বান

রিংকু কর্মকার চৌধুরী on

-ও মিঁঞা দেহেন না ছাগল দুইটা ডাকতাসে ক্যান?
ও মিঁঞা। মানোয়ারা বেগমের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল রহমতের।
খ্যাঁক করে উঠল রহমত,’আহ! এত ফাড়ান দাও ক্যান, আমি কি করুম? ডাকতাসে তো কি কোলে নিয়া বইস্যা থাকুম। হালা কুথাও এট্টুকুন বিছ্রাম নেই। কাজের জাগায় মালিকের হালুম হুলুম ঘরে বিবির বজবজ।ঘুমাও না ক্যান? ঘুম আহে না? ঘ্যানঘ্যান করতাসো। বাইরে পানী পড়তাসে। অরা বৃষ্টিতে ডাকসে ঘুমাও দেহি।
রহিমা অ রহিমা! অ রহিমা! মইর‍্যা গেলি নাকি ভাতারখাকি। মরণ ঘুম ঘুমাইতাসোস। স্বামীর কাছে বকা খেয়ে মনোয়ারা তার কুড়ি বছরের সদ্য বিধবা মেয়েটাকে গালিগালাজ করতে লাগলো।
একমাস হল রহিমার স্বামীর এন্তেকাল হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে ভরপুর সম্মান দেখিয়ে বিদেয় করা হয়েছে তাকে। দুধের খোকা কে অব্দি এতটুকু কিছু দেয়নি ওরা।বাপের ঘরে আসা ইস্তক মায়ের ঝাঁঝে টিকতে পারছে না রহিমা। তবু খোকা আছে বলে বেঁচে থাকা। আরও একজন আছে বটে যে খবর তালুক পুছতাছ করে।এটা সেটা দেয়।
ইদানীং সেও একটা কারণ বটে। তবে এসব কথা তার আব্বু জানতে পারলে পিঠের ছাল খেঁচে দেবে তা বেশ ভালো জানে রহিমা। আপাতত এই ক্ষণে মায়ের কথা শুনেও চুপ করে পড়ে থাকে সে। জানে উঠলেই হুকুম শুরু হবে।

অরে অ মুখপুড়ি।ঘাপটি মাইরা পইড়া আসোস।আবাজ দেস না। বেটি বাপের খাবে আর মায়েরে পাত্তা দিব না।ইয়াল্লা! আমাকে তুইল্যা নাও। কি পাইলাম আর এ জেবনে। মানোয়ারার একটানা ঘ্যানঘ্যানানিতে উঠে পড়ল রহমত।উঠেই মানোয়ারার পিঠে ধুর মাগী বলে খিঁচে লাথি মারলো।মানোয়ারা ঘা খাওয়া কুকুরীর মত ক্যাঁও ম্যাঁও করতে লাগলো।
বাপকে উঠতে দেখে রহিমাও ভরসা পেয়ে উঠে পড়েছে। মানোয়ারার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ডাকছিলা ক্যান? কি হইসে?
হারামখোর বাপের কাসে মার খাওয়াইয়া এহন ন্যাকামি সাধছো। দূর হ।
রহিমা মানোয়ারার কথা যেন গায়েই মাখলো না। বলল,খোকারে দুধ খাওয়াইলাম।ঘুমাইতেসেলো তাই আবাজ দেয় নাই।
মিছা কথা কবি না। দূর হ।
রহিমা কথা না বাড়িয়ে ঘরে ঢুকে দেখল খোকার মাথার উপরের টিন ফুঁটো হয়ে জল পড়ছে অঝোরে।ছেলে কে বুকে তুলে নিল, কাপড়ের আঁচল দিয়ে মাথাটা মুছে,দৌড়ে এল মায়ের ঘরে।
আম্মু! আব্বু কই গেলো। পানী বাড়তাসে বাইরে।ঘরের চাল ফুঁটা হয়ে গেসে।
কি কস? হায় আল্লাহ পরবরদিগার রহমতুল্লা।সব নিয়া নিতাসো আমাদের থিক্যা। হা কিসমত।গতবার পোলা গেল। এবেরে মাথার ছাও যাবে। হায় আল্লাহ। আমি মরি না ক্যান মওলা।

বাইরে অঝোর বৃষ্টির মধ্যে পোয়াতি বিড়ালিনীর মত কঁকিয়ে যাচ্ছে মানোয়ারা। ছেঁড়া বস্তা মাথায় চেপে রহমত তখন ছাগল দুটো কে জলের হাত থেকে বাঁচাতে ঘরে টেনে আনার ব্যবস্থা করছে। বস্তায় জড়িয়ে ছাগল দুটো কে দলা করে নিয়ে বুকের কাছে চেপে ধরেছে। এই ছাগল দুটো চলে গেলে ওর আর কিছুই থাকবে না। মুরগীগুলো আগেই গেছে ফ্লু তে। এই ছাগল দুটো নেবে বলেছে রামু মুদি। দুইহাজারে রফা হয়েছে। অষ্টমীর দিন বলি দেবে। রামু মুদির মানত আছে নাকি।দু বর্ষা আগে ওর দুটো ছেলে ভেসে গেছে।তাই মানত ছিল এইবারেও যদি ওর ছেলে হয় ও জোড়া ছাগ বলি দেবে। ওর যমজ ছেলে হয়েছে।
রহমত ঘরে ঢোকার আগে আকাশের দিকে তাকালো। অবস্থা ভালো না। প্রবল ঝড়ে বড় বড় গাছগুলো নটে গাছের মত দুলছে। গেল বর্ষা ওর ছেলে জয়নাল কেও খেয়েছে। তাগড়াই জোয়ান ছেলেটা নদীর টানে বেড়িয়ে গেল।জ্বালা করে উঠল রহমতের চোখ। বৃষ্টিভেজা মুখে আলাদা করে জল বোঝা যায় না। তবু দু চোখে চিক চিক করে জল বয়ে গেলে ছাপ রেখে যায়। কালশিটে লম্বা ছাপ। এই পথ দিয়েই বিষাদের আসা যাওয়া। এই পথটাই মসৃণ নইলে পুরো জীবনটাই তো খানা-খন্দে ভরা।

রহিমা দরজাটা খোল মা। অ রহিমা।
খুলতেসি আব্বু। রহিমা দরজাটা খুলে দেয়। রহমত ঘরে ঢুকে ছাগল দুটো কে নামিয়ে রাখে।
আফনে একদম ভিইজ্যা গেসেন। ঠান্ডা বোধ হইব আপনার।জুকাম লাগবো।মাথা পুইছ্যা নিন। রহিমা রহমতের দিকে গামছা এগিয়ে দিয়ে বলল।
অ কিসু না। গরীবের আবার ঠান্ডা জুকাম।তর আম্মি ঘুমাইসে?
হ এক্ষণ ঘুমাইলো।
রহমত মাথা মুছে বলল খোকারে এহানে আনলি যে? জল পড়ে বিটি? হা কিসমত কি আর করবি কত বড় ঘরে বিয়া হইল।কত মনিষ্যি খাইল।তর ভাইজান কত আমোদ করল।এহন তো সব শেষ। । দুই বৎসর না ঘুরতেই।
রহিমা তার আব্বু কে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, ওসব কথা থাউক এহনে।আপনি জিরোন।
তুই কুথায় শুবি বিটি? রহমতের মেয়ের শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখে করুণা হল।
এথানেই শুয়ে পড়তাসি।ঘুম আইবো না। খোকার শরীলে তাপ আইসে বুজি। কাঁপে আব্বু। পিদিমের শিখার মর এতটুকুন প্রাণ ধড়ফড় করে জানেন।খোকা আমার কিইবা পাইল আর। যা হউক।আফনে ঘুমান আব্বু। আমি আসি।রহিমা ছেলে কে আরো ঘনভাবে জড়িয়ে ধরল বুকের মধ্যে।
রহমতের দীর্ঘনিশ্বাস বৃষ্টির আওয়াজে ঢেকে গেল।

একসময় সব চোখই বুজে এল। মাঝরাতে ধড়মড় করে উঠে বসল মানোয়ারা।রহমত কে ধাক্কা মেরে ডেকে তুলল, ‘ওঠেন! ওঠেন! পানী বেড়েসে। ঘরে পানী ঢোকে। ইয়াল্লা কিছু করেন আফনে।
রহমত তড়িঘড়ি উঠে বসে দেখে রহিমা ছেলে কোলে নিয়ে যেখানে বসে তার অদূরেই একটা সাপ কিলবিল করে চলে গেল। দুর্যোগে সবাই আপন আপন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত ভেবে খুশীই হল রহমত। ঘরময় পায়ের পাতা ডোবা জল। মানোয়ারা ডাকলো ওলো ও রহিমা বার অইতে হবে মা ঘর যে পানীতে ভইর‍্যা যাইতাসে। ওঠ দিকিনি।উইঠ্যা পড়।লড়নচড়ন দিয়া ওঠ।
রহিমার ঘুম ভেঙে দেখলো কোমর থেকে শাড়ি জবজবে ভিজে।খোকার গায়ে বেশ তাপ।

কুপি তে আরেকটু তেল দিয়ে ঝটপট দুটো তিনটে পুঁটলি বেঁধে নিল রহিমা আর মানোয়ারা।ততক্ষণে রহমত দুটো শুকনো বস্তায় জড়িয়ে নিয়েছে ছাগল দুটো কে। আরেকটা শুকনো বস্তা রহিমা কে দিয়ে বলল, ‘খোকা কে ভালো কইর‍্যা জড়াইয়া নে বিটি। দেহস ভেজে না যেন পোলাডা। মানোয়ারা কে বলল, জলদি হাত চালাও বিবি। বৃষ্টির অবস্থা ভালোনা।

মানোয়ারার খুব সজাগ কান, এত জল ঝড়েও শুনতে পেল কারা যেন বাইরে খুব চেঁচামেচি করছে। শুনছেন আফনে? কারা যেন চেঁচায়। রহমত ও শুনেছে আওয়াজ মাথা নাড়িয়ে জানান দিল। হঠাৎ চিৎকার টা ওদের বাইরে এসে পড়ল।কারা যেন ধাক্কা দিচ্ছে রহিমাদের দরজায়। রহমত তড়িঘড়ি দরজা খোলে। দেখে পাড়ার লোকজনের জমায়েত।
পাশের বাড়ির বসীর বলছে ও চাচা চলেন গো জল ছেড়েছে নাকি বাঁধের এবার না বাইর অইলে মরতে হইব। আমরা তৈরী বসীর মিঁঞা। মানোয়ারা আর রহিমাও বেড়িয়ে এসেছে ঘর থেকে। ঘরে তালা দিচ্ছে মানোয়ারা। খোকা রহিমার কোলে। একখান
দুঃসংবাদ আছে চাচা, পাশের পাড়ার দীনু বলল।
রহমত জিজ্ঞেস করলো কি হয়েসে দীনু?দীনু বলল, আমাদের পাড়ার রমেশ দত্ত, রিক্সা চালায় চেনো তো?
হ চিনি রহমত বলল।
তার ছোট পোলাটা একটু আগে মারা গেছে।দীনু বলল।
মানোয়ারা দুকানে হাত দিয়ে বলল,ইয়া আল্লা, কেমনে?
বাজ পড়েছেল চাচী, টিটু চোখের সামনে ধড়ফড় করে চলে গেল। রাজমিস্তিরির কাজে দারুন হাত পাকাচ্ছিল।জয়নালের বয়সী তো ছিল গ।
রহিমা খোকা কে আরো জোরে জড়িয়ে ধরল। খোকা কেঁদে উঠল।
সামনেই কোথাও বাজ পড়ল, কেঁপে উঠল সবাই।

নৌকায় করে দীনু আর বসীর অনেককেই ইস্কুলবাড়ি অব্দি পৌঁছে দিচ্ছে। গুপিচুপি করে সব্বাই গায়ে গা লাগিয়ে বসে। মানোয়ারা দীনু আর বসীর কে দেখে ভাবছে এই কাজটা তার ছেলে জয়নালও করতো। কিভাবে তাজা ছেলেটা ভেসে গেল। শরীলটাও পায়নি কেউ। কঁকিয়ে উঠল মানোয়ারা। রহমত মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে রহিমা কাঁদছে। রহিমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, কাল সক্কালে ডাক্তারের খোঁজ করবো বিটি। এট্টু পানী কমুক, খোকা ভালো হইয়া যাইব রে মা। রহিমা কিঁছুই বলল না।

ভোর হতে চলল,খোকার জ্বর একটু কমেছে।রহিমা দেখল আব্বু আর আম্মি দুজনেই ঘুমোচ্ছে দেওয়ালে ঠেঁস দিয়ে।পাশে পড়ে থাকা পুঁটুলিটা খুলে একজোড়া পাজেব বের করল, আর একটা রঙ্গীন কাপড়,জরী চুমকি বসানো। জিনিষগুলো বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল রহিমা।বিড়বিড় করে বলল, টিটু সব খোয়াব মাইনষের পুরা হয়না। আল্লা তোমারে বেহস্ত নসীব করাক।আমার জম্মটাই তো দোজখের।

একফোঁটা জল গড়িয়ে খোকার গালে পড়ল,খোকা নড়ে উঠল।খোকা কে কোলে নিয়ে স্কুলবাড়ির বারান্দায় এল রহিমা। দেখে বাইরে বৃষ্টি একটু থেমেছে। ভরা বন্যার ডুবুডুবু জলে শাড়ি আর পাজেব ছুঁড়ে ফেলে দিল রহিমা।



রিংকু কর্মকার চৌধুরী

ইংরেজী তে স্নাতকোত্তর।অপদার্থের আদ্যক্ষর পত্রিকা, পথের আলাপ, দৌড়, কবিতা ক্লাব, নতুন কৃত্তিবাস, চিলেকোঠা, নিয়ন,রংছুট, শব্দের মিছিল, শাব্দ, শব্দযান, বৃষ্টিদিন এ ছাড়াও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিওমিত লেখেন। কবির কাছে লেখা মনের আরাম। কেরিয়ার- নিজস্ব বুটিক অমলতাস।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।