মাস্টারপিস

যূথিকা আচার্য্য on

“ আর কতক্ষণ এভাবে বাঁদরের মতো গাছের ডালে লটকে থাকতে হবে, ও নির্মলদা ? কাঠ পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে মাইরি সেই কখন থেকে !”
নীচের ডাল থেকে ঝাঁঝিয়ে উঠলো নির্মলদা,
“ থাম না রে শুয়ার, তোরা আজকালকার ছেলেপেলে একটুতেই কেলিয়ে পড়িস কেন বে ! শালা ভিডিওগুলার থেকে মাল্লু কামানো কী অতই সোজা! বাল কষ্ট না করলে কেষ্টা পাবি কোথ্থেকে ?”
“ কোন শালায় কেষ্টা চায় গো নির্মলদা, বরং ডবকা দেখে একটা রাধা জোগাড় করে দাও দিকিনি !”
“ চুপ কর শালা,তোর ভ্যানতাড়ানো তোর ইয়েতেই গুঁজে রাখ।“
খিক খিক খিক করে হেসে উঠলো তড়কা। নাহ্ নির্মলদা উপর আর যাই হোক রাগ করা যায় না, রিয়েল কেসগুলোর ভিডিও করতে গেলে এইসব একটু দেরী-টেরী হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। আগে আগে যখন ওরা এসব ভিডিও করতে শুরু করেছিলো তখন সবকিছুই ভাড়া করা ছিলো। ভাড়ার মেয়ে, ভাড়ার মোলেস্টার, ভাড়ার গুন্ডা; সবকিছুই নকলি। অনেক ভদ্রবাড়ির ছেলে-মেয়েও ছিলো তখন ওদের দলে, শুধু তাদের বেলা ভিডিও তে মুখ দেখানো হতো না। কিন্তু পাবলিকও কী কম হারামজাদা। ধীরে ধীরে ভিডিওগুলোতে কমেন্ট পড়তে লাগলো যে বড়ো ওভার অ্যাক্টিং হচ্ছে, রিয়েলিটির চাবুক নেই কিছু। ভাবো, পর্ন সাইটে এসে চুলকানির জন্য মোলেস্টেশনের ভিডিও দেখবে তাতেও শালারা রিয়েলিটি খোঁজে। নির্মলদার মাথায় যখন এই আধা রিয়েলিটির প্ল্যানটা এসেছিলো তখন দলের কেউই সায় দেয়নি তাতে। মালতী, শিবু, বংশী, কাজলী, গয়নাদের মতো বেশীর ভাগ লোকজনই রাতারাতি বেরিয়ে গেছিলো দল ছেড়ে। মুখে যদি বলছিলো সবাই,
“ না না, এমন জিনিস মেনে নেওয়া যায় না ।“
কিন্তু আসল কারণ জানে তড়কা, মামুর ভয়। এতদিন যখন অ্যাক্টিং করে ভিডিও করতো, নির্মল দা রেগুলারলি দক্ষিণা দিয়ে যেত পুলিশকে। তাছাড়া সবাই নিজের ইচ্ছায় অ্যাক্টিং করছে, তাই কমপ্লেন হওয়ার চান্স ছিলো না কিছুই। কিন্তু এবার যদি নির্মলদার কথামতো নকলি গুন্ডা দিয়ে আসলি মামণিকে নিয়ে টানাটানি করা হয় তাহলে মামুর কাছে রিপোর্ট যেতে কতক্ষণ! সেই ভয়েই পালালো সব। মেনে নেওয়া যায় না ফায়না ওসব ফালতু কথা, অতই যদি নীতিবাগীশ তো, শালা ছিলিস কেন এই লাইনে বে? আর সত্যি কথা বলতে কী এই চক্করে তড়কার পজিশনটা হুট করে চড়ে গেছে নির্মলদার কাছে। নইলে আগে যখন শিবু ছিলো তখন তো দাদা ওর দিকে ফিরেও তাকাতো না। নির্মলদার ডানহাত ছিলো শিবু, আর ছেলেটারও মাইরি এলেম আছে মানতে হবে। শিবুর হাতে পড়লে ফালতু জিনিসকেও এডিট করে, সাউন্ড এফেক্ট বসিয়ে পুরো ঝক্কাস ভিডিও বানিয়ে দিত । নির্মলদা প্রায়ই বলতো,
“শিবু হলো শিল্পী।“
কিন্তু দল ছাড়ার পর অবশ্য শিবুর অন্যরূপ দেখেছে তড়কা। ওর নাকি হাজার দশেক টাকা পাওনা আছে আগের কোন একটা ভিডিও থেকে। নির্মলদা কয়েক লাখ কামিয়েছে সেটাকে বেচে, কিন্তু দল ছেড়েছে বলে ওর টাকাটা দেয়নি এখনো। সেদিন ঠেকে বসে, নেশার ঘোরে দাদার মা-বোন তুলে গালি দিচ্ছিলো শিবু। তড়কা কিচ্ছু বলেনি, চুপচাপ শুনে গেছে খালি। একবার ভাবলো নির্মলদাকে জানিয়ে সাবধান করে দেবে, কিন্তু তারপর ঠিক করলো যে ফালতু ফালতু অন্য লোকের ঝামেলায় জড়িয়ে লাভ কী ? ওদের ঝামেলা ওরাই সামলাক।

“তড়কা, ক্যামেরা রেডি রাখ রে, হিরোইন এসে গেছে …”
নির্মলদার ডাকে হকচকিয়ে উঠলো তড়কা। ওই তো মেয়েটা আসছে সাইকেল চালিয়ে, গায়ে একটা নীল-হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ। সাইকেলের সামনের ঝুড়িতে বইখাতা রাখা, মুখখানা বেশ মিষ্টি।
পাঁচিলের পাশে যে ঝাঁকড়া মতো পাকুড় গাছটাতে গা ঢাকা দিয়ে তড়কা বসেছিলো, তার নীচেই বিশে আর কার্তিক ভালোমানুষের মতো মুখ করে তাস পেটাচ্ছিলো এতক্ষণ। নির্মলদার সিগন্যাল পেয়ে তড়কার মতো ওরাও গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। ঝটপট মুখে গামছা বেঁধে নিজের নিজের পজিশনে নিয়ে নিলো দুজনে।
মেয়েটা পাকুড় গাছের কাছাকাছি আসতেই প্ল্যান মাফিক কার্তিক একটা ছোটো লোহার রড ঠিক কায়দা মতো ছুড়ে মারলো ওর সাইকেলের সামনের চাকা লক্ষ্য করে। কার্তিকের হাতের টিপ দারুন। রডখানা সাইকেলের চাকায় লেগে সঙ্গে সঙ্গে ট্রং ট্রং আওয়াজ করে খানকতক স্পোক ভেঙে গেলো। মেয়েটা সাইকেলসহ হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তেও শেষ মুহুর্তে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো রাস্তায়। বিশে আর কার্তিক এই সুযোগে ঘেরাও করলো মেয়েটাকে । ঠিক এখানেই তড়কার কাজ শুরু হয়। মেয়েটার ওই ভয় পাওয়া চোখমুখ, চীৎকার,পালানোর জন্য হাঁচোড়পাচোড় করা, এসব ক্যামেরায় তুলতে হয় ঠিক করে। বিশেদের বলা আছে ওরা বেশী কিছু করবে না। খালি জামা কাপড় ধরে টানাটানি করে একটু, বুকে টুকে হাত দেয়, চুলের মুঠি ধরে টানাহ্যাঁচড়া করে। তড়কা সবকিছু রেকর্ড করে নেয় চটপট। মিনিট দুয়েকের মধ্যে বিশে আর কার্তিক “আরো লোক নিয়ে আসছি” হুমকি দিয়ে চম্পট দেয়। মেয়েগুলোও এ সমস্ত কেসে যত তাড়াতাড়ি পারে পালায়। এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি হলো। মেয়েটা মাটিতে পড়ে গেছিলো, কোনোরকমে উঠে বসে ওড়নাটাকে বুকের উপর টেনে, সাইকেল, বইখাতা সব ফেলে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালালো ওখান থেকে।
মেয়েটা চলে গেলে ভিডিও ক্যামেরাটাকে ফোল্ড করে ধীরেসুস্থে গাছ থেকে নামতে নামতে ভাবলো তড়কা, মেয়েগুলো যে কেন উল্টে মার লাগায় না কেন কে জানে ? কেউ গায়ে হাত দিলে আর কিছু না হোক খামচে কামড়ে তো দিতে পারিস, তা না নিজের বুক-পাছা বাঁচাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে! এই মেয়েটার বেলাতেই দ্যাখ না, কার্তিকের ছুঁড়ে দেওয়া নিরেট লোহার রডটা ঠিক ওর পাশেই পড়ে ছিলো। সেটা উঠিয়ে নিয়ে একবার যদি মারতিস তাহলেই সীন পুরো উলটে যেত এখন। মেয়েটার জায়গায় বিশে আর কার্তিক ফাটা মাথা নিয়ে রাস্তায় পড়ে গড়াতো। কিন্তু নাহ্, মামণি সেসবের ধারে কাছেও গেল না। উল্টে সাইকেল থেকে মাটিতে পড়েই হাউ-মাউ করে কান্না জুড়লো!
আপন মনে হেসে উঠলো সে,
“দূর বাল, বলি কেঁদে হবেটা কী !”

রাত্রিবেলায় নির্মলদার সঙ্গে বোতল খুলে বসে তড়কা বললো,
“ নির্মলদা তোমার ভয় করে না ?”
নির্মলদা তখন দুপুরের তোলা ভিডিওটা দেখে বিড়বিড় করে বলছিলো
“ ভালো, ভালো, খুব ভালো।পাবলিক খাবে ভালো!”
তড়কার প্রশ্ন শুনে চাখনার পেঁয়াজকুচি আর মটর কয়েকখানা মুখে পুরে বললো,
“ভয়, কীসের ভয় বে !”
“ না মানে, যদি কোনোদিন পুলিশ কেস-ফেস হয়ে যায় ?”
“ আট বছর ধরে এই লাইনে কী ঘাস কাটছি রে আমি বাল ! হ্যাহ্, পুলিশ কেস! কে করবে পুলিশ কেস ? রেপ তো আর করছি না কাউকে। আর তাছাড়া খুঁজেপেতে ঠিকঠাক মেয়েগুলোকে টার্গেট করতে হয় ।“
“ তার মানে ?”
“দ্যাখ তড়কা, এখনকার মামণিদের মধ্যে তিনটে আলগ ক্যাটেগরী আছে। এক নম্বর হলো ভীতু ভয় পাওয়া অবলা মামণি। এই আইটেমগুলো দেখবি নি:শ্বাস নিতেও ভয় পায়। ডিমের থেকে ফুটতে না ফুটতেই এগুলোর বিয়ে দিয়ে দেয় বাড়ির লোক আর তারপর বছর না ঘুরতেই সে মামণি নিজেই ডিম পেড়ে তা দিতে বসবেন।
দুই নম্বর হলো ডাকাবুকো মামণি। এই মালগুলো কারোর ধার ধারে না, ভয়-ডর নেই, দরকার পড়লে তুলোধোনা করতে পারে যাকে তাকে, যখন তখন। এগুলোর ব্যাগে-পকেটে শালা চাকু আর পেপার স্প্রে থাকবেই থাকবে।
আমরা এই এক নম্বর আর দুই নম্বর কে টার্গেট করিনা। এক নম্বরগুলোর গায়ে হাত দেওয়ার আগেই চোখ উলটে হার্টফেল করবে। তখন লাশ হাপিস করার ঝামেলা অনেক। দুই নম্বরের গায়ে হাত দিলে শালা তোর নিজেরই পেট-গলা ফেঁসে যেতে পারে। আর যদি প্রাণে বেঁচেও যাস তো মামুর কাছে খবর যাবে, তখন জীবনভর ক্যাতরাবি।
আমাদের হিরোইন হলো তিন নম্বর, এই মালগুলোর চুলকানি আছে অনেক, কিন্তু আবার ভয়ও আছে ষোলোআনা, লোগ কেয়া কহেঙ্গে ! তাই এরা বয়ফ্রেন্ডদের নিয়ে পুকুর পাড়ে, ঝোপের ধারে ইন্টুসিন্টু করে রেগুলার কিন্তু বাইরে ভাব দেখায় এমন যে ব্যাটাছেলের “ব” কী তাও চেনে না। আমরা এই মামণিদের টার্গেট করি। যদি পুলিশ কেস-ফেস কিছু হয়েও যায়, তাহলে বয়ফ্রেন্ডদের ঘাড়ে ফেলে দেওয়া যাবে । ব্যস, খেল খতম, পয়সা হজম !”
তড়কা হাঁ করে শুনছিলো সবকিছু। নির্মলদার এক্সপিরিয়েন্স আছে মানতে হবে। মালের নেশা ততক্ষণে একটু একটু করে ঝিমানি ধরাচ্ছে, একটু সাহস করে ও বললো,
“ তাহলে দাদা এই যে সবাই বলে মেয়েছেলেগুলো টাইট কাপড়-জামা পরে বলেই এসব হচ্ছে আজকাল, সে কথাটা তো ফালতু ! মানে মনে করো আজকে যে মালটাকে ধরলাম আমরা, সেটা শাড়ি, চুড়িদার, ফ্রক যাই পরে আসতো না কেন, আমরা তো ধরতামই ওকে। তাহলে আর ও কী পরলো তাতে কী যায় আসে ?”
নির্মলদার বেশ চড়েছে এতক্ষণে। একটু ঢুলু ঢুলু চোখে বেশ হেসে সে বললো,
“ শোন তড়কা, তুই বিলেতের কথা শুনেছিস তো। সেদেশে বুড়ি ছুঁড়ি সবাই হাঁটুর উপরে কাপড় পরে থাকে। তাতে কারুর কিছু যায় আসে না। কেন সে দেশে কী মরদ-জোয়ান নেই ভেবেছিস ! সবই আছে। তাহলে কিছু হয় না কেন? যে শুয়ার এখানে হাতকাটা ব্লাউজ দেখে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে, সেই শালাই ওদেশে গেলে জাঙ্গিয়া পরে ঘোরা মেয়েমানুষ দেখেও সামলে থাকে। কেমন করে হয় বল! আসল চুলকানিটা হলো এইখানে !”
নিজের চাঁদিতে জোরে জোরে তিনবার টোকা দেয় নির্মলদা। তারপর আরো কতগুলো মটর মুখে দিয়ে বললো,
“ রেপিস্ট শুয়ার রেপ করবেই আর তার জন্য ছুতো খুঁজবে হাজারটা! আবার এমনও পুরুষমানুষ দেখেছি জানিস তো যে মেয়েছেলে মাইরী ন্যাংটা হয়ে থাকলেও তার দিকে ফিরে তাকাবে না। সবকিছুই শিক্ষা বুঝলিনা! ওইসব কাপড়-জামার বাহানা সব ফালতু!“

হাতে ধরে রাখা গেলাসটা পাশে নামিয়ে রেখে শিবু বললো,
“তুমি মাইরি পায়ের ধূলা দাও দাদা। কত জানো…!””
“জানাজানির কিছুই নেই, মার্কেটের ডিম্যান্ড বুঝতে হয়। একবার যদি ওই সাপ্লাই আর ডিম্যান্ড-এর খেলটা বুঝে যাস না, তাহলেই বাল তুই রাজা হয়ে যাবি। সব দাঁড়িয়ে আছে পাবলিক খাবে কী খাবে না তার উপরে। এখন পাবলিকই তো সেরকম, ভালো জিনিস নিয়ে ভিডিও বানা, শালা কঁকিয়ে মরলেও কেউ দেখবে না। ওদিকে “লুট হলো লায়লা”, “জখমী হাসিনা”,“সায়ার ভিতর স্বপ্নলোক” এইসব নাম দিয়ে মোলেস্টেশন, লটরপটরের ভিডিও একখানা ছেড়ে দে। দেখবি সুড়সুড় করে ভিউয়ার-এর নাম্বার বেড়ে যাচ্ছে। আমার আর কী, মৌকা দেখে চৌকা লাগাই। বুঝলি তড়কা, চুলকানি আছে সব শালারই কিন্তু মুখে সাজে সাধুপুরুষ!”

মদের মাত্রাটা চড়ে গেছিলো আজ একটু বেশীই। আর দেরী করা ঠিক হবে না ভেবে তড়কা নিজের সাইকেলটা নিয়ে রওনা দিলো বাড়ির দিকে। রাত্রিবেলায় ফুরফুরে মেজাজে শুয়েছিলো বেশ, কিন্তু তড়কার কপালে সুখ থাকলে তো! সকালবেলায় উঠেই দাঁত মাজতে মাজতে মাকে বললো,

“ ও মা, চা দিলা না ?”
কথাটা শোনামাত্রই মা খ্যাঁটম্যাট করে উঠলো,
“ এক সপ্তাহ ধরে যে বলে যাচ্ছি চিনি নাই, চিনি নাই! এনেছিস চিনি ? আবার নবাবপুত্তুরের মতো হুকুম করা হচ্ছে “ চা দাও!” ঘরে চাল নাই, আটা ফুরাচ্ছে, দু হপ্তার উপর হলো ভাইয়ের ব্যাথার মলম নাই….কিন্তু নবাবজাদার হুকুমের শেষ নাই! চিনি, চাল আনগে আগে, তারপর চা খাবি।“
রান্নাঘরের চালার ভিতর থেকে প্লাস্টিকের চিনির কৌটাখানা দাওয়ায় ছুঁড়ে ফেলে সরমা।
তড়কা থু করে মুখে জমে থাকা থুতুটা উঠোনের এককোণে ফেলে বললো,
“ আবার কীসের টাকা! দিলাম যে পাঁচশো গেল হপ্তায়, সব খরচা হয়ে গেল?”
“ ইহ্, আবার হিসাব চাওয়া হচ্ছে! রান্নাঘরের টালির ছাদটার অবস্থা কি হয়েছিলো দেখেছিলি একবার! সারাতে খরচা লাগে না! সারা হপ্তা ধরে যে গিললি,সংসারের তেল, নুন,সার্ফ, সেগুলা কি তোর শ্বশুরের ব্যাটা এসে দিয়ে গেছিলো?”
মেজাজটা আবার খিঁচড়ে গেল তড়কার। শালার বাড়ি তো নয়, মুখ হাঁ করা অজগর সাপ যেন, যতই ঢালো মুখে, খিদে মেটে না তবু। এইজন্যই শুধু রাত্রিবেলার শোয়ার সময়টুকু ছাড়া আজকাল প্রায় বাড়িতে আসাই বন্ধ করে দিয়েছে ও। কিন্তু তাতেও কী আর কপালে শান্তি আছে! নির্মলদা কে টাকা বাড়ানোর কথাও বলা যাবে না, মাস দুয়েক আগেই বাড়িয়েছে। বরং একবার শিবু কে বলে দেখলে হয়, যদি কিছু বাড়তি কাজের হদিশ দিতে পারে।
কপাল সহায় ছিল তড়কার। রামপ্রসাদের চায়ের দোকানেই দেখা পেলো শিবুর। অবশ্য শিবু তখন জলখাবারের দাম মিটিয়ে, বাইক নিয়ে বেরোচ্ছিলো।ওর হাতে বেশ দামী একটা হ্যান্ডিক্যামের প্যাকেট। তড়কা গিয়ে শিবুকে ডাকলো,
“ কীরে সাতসকালে হ্যান্ডিক্যাম নিয়ে কোথায় চললি?”
“শো-রুমে যেতে হবে রে আজকে একবার, শালা পকেট পুরো খালি করে মালটাকে কিনলাম, কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই বেগড়বাই শুরু করলো। বেশীর ভাগ সময়ই ভালো চলে, কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ঝুপঝাপ বন্ধ হয়ে যায়। তুই বল, খবর কী তোর ?”
“ একটু দরকার আছে…”
শিবু ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
“ কী হলো বে, সব ঠিকঠাক আছে তো !”
তড়কা একটু সঙ্কোচের সাথেই বললো,
“ আরজেন্ট টাকার দরকার রে শিবু। না না, ধার চাইছি না, কিন্তু তোর তো অনেক জানাশোনা, একটু এক্সট্রা কাজ দিতে পারবি।“
শিবু হাসলো,
“ কেন তোর নির্মলদা আজকাল মাল ঠেকাচ্ছে না বুঝি? তোরও টাকা মেরেছে নাকি?”
“না, না… নির্মলদা কিচ্ছু করেনি, বরং মাস দুয়েক আগেই চারশো টাকা মাইনে বাড়িয়েছে, কিন্তু বুঝিসিতো, বাড়িতে মা ভাই …. “
খ্যাক খ্যাক করে হাসলো শিবু, তারপর পিচিৎ করে দুই দাঁতের মাঝখান দিয়ে থুতু ফেলে বললো,
“ কী বললি, কত বাড়িয়েছে ? চারশো ! হাহাহা…. শালা নির্মলদা ভালো মুরগী পেয়েছে রে তোকে! তোর কোনো আইডিয়া আছে মাইরি, ও কত কামায় প্রতি মাসে? তার উপর আবার মেয়ে পাচারের ব্যবসাও ধরেছে শুনলাম। মালটা তোদের ভোগে চারশো টাকা ফেলে নিজে লাখ লাখ কামায়। সাধে কী ওর দল ছেড়েছি আমি ?”
তড়কা দেখলো শিবুর মেজাজ আবার টসকাচ্ছে। একটু পরেই নির্মলদা-র গোটা খানদানকে গালিগালাজ দিতে শুরু করবে। তখন কাজের কথা বলেও লাভ হবে না, তাই কথা ঘোরালো ও,
“ আরে ছাড় না ভাই ওসব কথা, আমি শালা আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর নিয়ে কী করবো ? আসল কথাটা বল না তুই! কাজ দিতে পারবি ?”
“ কাজ কী অত সহজে এক কথায় পাওয়া যায় রে তড়কা! একটা কথা বল, এখন কী করছিস?”
“ কিস্যু না।“
“ তাহলে একটা কাজ কর, আয় আমার সঙ্গে। গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের ঠেকে যাচ্ছি, কাজের জন্যই ডেকেছে। চল তুইও আয় সাথে।“
তড়কা শিবুর বাইকের পেছনে বসে বললো,
“গিয়াসুদ্দীন ভাই আবার কে রে ? নাম শুনিনি তো!”
“দিনরাত নির্মলদার পা চাটলে থাকলে শুনবি কোথ্থেকে বাল! চোখ-নাক-কান খুলে এদিক ওদিক দেখতে শেখ একটু। এই লাইনে গিয়াসুদ্দীন বেগ হলো এই এরিয়ার বস্।তোর নির্মলদার মতো ক্যালানে পাবলিককে ও এক হাটে বেচে আরেক হাটে কিনতে পারে। বুঝলি!””
তারপর গলাটা একটু নামিয়ে বললো,
“ এক্সট্রীম্-এর নাম শুনেছিস তো!”
“ মানে ওই ইউটিউব চ্যানেলটা, লাইভ অপারেশন, মার্ডার ওগুলো দেখায় যে….”
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ ওটাই। চিল্লাস না, ধীরে বল। ওটা গিয়াসুদ্দীন ভাইয়েরই ব্রেইন চাইল্ড।“
“ কিন্তু ওটা তে তো মার্ডারও দেখানো হয়!!!!”
“ ধূর বাল, তুই এই লাইনের লোক হয়েও বুঝিসনি, ওগুলো সব অ্যাক্টিং। গরুর রক্ত, শুয়োরের রক্ত দিয়ে চালায় রিয়েল এফেক্ট হবে বলে।“
“ ওহ্ আমি ভাবলাম বুঝি…”
“ শালা তুই খালি ভেবে ভেবেই সাবাড় হয়ে যাবি একদিন দেখে নিস। শোন গিয়াসুদ্দীন ভাই নতুন ক্যামেরাম্যানের খোঁজ করছে, সেইজন্যই দেখা করতে যাচ্ছি। তোকে নাহয় আমার অ্যাসিট্যান্ট বলে চালিয়ে দেবো, চল।“

তড়কা ভেবেছিলো গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের ঠেক মানে দোকান টোকান টাইপের কিছু একটা হবে, কিন্তু গন্তব্যস্থলে পৌছাতে ওর ভুল ভাঙলো। জায়গাটাকে ঠেক বলা চলে না কিছুতেই। বেশ বড়ো জায়গা নিয়ে শহরতলি তে গিয়াসুদ্দীন বেগের বাংলো,আর বাংলোর সামনের রুম দুটো অফিস ঘর । সদর দরজার সাথে লাগোয়া ঘরটা বোধহয় ওয়েটিং রুম, ওখানে আরো চার-পাঁচটা লোক দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। অফিস ঘরের দরজা বন্ধ। তড়কা আর শিবু গদি আঁটা সোফায় গিয়ে বসতেই অল্পবয়সী একটা ছেলে এসে জানতে চাইলো,

“ মেহেমানেরা কী ঠান্ডা খাবেন না গরম কিছু পসন্দ্ করবেন ?”
ওরা দুজনেই মাথা নাড়িয়ে বললো,
“ এই গরমে ঠান্ডাই ভালো।“
ব্যাপার-স্যাপার দেখে তড়কার তাক লেগে গেল।
“ বাপরে, এত দেখি এলাহী কান্ড রে শিবু! নাহ্ মানতে হবে তোর গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের রেয়াৎ আছে!”
শিবু ফিসফিসিয়ে বললো,
“ তাহলে বলছিলাম কী, চোখকান খুলে দুনিয়াটা এবার দেখ তড়কা, কতকাল আর বেগাড় খেটে ….”
শিবুর কথা শেষ না হতেই অফিস থেকে কোট-প্যান্ট পরা একটা লোক বাইরে বেরিয়ে এসে বললো,
“ শিবেন নন্দী কৌন?”
শিবু উঠে দাঁড়াতেই লোকটা বললো,
“ আপ আইয়ে, গিয়াসুদ্দীন ভাই আপকো অন্দর বুলা রহে হ্যায় !”

শিবু অফিসের ভেতরে চলে যেতে তড়কা চুপ করে বসে বসে শিবুর বলা কথাগুলো ভাবতে লাগলো। কথাগুলো ফেলে দেওয়ার নয়। কতকাল আর দু-আনা, চার-আনা করে কাটাবে, লাইফে বড় কিছু করতে চাইলে ঝুঁকি তো নিতে হবেই। একটা পাকা বাড়ি ,চারচাকা না হোক একটা বাইক, মা আর ভাইটাকে পেট পুরে খাওয়ানো, শিবুর মতো একটা ঝিনচ্যাক মোবাইল ফোন….মাথার দুপাশের রগদুটো কে আঙুল দিয়ে টিপে ধরে সে। টাকার দরকার, অনেক অনেক টাকা!

কথাবার্তা শেষ করে মিনিট পনেরো পর শিবু বেরিয়ে এলো অফিস থেকে। ওর মুখ দেখে অবশ্য কিছুই বোঝার উপায় নেই। কেমন একটা না ঘর কা, না ঘাট কা চোখমু্খ। শেষপর্যন্ত থাকতে না পেরে তড়কাই বললো,
“ কীরে কী হলো? কাজটা পেলি ?”
“ বাইরে চল, বলছি।“
গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের বাংলোর বাইরে বেড়িয়ে কিছুটা দূরে একটা চায়ের দোকানে বাইক থামালো শিবু। তারপর দোকানদারের কাছে দুইকাপ কড়া চা আর দুটো ডবল ডিমের অমলেট অর্ডার করে তড়কার দিকে ঘুরে বললো,
“ গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের আমাকে পছন্দ হয়েছে, কিন্তু বললো কাজের কোয়ালিটি নাকি আরো ভালো চায়‌। আরোও একটা ব্যাপার হলো, উনি নাকি নিজেই ফটোগ্রাফার ছিলেন শুরুর দিকে, কাজেই ছবি তোলা, ভিডিও করা এসব ব্যাপার তোর আমার থেকেও অনেক ভালো বোঝেন। লোকটা গ্যাটিস মারা কাজকর্ম পছন্দ করে না আর অল্প কথার মানুষ।“
“ তাহলে, কী করবি ?”
“ দেখি, আপাতত কয়েকটা ভালো ফটোগ্রাফ তুলে আবার যেতে হবে, দামী লেন্স দরকার সেজন্য। টাকা লাগবে প্রায় হাজার ছয়েক। ওদিকে গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের সেক্রেটারী লোকটা আবার ছাড়তে আসার সময় ফিসফিসিয়ে বললো,
“ যে করে হোক, ভাই কে খুশি করার চেষ্টা করো, কাজে একবার ঢুকে যেতে পারলে তোমার টাকার অভাব হবে না আর !”
“ কিন্তু চায় কী লোকটা, মানে আইডিয়াটা কী?”
“ ওদের কনসেপ্ট সোজা,আজকাল মানুষের রিয়েল লাইফ এত বোরিং বলে সবাই এক্সাইটমেন্টের জন্য ফেসবুক, ইউটিউবের দুনিয়ায় গুঁতোগুতি করে মরছে। দেখিস না ফিল্মে হিরো ভিলেন কে গুলি করে কুকুরের মতো মারে, আর দেখনেওয়ালা তুই আমি টেবিলে ঘুষি মেরে, দাঁত কিড়মিড় করে বলি,
“ মার শালা কে, আরো মার। শালার ইয়ে ফাটিয়ে দে!”
রেপের সীনে ঘাটের মড়া বুড়ো থেকে দমকা জোয়ান সবাই ভাবি, ব্যস আরেকটু, শাড়ি টা আরেকটু উঠে যাক… উফ্ মালটার বুকদুটা কী টাইট দেখেছিস… ব্লাউজ যেন এক্ষুনি ফেটে পড়বে মাইরি!
তুইও জানিস, আমিও জানি সবকিছুই পর্দায় হচ্ছে, সবটাই অ্যাক্টিং… তাও উত্তেজিত হয়ে যাই, তাই তো! মানুষ সবকিছুই করে এখন কয়েক মিনিটের সুড়সুড়িটার জন্যই। ভেবে দ্যাখ ব্যাপারটা নেশা করার মতোই, অথচ নেশার দায়ে ধরা পড়বি না কখনো। শালা পুরো এন্টারটেইনমেন্ট ইনডাস্ট্রিটাই তো ওই সুড়সুড়ির উপর দাঁড়িয়ে আছে। যে যত বড়ো সুড়সুড়িবাজ হবে তার ছবি তত বিকোবে।“

একটানা অনেকটা বলে থামলো শিবু। তড়কা হাঁ করে শুনছিলো এতক্ষণ। শিবুর কথা খুব বেশী বোঝেনি সে কিন্তু একটা জিনিস বেশ বুঝলো, শিবুর সঙ্গে থাকলে আখেরে লাভই হবে তার। ও বললো,
“ তাহলে এখন কী করতে হবে ?”
“ আপাতত ভালো কয়েকটা ফটোগ্রাফ তুলে নিয়ে দেখাতে হবে, আর সবথেকে ভালো হয়…”
শিবুর কথার মধ্যেই চলতি হিন্দী গানের সুরে ওর মোবাইলটা বেজে উঠলো, শিবু মোবাইলের পর্দায় নম্বরটা দেখে বললো,
“ গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের সেক্রেটারী, তড়কা চুপচাপ থাক, কথা বলিস না। দেখি কেন ফোন করলো আবার?”
ফোন ধরলো শিবু, তারপর বেশ কয়েকবার “হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছে স্যার, হয়ে যাবে স্যার।“ বলে কেটে দিল কলটা।
তড়কার কৌতূহল আরোও বাড়ছিলো। শিবু ফোনটা রাখতেই ও চেপে ধরলো,
“ ওই, কী বললো রে, কেন ফোন করেছিলো?”
“ আমার কয়েকটা ভিডিও পেনড্রাইভে করে দিয়ে এসেছিলাম। গিয়াসুদ্দীন ভাইয়ের নাকি খুব ভালো লেগেছে, মেইনলি মোলেস্টেশনেরগুলো। কিন্তু এখন বলছে আরেকটা নতুন কিছু করতে, এক্সট্রিম কোয়ালিটির, ভালো লাগলে ওরা নগদ দাম দিয়ে কিনে নেবে প্লাস আমার আর তোর চাকরিও পাক্কা !”
“ তুই আমার কথাও বলেছিলিস !”
“ হু, তোকে বললাম না, আমার অ্যাসিটেন্ট বলে বানিয়ে বলবো।“
“ থ্যাঙ্কিউ ভাই। কিন্তু এখন কী করবি, ভিডিও করতে গেলেও তো টাকা লাগবে। নইলে কেউ কাজ করবে কেন?“
“ থাম শালা তোর পেয়ারের নির্মলদার ঘুনসী ধরে এবার নাড়া দিতেই হবে, ওই টাকাটা পেয়ে গেলেই কাজ হয়ে যাবে।“
কথামতোই কাজ করলো শিবু। সঙ্গে সঙ্গে নির্মলদা কে ফোন করলো। ওদিক থেকে ফোন ওঠাতেই কোনো ভ্যানতারা না করেই বললো,
“ নির্মলদা টাকাটা তো ছাড়তে হচ্ছে তোমায়! আমি আর ওয়েট করতে পারবো না। কখন দিচ্ছো বলো?”
তারপর আবার বললো,
“ আজ,পুরানো রেল গুমটির ওখানে, ঠিক আছে, বিকেল কটায়…বিকেল না…ঠিক আছে দেড়টা নাগাদ পৌছে যাবো।”
ফোনটা রেখে মোবাইলে সময় দেখলো শিবু, প্রায় এগারোটা বাজতে চললো। তারপর তড়কার দিকে ঘুরে বললো,
“ আজকেই দেড়টা নাগাদ দেখা করতে বললো, এই দু-আড়াই ঘন্টার জন্য বাড়ি গিয়ে লাভ নেই। আমি বরং এখানেই ওয়েট করি। ঘন্টা দুয়েক পরে সোজা গুমটি তে চলে যাবো। তুই নাহয় আড়ালে থাকিস, যাবি আমার সাথে?”
তড়কা শিবুর হ্যান্ডিক্যামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলো। প্রশ্নটা শুনে একটু ঘাবড়ে গেলো, নির্মলদার সামনে শিবুর সাথে একই বাইকে। ওর চাকরি খতরায় পড়বে। কম টাকা হোক আর যাই হোক, ওর বাড়ির তিনটে প্রাণীর ডাল-ভাতের খরচাটাতো ওই চাকরিই জোগায়। কিন্তু আবার ভাবলো, এইসময় শিবু কে চটানো ঠিক হবে না। রিস্ক নিতে না শিখলে সারাজীবন ওই ডাল-ভাত খেয়ে আর ফাটা চপ্পল পরেই কাটাতে হবে। একটু ভেবেচিন্তে গলায় জোর এনে ও বললো,
“ আড়ালে থাকার কী আছে, চুরি-ডাকাতি থোড়াই করছি। ঠিক আছে চল, কিন্তু তাহলে শো-রুমে যাবি না তুই আজ ?”
আবার দুই প্লেট ঘুগনির অর্ডার করে শিবু বললো,
“ দেখি সন্ধ্যা নাগাদ চেষ্টা করবো, ওটা আপাতত থাক।“

দুপুর একটা কুড়ি নাগাদ রেল গুমটির থেকে একটু দূরে শিবু বাইকটাকে স্ট্যান্ড করিয়ে বললো,
“ তুই এখানেই থাক, হাজার হোক তুই তো ওরই আন্ডারে কাজ করিস।আমি টাকাটা নিয়ে আসছি।“
শেডের নীচে শিবু দাঁড়িয়ে ছিলো প্রায় আধঘন্টা খানেক। হঠাৎ দেখলো শিবু ওর দিকেই আসছে দৌড়তে দৌড়তে, হাতে একটা ছোটো কালো পেটমোটা ব্যাগ। গায়ের জামায় ছিট ছিট রক্ত। তড়কার বুকটা ধ্বক করে উঠলো,
“শালা কী হয়ে গেল ! শিবু কী করলি রে তুই !”
শিবু হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে বললো,
“ মাথার ঠিক রাখতে পারিনি রে তড়কা, শুয়োরের বাচ্চাটা ইচ্ছে করে ব্যাগটা দেখাচ্ছিলো বারবার আর শোনাচ্ছিল ও নাকি ইচ্ছা করলে টাকার গদিতে শুতে পারে এখন। আমি বললাম বাতেলা না মেরে আমার দশ হাজার দিয়ে দাও। তারপর তোমার টাকায় তুমি শোবে না হাগবে সে তোমার ব্যাপার। মালটা ওকথা শুনে আমার মুখের উপর দুহাজার টাকার একটা নোট ছুঁড়ে দিয়ে বললো, যা ভাগ্ শালা ভিখারীর বাচ্চা! যখনই দ্যাখো লেলুয়ার মতো টাকা টাকা করে কেঁদে মরে! এক বাপের বাচ্চা হলে শালা কামাই করে দেখা। শালা দশ হাজার টাকা বাপের জন্মে দেখেছিস!
আর সহ্য হলো না। প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বের করে শালার পেট ফাঁসিয়ে দিয়েছি। বাঁচবে না, মাটিতে পড়ে কাতল মাছের মতো হাঁ করে খাবি খাচ্ছে এখন। শালার ব্যাগটাও নিয়ে এসেছি, মাল কড়ি যা আছে, পঁচিশ পার্সেন্ট তোর। এখন চল, তাড়াতাড়ি বেরোই এখান থেকে।“

কী যেন হয়ে গেল তড়কার, এতক্ষণ হাত-পা কাঁপছিলো ভয়ে, কিন্তু ওই পেটমোটা ব্যাগটার এককোণায় উঁকি মারা গোলাপী বান্ডিলগুলো দেখে হাত-পায়ের কাঁপুনি বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক করেছে শিবু। নিজের পাওনা সুদে-আসলে বুঝে নিয়েছে। কিচ্ছু খারাপ করেনি। কিন্তু তড়কার নিজের ভাগের কাজটাও ওকে করতে হবে, ভগবান হাতের কাছে এমন আসলি জিনিস দিয়েছেন যখন, তখন আর নকলি অ্যাক্টিং করা ভিডিও-র দরকার কী! আর কপাল গুণে এই সময় পুরানো গুমটির এদিকে মানুষ তো দূরের কথা, নেড়ি কুত্তাও আসবে না। ভালো, ভালো, এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। শিবুর দিকে তাকিয়ে ও ঠান্ডা গলায় বললো,

“ একটা কথা বল, পুলিশে জানাজানি হলে কী করবি?”
তড়কার গলা শুনে শিবু খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে বললো,
“ পুলিশের খেয়েদেয়ে কাজ নেই। যেদিন থেকে মেয়ে পাচার করতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই ওর নাম ওদের ক্রিমিনাল লিস্টে উঠে গেছে। ওর মরায় কারোর কিচ্ছু যায় আসবে না।“
“ তাহলে আয় আমার সাথে!”
“ কোথায় ?”
“হ্যান্ডিক্যামটা সঙ্গে নিয়ে তড়কা এগিয়ে গেল। হাত কাঁপলে চলবে না। এমন মউকা বারবার আসে না। মার্ডারের এমন মাস্টারপিস ভিডিও বানাবে যে শালা গিয়াসুদ্দীনের মাথার চুল খাড়া হয়ে যাবে। রসদ তো সামনেই আছে। স্পেশাল এফেক্টরও দরকার নেই, আক্কা ন্যাচারাল চীজ!”



যূথিকা আচার্য্য

পেশায় রেস্তোরাঁ ম্যানেজার এবং নেশায় কলমচি। মেলবোর্নে থাকেন। দেশ, যুগ- তোমার আমার, হাট্টিমাটিম, কুলিক-রবিবাসরীয়, সংঘমিত্রা এবং আরও কিছু ম্যাগাজিনে লিখেছেন। ছোটোগল্প সংকলন "আশাবরী" প্রকাশিত হয়েছে দু'বছর আগে। অবসর সময় কাটান নিজের বাগানে।

1 Comment

অনির্বাণ সরকার · আগস্ট 6, 2020 at 12:03 অপরাহ্ন

অসাধারণ লাগলো। লেখিকা অনায়াস দক্ষতায় সমান্তরাল অন্ধকার জগতের আবহ সৃষ্টি করেছেন এবং গল্পটি ছবির মত তুলে ধরেছেন। কলমের প্রতিটা মোচড়ে সেই অন্ধকার নিষ্ঠুর জগতের প্রবল সংগ্রামের ছবি পাওয়া যায়। হ্যাঁ, সংলাপে স্ল্যাং গল্পের প্রয়োজনে এসেছে এবং একদম যথোপযুক্ত। জঙ্গলের আইন চলে এই জগতে। কে যে কখন কী ভাবে শেষ হবে কেউ জানেনা। এক কথায় দারুন লাগলো গল্পটা।

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।