ কণ্ঠের হাসির আওয়াজ এল। চমকে ফিরে তাকাতেই দেখল কত গুলো ১৯-২০ বছরের ছেলে তাদের অনাবৃত শরীরের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, অশালীন ইশারা করে কুৎসিত ভঙ্গীতে হাসছে। শিবাম্মা চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল। ছেলে গুলো এগিয়ে আসছে, ভয়ে কাঁটা হয়ে রেবতী শিবাম্মার হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে। তাড়াতাড়ি করে বুকের কাপড় জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল রেবতী, শিবাম্মা নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, যেন বোঝাতে চাইল লাভ নেই। পঞ্চদশী রেবতী অবাক হয়ে পিসির দিকে তাকালো, বিস্ময়ের সাথে লজ্জা, ঘৃণা ও ভয় মিশ্রিত সে দৃষ্টির অভিব্যক্তি ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল। ছেলেগুলো আরেকটু কাছে এসে রেবতীর দিকে তাকিয়ে বলল,

-“কি রে মাগী, আমাদের সামনে বুকে কাপড় দিচ্ছিস যে বড়? তোর বাপ কর ভরেছে? মুলাক্করম?” 

পাথরের মত শক্ত মুখে তাকিয়ে আছে রেবতী, কী বলবে সে জানে না। নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণ ছেলেগুলোর চোখ মুখ থেকে কামনা ঝরে পড়ছে। নীচু জাত, অস্পৃশ্য বলে হয়ত তাদের শরীর ওরা ছোঁবে না, কিন্তু এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দিয়ে ধর্ষণ করবে, লোলুপ দৃষ্টি লালা ঝরা জিভের মত চেটে নেবে ওদের উন্মুক্ত ঊর্ধাঙ্গ।

নাহ! দিন এনে দিন খাওয়া হতদরিদ্র এই দলিত পরিবার, চড়া হারের মুলাক্করম বা স্তন শুল্ক জমা করতে পারেনি রাজতহবিলে। ব্রাহ্মণ ছাড়া এ সমাজে অন্য কোনো নারীর বুক ঢাকার উপায় নেই, যদি ঢাকতে হয় তার জন্য দিতে হবে দূর্মুল্য কর, মুলাক্করম, যার সিংহভাগ জমা পড়বে পদ্মনাভ মন্দিরে। 

-“নীচু জাতের মেয়েছেলে আবার বুক ঢাকবি কী? তাও আমাদের মত উচ্চবর্ণের সামনে?” – রাজ পরিবারের কৃপাধন্য ব্রাহ্মণ সমাজ এই করের প্রচলন করেছে, নিজেদের গগনচুম্বী অর্থলোভ চরিতার্থ করতে। কিছুতেই তাদের খাঁই মেটে না। 

-“দলিত হয়ে জন্মেছিস, দলিত হয়েই মরবি – আমাদের সামনে কীট পতঙ্গের মত মূল্যহীন জীবন তোদের।” – যেন প্রতি পদক্ষেপে নিম্নবর্গকে এই বার্তা দিতে চায় ব্রাহ্মণরা। 

“আর যদি মাথা তুলে বাঁচতে চাস তাহলে হাজারটা শুল্কের তলায় চাপা পড়ে যাবি” –  এই কর, সেই কর – নীচু জাতির জন্য খাজনাতন্ত্রের খোল নলচে আমূল বদলে ফেলা হয়েছে কেরালায়। এমন অদ্ভুৎ সব শুল্কের প্রবর্তন করা হয়েছে, যার নজির পৃথিবীর আর কোনো আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় নেই।

চোখ দিয়ে মাপতে মাপতে শিবাম্মার দিকে তাকিয়ে একটা ছেলে দাঁত বের করে বলল, -“মনে হচ্ছে, এ মাগীটার এ বছর কর একটু বেশি লাগবে রে! দেখেছিস.. পুরো ডাব”! – অন্য ছেলেগুলোও অশ্লীল ভাবে হেসে উঠল। মুলাক্করমের নিয়ম হচ্ছে, বুকের মাপ অনুযায়ী কর দিতে হয়, অর্থাৎ ঢাকতে যতটা কাপড় লাগবে, সেই অনুপাতে শুল্ক নির্ধারিত হবে।

আরেকটা ছেলে রেবতীর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “তবে, এটাও ডাগর হচ্ছে রে, কদিন পর আরো ডবকা হবে, তখন পুকুর পাড়ে ভীড় জমে যাবে দেখে নিস।”   

শিবাম্মা রেবতী কে টেনে নিয়ে গেল জলের আরেকটু গভীরে, বুক ঢাকা জলের গভীরতায় না গেলে এই অবস্থা থেকে আর উদ্ধার নেই। রাগে, লজ্জায়, অপমানে রেবতীর ইচ্ছে হল তলিয়ে যেতে। বোধহয় সেটা আঁচ করেই শিবাম্মা তাকে শক্ত করে ধরে আছে একটা হাত দিয়ে। রেবতী শুনতে পেল, পিসি ফিসফিস করে বলছে, “অভিশাপ! অভিশাপ! – হে ঈশ্বর, কোন পাপে আমাদের এই নীচু জাতের ঘরে জন্ম দিলে?”

দুজনের ই গাল বেয়ে অশ্রুধারা নেমে আসছে। আকাশে একটু শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকালো, পরক্ষণেই বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা নিম্নমুখে ধেয়ে আসল। বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই বোধহয় ছেলেগুলো পুকুর পাড় থেকে দ্রুত বিদায় নিল। দুই নারী স্তব্ধবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, বর্ষার বারিধারা তাদের চোখের জল ধুইয়ে দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু নির্নিমেষ দৃষ্টির আগুন কি নেভাতে পারছে?

সকাল থেকেই নাঙ্গেলী আজ বেশ খোশ মেজাজে আছে, দু সপ্তাহ পর তার মরদ চিরু বাড়ি আসবে। প্রান্তিক ‘এজাভা’ শ্রেণীর মানুষদের সাধারণত স্থায়ী উপার্জনের কোনো বন্দোবস্ত নেই, কখনো ভাগচাষী হিসেবে মাঠে ঘাম ঝরাতে হয় কখনো বা তাঁত বুনে পেট চালাতে হয়। নিম্নবর্গের আর পাঁচটা পরিবারের পুরুষদের মত চিরুও মরশুম বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন পেশা অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই কদিন সে গেছিল আলেপ্পীর দিকে জেলে মাঝিদের সাথে, আলেপ্পী আর কুমারকোমের মধ্যবর্তী জলাশয়ে মাছ ধরার কাজে। রাতরাত নৌকোয় জেগে থাকতে হয়, বড় পরিশ্রমের কাজ। মাসে এক বা দুবার বাড়ি এসে কদিনের বিশ্রাম নিয়েই আবার ছুটতে হয়। গড়িব লোকের গায়ের বেদনা জুড়োনোর জন্য দুদণ্ডের বেশি অবকাশ মনজুর করেন নি যে উপরওয়ালা। নাঙ্গেলী তার ঘরের দাওয়ায় বসে চাল বাছতে বাছতে গুনগুন করে একটা মালয়ালী লোকগীতি গাইছে। তার শ্বাশুড়ি গোয়ালে কালো গাইটার দেখা শোনা করছেন, আজ বোধ হয় দোয়ানো দুধ দিয়ে কিছু একটা মিষ্টান্ন বানানো হবে, ছেলের ঘরে ফেরার খুশিতে। 

গোটা চারথালা গ্রামে, নাঙ্গেলীই এক মাত্র নারী যাকে সমাজপতিদের রক্তচক্ষু বশে আনতে পারে নি। অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও ভয়ডরহীন এই মেয়েটি নিয়ম কে কাঁচকলা দেখিয়ে ‘মুলাক্করম’ প্রথা কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। সে শুল্ক দিতেও রাজী নয় আবার বুক খোলা করে ঘুরতেও তার প্রবল আপত্তি। দু একবার ব্রাহ্মণরা তাকে আকারে ইঙ্গিতে ‘ফল ভালো হবে না’ – বোঝাতে চেয়েছে কিন্তু সে পাত্তা দেয়নি। 

তার শ্বাশুড়ি গোয়ালের দিক থেকে কিছু একটা কথা বলার জন্য ডাকছিলেন, চালের পাত্রটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে কথাটা ভালো করে শুনতে যাবে, হঠাৎ বেড়ার দিকটায় বহু লোকের সম্মিলিত কোলাহলের আওয়াজ পাওয়া গেল। নাঙ্গেলী এক ছুটে বেড়িয়ে এল, ঘটনাটা কী – তা বোঝার জন্য। বাইরে এসে চমকে গেল, পাড়া পড়শীদের একটা দল হাঁফাতে হাঁফাতে ছুটছে। গায়ত্রী নামের পাশের বাড়ির বউটাকে জিজ্ঞেস করাতে সে কোনোক্রমে বলল, সবাই রামনাথনের বাড়ির দিকে যাচ্ছে, আজ সকালে বাড়ির পেছনের বাগানে, একটা গাছের ডালে রামনাথনের মেয়ে রেবতী গলায় দড়ি দিয়েছে! নাঙ্গেলি আর কিছু ভাবতে পারল না। ঊর্ধশ্বাসে সেও ছুটল ওদের সাথে। ওরা রামনাথনের বাড়িতে যখন এসে পোঁছল, সারা গ্রামে খবর রটে গেছে, পুরো চারথালা ভেঙে পড়েছে উঠোনে। রেবতীর মৃত দেহটা গাছের ডাল থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে, একটা চাদরে ঢেকে শোয়ানো আছে বাড়ির সামনে। রেবতীর মা পাগলের মত আছড়ে কাঁদছে, তার কিছু আত্মীয়া তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। রামনাথন মেয়ের মৃতদেহ ধরে বসে আছে পাথরের মত, এক বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে, কোন শব্দ নেই তার মুখে। শিবাম্মার গলা থেকে শুধু সাপের মত একটা হিসহিসানির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, – ‘মুলাক্করম, মুলাক্করম এর অভিশাপ লাগবে ওদের, এ পাপের নিস্তার নেই!’

শিবাম্মার বয়ান যারা শুনেছিল, সেই প্রতিবেশী দের কাছ থেকে গতকালের পুকুর পাড়ের ঘটনাটা পুরো জানল নাঙ্গেলী। ১৫ বছরের মেয়েটার লাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ দিয়ে যেন আগুন বর্ষাতে শুরু হল। হঠাৎ চিৎকার করে উঠল নাঙ্গেলী – “অনেক হয়েছে, আর নয়, এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সময় এসেছে। মুলাক্করমের নিয়ম আমরা আর মানব না। উঁচু জাতের মেয়েদের মত আমাদের ও সম্পূর্ণ অধিকার আছে নিজেদের লজ্জা নিবারণ করবার। আজ একটা মেয়ে এই কুপ্রথার জন্য বলি তে চড়ল, এখন ই এর পূর্ণচ্ছেদ টানার সময়।”

হতচকিত জনতা থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না, হয় তারা শোকের আবহে ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছে না নাঙ্গেলি  বলতে চাইছে, অথবা ব্রাহ্মণ্যসমাজ প্রবর্তিত এই নিয়মের উল্টোপথে হাঁটবার মত মনের জোর তাদের নেই। নাঙ্গেলী খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে যখন বুঝল, এদের মধ্যে কেউ তার পক্ষ সমর্থন করার সাহস দেখাতে পারছে না, তখন কাপুরুষদের দিকে একটা ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে, “বেশ কাউকে যদি পাশে নাও পাই, ক্ষতি নেই, আমার লড়াই আমি একাই চালিয়ে যাব।” – এই বলে হনহন করে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল সে।

খাল, বিলের পাশ কাটিয়ে বাড়ি আসতে মাঝখানে একটা জলা জায়গা পড়ে, ছোটো বাঁশের সাঁকো পার হতে হয় সেখানে। নাঙ্গেলী যখন সাঁকোর প্রায় মাঝ বরাবর চলে এসেছে, তখন দেখল অন্য দিক থেকে মাঝবয়সী নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণ ভেলুস্বামী সাঁকোতে উঠে তার দিকে আসছেন। খুব সরু জায়গা, দুজনে মুখোমুখি পার হলে গায়ে গায়ে ঠেকে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাকে দেখেই ভেলুস্বামী চেঁচিয়ে উঠলেন, 

“এই ছোটোলোকের মেয়ে, চোখের মাথা খেয়েছিস নাকি? দেখতে পাচ্ছিস না আমি আসছি? জানিস না তোর জাতের ছায়া মাড়ানোও পাপ? যা, যা নেমে দাঁড়া!”

নাঙ্গেলীর মাথায় আগুন আগে থেকেই জ্বলছিল, কোনোক্রমে নিজেকে সংবরণ করে সে বলে উঠল, 

-“আমি নামব না, প্রয়োজন হলে আপনি নেমে দাঁড়ান।”

ভেলুস্বামী ভীষণ অবাক হলেন, অচ্ছুৎ নীচু জাতের কাছে এরকম আচরণ প্রত্যাশিত নয়, অভ্যস্ত নন তিনি।

প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বললেন, “কী বললি? নেমে দাঁড়াবি না? তোর সাহস তো কম নয়, আমার মুখে মুখে তর্ক করছিস, আমার অভিশাপে পুড়ে ছাই হয়ে যাবি জানিস সে কথা?” 

নাঙ্গেলী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ব্রাহ্মণের ওপরে গলা চড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “যা খুশি করার করুন আমি নেমে দাঁড়াব না”। উত্তরের অপেক্ষা না করে সোজা এগিয়ে যায় সে। 

এই একরত্তি মেয়ের সাহস তো কম নয়! তাঁকে একেবারে গ্রাহ্যই করছে না, হনহন করে চলে আসছে! কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন ভেলুস্বামী, হঠাৎ খেয়াল হল, ‘আরে এই নীচু জাতের মেয়েছেলেটা তো দিব্যি বুকের ওপর কাপড় চড়িয়ে আছে!’ এদের যা আর্থিক অবস্থা তাতে মুলাক্করম দেওয়ার ক্ষমতা থাকার কথা নয়।

একটা অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে বললেন, “এই চাঁড়ালের বেটি, কী পেয়েছিস কী তুই? আমার সামনে বুক ঢেকে আছিস যে বড়? দেশে কি আইনকানুন বলে কিছু নেই নাকি? জানিস না বুক ঢাকতে হলে শুল্ক দিতে হয়, মুলাক্করম! দিয়েছিস সে খাজনা?”

-“না, দিইনি আর কোনো দিন দেবও না” – দৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দেয় নাঙ্গেলী।

-“তাহলে খোল কাপড়, খোল” – ধমকের স্বরে বলেন ভেলুস্বামী।

ব্রাহ্মণের চোখে চোখ রেখে আগের মতই আত্মপ্রত্যয়ের সাথে বলে সে, -“না খুলব না, মুলাক্করম ও দেব না আর বুকের কাপড় ও সরাব না, দেখি আপনার কত ক্ষমতা!”

ভেলুস্বামীর প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে নাঙ্গেলী, ছুঁয়ে দিল বলে। অভিশম্পাতের ভঙ্গীতে ডানহাতের তর্জনী তুলে কিছু একট মন্ত্রোচ্চারণ করেই উল্টো দিকে হাঁটা দিলেন ব্রাহ্মণ। – “দেখি কী করে কর না দিয়ে ছাড় পাস তুই” – এই বলে শাসিয়ে নাঙ্গেলীর দিকে একটা অগ্নিবর্ষী দৃষ্টি হেনে নিষ্ক্রান্ত হলেন ভেলুস্বামী।

বাড়ি ফেরার পর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। যা হবার কথা ছিল তাই হল, খবর পেয়ে স্থানীয় শুল্ক আদায়কারী আধিকারিক বা ‘পর্ভতাইয়ার’ এসে হাজির। ভেলুস্বামী সবিস্তারে নাঙ্গেলীর ঔদ্ধত্ব্রের বর্ণনা দিয়ে তার কান বিষিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ রইল না।

-“এ বছরের মুলাক্করম জমা পড়ে নি, বকেয়া শুল্ক চাই”!

-“না দেব না”।

-“বেশ আমি ও না নিয়ে যাব না” – পর্ভতাইয়ার ও ছাড়ার পাত্র নয়।

-“আজ যত বেলাই হোক না কেন, আমি অপেক্ষা করব কিন্তু মুলাক্করম নিয়েই তবে উঠব”।

সকাল গড়িয়ে দুপুর, তার পর বিকেল হতে চলল, কিন্তু কর আধিকারিকের নড়বার কোন লক্ষণ দেখা গেল না।

-“বেশ আপনি বসুন, আমি ভেতর থেকে গিয়ে নিয়ে আসছি” – কী ভেবে যেন শেষমেশ বলে উঠল নাঙ্গেলী।

খুশি হয় ‘পর্ভথাইয়ার’, “কুকুরের লেজ কেও সিধে করার ক্ষমতা রাখি আমি, আর তুই তো কোথাকার এক নীচু জাতের মেয়েছেলে!” – মনে মনে ভাবে ‘পর্ভথাইয়ার’।

-“এই নিন, ধরুন” – বড় কলাপাতায় মুড়ে কী একটা যেন নিয়ে এসেছে নাঙ্গেলী।

-“এটার মধ্যে করে আবার কী …” বলতে বলতে কলাপাতাটা ধরতে যেতেই অবাক হয় শুল্ক আধিকারিক, ওপর থেকে টুপ টুপ করে রক্ত ঝরছে। চমকে মুখ তুলে তাকাতেই দেখে নাঙ্গেলীর বুকের কাপড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে, একটা দমকা হাওয়ায় হঠাৎ কাপড় টা সরে যেতেই আতঙ্কে শিউড়ে উঠল ‘পর্ভথাইয়ার’, নাঙ্গেলীর উন্নত সুগোল বক্ষদ্বয় আর নিজের জায়গায় নেই, তার বদলে বুকে বীভৎস দু খানি ক্ষত! কর আধিকারিকের হাত ঠকঠক করে কাঁপছে, হাতের কলাপাতায় নরম মাংসপিণ্ডের উষ্ণতা অনুভব করে সে, সেখান থেকেও তাজা রক্ত গড়িয়ে মাটির দাওয়া ভিজিয়ে দিচ্ছে। আধিকারিকের শিহরিত হাত থেকে কলাপাতা টা পড়ে যেতেই দেখা গেল রক্তে মাখামাখি নাঙ্গেলীর স্তনযুগল, তার তরফ থেকে রাজকোষের ভেট, ‘মুলাক্করম’!

—————————————————————————————————

উপসংহার

আধিকারিকের প্রবেশের পর থেকে উপরিলিখিত ঘটনার পুরোটাই স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত একটি কাহিনী, যদিও ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত নয় বলে অনেকে মনে করেন। তার আগের অংশ টুকু গল্পের পটভূমি গড়ে তোলার স্বার্থে কল্পনা করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে সেই দিনই নাঙ্গেলীর মৃত্যু হয়। তার স্বামী চিরুকন্দন সেই শোক সহ্য না করতে পেরে স্ত্রীর জ্বলন্ত চিতার আগুনে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। এই অসমসাহসী নারীর অভূতপূর্ব বিদ্রোহ পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। তার স্বামী চিরুকন্দনের ঘটনাও অদ্বিতীয়, কারণ স্বামীর সাথে সহমরণের প্রথা চালু থাকলেও আক্ষরিক অর্থে স্ত্রীর চিতায় ‘সতী’ হওয়ার কাহিনী এর আগে কখনো শোনা যায় নি। নাঙ্গেলীর মৃত্যুর পর ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয় ফলে ক্রমাগত আন্দোলনের সম্মুখীন হয়ে ত্রিবাঙ্কুরের রাজা কয়েক বছরের মধ্যে মুলাক্করম বা ‘ব্রেস্ট ট্যাক্স’ নামক এই অভিশপ্ত প্রথা রদ করেন। নাঙ্গেলীর বাড়ি যে জায়গাটায় ছিল, পরবর্তী কালে তার নামকরণ করা হয়, ‘মুলাচিপরম্বু’ যার অর্থ, “Land of the breasted woman”!


হিল্লোল ভট্টাচার্য

জম্ম ২৪শে ডিসেম্ব, ১৯৮০ মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্নাতক, বর্তমানে ডেনভার, আমেরিকায় প্রজেক্ট ম্যানেজারের পদে কর্মরত। সব ধরণের লেখা লিখলেও রহস্য-রোমাঞ্চ বা থ্রিলারধর্মী লিখতে বেশি পছন্দ করেন। অপদার্থের আদ্যক্ষর, অনুরণন, কল্পবিশ্ব, তিলোত্তমা, গল্পের সময়, আবেক্ষণ পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এবছর বইমেলায় প্রকাশিত প্রথম রহস্যোপন্যাস "অফ্রিয়াজার অভিশাপ"।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।