ফাগুন গাড়োয়ান

চৈত্রী ব্যানার্জী on

আলের গা ঘেঁষে শেষবার রোটার চালিয়ে দেয় সুজন ।
কোণায় এসে ব্রেক্ কষে বলে,
  ‘শিখবি?’
ফাগুনের সখ ট্রাক্টর্‌ চালানো। সে দিশি আমড়ার আঁটি চোষে আর দ‍্যাখে , ফি মরশুমে সুজন দা তাদের বিলে রোটার দেয়। ফাগুনের বাবা বিঘে’য় ভাড়া নেয় সুজনের বাবার ট্রাক্টর। ফাগুন জানে
পাট কাটার পর জমি এবড়ো খেবড়ো হয় ,  পা দ‍্যাওন যায় না। চষলি জমি মোলাম্ হয়, মাটির গেরো আলগা হয়। ফাগুনের ইচ্ছে হয় নিজে চষে। জুলজুল চোখে তাকিয়ে থাকে সুজনের দিকে। সুজন কাজ শেষ হলে ডাকে,
  ‘ আয় উঠে আয়, পাদানে পা দে, আমড়া ফ‍্যাল মুখের থে, শিখোই দিচ্ছি চালানো, এদ্দম সহজ।’

ঝোঁকে ঝোঁকে আসে ফাগুন। সুজন দা চালায়, ও পাশে বসে থাকে, কোনোদিন বড়ো ঠাকুরের নাম নিয়ে চালাতে যায়, গাড়ি গাঁআআ করে এগিয়ে যায়। সুজন দা খপ করে হাত পা চেপে ধরে।
বলে ,    ‘আর যা করিস করিস, লোকের ক্ষেতে চাকা তুলে দিসনে’।
সুজন দা আপন মনে রোটার দেয় আর গুনগুন গান গায়। বলে অখিল ঘোষের গান। কেডা সে অখিল ঘোষ! ফাগুন কচুপোড়া জানে। তাদের বাড়ি রেডিওয় একখান গান হয়,    ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস’      
গান ডার শ‍্যাষে সত্যি সত্যি ঝড় ওঠে শোঁ শোঁ করে। আর যে লোকটা ঐ শ‍্যাষে   ‘ ঝড় উঠেছেএএএএএএএ…’ বলে ডাক দেয় তার নাম হেমন্ত।
হেমন্ত মৎসুদ্দী ফাগুনের ইস্কুলের অঙ্কের মাষ্টার। দশমিকের পর তিন ঘর গেলেই ফাগুনের অঙ্ক ভুল হয় আর সপাৎ করে হাতে এস্কেলের মার।

সুজন দা ভালো গান গায়, চাষ জানে, আবার মোকামে জুতোর দোকান সুজনদার বাবার। ফাগুন দুগ্গা পূজোর আগে বাবার সাথে যায় জুতো কিনতে। পা ধরে জুতোয় ঢুকিয়ে দেয় সুজনদা , বলে,   হেঁটে দ‍্যাখ্, লাগে কিনা, হেবি মানিয়েছে।
ফাগুন যখন পদ্মপুকুরে দাপায় , পতিতপাগল, মণি দি, আর কানাই এর সঙ্গে চিৎ সাঁতার দে ভাসে, সুজন দা সাইকেল নে দোকানে যায়। যাবার পথে হাঁক দে যায়,     তোর মা আসতেছে কুঞ্চি নে, কতক্ষণ নেমিছিস জলে! চোখ জবাফুল হয়ে গেছে সবকটার… ।
এখন ফাগুন মন দিয়ে টেরাক্টর শেখে, কারে বলে গিয়ার। সেখানে পষ্ট করে ওয়ান টু লেখা আছে, বুঝে শুনে টান দিতি পারলি হলো। ফাগুনের কেলাচ্ গিয়ার এ হাত পা আগে পরে গুলিয়ে যায়, একটুকুন টুকুন রোজ চালায় সুজনদার সাথে এমাঠে ওমাঠে, তাও এসটার্ট করতি গেলিই গাড়ি গাঁআআআ করে আলে গে ওঠে। সুজন দা রাগ করে। ফাগুন বকা খায়,    ‘ হুপ্ করে চাপিস কেন, এত কির তাড়া!’


ফাগুন চোখ নামিয়ে নেয়। সুজন দা হাতে ধরে শেখায়,    ‘ রয়ে সয়ে ফাগুন, রয়ে সয়ে’। খুব নরম করে বলে, পিছনে দেখায়,   ‘দ‍্যাখ , এইখেনে চাপলি, রোটারের ফাল উঠে এলো, ফাল কতটা গাঁথাবি তা ডেরাইভার এর হাতে, মাটি যেরাম, গাঁথন সেরাম।’ হাত শক্ত করে চাপ দেয়। ফাল নামে, কাদার ঢ‍্যালা ভাঙে, কাদানে জলের মধ্যে ফাল ডুবে যায়। মুখের দিকে চেয়ে সুজনদা বলে,  

ফাগুন!

তুই খুব সুন্দর।





পতিতপাগলের সাথে বেশি ঘুরলি মা বকে। খেলতি যাওয়ার আগে বলে জামার তলায় টেপজামা পর। ফাগুনের গরম লাগে, তবু পড়ে। ভাত খেতি বসলি বলে হাঁটু ঢেকি বোস্। ফাগুনের হেবি রাগ হয়। কি এমন দ‍্যাখনাই বকনাই হয়েছে সে যে মা সবসময় ট‍্যাকট‍্যাক করে! কানাই এখন অন‍্য দলে বল্ খেলতি যায়, মনি দি বিকেল হলি সেলাই নে বসে। খেলতি গেলি বলে     আগে আমার রোমাল দুটোয় হেম দে, সোন্দরপানা ফুল তোলবো বকেয়ায়।
ফাগুন হেম দেয় আর ভাবে, সুজনদার মরণদশা,  ফাগুন নাকি সুন্দর! মা সারাদিন গাল পাড়ে ,    চুলি এট্টু তেল দে, বেড়াবেনী বাঁধ। তা ফাগুনের ফিতে দেখলি মাথা ব‍্যথা দেয়, সে দৌড়ে বাঁচে এলো চুলে।
সুন্দর না ছাই!
বাঁশুয়া দের বিলে আজ রোটার দেচ্ছে সুজনদা। এতক্ষণে বোধহয় শেষ। সন্ধ্যে নামে নামে। বিলের দিকে দৌড়োয় ফাগুন। কি যে ভালো লাগে তার টেরাক্টর চালাতি! বিলের ধারে এসে হাঁপায়। সুজনদা দেখতি পেয়েছে। বলে,    এইছিস্! কোথায় ছিলি! পেরায় শেষ ! আসবি!
কাদা ঠেলে উঠে যায় ফাগুন। বাঁশুয়ার বিলেন মাটি, বড্ড নরম। সুজনদা তিন পাক দেয়, বলে   এইবার তুই চালা। লম্বা টানা মাঠ, তোর সুবিধে ।’
ফাগুন খুব সাবধানে চালায় আজ, কিছুতেই ভুল করবেনা। আস্তে আস্তে কেলাচ্ ছাড়ে। গাড়ি এগোয় , ধীরে ধীরে। বিলময় শুধু কাদা, ক্ষেতের পর ক্ষেত। কারোর চষা, কারোর আচষা। নয়ানজুলির ধারে লম্বা করে বীজপাতা ফেলেছে কেউ। সন্ধ্যে নামতেছে। ফাগুন আউল ঝাউল কত গল্প করে। কবে ভেলোর মুরগী গুলতি দিয়ে মেরেছে, কবে তেঁতুলতলায় চটি হারিয়েছে, কবে একশ মিনিটে এক ঘন্টা বলে ফেলিছিলো অঙ্ক ক্লাসে, কবে গোদোর সাথে মারপিট করে বুকের বোতাম ছিঁড়ে দিয়েছে তার। সুজনদা একমনে  ফাগুনের গল্প শোনে। এসব কথা ফাগুন কারোর সাথে বলেনা আর।  মাঠের শেষ টানে এসে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নেয় , মনে জোর পেয়েছে আজ, পারবে চালাতি। যেটায় জোর বাড়ে সেইটায় পা চেপে জিগ্গেস করে,  এইডার জানি নাম ডা কি সুজনদা!

চোখদুটো যেন অচেনা লাগে হঠাৎ।
একটা মরদ্ গলার স্বর কানের কাছে মাদোল হয়ে কেঁপে ওঠে শুধু        কানের কাছে মুখ এনে বলে
       ‘এক্সিলারেটর’

তারপর …..
এক গেরাসে পুরে নেয় ফাগুন কিশোরীর ঠোঁট।



সে অনন্ত বিলানে তখন কাকপক্ষীও ঘরে ফিরেছে সন্ধ্যা বেলা। ইঞ্জিনের শব্দ থেমেছে। আর যন্ত্রদানবের কোলে বসে রয়েছে এক তরুণ চালক, যার মুখময় ছেতরে ছেতরে গেছে দুটো মোসোম্বির কোয়া, যে কোয়া আঁট হয়ে থাকে, কিছুতে ছাড়ায় না।
আর কোলে হাত দুটো জোড় করে বসে রয়েছে ফাগুন গাড়োয়ান। সে না জানে রসের স্বাদ, না জানে কত তারে রস। তার মুখ ভর্তি নাল আর বুক ভর্তি ভয়,   …    মা বঁটি তে কুচোবে, জুতোবে উঠোনে দাঁড়িয়ে। ঝ‍্যাঁটা মারবে। ফুলকাটা ফ্রকের পিঠময় ফুটে থাকবে খ‍্যাঁংড়ার চোঁচ।




ফাগুন ইস্কুলে যায় তালতলা ঘুরে, পতিতপাগল জিগায়, মোকাম দে চল, এত ঘুরিস ক‍্যান্! ফাগুন বলে, মোকামে কুকুর পাগল হয়েছে, যদি কামড়ায় , সেই ভয়ে ঘুরি।
 তার বুকে ইন্জিন দৌড়োয়, সামনে দুগ্গা পূজা, কোথায় যাবে জুতো কিনতে !
পড়তে বসলে চুপ করে যায় , খেই হারিয়ে ফেলে অঙ্ক করতে বসে। দশমিকের পরের ঘর , তার পরের ঘরে দুটো পাতলা পাতলা তেজপাতা ঠোঁট। গরম। নাল।
বুকের ধানকলে তুষ খোসা সব ছাড়িয়ে যাচ্ছে,
ক মণ ভারী চাল!

নিস্তব্ধ দুপুর, পাতা পড়লে শোনা যায়। ফাগুন কান খাড়া করলে সব শুনতে পায়। চুমু খেলে শব্দ হয়। যেন সত্যি সত্যি খাচ্ছে কিছু তেমনি শব্দ। ব‌ই খাতা বন্ধ করে কাঁঠালতলায় বসে থাকে।
এরাম পড়া করলি নম্বর কমবে। মা বঁটিতে কুচোবে, জুতো মারবে উঠোনে দাঁড়িয়ে………

কদিনের মধ্যি কেমন বড়ো হয়ে গেছে। মনে হয় কানাই বাচ্চা ছেলে তাই বল খেলতি যায়। পতিতপাগল ধেড়ে বাচ্চা। একমাত্র মণি দির সাথে মেশে। বিকেলে ফুল তোলে রোমালে। রান দেয়, কাশ্মীর দেয় ফুলে। কলে জলে আনতি যায় মণি দির সঙ্গে। একা কোত্থাও যায় না।

জিতেন দালালের বাড়ি মনসার ভাসান, সারাদিন সেখানে অন্নভোগ, চিঁড়ে ভোগ। খাও আর গান শোনো। এক বুড়ি   চ‍্যাং মুড়ি কানী সেজেছে, সে সুর করে অভিশাপ দেয় সদাগর কে। ফাগুন ঠেলা দেয় মণি দি কে,   বাড়ি যাই চল মণি দি, রাত হয়ে যায় যে। সে বলে আর এট্টু দেখি যাই।
বাতাস আজ গুমোট, কখন ঝড় বিষ্টি আসে! আকাশ মেঘলা।  
…. ‘তুই পরে আয়, আমি যাই মণিদি’, বলে বেরিয়ে পরে ফাগুন। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে অকস্মাৎ। দূরে কোথাও বৃষ্টি বোধহয়। ফাগুন ইঁটের রাস্তা ধরে। আড়ে মারবে পোল্ট্রি ঘরের পাশ দিয়ে। কাঁঠাল তলা হয়ে বাড়ি। পোল্ট্রি ঘরের কাছে আলো আছে , ভয় নেই। ফাগুন জোর পায়ে এগোয়। আজকাল কি যেন বাতিক হয়েছে! মনে হয় কে যেন দ‍্যাখে তারে ! নিজেরে কোথায় লুকোয়! কি মরণে যে টেরাক্টর চালাতি গিছিলো! নিজেরে সে অনেকবার আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখেছে। কি দেখে ব‍্যাটাছেলের লোভ লাগে! ক‌ই কিছু তো নেই। বুকের জামা আঁট করে টেনে দেখেছে ভিজে গায়ে। ক‌ই! যা আছে তা নাই বলতি গেলি। তা কিসে অমন ভেটকি মাছের মতো হাঁ করে বেটাছেলে! যেন পুকুরের সব মাছ গিলে খাবে একবারে!
খেয়েছে।‌ খেয়েছে । মাছ শুধু ! পুকুরটারে খেয়েছে চোঁ চোঁ করে। শুকিয়ে দিলো বুকটা ভয়ে। রাগে কষকষ করে ফাগুন। কাঁঠালতলার কাছে এসে বুকটা ছ‍্যাঁৎ করে ওঠে। কেউ কি আছে পেছনে! পাতার শব্দ। শিয়াল ! শোরেল! না……?

পিছনে ফিরে পোল্ট্রি ঘরের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় । আসছে হেঁটে। এতক্ষণ তবে পাছ ধরেছিলো! রাগে শিরা দপদপ করে ফাগুন এর। ভয় উবে গেছে যেন এই রাতের ঝোঁপ জঙ্গলে। ডান  পাশে ফণিমনসার ঝোঁপ। ফাগুন এগিয়ে যায় সেদিকে। মোকামের কুকুর পাগল হয়েছে। কামড়াতে এলি ঠুসে ধরবে ফণিমনসার ডালে।
তেজপাতা ঠোঁট আজ সেলাই দেবে মনসা কাঁটায়। মনে মনে জয় মা বিষহরি ডাকে। মরদ টা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারে চোখ বোঝা যায় না।
মরণ কামড় দিতি এসেছে আজ। ফাগুন প্রস্তুত। এগোলিই হাঁটু চালাবে অ‍্যাণ্ডাকোষে, তারপর যেখানে গে ঠেকে।

আঁধারে গায়ের গন্ধ বোঝা যায় মানুষের!
সে এত কাছে! কি করবে! কি ! কি! বুকের ধানকল ! তুষ খোসা! ধবধবে চাল ! ঝরঝরে! বাসমতি গন্ধ। কি করবে কি! কি! এক মণ ভার পায়ের, দু মণ ভার গতরের! নড়তে পারে না! কাঁঠালতলার মাটি কেন নরম লাগে বিলের মতো!
ফাল গেঁথে যায়, ওলটপালট মাটি। সব ওলটপালট। কে চালায় ট্রাক্টর, কে টানে গিয়ার! কে ছাড়ে কেলাচ্!
ওফফ্
জোর বাড়ে কিসে গো ডেরাইভার !



….এক্সিলারেটর ‌!!



চৈত্রী ব্যানার্জী

নাম: চৈত্রী ব্যানার্জী। বাস : কলকাতা। বিদ্যা: ইংরেজি স্নাতকোত্তর। পেশায় : সরকারী চাকরি। "মানুষ দেখতে ভালো লাগে। খালে বিলে ঘুরি। তাদের কথা শুনি। প্রত্যন্তের মানুষ যে ভাষায় কথা বলে , তাই আমার ভাষা।"

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।