ভাত

মৌসুমী ভৌমিক on

“(১)

পেছনে কয়েক জোড়া ভারী বুটের শব্দ এগিয়ে আসছে। ধরতে পারলে হয়ত বেয়নেটের খোঁচায় রক্তাক্ত করবে আগে, তারপর সোজা গুলি করে জাহান্নমে পৌঁছে দেবে। পারভেজের বুকের দম শেষ হয়ে আসছে দৌড়ে। ব্যস আর একটা ছোট বাঁক পেরোলেই জঙ্গলে ঢুকে যেতে পারবে সে, অথচ মৃত্যুর সাথে জীবনের দূরত্ব কমে আসছে। পারভেজের কাছে এইমুহূর্তে জীবনের প্রতিশব্দ এখন দৌড়। ঠিকঠাক দৌড়তে পারলে আজ বাঁচবে সে, পরবর্তী আর একটা স্তরের লড়াই এর জন্য।


বারাসাত কাছারির মাঠে ডিমের ঝোল ভাতের শেষ গ্রাসটা মুখের ভেতর চালান করে থার্মোকলের থালাটা চাটতে চাটতে পাশে উবু হয়ে বসা গোগ্রাসে ভাত গিলতে থাকা বাবাকে দেখতে দেখতে বললাম, “খুব ভাল খেলাম বল! ও হ্যাঁ বাবা, মনে করে আমাদের পতাকাদুটোকে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। এবারের পতাকাদুটো কিন্তু বেশ বড়। মা সেলাই করে দিলে রান্নাঘরের চালের ছেঁড়া তেরপলটাকে তাপ্পি দেওয়া যাবে। মনে করে তুলে নিও। ওভাবে মাটিতে ফেলে রেখেছ কেন? “ বাবা এমন ঝোলে মাখা হাত এমন করে চাটছে যেন চাটতে চাটতে হাতটাকেও খেয়ে ফেলবে। এরপর ঢকঢক করে খানিক জল খেয়ে ঢকাস করে এক ঢেঁকুর তুলে বললে,”জানি রে। মনে আছে। মিছিলে আসার সময় তোর মা বলেছে নিয়ে যেতে। কিন্তু এখন তো পতাকাদুটো লাগবে। পতাকা হাতে নিয়ে বসতে হবে ভেতরে। আগে খেয়ে তো নিতে দে। কাল আবার অন্য পতাকা। কালও আসিস আমার সাথে। চল, এখন খেয়ে নিয়ে ঐ ভেতরে বসে নেতাদের অনেক কথা শুনে বাড়ি যাব। ইশশশ, তোর মা যদি তোর বোন দু’টারেও নিয়ে যদি আসতো রে। পেটটা ভরে খেতে পেত রে। সে মাগীর আবার বড্ড গুমোর। লোকের বাড়ি বাসন মেজে খাবে, কিন্তু এখানে আসবে না।“ যে বাড়িগুলিতে মা ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে, তারা সবাই যে মাকে খেতে দেয়, তা নয়। একটা বাড়ি চা জলখাবার দেয়। ঐ হয়তো দুটো হাতরুটি, এক টুকরো ভেলিগুড় আর এককাপ চা। আর একটা বাড়ি মাকে সন্ধ্যায় সারাদিনের বেঁচে যাওয়া ঠাণ্ডা ভাত আর তরকারি টিফিন কৌটোতে দিয়ে দেয়। মা সেটা নিয়ে আসে বাড়িতে। আমাদের পাঁচখানা পেট রাতে সেই খাবারেই খিদে মেটায়। মাসের শেষে বেতন পেলে বাজার থেকে সস্তায় চাল, ডাল কিনে আনে মা। বাবা রিক্সা টেনে যা পায়, অর্ধেকই চলে যায় চুল্লুর ঠেকে।“আচ্ছা, কালও কি ডিম ভাত দেবে? ও বাবা, বাবা!” আমি বাবার সাথে মিউনিসিপ্যালিটির জলের ট্যাঙ্কের জলে মুখ ধুতে ধুতে জিজ্ঞেস করলাম। বাবা ধুতির খোঁট দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলো আমার। কয়েকজন ধুমসো মত লোক “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” বলতে বলতে আমাদের সবাইকে ঠেলে ঠেলে লাইন করিয়ে বাঁধানো শামিয়ানার ভেতর ঢুকিয়ে দিলো।

মঞ্চে সব বড় বড় নেতারা কত কিছুই যে বলছে। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ঘুম পাচ্ছে। গরম ভাতের গন্ধে বড় ঘুম পায় আমার। আর সেই গরম ভাত যদি পেটে ঢোকে, তখন কি আর চোখ তার বশে থাকে? মিটিং মিছিল হলেই আমি আর বাবা আসি। বাবা তখন বেশ কদিন আর রিক্সা চালায় না। মিছিলে যেতে হয় যে। আগে বাবা একাই যেত। এক পেট ভাত আর পাঁচশ টাকা পায় বাবা, এখন আমাকেও নিয়ে যায়। গরম ভাত খেতে আমি যে বড্ড ভালবাসি। কখনও কখনও অবশ্য খিচুড়িও দেয়, সঙ্গে পাঁচমিশালী ঘ্যাঁট তরকারি। খাবার মেলে নানা দলের নানা রঙের মিছিলের ভিড় ভরালেই। আমার এই চৌদ্দ বছর বয়সেই বেশ রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়ে গিয়েছে। কত মিছিল, কত রঙ, কত পতাকা! মিটিং মিছিল না থাকলে হরেনকাকার খাবারের দোকানে বাসন মাজি। টেবিলে টেবিলে চা, রুটি, সব্জী ঘুঘনী দেই। একবেলা পেটচুক্তিতে কাজ আর সঙ্গে তিনশো টাকা মাস মাইনে। দুপুরবেলা হরেনকাকা দুটো রুটি দেয় খেতে , আর এক কাপ চা। সঙ্গে কড়াই চাঁছা তরকারি। কোন কোন সন্ধেবেলা হরেনকাকার বাড়িতে আমায় ন্যাংটো হয়ে শুতে হয়। হরেনকাকা আর তার এক বন্ধু পালা করে আমাকে নিয়ে বিছানায় মেতে ওঠে। দুজনেই বড্ড ব্যথা দেয় তখন। কোন কোনদিন পেছন খুবলে রক্ত বের করে দেয়। প্যান্ট খুলে উপুর হয়ে শোবার বদলে পাই গন্ধ হয়ে যাওয়া পান্তাভাত, কাঁচালঙ্কা আর আলুসেদ্ধ। হরেনকাকার দোকানেই কাজ করে বিশুদাদা। ওকে বলেছিলাম একদিন চুপিচুপি। সেও তার প্যান্ট খুলে দেখিয়ে দিয়েছিলো তার পেছনের দগদগে ঘা। গরম ভাতের গন্ধে বিশুদাও বেঁচে থাকে। ভাতের গন্ধে আসলে জীবন বাঁচে।

(২)

“আম্মি, ভাত লাই? ক্ষিদা পাইসে রে আম্মি, ঐ আম্মি ভাত লাই?” ফতেমার বছর বারোর ছেলে বাবলু খিদেয় গোঙাতে থাকে। ফতেমা আজ ইট ভাঁটায় কাজে যেতে পারেনি। রান্নাও করতে পারেনি গায়ে জ্বরের জন্য। ভাঁটায় রোজকার কাজের ফাঁকে তাকে মালিক রফিকুলের সঙ্গে মাঝে মাঝে শুতেও হয়। তাতে কখনও পঞ্চাশ আবার কখনও দেড়শ টাকা বেশী হয় রোজগার। গতকাল সন্ধ্যেতে মদের ঘোরে আর বিকৃত লালসায় মালিক জ্বলন্ত বিড়িটা ঠুসে ধরেছিল ফতেমার দুই পায়ের মাঝখানের লালা ঝরানো লোভের জায়গাতে। যন্ত্রনায় কাতরালেও ছাড় পায়নি সে। রফিকুল উন্মত্তের মত তাকে ধামসিয়ে ছিবড়ে করে তবে ক্ষান্ত হয়।

নিশিগঞ্জের আরও অনেক ভেতরে ফতেমাদের গ্রাম। দুর্ভিক্ষ, অশিক্ষা ও অপুষ্টির ছাপ সর্বত্র। গ্রামের যে কটা ঘর দেখা যায়, হয় ভাঙ্গা, নাহয় কোনোরকমে নারকেল-সুপুরি গাছের পাতা দিয়ে মাথা গোঁজার অবস্থায় এনেছে। ফতেমার মরদটা ওকে পোয়াতি বানিয়েই পালিয়ে গেলো কোথায় যেন। লোকে বলে সে নাকি জঙ্গি দলে যোগ দিয়েছে। পেটেরটাকে বাঁচাতে তার পাশের গ্রামের ইট ভাঁটায় কাজের শুরু, শুরু নিজেকে বেচাও। কয়েকদিনেই সে আবিষ্কার করে দিনের আলোর চেয়ে রাতের অন্ধকারে কয়েকটা টাকা বেশী পাওয়া যায়।

ফতেমার ফুফাতো ভাই পারভেজ চায়ের দোকানের এঁটো বাসন গুলো মেজে ওঠার পর দিনের শেষে সারাদিনের ক্লান্তিতে দোকানের লাগোয়া ঘুপচি ঘরটাতে সুলেমান চাচার সঙ্গে বসে বাড়ীর গল্প করে। আজ সুলেমান চাচা তাকে দুটো বনপাউরুটি আর কড়াই চাঁছা ঝাল আলুর দম বেশী দেবে বলেছে। শুধু তাকে সন্ধ্যের নামাজের পর কিছুক্ষন সুলেমান চাচার শরীরটা তেল দিয়ে দলাই মলাই করে দিতে হবে। তা সে আর এমন কী কাজ! তার সদ্য কৈশোরে পরা হাত-দুটোতে যদিও অপুষ্টির ছাপ রয়েছে, তাও সে দেবে কিছু বেশী খাবার পাবার লোভে। পারভেজের ভয় শুধু গোরস্থানের পাশ দিয়ে রাতের বেলা বাড়ী ফিরতে। ভাঙ্গাচোরা কবর বা সদ্য কবরের উপর শুকনো ডালপালা গুলোকে দেখলে মনে হয় জিন দত্যি গুলো বুঝি হাঁ করে তেড়ে আসছে। গোরস্থানের অন্ধকারে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। ওর পাশ দিয়ে বাড়ী যাবার সময় নাকে আসে তার মৃত্যুর ঠাণ্ডা গন্ধ। প্রাণপনে বাড়ীর দিকে দৌড়তে থাকে তখন সে।

সন্ধ্যের নামাজের পর সুলেমান চাচা লুঙ্গি খুলে উদোম হয়ে শুয়ে পড়ে। পারভেজ এই বীভৎস আদিমতায় ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। “কেয়া রে, ঘাবরাতা কিউ হ্যায়? আ যা লাল্লু” সুলেমান জিভ টাকরায় আটকে অদ্ভুত আওয়াজ করে ডাকে ওকে। ঘোর ভাঙ্গে সুলেমানের হাত তার প্যান্টের ভেতর ঢুকিয়ে যখন সদ্য পনেরোর লিঙ্গটা নিয়ে খেলতে শুরু করে। “ছিঃ সুলেমান চাচা” পারভেজের প্রতিবাদকে পাত্তা না দিয়ে সুলেমান তাকে তার চিটচিটে বিছানায় টেনে শুইয়ে প্যান্টটা একটানে খুলে ফেলে। লন্ঠনের টিমটিমে আলোয় পারভেজের জীবনের সাথে সঙ্গম শুরু হয় সুলেমানের হিসহিসে শব্দের সঙ্গে। ধর্ষণ তৃপ্ত সুলেমান লুঙ্গি বাঁধতে বাঁধতে পারভেজকে হুকুমের স্বরে বলে “ রোজ খাবার বেশী দেব রে শালা তোকে। মেয়েমানুষে আমার আরাম নাই।তোর মত কচি ছেলে চাই। রোজ তুই সন্ধ্যের পর আসবি আমার কাছে।“ পারভেজ জানলো সাদা হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকা শুকনো মাংসেরও দাম আছে।

(৩)

আমি কর্পোরেশনের স্কুলে পড়েছি ক্লাস ফাইভ অব্দি ফ্রিতে। তারপর মা স্কুল ছাড়িয়ে বেঁচে থাকার লড়াইতে নামিয়ে দিলো। আমাদের মত প্রান্তিক মানুষদের জীবনই তো খুঁটে এবং খেটে খেয়ে বেঁচে থাকা। একমুঠো খাবার জোগাড়ের চেষ্টাতেই কাজের খোঁজে নামি। কাজ পেলে নিজের পেটের একবেলা খাওয়া জোটে, সঙ্গে জোটে কিছু পয়সা। কাজ না পেলে বাড়ি এসে আধপেটা খেয়ে রাত কাবার। তারপর মা নানা জনের কাছে খোঁজ নিয়ে হরেনকাকার দোকানে দিয়ে আসে। বোনদুটো বড় হলে ওদেরও হয়তো মা কোথাও লাগিয়ে দেবে কাজে। কিংবা নিজেরাই কিছু না কিছু কাজ জুটিয়ে নেবে। সেই এগারো বছর বয়স থেকেই কোমর থেকে খসে পড়া হাফপ্যান্টটাকে মায়ের ছেঁড়া শাড়ির পাড় দিয়ে বেঁধে হরেনকাকার দোকানে বাসন মাজা আর টেবিল মোছার কাজ করি। চার বছর হয়ে গেল এখানেই। সকাল থেকেই ভিড় শুরু হয়। ভোরবেলাতেই চলে আসতে হয় দোকানে রুটি, চা, সব্জীর জোগান দিতে। আবার কেউ কেউ ভাত,ডাল তরকারিও খায় লেবু লঙ্কা চটকে। অত সকালে আমার চোখে ঘুমের রেশ। সেইসময় নাকে ভাত ফোটার গন্ধে কাজে ভুল হয়ে যায়। গরম ভাতের গন্ধে খিদে পায় ভীষণ। বিশুদা আর মাছ,সব্জী কেটে দেওয়া সন্ধ্যামাসী সামাল দেয় আমার কাজের ভুলগুলো। সকালে মুড়ি জল খেয়ে কাজে আসি। বেলা বাড়লে খিদের চোটে মাঝে মাঝে মনে হয় চারদিক অন্ধকার, বাতাস নেই, আলো নেই। তারপরেও আমি বেঁচে আছি।

মাঝেই মাঝেই সবাই “ জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ” চেঁচাচ্ছে। আমার নাকে তখনও গরম ভাতের গন্ধ। “জিন্দাবাদ, বন্দেমাতরম” হরেনকাকার দোকান থেকে ভাল। ভাতের বদলে প্যান্ট খুলে শুতে হয় না। এখানে খালি মিছিল করো, পেট পুরে খাও আর মাঝে মাঝে পতাকা নেড়ে “জিন্দাবাদ, বন্দেমাতরম” বল। আমার হঠাৎ কী খেয়াল হতেই জিজ্ঞেস করলাম “বাবা তুমি ভোট দাও?” বাবা নিজের কাঁধে প্রায় মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে হ্যাঁ বলল। “আচ্ছা বাবা, আমরা তো সব দলের মিছিলেই আসি। তাহলে কাকে ভোট দাও? “ বাবা কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললে, “ ধুর, ওসব ভেবে কী করবো? যে দল মিছিলে যত খেতে দেবে। কেউ কেউ তো আবার মদের প্যাকেটও দেয় রে, ভোট তো তাকেই দেব। ভোটের দামে আগে পেটটা তো বাঁচাই। ওটাই তো রোজের চিন্তা রে বাপ।“ আমার নাকে তীব্র ভাবে ভেসে আসে গরম ভাতের গন্ধ। বড় মন জুড়ানো সে গন্ধ। চোখ বুজে ভাবতে থাকি গরম ভাতের উত্তপ্ত ধোঁয়ার ছবি।

(৪)

“ফতেমাদিদি? আজ কিছু খাবার বেশী পাইসি। বাবুরে দে। তুই ও খা। জ্বর তো কমে লাই দেখতাসি। কাল বাবুরেও লিয়া যামু কামে আমার লগে ” পারভেজের হাত থেকে ফতেমা আর তার ছেলে খাবার নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে। সারাদিনের অভুক্ত পেট ঠাণ্ডা হয় ক্ষনিকের জন্য। সন্ধ্যের ধকল পারভেজকে ক্লান্ত করে তোলে। নিজের ভাঙ্গাচোরা দাওয়াতে ফিরে আসে। শরীর মাথা ভার হয়ে আসে তন্দ্রায়, ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে ওঠে সে “শরীলের লিগ্যা শরীল বেচি , এই শরীলের লিগ্যাই কত লোভ রে বাপ, আল্লা রে শরীলডা ফিরত লিবি না?” চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে রাত নেমে আসে আর ঘুম নামে শরীরে।

সকাল হয়, রোজের মত। পারভেজ ঘুম থেকে উঠে দেখে আজ গ্রামে জংলা ছাপের পোশাক পরা কয়েকজন এসেছে । যে কটা পরিবার আছে গ্রামে, সবাইকে এক হাজার টাকা , চাল, ডাল আর আলু দিয়েছে। একজন ষণ্ডা মতন লোক কত কী যে বলে গেলো, তা পারভেজ কিচ্ছু বোঝেনি। খিদেতে তার পেট জ্বলছে। ফতেমাদিদির ছেলেটাকে নিয়ে আজ যাবে সুলেমানচাচার দোকানে। বাসন ধুয়ে, ফরমাশ খেটে কিছু তো খেতে পাবে ছেলেটা।

আস্তে আস্তে গ্রামের খেতে না পাওয়া শান্ত রাতগুলো সজাগ হয়ে উঠলো জংলা ছাপের পোশাক পরা লোকেদের সভায় । পাশের গ্রামের মৌলবিরা এসে রোজ ধর্মের বাণী শোনাতে লাগল। সঙ্গে গরম ভাত মাংসের মোচ্ছব। খেতে না পাওয়া মানুষগুলো সন্ধ্যের পর হাঁ করে গিলত মৌলবিদের সেইসব কথা। আতর আর মাংসের গন্ধের মোড়কে ধর্মের বাণী গিলতে অবশ্য মন্দ লাগত না কারোরই। সাথে টাকাও আসছে হাতে, মন্দ কী! পেটগুলো ভাতের স্বাদ পেতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে গ্রামের মেয়েমানুষগুলোকে তাদের শরীরের নৈবেদ্য দিতে হয় এই পবিত্র বান্দাদের, কিন্তু তাতে কী? পেটে ভাত পড়াতে তো তাদেরও শরীরের খিদে বাড়ছে। মেয়েমানুষ বলে কী শরীরের খিদে নেই?

ফতেমার ছেলে বাবলু সুলেমানের দোকানে চায়ের বাসন ধোয়ার কাজ নিয়েছে প্রায় একমাস হতে চলল। বারো বছরের কচি ছেলেটাকে দেখে সুলেমানের শরীর আনচান করে ওঠে। মাঝে মাঝেই দুপুরের খাবার দেবার সময় পারভেজের নজর এড়িয়ে বাবলুর প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেয় সে। বাবলুকে সে খাবারের লোভ দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখে।

পারভেজ আজকাল আর ভয় পায় না গোরস্থানের পাশ দিয়ে বাড়ী ফিরতে। বরং গোরস্থানের কবর খোঁড়ে যে কাশেমচাচা, তার সঙ্গে বাড়ী যাবার সময় ফাঁক পেলে গল্পও করে যায়। চাচাকে সে বলেছে একটা কবর তার জন্য খুঁড়ে রাখতে, খুব দরকার আছে তার।

গ্রামে ইমাম সাহেব এসেছেন। আজ নাকি অনেক ধর্মকথা বলা হবে। তাই জংলা পোশাকের বন্দুক হাতে ফেরেশ্তাদের আজ অনেক ভিড়। আজ পারভেজ কাজে যায়নি, বাবলু একা গিয়েছে। পারভেজের অনেক কাজ আজ গ্রামের এই সভায়। সন্ধ্যে নামে। গ্রামের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের সুর। সুলেমানের বিছানায় বাবলুর চিৎকার আজানের সুরে ঢাকা পড়ে যায়৷ ইটভাঁটায় ফতেমা ব‍্যস্ত রফিকুলের কাছে। এদিকে গোলাপজল আর মাংসের গন্ধে সভার মঞ্চের পাশটা ম ম করছে। ইমাম সবাইকে কালো নুনিয়ার চাল দিয়েছে একমাসের। সাথে লাল মেটে আলু৷ জংলা পোশাকের লোকগুলোর সর্দারটা বলেছে বড়লোকরা নাকি এই চাল খায়। বলেছে আরো দেবে, শুধু তাদের বর্ডার পার হয়ে পাশের দেশে যেতে হবে৷ বিধর্মীদের নিকেষ করতে হবে৷ গ্রামের শেষে যেখানে দেশটার শেষপ্রান্ত কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে দেওয়া, ওখানে যেতে হবে কাফেরদের শেষ করতে। তবেই পারভেজরা আল্লাহর কাছে যেতে পারবে৷ পারভেজরা ক্ষিদেকে চেনে, গরম ভাতের গন্ধের জন‍্য শরীর আনচান করে, তাই ঢকঢক করে মাথা নেড়ে দেয়, পেটটা তো ভরবে দিনের শেষে৷


গোরস্হান পেরিয়ে পারভেজদের চার জনের দলটা এগিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে গ্রামের শেষপ্রান্তে, কাঁটাতারের কাছে৷ আজ তাদের আল্লাহর কাছে পবিত্র কাজের দিন। এগিয়ে যায় ওরা বিএসএফ ক‍্যাম্পের পাশের জমিতে। কিন্তু একি? হঠাৎ উল্টোদিক থেকে গুলি ছুটে আসছে কেন? ইমাম বা জংলা পোশাকের সর্দার যে বলেছিল গ্রামের পেছনদিকটা দিয়ে গেলে বিপদ নেই?পারভেজরা দৌড়তে শুরু করে গ্রামের দিকে। পেছনে ভারী বুটের শব্দ তুলে বিএসএফের জওয়ানরা৷ মাঝরাতে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দও ফিকে হয়ে যায় ভারী বুটের শব্দে, বাতাস ভারী হয় বারুদের গন্ধে৷ পারভেজরা দৌড়চ্ছে …..”


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


মৌসুমী ভৌমিক

জলপাইগুড়িতে জন্ম। শিক্ষাগত যোগ‍্যতা MA(English) এবং MBA in Human Resource. লেখা ছাড়া ফোটোগ্রাফি ও ফোটোশপ ডিজাইনে আগ্রহী। ছোট এবং বড় গল্প লিখতে পছন্দ করেন। ব্ল‍্যাকবোর্ড ওয়েবজিন ও অপদার্থর আদ‍্যক্ষর পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।