পোষাক

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস on

উল্লাহা,উল্লা….
এইসব শব্দের কি মানে হতে পারে? কিন্তু শিশুর মুখের শব্দ তো! তারওপর উল্লাহা,উল্লা বলে কেঁদেই চলেছে।

প্রতিবেশি হিসেবে আমার কিই বা করার আছে, একথা ভাবলেও একটি শিশুর না থামা কান্নাকাটি জুড়ে বাঙালির মনের মনিকোঠায় একটিই ডাক ভেসে আসে। আর সেটি হোলো ‘মা’।
দরজায় ঠোকা দিলাম। দরজা খুলতে কেউই আসলো না। এবার জোরে কড়া নাড়তে শুরু করলাম। এতে একটা কাজ হোলো। শিশুটি, উল্লাহ,উল্লা বলে কান্নার শব্দের সাথে এক পা, দু’ পা করে দরজার কাছে চলে আসলো। আর আমি বর্ষায় বেড়ে যাওয়া দুটো পাল্লার ফাঁক দিয়ে স্পষ্টত দেখলাম – শিশুটি একটি ছেলে। কেননা, সে তার উলঙ্গ শরীরের উন্মুক্ত লিঙ্গের অগ্রভাগ হাতের মুঠিতে চেপে ধরে সমানে ওই উল্লাহ,উল্লা করে কেঁদেই চলেছে।

আমি এই এলাকার স্থায়ী প্রতিবেশী। আর এই বাড়িটি ভাড়া হিসেবেই দিয়ে থাকি। মাত্র কয়েকদিন হোলো পুরনো ভাড়াটে চলে গেলে, মিনিমাম রিপেয়ার আর রং করে নতুন ভাড়া বসিয়েছি। দরজায় ঠকঠককরে টুলেট বোর্ড ঝুলেছে আবার। যথারীতি একজন ত্রিশ- বত্রিশএর যুবক ফোন করলে, দরজা খুলে তাকে স্বাগত জানিয়ে এই বাড়িটি দেখাই। পছন্দ কি না, জানতে চাইলাম। সম্মতি দিলেন যুবক। এরপর ফ্যামিলি মেম্বার জানতে চাইলে যুবক বললেন- আড়াই জন । অর্থাৎ, তারা স্বামী স্ত্রী দুই, আর বছর খানেক বয়সের একটি সন্তান। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কর্মী বললেন, তিনি। জানিয়ে দিলাম, আমি এমনই ছোটো পরিবারকেই বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকি। এরপর অ্যাডভানস পেমেন্ট আর ইলেকট্রিক মিটারের লাস্ট রিডিং দেখিয়ে বললাম – কবে আসছেন? উনি বললেন, আজই। কেননা স্ত্রী সন্তানকে হোটেলে রেখেছেন। তাই আজই – এই শব্দের ওপরে তিনি বেশ জোর দিলেন।

আমার আর কি, মনে মনে একথা ভেবে যুবককে বাড়ির চাবিটা দিয়ে বলে আসলাম – নিজের বাড়ির মতই ঘর দরজাকে রাখবেন। কারণ আমি নিজেরই, অন্য আরও একটি বাড়িতে থাকি। আরও বললাম, যা প্রত্যেক ভাড়াটেকেই বলে থাকি – হ্যাঁ, বলে রাখা ভালো আপনাকে, বাড়ি ভাড়া দেওয়া আমার পেশা। আর এটাই আমার একমাত্র জীবিকা। এই শহরে পৈতৃক সুত্রে আমার প্রয়াত স্বামীর এমন কয়েকটি বাড়ি আছে। তার সবগুলোই ভাড়া খাটে। মনে রাখবেন, আমি কোনো চাকুরী জীবী নই! তাই এক থেকে পাঁচ – এই সময়ের মধ্যে পেমেন্ট মেটাবেন।
এসব কথা মেমোরিতে সবসময়েই রাখতে হয়। যখন, যেমনভাবে প্রয়োজন হয়, তেমনভাবেই কথাগুলো বলি। এই যেমন নতুন ভাড়াটে, এই তরুন কর্পোরেট ম্যানকে আজ বললাম!

এপথে আমাকে রোজই যেতেই হয় । কারণ, এই পথটা বড় রাস্তা, রেল স্টেশন, বাজার, বাস টার্মিনালে যাওয়ার সংযোগ ।
হাতে বাজারের ব্যাগ। পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ই এই বিপত্তির উল্লাহ, উল্লা….

আচ্ছা ঠেকাতে পরলাম তো আজ! এইটুকুনি শিশু! ওর বাবা না হয় কাজে গেছে! কিন্তু ওর মা!
হাঁটু মুড়ে বসে তাই, দরজার ওইটুকু ফাঁক দিয়ে বাচ্চাটিকে কান্না থামানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। বাচ্চাটি এইবার দরজার একেবারেই মাঝখানে, ঠিক যেখানে দুটো পাল্লা এক জায়গায় মিলেছে, সেইখানে এসে দরজায় ছোটো ছোটো হাত দিয়ে আঁচড় কাটছে। আমি শুনতে পাচ্ছি ওর হাতএর সেই আর্তির আঁচড়-পাঁচড়। আমি চেষ্টা চালাচ্ছি কান্না থামানোর।

আলে লে.. লে.. কাঁদে না, কাঁ..দে…না, ইত্যাদি। কেননা, শিশুর কান্না বড় স্পর্শকাতর বিষয়! এছাড়াও এ বাড়িটি আমার। ভাড়া দিয়ে রোজগার করলেও, এইসব দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

ছিটকিনি খোলার শব্দ হোলো। হ্যাঁ, যা ভেবেছিলাম! বাচ্চার মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বাথরুম থেকে বেরুলো। বেচারা! নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির দায়িত্বশীল শব্দ- ‘মা’! বাথরুমটুকু যাওয়ারও উপায় নেই!
আমি তাকিয়ে আছি ওইটুকু ফাঁক দিয়ে, যতদূর সম্ভব আমার দৃষ্টি যায়! আর দেখলাম – টপটপ করে ঝরে পড়া বিন্দু বিন্দু পাথরের মত গেঁথে থাকা জলকণায় ঢাকা আপাদমস্তক উলঙ্গ একজন নারী! খুউব দ্রুততার সঙ্গে তিনি তার সন্তানকে সিক্ত বুকের ভেতরে জড়িয়ে ধরলেন।
শিশুটি মাএর গালে এইবার হাত রাখলো। তার ভেজা থুতনিতেও! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে মাকে বলছে – উল্লাহ, উল্লা.. হুঁ..হুঁ…..
মা, ততক্ষণে শিশুকে ঘরময় পায়চারি করতে করতে বলেই চলেছে উল্লাহ, উল্লা.. উল্লা…

আমার মন তখন আদিম প্রস্তরীভূত খন্ডটি যেনো! যেনো, খুব, খুউব কষ্ট করে, অনেক পরিশ্রম করে সরাতে পারলাম সেই ভারী পাথরটিকে। আর তারপরেই সেই আদি গুহার অন্ধকারে জন্মদানের সময় নগ্ন এক নারী ও তার নগ্ন এক সন্তান, যেনো আমারই প্রতিচ্ছবি! এই ছবিতে অদ্যাবধি অভিনয় করেই চলেছেন একজন আদ্যা মা। সেই মা, মাত্র দু’বার জ্ঞাতভাবে, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় উলঙ্গ হতে পারেন! তাঁর নিজের সন্তানকে কামনা করতে গিয়ে , আর সেই সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে ! এ যেনো ভেনিসের এক মূর্ত প্রতীক-প্রায় গণ্ডোলা-গ্রাম! যেখানে কেবলই হেমন্তের পত্রঝরি ঋতু পেরিয়ে শরৎকাল এসেছে ! আর, গাছের শরীরের কচি কচি পাতায় বনানী ছেয়ে গেছে!

তবে কি উল্লাহ,উল্লা- এর মানে – ”নগ্নতার কোনও পোষাক নেই?”

কান্না থেমে গেছে। আমিও ধীরে ধীরে পথের প্রান্তরে পা বাড়ালাম।



শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস

নাম- শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস। জন্ম ১৪ই নভেম্বর, মালদা জেলা। শিক্ষা - উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় স্নাতক । লেখালেখি - নয়'র দশকের গোড়া থেকে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য ইত্যাদি। দেশে ও বিদেশে, বাংলাভাষা যতদূর, ততোদূর পর্যন্তই । বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি। বর্তমানে নানা ওয়েব ম্যাগাজিনেও চলছে লেখালেখি। এপর্যন্ত কবিতা ও ছড়া মিলিয়ে বইএর সংখ্যা সাত। পুরস্কার ও সম্মাননা - পিইএন ( বিশ্ব) কর্তৃক নবীন প্রতিভা সম্মাননা ১৯৯৪, ২০০৪-এ সীমান্ত সাহিত্য সম্মাননা, ২০১২ তে স্বপ্নভূমি সাহিত্য সম্মান ও বাংলাদেশের কবিকুঞ্জ,ঝাড়বাতি সহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন থেকে সম্মাননা। ভালোবাসা - ভ্রমণ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।