নবরাগ

রাই পারমিতা আইচ on

বসন্ত আসে, বসন্ত যায়, সোনাঝুড়ির পাতাগুলো কচি সবুজ থেকে রং পরিবর্তন করে, সময় ফুরালে মড়্ মড়্ – সর্ সর্ করে এদিকে – ওদিকে দিকভ্রষ্টের মত বইতে থাকে। অলোকের মনের নৈঃশব্দ, একাকিত্ব ও যেন এমনই দিশেহারা ঘূর্ণাবর্ত…. জীবন যেন সরু – মোটা বিনুনির প্যাঁচ এর মধ্যে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছে।

আজপ্রায় বছর পাঁচ ধরে সরমা পাশে থাকলেও এ যেন এক অদ্ভুত একাকিত্বের যাপন,যেন রঙিন জলছাপের ইজেলটা বিবর্ণ করতে কেউ একরাশ সাদা রং ঢেলে দিয়েছে ।

প্রায় বছর বারো আগে শন্তিনিকেতনের পলাশ, শিমুল , কাগজ-ফুল আরও কতশত অজানা ফুলের নেশামাখানো গন্ধ , রং, বর্ণ ওদের শিরায় শিরায় শত পিঁপড়ের ওঠানামা হয়ে মিশে গেছিল। সম্পূর্ণ অচেনা দুজনের একই লাইনে দাঁড়িয়ে ফর্ম তোলা, ভর্তি হওয়া, থেকে শুরু হয়ে একসাথে বহুবছর মিলে কাটানোর অদেখা ফর্ম জমা করার হাতে হাত….. প্রতিশ্রুতি ….. উফ্ ! কখন যে সেসব দিন কেটে গেল ! অলোক আজও ভাবলে যেন শিহরিত হয়। দুটো পৃথক বিভাগ হলেও নানা অছিলায় দেখতে চাওয়া, নিমেষের চোখাচোখি বা হাতে হাত ছোঁয়ানোর পরম পাওনাটুকু আজ ও অলোককে স্মৃতির ভাল লাগায় বুঁদ করে রাখে। প্রতিমুহূর্ত যেন স্বপ্নের স্টেজে রূপকথার আদর্শ রাজা – রাণী সাজার খেলা। এমনটাই তো সবাই চায়……..

কিছুবছরেই ইচ্ছার গাছ ফুল ধরেছে জানান দিল। ডঃ এর চেম্বার থেকে বেরিয়ে দুজনের সে রাতের আনন্দে যেন হাজার – হাজার জোনাকি তাদের বিস্ময় আলো দিয়ে সোহাগ সূতোর সোয়েটার বুনতে লাগল।

পরিবারের থেকে বহু দূরে চাকরি সূত্রে থাকার জন্য , এখন অলোকের দায়িত্ব চতুর্গুণ হল…… একপক্ষে মা- বাবা সাজা , অন্য পক্ষে বাড়তি পরিশ্রমের দায়িত্ব নেওয়া…. এসব সে বেশ উপভোগ ই করে। সকালের চা বিছানায় দেওয়া, দুপুরের খাবার টেবিলে ঢেকে রেখে অফিস যাওয়া…. বাড়ির কাজের সাহায্যকারী কে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া… ডঃ এর চার্ট মেনে সরমাকে চালনা করা…. রাতে ওষুধ খাওয়া… বিছানায় যাওয়া অবধি সরমার যেন বিশ্বাস ই হয় না ! এমন রূপকথাও বাস্তবে হয়… !

কোন এক বসন্তের বিকেলে অলোকের মনটা আজ বডড ফুরফুরে । অফিস শেষে তাদের অতি পছন্দের পলাশ ফুল , আবির , মালা কিনে অলোক বাড়ি ফিরছিল আর ভাবছিল কিভাবে সারপ্রাইজটা সরমাকে দেওয়া যায়……। ভাবতে ভাবতেই বেলের পর বেল ! সরমা…. স- -র– মা ! আরে ! কিন্তু বন্ধ দরজায় বহু বার সাড়া না পেয়ে এবার মনে কু ডাকল। কোনমতে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে যা দেখল তাতে স্বপ্নের কাঁচের ফুলদানিটা যেন শতচূর্ণ হয়ে তাকেই বিদ্ধ , রক্তাক্ত করছে …. শুধু নিঃশব্দ সব জানান দিল, চারিদিকে চাপ চাপ রক্তের মধ্যে পড়ে আছে সরমা। কিছুক্ষণ নাকি অনেকক্ষণ তা সে জানে না ! জ্ঞান নেই …. কোনমতে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিতেই শুরু হল যমের সদিচ্ছাকে নাকচ করতে মানুষের লড়াই ।

ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা , তিন বোতল রক্তের বিনিময়ে সে যাত্রা সরমাকে নিজের কাছে ফেরাতে সক্ষম হলেও….. সারাজীবন ফুল ফোটানোর অক্ষমতার সাজা সরমার সারা শরীরে মনে কাঁটার মত বিঁধিয়ে দিল। অলোক যেন বাড়ি নিয়ে এল কোন জীবন্ত লাশ। অলোকের ও সাময়িক বিষাদে কাজকর্ম প্রায় শিঁকেয় উঠল। কোন কোন সময় সারা রাত জেগে ফোপানি …. গোঙ্গানি … আবার কখনও চিৎকার করে অব্যক্ত যন্ত্রণার চোখের জলে প্রকাশ……ব্যাস এটুকুই অভিব্যক্তি ছিল ।

স্মৃতিফাগের রঙে যেন শুধুই কালচের বেসাতি।

শারীরিক – মানসিক নানাভাবে…. আবেগ, উত্তেজনা, কাম অলোকের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর সব চেষ্টাই এখন শুধুই সমান্তরাল রেখা । ডাক্তার, ওষুধ , বাড়ি ,চাকরী আর পাথরের মত ডিপ্রেসড সরমা এটুকুই এখন অলোকের জগত।

অফিস , টিভি , বাস রাস্তা , দেয়ালে দেয়ালে পোষ্টার সবখানেই এক আবেগ পূর্ণ হাওয়ার গুঞ্জন আজকাল অলোকের কানে আসছে….. নাম নাকি ভ্যালেনটাইন ডে ! এসব দেখে সে মনে মনে হাসে, ভাবে মেকি আড়ম্বর হলেই বা মন্দ কি ! ঠুনকো পেয়ালা পিরিচে না হয় নতুন করে ভালবাসা ঢেলে খাওয়াই গেল….. উপস্থাপনাটাই তো স্বপ্নীল। মাথায় হঠাৎ তড়িৎ খেলে গেল তার, অফিসে মিথ্যে বলে আপতৎকালীন ছুটি ম্যানেজ করে গররাজি সরমাকে নিয়ে রওনা দিল নিজেদের পুরনো গন্তব্যস্থান শান্তিনিকেতনে। মনে ভয় ! আবার দ্বিধা ও ! ও তো আজকাল যখন… তখন… এমন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে…. !! আবার মনে কিঞ্চিৎ আশার আলো যদি কোনভাবে তার হঠাৎ বাড়ি হয়ে যাওয়া সুখের ঘরটা…. যদি আবার !!!…

কিন্তু না ! অলোককে এবারেও ব্যর্থ হয়েই ফিরতে হল । আশার প্রদীপ তো আর সহজে নেভে না! অলোক ও তাই হাল ছাড়বার পাত্র নয় …..

আবার ও কিছুদিন বাদেই নববর্ষ আসছে , ফিকে হওয়া ইজেলটার রং সে ফেরাতে আপ্রাণ শেষ একটা চেষ্টা করে দেখবেই । ক্ষুদ্র অবয়বে বৃহৎ কে দেখার চেষ্টা । দোলাচলে দুলতে দুলতে নববর্ষের দিন সে নিজে নতুন হলুদ সাদা পাজামা – পাঞ্জাবি তে সাজল , সরমাকে পড়াল তার সবচেয়ে পছন্দের রং লাল রঙের একটা ঢাকাই আর মুক্তোর গয়না । এবার সাহসী পা বাড়াল অলোক সরমাকে নিয়ে, গন্তব্য সেই সুখের আকাশ , তাদের পুরনো ভালবাসার জায়গা শান্তিনিকেতন।

চারপাশের প্রকৃতির উচ্ছাস, আবেগ তখন অলোককে পুরোপুরি উত্তাপে মুড়ে ফেলেছে । পৌঁছনো মাত্র মোরাম বিছানো লাল রাস্তাটায় হাতটা ঠিক আগের মতই শক্ত করে ধরল অলোক আবার । সরমা ! সরমা ! চুপ করে থাকবে এখনও ?? চিবুকটা দুহাতে ধরে খোঁজার চেষ্টা করল লজ্জার সেই গোলাপী রঙ । আমার দিকে দেখ, চারপাশটা লক্ষ্য কর একটু…. কিছু ! কিছুই কি মনে পড়ছে না তোমার ! আমরা একসাথে এখানে কত …. সমুদ্রের প্রবল জলরাশি বারংবার পাথরে ধাক্কা খেয়ে ব্যর্থ ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে । স – র- মা ! এবার দুঃখে, রাগে, চিৎকার করে অলোক। ভালবাসা আর অনিশ্চয়তার জিত – হারের চরম দ্বন্দ্ব চলছে মনে । বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ যেন গরল হয়ে ঝড়ছে এবার ।

হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় খোয়াইয়ের হাটে, বসায় সেই পুরনো গাছের গুড়িটায়। পরন্ত বিকেলের রোদ তখন, কখনও আসমানি কখনও লাল আভার ওড়নায় যেন ওদের আশ্লেষে বাঁধতে চাইছে । পায়ের কাছে বসে কোলে মাথা রাখে অলোক , দমকা হাওয়ায় সরমার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যায়, চোখেমুখে ধুলোর ঝাপটা লাগে। পায়ের পাতা ছুঁয়ে যায় শুকনো পাতার শিঞ্জীনি। সরমার চোখ বন্ধ ….ধীরে ধীরে যেন তড়িৎ এর মত সারা রক্তে প্রবাহ শুরু হয়েছে …. কাঁপছে মুঠোয় ধরা হাতদুটো , ঠোঁটের কোণে যেন চিলতে হাসির সীমন্তীরেখা , বুকে জড়িয়ে অলোক ওমটুকু ভাগ করে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে … সরমা ফিরে এস ! কিছু শেষ হলেও কিছু বাকি থাকে । তুমি আগের মত সাথে থাকলে আমরা নিশ্চই অন্য পথের নতুন দিশা খুঁজে পাব। কি হল ! সরমার এ হাসিতে যেন নববর্ষের নতুন বার্তা । ধীরে ধীর অনেক কিছুই মনে পড়ছে … আসছে … যাচ্ছে …। মুখ খুলল সরমা , এবার যে তার পালা । পেছন থেকে অলোকের কাঁধে মাথা রাখল আলগোছে, বিস্মিত সে ! সত্যি ই তবে আমি এতদিন …! আর তোমার অক্লান্ত চেষ্টা, ভালোবাসা, নিজের মানুষ কে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা , নববর্ষের দিন আমাকে নতুন জীবন দিলে অলোক । আবেগে তার কথা জড়িয়ে আসে…..

সরমা নিজের উষ্ণতায় শক্ত করে চেপে আছে দুটো হাত, বহুদিন বাদে নতুন সাজে অলোককে যেন আগের চেয়েও ভাল লাগল , এবার নিজের দিকে ফেরায় শোন ! তুমি প্রমাণ করে দিলে সবকিছুর মেলবন্ধনে মানসিক অসুখ থেকেও বেরিয়ে আসা যায়। খুব হাসছে সরমা…. অবাক হয়ে চোখ ভরে বহুদিন বাদে তাকিয়ে দেখছে অলোক। আজ নববর্ষের দিন এ তার অদ্ভুত প্রাপ্তি । সরমা বলল এটা বোধহয় তবে চলার রাস্তায় শুধুই একটা বেন্ড ছিল এন্ড নয় … ।।



রাই পারমিতা আইচ

নামঃ রাই পারমিতা আইচ। ঠিকানাঃ কলকাতা। শিক্ষাঃ এম. এ । পেশাঃ সরকারি চাকরি।বেশ কিছু পুজোসংখ্যাতে লেখা প্রকাশিত। আনন্দমেলাতে লেখা নির্বাচিত। শুকতারায় ছোটদের পাতায় লিখতেন। লেখা ছাড়া কবিতা বলা, গান গাওয়া এগুলো পছন্দের।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।