ফিনিক্স

ঋভু চট্টোপাধ্যায় on

এই বাড়িটা বেশ সুন্দর, অন্তত মৃনালের কাছে।দু’তলার একটা ঘর তাদের কম্পানি ভাড়া নিয়েছে,পাশের আরেকটা বাড়িরও নিচের তলার পুরোটা ভাড়া নেওয়া রয়েছে।সেখানে সিমেন্ট, বালি পাথরের সাথে কয়েকজন লেবার থাকে, এটা হল স্টোর-রুম।এই ঘরটারও একটা চাবি মৃনালের কাছে থাকে।মৃনাল এই কম্পানির স্টোর কিপার, কাম সুপারভাইজার।বি.এস.সি. পাশ করে কয়েকবছর বসে থেকে আর মাঝে মাঝে সস্তার কয়েকটা পরীক্ষায় বসে, চাকরি পাবার চেষ্টার মাঝে বড় মেসো এই কম্পানিতে চাকরিটা করে দিয়ে বলেন, “দ্যাখ, দিনকালের যেরকম অবস্থা,তাতে সরকারি চাকরির আশায় বসে থাকলে বুড়িয়ে যাবি।তখন কোন প্রাইভেট কম্পানিও চাকরি দেবে না।আর তোর বাড়ির অবস্থা এমন নয় যে পাঁচ ছয় বছর তোকে শুধু টাকার জোগান দিয়ে যাবে।তার থেকে হাতের কাছে যেটা পাচ্ছিস সেটাতে দুগ্গা বলে ঢুকে যা।সময় সুযোগ হলে, বা বয়স থাকলে সরকারি চাকরির পরিক্ষা দিবি, ব্রাহ্মণ বাড়ির পাপ তো।তাছাড়া তোকে ভালো কম্পানিতেই ঢোকাচ্ছি,ওভার-টাইম আছে, হাসপাতালের সুবিধা আছে, ইপিএফ আছে, কোন অসুবিধা হবে না।”

মেসোর কথার উপর মৃনাল কোন কথা বলে না, বলবেই বা কি করে, বাবা মারা যাওয়ার পরে জমানো টাকার ওপর পাল তুলে ছিল তো এই মেসো।তাই নিজের ইচ্ছেতে না হলেও মায়ের ইচ্ছেতেও শুনত।কিন্তু এসময়ে সমস্যা হল মাকে একা রেখে চলে যাওয়া।বয়স বাড়ছে, তাছাড়া বাবা চলে যাওয়ার পরে বেশ অন্যমনস্ক হয়ে গেছে, ভুলে যায়, মাঝে মাঝে চুপ করে একা বসে থাকে।তাও মেসো বলা মাত্রই মাকে একা রেখে বাড়ির থেকে একশ ষাট সত্তর কিলোমিটার দূরে থাকতে আরম্ভ করল,সঙ্গি থাকল শুধু মায়ের জন্য চিন্তা।মাকে একবার নিজের কাছে নিয়ে রাখবার কথা ভাবলেও বলতে পরেনি।বেসরকারি কাজ, ছুটিও হাতে গোনা।দু-আড়াই সপ্তাহ পর পর বাড়ি ফিরতে পারে, তাও মাত্র একদিনের জন্যে।সারাটা দিন হাড় ভাঙা পরিশ্রম।প্রতিদিন মায়ের সাথে যোগাযোগ বলতে এই ফোনটাই একমাত্র সম্বল।

খুব সকালে উঠে স্নান করে, স্টোরে সে’দিনের সব মাল হিসাব করে মিলিয়ে দিয়ে, তারপর কাজের জায়গায় যায়।প্রতিদিনের এক্সট্রা লেবারদের পেমেন্ট বা অন্যান্য কাজকর্মের মাঝে সব কিছুর মনিটারিং করাও একটা বিরাট কাজ।এঞ্জিনিয়ারদের সাথে কথা বলা বা স্থানিয়দের সাথে কথা বলার মাঝে, মাকে ফোন করবার সুযোগ পায়।জীবনটা এই রকমই দূরদর্শনের মতই চলতে শুরু করে, শুধু দেখবার কেউ নেই।

সন্ধে নামলেই বাসাতে ফিরে আসে।অন্য সবার কাজ মিটে গেলেও মৃনালের মেটে না।সারাদিনের সব কাজের হিসেব এস.এম.এস বা ফোনে হেড অফিসে পাঠিয়ে দিতে হয়।এইসব কাজ সারতে সারতেই শরীরে রাত্রি নামে।সারাদিনের ওঠা নামা, টানা-পোড়েনে শরীরের কলকব্জা গুলো ক্লান্ত হয়ে যায়, তখনই ঘুমে ঢলে পড়ে শরীর।

ভাড়া বাড়ির মালিকের সাথে মেলামেশার কোনো সুযোগ নেই, মৃনালও সেরকম আগ্রহ দেখায় নি, হাজারটা প্রশ্ন, অতো আর ভালো লাগেনা।কম্পানি একদিন ছুটি দিলে আগের রাতে বাড়ি ফেরার জন্য হাত পা ছট্ ফট্ করে।তারমধ্যে যদি বাড়ির মালিকের সাথে দেখা হয়, মালিক প্রথমেই বাড়ি ভাড়া সম্পর্কে কিছু কথা জিজ্ঞেস করে, কখনো বা,“কেমন আছো হে, কাজ কতদূর এগুলো, আমরা জল পাবো তো, নাকি কুয়োর জলেই শেষ স্নানটা করতে হবে।”  

মৃনাল এইসব কথার সেরকম জবাব দেয় না।কখনও মাথা নেড়ে, কখনও বা হ্যাঁ হুঁর মাধ্যমে কথা বলে নেয়।কোনদিন কোনো পাল্টা প্রশ্ন করেনা, “আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?বা কে কি করেন?”                                                                

এই ভাবেই চার মাস কেটে যায়।কম্পানির কাজে কলকাতা আসার জন্যে একদিন অন্ধকার থাকতে উঠে নিচের বাথরুমের কাছে এসে আলো জ্বালাতেই চমকে ওঠে মৃনাল।চোখের ভুল!না তা’তো নয়, চোখ দুটো বন্ধ করেও আবার দেখে, না না ভুল নয়।এই এত দিন এখানে এসেছে, সকালে স্নানও করেছে, কিন্তু এনাকে তো কোনো দিন দেখতে পায়নি।একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে,“আপনি কে?আমি তো ঠিক আপনাকে চিনলাম না।”সঙ্গে সঙ্গে টর্চটা নিভিয়ে বলেওঠে, ‘সরি আপনি স্নান করছেন বুঝতে পারিনি।’            

-না না এতে তোমার কোনো দোষ নেই।আমিই তো অন্ধকারে ছিলাম।

-আপনি স্নান করে নিন, আমি পরে আসব।

-তুমি বাথরুমে যাবে তো, পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারো, অন্ধকারে অসুবিধা হবে না।

-কিন্তু কেউ উঠে গেলে?

-এখন কটা বাজে,পাঁচটা? ছ’টার আগে কারোর ঘুম ভাঙবে না।

-কিন্তু এভাবে আপনার সামনে…..                               

-আচ্ছা, আমি সরে যাচ্ছি।

ততক্ষণে আকাশ ফেটে আবছা আলো ফুটেছে।পাখিদের কিচির মিচির মৃনালের বাথরুম করবার আওয়াজ চাপা পড়ে গেলেও অনেক প্রশ্ন লাফাঝাঁপা আরম্ভ করে দিল।

বাথরুম করে কলতলা থেকে বেরিয়ে সামনে আসতেই, দেখতে পেল ভদ্রমহিলা তখন একটা গামছা পরে দাঁড়িয়ে আছে।আবছা আলোতেও গায়ে সাবান চোখে পড়ল।

মৃনালকে বেরিয়ে আসতে দেখে প্রশ্ন করল,‘আজ এত আগে উঠলে?’

-কলকাতা যাবো, সাড়ে ছ’টার ট্রেনে।

-তাই!স্টেশন কিভাবে যাবে?অনেকটা রাস্তা তো।

-ড্রাইভারকে তুলব।কম্পানির গাড়িতে চলে যাব।সাইকেলও আছে।আপনি স্নান করে নিন।

মৃনাল নিজের ঘরের দিকে হাঁটা আরম্ভ করবার পরে আবার পিছু ডাক শুনল, “চা খাবে?”                                       

-আমার এখনো হাত মুখ  ধোওয়া হয়নি।  

-ঠিক আছে তুমি হাত মুখ ধোও, আমিও স্নান করে নি।           

-আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।রোজ বাইরে খেয়ে নি, লেবাররাও বানায়।  

-জানি, প্রতিদিনই তো দেখি।          

-আপনি প্রতিদিন দেখেন?

-দেখব না!একই বাড়িতে থাকা।

-কিন্তু আমি তো আপনাকে কোন দিন দেখিনি।                      

-ঘরে যাও, চা আনছি।                                     

মৃনাল নিজের ঘরে গেলেও একটা প্রশ্নও পিছন ছাড়ল না।কি, কেন কিভাবে কোথায়, সব ক একসাথে মাথার ভিতর কিলবিল করতে আরম্ভ করল।বাইরেটা যত পরিষ্কার হচ্ছিল অন্ধকার ততই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল।উপরে হাতমুখ ধুয়ে জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেই দরজায় টোকা মারবার আওয়াজ পেল।দরজা খুলতেই সামনে সেই মহিলাকে চায়ের কাপ ডিশ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।মৃনাল ভিতরে আসতে বললে উত্তর দিল,‘না, ভাই আজ না, অন্য আরেক দিন আসব।রান্না চাপাতে হবে।সবাই খেয়ে যাবে তো।’

-আপনি……………?

-এ বাড়ির বড় বউ।

সেদিনের কোলকাতা ঘোরাটা ভালো হল না।মনের এ’কোণে ও’কোণে মাঝে মাঝেই খোঁচা লাগতে আরম্ভ করল।বাসে যেতে যেতে অন্যমনস্ক হয়ে গেল।অবিরাম ছুটতে থাকা ঘরবাড়ি লোকজন সবাই যেন পিছনের দিকে টানছে।

বাসায় ফিরে ঘরে ঢোকার আগে চোখ সেই বাথরুমের দিকে চলে যাচ্ছিল।আলো ছিল, তবে সকালের সেই আবছা অন্ধকারটা বড়ই প্রয়োজন মনে হচ্ছিল।এরপর থেকে প্রতিদিনই বাসা থেকে সকালে বের হওয়ার আগে বা সন্ধ্যার অন্ধকারে বাসাতে ফেরবার সময় চারদিকটা দেখতে আরম্ভ করল।বাড়িটা এমনভাবে তৈরী, যে ভিতরের লোকদের উপস্থিতি বোঝা গেলেও দেখার সেই রকম অবকাশ নেই।অবশ্য মৃনালের সেই সময়ও নেই।কাজ থেকে ফেরার পথে রুটি নিয়ে বাসাতে চলে আসে।তারপরে নিচে নামা বলতে রাতের বাথরুম।

কয়েকদিন পরে কাজ থেকে ফিরে, আরো কিছু কাজকর্ম ও খাওয়া দাওয়ার পরে, শুয়ে পড়ল।সারাদিনের হাড় ভাঙা খাটুনিতে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমও এসে গেল।মাঝরাতে দরজাতে হাল্কা টোকা মারবার শব্দ কানে এল।প্রথমবারটা শোনার ভুল ভেবে শুয়েই থাকল।আবার শব্দ।শুয়ে শুয়েই বলে উঠল, ‘কে?’

অন্যদিক থেকে মহিলার চাপা গলার আওয়াজ শুনল, ‘বড় বউ, দরজা খোলো।’

 এত রাতে বড় বৌ! কোনো বিপদ হল? নাকি মৃনালকে বিপদে ফেলতে এসেছে। সেদিনের  পরে অনেকদিন দেখা হয় নি।তবে সেই মহিলাকে তো খারাপ মনে হয় নি।তাও বলা যায় না।মৃনাল একটু ইতস্তত করেই দরজা খুলল।বড়বউ সঙ্গে সঙ্গে মৃনালের ঘরের ভিতরে এসে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিল।

হেমন্তের অন্ধকার রাত।ঘরের ভিতর দুটো মানুষ প্রথমেই কেউ কারোর সাথে কথা না বলে দাঁড়িয়ে রইল।শুধু দু’জন, দুজনের শ্বাসের আওয়াজ শুনল।কিছুসময় ঐ রকম ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবার পরে বড় বউ বলে উঠল, ‘বিরক্ত করলাম?’

-না ঠিক বিরক্ত নয়,তবে একটু অবাক হয়ে আছি।আপনি বসুন, আমি আলোটা জ্বালছি।

-না, না আলো জ্বালাবার দরকার নেই, অন্ধকারই ভালো।

-আপনি বসুন, আমি তাহলে ছোটো টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালছি, কম আলো সুবিধে হবে।

-এখন এমনিতেও কেউ বুঝতে পারবে না, প্রায় আড়াইটে পৌনে তিনটে বাজে তো, এবাড়ির সবাই এখন ঘুমিয়ে পড়েছে।বড়’বৌ বেশ চাপা স্বরে কথাগুলো বলে আস্তে আস্তে মৃনালের মশারি লাগানো খাটের এককোণে গিয়ে বসল।মৃনাল টেবিল ল্যাম্পের আলোতে সামনা সামনি ভালো ভাবে বড়’বউকে দেখল।বয়স পঁয়ত্রিশের কাছে।পরনে সাদা শাড়ি, তবে হাতে শাঁখা, পলা ,মাথায় সিঁদুরও আছে।টেবিলে রাখা বোতল থেকে জল পান করে, বড় বৌএর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,‘জল খাবেন?’

-না, তুমি বোসো।

মৃনাল চেয়ার তুলে বড়’বৌএর সামনে রেখে তাতে বসে বলল,‘এত রাতে কোনো দরকার আছে?’

-দরকার তো আছে, তবে এখন বলব কিনা বুঝতে পারছি না, তোমাকে কতটা বিশ্বাস করব সেটাও তো বুঝতে হবে।

এই কথাগুলোতে মৃনাল বেশ অবাক হয়ে কিছুসময় কোনো কথা বলতে পারল না।কিছু সময় পরে বলল,‘এত রাতে বাইরের একটা ছেলের কাছে চলে এলেন, এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না?’

-তোমার ঘরে আসার আগে এই ক’মাস ধরে তোমাকে লক্ষ করছি।তোমার আসা  যাওয়া, খাওয়া, রাত জেগে জেগে কাজ করা সবকিছু।

-তাই!কিন্ত আমি তো কিছুই বুঝতে পারিনি।

-কিভাবে বুঝবে?তুমি বের হও সকালে, ফেরো রাতে।ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দাও।তবে আলো জ্বলে, অনেক রাত অবধিই জ্বলে।আজ একটু আগে নিভেছে, এগারোটা পনেরো কুড়ি নাগাদ।ঠিক তো?

-বাব্বা!আপনি এত খবর রাখেন? আমি তো কিছুই জানিনা, এমনকি এ’বাড়িতে কতজন লোক আছে তাই জানিনা।বড় বৌ সে’রাতে মৃনালের ঘরে অনেকক্ষণ ছিল, মৃনাল কথা প্রসঙ্গে জেনেছে কিভাবে  ছোট বয়সে বাপ-মা মরা বড়বৌ এর মামা মামি, এবাড়ির বড় ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়।চমকে ওঠে মৃনাল যখন বড় বৌ বলে,‘এবাড়িতে আমার কোন অধিকার নেই।তবে এই ঘরটাতে, আমি ফুলশয্যা করেছি, মানে এ’বাড়ির বড় ছেলের সাথে বৌ-ভাতের রাতে কয়েক ঘন্টা থেকেছি।’

-আপনার হাসবেন্ড?

– হ্যাঁ।

– এখন কোথায় থাকেন?এথানে থাকেন না বুঝি?

– না, পালিয়েছে।বিয়ের দুদিন পরেই।পাগল ছিল তো।

-পাগল!আপনি বিয়ে করলেন ক্যানো?

 বড’বৌ লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলল,‘বিয়ে কি আর সাধ করে করলাম ভাই, দিয়ে দিল।’ মৃনালের সামনেই বড়বৌ নিজের শ্বশুরকে ঢ্যামনা বলে পরেই আবার বলে উঠল,‘গুরুজন তো, বলতে নেই, কিন্তু টাকা ছাড়া আর কিছুই চেনে না।আমার মায়ের গয়না, জমি বিক্রির টাকা, সব নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।’

-আপনি পালান নি কেন?

-কোথায় যাবো ?

-কেন বাপের বাড়ি, কেউ থাকেনা বুঝি এখন?কথাগুলো শুনেই বড়বৌ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,‘বললাম না, বাবা মা অনেক ছোটোতেই মারা গেছে।’তারপরে একশ্বাসে বলে গেল কিভাবে মামা মামি জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল।

শেষের কথাগুলোতে গলা আরো জড়িয়ে যাচ্ছিল, সাদা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল,‘বাঁচাটা এখন একটা দায়, বুঝলে ভাই।’

মৃনাল সব শুনে কিছু সময়ের জন্য কথা বলতে পারছিল না।বাইরের অন্ধকার তখনও দুজনকে জাপটে ধরে আছে।কিছু সময় পরে মৃনাল বলে ওঠে,“আপনি সাদা শাড়ি পরেন কেন?”

-সেটাই তো ভাই।এ’বাড়ির আদেশ, সাদা শাড়ি পরতে হবে।না হলে বাইরের লোকজন দেখে ফেলবে যে।

-কেন সারাদিন কেউ দেখতে পাবেনা?

-আমি রান্না ঘরে থাকি।জানলা দিয়ে তোমার ঘরটা দেখা যায়।সারাদিন রাত এদরজা দিয়ে বের হবার অনুমতি নেই।খিড়কির দরজা দিয়ে শুধু পুকুর পারে যাওয়া যায়।

-তখন কেউ দেখে নিলে?

-ঐ জন্যেই তো ভোরের আলো ফোটার আগে সব কিছু করে নিতে হয়।মৃনাল কিছু সময় চুপ থেকে আবার প্রশ্ন করল,“এখন আপনাকে দেখলেই বা কি হবে, আপনি তো এ’বাড়ির বউ।”

-বোকা ছেলে, যদি কিছু করে ফেলি, এবাড়ির মান সম্মান সব ধুলোতে মিশে যাবে না।জানো আমি বিধবার মত নিরামিশ খাই।

-কেন?

-মাছ মাংস খেলে শরীর গরম হয়ে যাবে।

-আপনিতো নিজেই রান্না ঘরে থাকেন, খেতেই পারেন।

– সব গোনা গুন্তি ভাই।

– ঠিক আছে, আমি আপনাকে একদিন মাছ খাওয়াবো।

– মাছ খাওয়াতে হবেনা, মাছে এখন অরুচি হয়ে গেছে।তোমাকে একটা কাজ করতে বলব, তখন না বললে হবে না।

-বারে, না কেন বলব?

মৃনাল আর কিছু না বললেও বড়’বৌ এক ভাবে বলে যেতে লাগল, “আমার শাশুড়ি মা খুব ভালো ছিলেন।আমাকে বলতেন বাবুরে পুরুষ মানুষ কুকুরের জাত, এদের এক ঘরে মন বসে না, সব সময় সুযোগ খোঁজে, তুই ভালো থাকলেও এরা তোকে ভালো থাকতে দেবে না, তোর আশে পাশে ছুটে বেড়াবে, তুই প্রতিবাদ করলেই তোর নামে বদনাম দেবে।শাশুড়ি মা খুব ভালোবাসতেন, উনিই সব খেতে বারণ করে দিয়ে বলেছিলেন ‘তুই মা নিজে সংযমি থাক দেখবি অনেক ভয় কমে গেছে।’একটু পুরানো ভাবনার মানুষ ছিলেন, তবে আমাকে খুব আগলে রাখতেন।”

-উনি এখন কোথায়?

-বেঁচে নেই।বছর সাত হল মারা গেছেন।তারপরেই তো সমস্যা আরম্ভ হল।কয়েকটা মাস সবাই খুব জ্বালিয়ে ছিল।

– কে ?

– কার নাম করব? দেওর, শ্বশুর সবাই।

শেষের কথাগুলো বলবার সময় বড়বৌএর আবার গলা ধরে গেল।মৃনালের চোখের সামনে হাজার হাজার কুণ্ডলি কিলবিল করতে লাগল।বাবা মারা যাওয়ার পরে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদবার সময় নিজেকে এই পৃথিবীর সব থেকে দুঃখি মানুষ বলে মনে হয়েছিল।কিন্তু বড়’বৌ এর সাথে দেখা হওয়ার পরে মনে হল দুঃখ কারোর একার সম্পত্তি নয়।এতসব কথা শুনে ঠিক করতে পারল না তার ঠিক কি করা উচিত বা কি বলা উচিত।কিছু সময় পরে বলে উঠল,“ আর কোন দিন দাদাকে খুঁজে পান নি, মানে খোঁজার চেষ্টা কেউ করেছিলেন ?”

-চেষ্টা করেনি কেউ।শুধু আমাকে ফরমান জারি করে রেখেছে।বারো বছর পরে মৃত ধরে পুরোপুরি বিধবা হতে হবে।

-আরো বিধবা?এর বেশি আর কি করবেন? আর এখন মনে হয় সাত বছর পরে সব কিছুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সরকারি পর্যায়ে।

-সে যায় যাক, এটাতো আর সরকারি পর্যায় নয়, আর আমি অতসব জানিও না, আমাকে যা বলেছে তাই বললাম।

-তারপর আর কি করতে হবে।

– কি আর হবে? আমার স্বামীর ভাগে যা কিছু আছে সব নিয়ে নেবে।

একটা শ্বাস ফেলে মৃনাল জিজ্ঞেস করল,‘বারো বছর হয়নি এখনোও?’

-দু’মাস বাকি আছে।

-তারপর ?

-তারপর আর কি আমিও জানিনা, আমাকে তাড়িয়ে দেবে।

-আপনি কিছু বলবেন না?

-কি বলব আমার আর বলবার আছেটাই বা কি?

-প্রতিবাদ করবেন না ?

-খ্যাপা ছেলে, মেয়ে মানুষের আবার প্রতিবাদ কি গো ? শুয়ে পড়, একটু ঘুমিয়ে নাও, আলো ফুটছে, আমি যাই, স্নান করতে হবে।

দরজা খুলে বারান্দাতে দাঁড়িয়ে, মৃনালকে আঙুল তুলে নিজের ঘরটা দেখিয়ে, বড় বৌ আবছা আলো গায়ে নিচে নেমে গেল, মৃনাল দরজা বন্ধ করে বিছানাতে শুয়ে পড়লেও ঘুম এল না বড়’বৌএর সঙ্গে সদ্য শেষ হওয়া সাক্ষাতের প্রতিটা অংশ নাড়িয়ে দিচ্ছিল।পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত।

পরের দিন সকালে কাজে যাওয়ার সময় বড় কর্তার সঙ্গে দেখা হতেই কর্তামশাই এক গাল হেসে বিভিন্ন কথার মাঝে বলে উঠল,‘অত রাত করে শুয়ে ভোরে ওঠার কি দরকার ? আর ভোরে যদি উঠতেই হয় তবে সব কিছু আস্তে আস্তে করবে।বড় বেশি শব্দ হয়, বয়স হচ্ছে তো ঘুম পাতলা হয়ে গেছে।’

মৃনাল অবশ্য বুড়োকে কিছু বলল না।সেদিন কাজে গিয়ে স্থানিয় কয়েক জনের কাছে বড় কর্তার ব্যাপারে কিছু খবর পেল।একজন তো বলেই দিল,‘ওটা তো গ্রামের একটা অভিশপ্ত বাড়ি।বড় ছেলেটা পাগল, কোথায় এখন আছে কেউ জানে না।কেউ কোনোদিন খোঁজ খবর করেছে কিনা সেটারও খোঁজ পাওয়া যায় না।ছেলের বৌটা আছে, তবে আমরা কেউ কোন দিন দেখিনি।অবশ্য পাড়ার কয়েকজন পুকুরে বাসন মাজতে দেখেছে, সবই বড় ধোঁয়া, আবছা।’

-বাকি ছেলে বউরা ?

-আছে, চাষবাস দেখে।অবস্থা তো ভালো।ঘরে ধান কাটার মেশিন, ট্রাকটর সব আছে।বাইরে বাইরে কাজও করতে যায়।গ্রামে কারোর সাথে মেশেনা।কে জানে কেনো ?

একজন আবার আরেকটু এগিয়ে বলে উঠল,‘আর ঘর পেলেন না, ঐ ঘরে কেউ থাকে?’ মৃনাল উত্তর দিল,‘আর তো বেশি দেরি নেই, এই কয়েকটা দিন চলে যাবে।’

সেদিন সন্ধেবেলা বাসাতে ফেরার কিছু সময় পরেই কর্তা হাজির।কাজের আর কত দিন জিজ্ঞেস করে আরো কয়েকটা কথা বলবার পর বললেন, ‘রাত বিরেতে দরজা টরজা খুলো না ভায়া।চোর ডাকাতের উটকো ঝামেলা আরম্ভ হয়েছে, কি থেকে কি হবে এখন, সাবধানের মার নেই তো, তাছাড়া তোমার বয়স অল্প, বাইরের ছেলে তুমি।’

প্রতিটা কথা শুনে তার ভিতরের ইঙ্গিত বোঝার জন্য মাথা ঘামানোর চেষ্টা না করলেও প্রশ্ন এল,তবুও কোনো পাল্টা প্রশ্নও করল না।এই কয়েকটা মাস এখানে থেকে চোর-ডাকাতের কোনো কথা শোনেনি।প্রায়ই রাত জাগে, কোনো দিন নিজেও কিছু দেখেনি।কোনো রকমে বুড়োকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।সেদিনও রাতে শুয়ে ঘুম এল না, ঠিক আর ভুলের দ্বন্ধ্ব সমাস আষ্টেপৃষ্ঠে মৃনালকে বাঁধতে আরম্ভ করল।সব কিছুর খেই হারিয়ে যেতে লাগল।মায়ের জন্য আচমকা মন খারাপ করে উঠল।তার পরের দিনেই কম্পানির হেড অফিসে ফোন করে মায়ের শরীর খারাপের কথা বলে দু’দিন ছুটি নিল।বাড়িতে থাকাকালীনও বড়বৌএর কথা খুব মনে পড়ল।মা’কে অবশ্য একটা কথাও বলে নি।বড়বৌ বারণ করছিল।তারপরে নিজেরই একটা ভুল কাজের জন্য খারাপ লাগতে লাগল।বড়’বৌ এর নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি তো!

দু’দিন পরে বাসাতে ফিরে তার দরজার কাছে বেশ যত্ন করে ইঁট ঢাকা দেওয়া, একটা কাগজের টুকরো পেল।প্রথমে একটু অবাক হলেও কাগজটা নিয়েই ভিতরে ঢুকল।দরজা বন্ধ করে ভাঁজ খুলল, অপটু হাতের লেখা, অনভ্যাসে অপরিণত, মৃনাল পড়তে আরম্ভ করে-

“ভাই, নিচে একটা ঠিকানা লেখা আছে, ওটা পরিদার ঠিকানা।পরিমল দাঁ।আমার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।কিন্তু মামা এই বাড়ির পাগল ছেলেটার সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়।তবে আমাকে শেষ দিনেও পরিদা বলেছিল, ‘মনি আমি তোর জন্য বসে থাকব।’তুমি যদি পার একটু যোগাযোগ করলে এই হতভাগিটার শেষ জীবনটা এই নরক থেকে মুক্তি পেতে পারে।তোমার আগে আর একজনকে বলেছিলাম, সে ভয়ে পালিয়ে গেছিল।যদি এই দিদিটার শেষ জীবনটাতে একটু সুখ দেওয়া যায়, দেখ না ভাই।অবশ্য যদি না পারো বিরক্ত করব না, সারা জীবন নিজের ভাগ্যটাকে মেনে নিয়েছি, এই কয়েকটা দিনও একই ভাবে চালিয়ে নেব।আর তোমার যদি মনে হয় তোমার কোনো বিপদ হতে পারে তাহলে কোনো কিছু করতে হবে না।এরপরেও যদি পরিদার কাছে গিয়ে দেখ আমার জন্যে একই ভাবে অপেক্ষা করে বসে আছে, তবে বোলো, তোমার মনি তোমার জন্যে মনে প্রাণে আজও কুমারি।কি করবে না করবে, জানিও, সাবধানে থাকবে-বড়বৌ।”

চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুসময় নাড়াচাড়া করল।সে’রাতে মৃনালের আবার ঘুম এলনা।বেশ কিছুটা সময় ঘর বার করতে লাগল।বাইরেও দাঁড়াল, রান্না ঘরে আলো জ্বলছে তার মানে এখনও বড় বৌ জেগে আছে, একবার দেখা করা দরকার।সাহস পেলো না।ঘরের ভিতর এসে চিঠিটা আরো কয়েক বার পড়ে, ঠিকানাটা ভালো করে দেখে শুয়ে পড়ল।ভোর হতেই বেরিয়ে গেল।মাঝ রাস্তায় কম্পানির অফিসে ফোন করে মায়ের আচমকা শরীর খারাপের কথা জানিয়ে দিল।

সাত দিন পরে নিচে বড়কর্তার চেল্লামেল্লিতে সকালের ঘুমটা ভেঙে গেল।আস্তে আস্তে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই বড়কর্তা জিজ্ঞেস করল,‘ভায়া কাল কত রাত পর্যন্ত জেগে ছিলে?’

-কাল তো তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিলাম, কেন কিছু হয়েছে?

-সর্বনাশ হয়ে গেছে, আমার বড় বৌমাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

-বড়বৌমা!এখনেই থাকতেন ?

বড়কর্তা আর কথা বাড়াল না।মৃনাল জিজ্ঞেস করল,‘কোথাও গেছেন?’

বড়কর্তা মৃনালকে কোনো জবাব না দিয়ে মেজোখোকাকে সম্বোধন করে বলল,‘চল্ একবার থানাটা ঘুরে আসি।’

কোনো জবাব না পেয়ে মৃনাল আস্তে আস্তে নিজের ঘরে ঢুকতেই কানে এল,‘তাতে কেচ্ছা আরো বাড়বে,বাদ দাও, যেখানে গেছে যাক্।’

ঘরের ভিতর ঢুকে একটা লম্বা শ্বাস নিল মৃনাল, এতক্ষণ মনিদি আর পরিমলদা এই গ্রাম ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে চলে গেছে।কথামত বেরোবার সময় মৃনালকে জানিয়ে যায়নি।এই কয়েকটা দিনে মৃনালের নিজের অনেক পরিশ্রম হয়েছে, ছোটাছুটিও হয়েছে অনেক।ওরা দুজনে ভালো থাকলেই সব পরিশ্রম সার্থক হবে।নিজেকে বেশ বীর মনে হল, এত বয়স পর্যন্ত নিজের প্রেম না হলেও পরিমলদার মুখটা মনে পড়ল।মনিদির কথা শুনে, চিঠিটি পড়ে চোখদুটো ছল্ ছল্ করে উঠেছিল।মৃনালের হাত দুটো ধরে বলে উঠেছিল, ‘তুমি ভাই একটা ব্যবস্থা করে দাও।’

-কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে কিছু লেবার ছুটি নেবে, আমি কম্পানিকে বলে একটা দিনের জন্য সবার ছুটির ব্যবস্থা করব।আপনি সেইদিন ঐ’ঘরটাতে থাকতে পারবেন।কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কাজের কথা বলবেন।তবে আপনাকে সেই দিনের মধ্যে সব কিছু করতে হবে।

দুজন দুজনের মোবাইল নম্বর দেওয়া নেওয়া করেছিল।ফেরবার সময় মৃনালকে পেট ভরে মিস্টি খেতে দিয়ে বলেছিল, ‘আমার টাকার জোর নেই, তবে মনির জন্য সব কিছু ছাড়তে পারি।’ বাসাতে ফিরে সেই রাতেই রান্নাঘরে গোপনে গিয়ে মনিদি’কে সব কথা জানিয়ে এসেছিল।মনিদি হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিল।এ’কান্না দেখে মৃনালের নিজের খুব আনন্দ হয়েছিল।

পরিদার আসার পরে সেই রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রান্না ঘরের পিছনে পরিদার সাথে মনিদির দেখাও করিয়ে দিয়েছিল।ওদের পরিকল্পনাতে নিজের কাজে যাওয়ার সাইকেলটাও দিয়ে বলে, ‘স্টেশনের কাছে চাবি দিয়ে রেখে সামনের চায়ের দোকানে চাবিটা রেখে দেবেন।আর দুজন স্টেশনে একসাথে ঢুকবেন না।আমার লেবাররা প্রায়ই যায়, কেউ সন্দেহ করবে না।’ নিচে তখনও সবাই বেশ উত্তেজিত ভাবে কথাবার্তা বলছে।ঘরের ভিতরে মৃনালের ঘুম পাচ্ছিল।বেলার দিকে সাইকেলটা আনাতে হবে।বিছানাটা ভালো করে গুছিয়ে আবার শুতে যাওয়ার সময় বিছানার নিচ থেকে মনিদির সেই চিঠিটা পেল।আর একবার পড়ল মৃনাল, তারপর কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ঘরের মেঝেতে রেখে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে বলল,‘ভালো থেকো।’



ঋভু চট্টোপাধ্যায়

নাম-সৌগত চ্যাটার্জী। লেখক হিসাবে নাম- ঋভু চট্টোপাধ্যায়। বাসস্থান-দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান। শিক্ষা-ইংরাজি সাহিত্যে এম .এ, বি.এড। পেশা - সরকারি স্কুল শিক্ষক। লেখা- বাংলা ও ইংরাজিতে, কবিতা গল্প, প্রবন্ধ। প্রকাশিত লেখা - আনন্দ বাজার, তথ্যকেন্দ্র, আরম্ভ, গৃহশোভা, সহ আরো অনেক পত্রিকাতে। পুরস্কার - আমাদের কফি হাউস পুরস্কার, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন কবিতা বিভাগে দ্বিতীয় পুরস্কার, শিবপুর শাখা, চুচুড়া শাখা।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।