প্যাকেজের নাম রবীন্দ্রনাথ

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

অনাদী বাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বুঝেছ?
আমি ঢোঁক গিলে বললাম,হ্যাঁ স্যার। ওনার সব কাজে সায় দেয়া পার্সোনাল সেক্রেটারি আমি।
অনাদী বাবু আগামীর চেয়ারম্যান এবং ভবিষ্যতের মন্ত্রী, এসব মানুষের সামনে বেফাঁস কিছু বলা ঠিক না। তাই একটু থেমে আবার বললাম, দারুন ভেবেছেন স্যার। দারুন।
উনি আমার কথা পাত্তা না দিয়ে বললেন, কচু বুঝেছ! আবার বলছি,এবার পুরোভোটে আমার থিম রবীন্দ্রনাথ। যেমন, পোষ্টার আর দেয়াল লিখনে থাকবে রবি ঠাকুরের মত দু একটা শব্দের পর কাটাকুটি।এই কাটা কুটি দিয়েই আমার প্রতীক চিহ্ন আঁকা হবে। এই কাজের জন্য চাই প্রচুর ভুল লেখার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পেইন্টার ।আর ফ্লেক্সের একপাশে আমি অন্যদিকে কবিগুরু। তুমি খেয়াল করলে দেখবে আজকাল কেউ ভাষণ শুনতে চায়না তাই আমি ঠিক করেছি কবিতা বলব। উন্নয়নের কথা বলব কবিতায়। অনেকটা পাঁচালীর মত। একাজের জন্য আমার একজন ভার্জিন কবির প্রয়োজন।মানে যার লেখা আগে তেমন কেউ পড়েনি!
আমি মুখ ফস্কে বলে ফেললাম, ওহ্!
অনাদী বাবু একটু থেমে বিরক্ত মুখে বলতে লাগলেন, আর চাই একজন রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ। যিনি আমায় গাইড করবেন। এই তিনজন মানুষ আমার চাই।

দুই

নবু দত্ত নামে একজন পেইন্টার পাওয়া গেল যার ভুলের অভিজ্ঞতা হল,শোনেন তবে, বিধূময়ী কাঠগোলাতে লিখতে গেছি।খুব সামান্য লেখা। দোকানের নাম আর চেরাই কাঠ বিক্রেতা,এইটুকুন লেখাতেও ছ’খানা ভুল করলাম। একটা খুব বড় ভুল হল ঝোঁকের বশে চেরাই লিখতে গিয়ে ওকার দিয়ে বসলাম হয়ে গেল চোরাই কাঠ বিক্রেতা।খুব মেরেছিল ওরা স্যার।
অনাদী বাবু খুব খুশি হলেন।

রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনজন এসেছিল। পাঁচ খানা প্রশ্নের সঠিক উওর দিয়ে নির্বাচিত হলেন কুসুম কুমার বসু ঠাকুর। অনাদী বাবুর প্রশ্ন ও তারউত্তর নীচে দেয়া হল–
এক) আপনি কি করে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হলেন?
উত্তর: মানুষ যে ভাবে বংশ পরম্পরায় হাইপ্রেশার,লোপ্রেশার,ডায়েবেটিস পায় আমি ঠিক সেভাবে হয়েছি রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ।

দুই)উনি নাইট ছাড়লেন কেন?
উত্তর: উনি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কারণ ক্রিকেট নিয়ে তেমন ফান্ডা তার ছিল না। পরে শাহরুখ তা নিজের কাঁধে নিয়েছে।

তিন)দাঁড়ি রাখলেন কেন?
উত্তর: প্রতিদিন সকালে দাঁড়ি কাটতে পাক্কা পনের মিনিট লাগে। উনি সে সময়টা নষ্ট না করে লিখবেন আর লিখবেন বলে…!

চার)জোব্বা কেন পরতেন?
উত্তর: সুইডেনে ঠান্ডা। ওখানে গিয়ে নোবেল নিতে হয় তাই অভ্যেস করেছিলেন!

পাঁচ) নোবেল কি ফিরে পাওয়া যাবে?
উত্তর:চুরির পরেই অনেক বাঙালি জেনেছে উনি নোবেল পেয়েছিলেন। চোর কে মনে করিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ।
ভার্জিন কবিও পাওয়া গেল। নাম পরিমল পাল।স্বভাব কবি। রাতের দিকে তার খুব কবিতা পায়। কবিতার কলিজা,কবির নৃত্য পত্রিকা থেকে নিয়মিত তার লেখা ফেরত আসে। অন্য বানিজ্যিক কাগজ তার লেখা ছাপে না বলে তাদের ঘৃনা করেন।

তিন


এখন অনেক রাত। ভোট হয়ে গেছে কাল ভোট গণনা। আমরা মদ খাচ্ছি। আমরা বলতে পেইন্টার, ভার্জিন কবি, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ আর আমি।নেশায় কাঁপছে চারপাশ। এমন সময় কবি খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, রবীন্দ্রনাথ!!
রবীন্দ্রনাথ আমাদের দিকেই আসছেন।
মদের বোতল সরাতে গিয়ে উল্টে পড়ল । একবারে সামনে এসে মৃদু হেসে বললেন, এবার বিবেকানন্দের পালা। আমি যাই।
পরদিন জয়ের পর আমরা গত রাতের স্বপ্ন নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিলাম।সব্বার এক স্বপ্ন!এও সম্ভব! আমার ফোন বেজে উঠল। অনাদী বাবু! বললেন, এক্ষুনি এস। ওরা এসেছে। আমার ফ্ল্যাট থেকে রবীন্দ্রনাথের ছবি গুলো, বাণী গুলো সরাও।এবার বিবেকানন্দ নিয়ে ভাবো। বুঝলে?
আমার গত রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ল।

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।