চৈতালি ব্যান্ড পার্টি

বরুণ তালুকদার on

আবু ঠেকে বসে পা দোলাচ্ছে অনেকক্ষণ । কেউ তখনও এসে উঠতে পারেনি । ঠেক বলতে একটা টেলিফোনের তারজালি ঘেরা বাক্স । বাক্সের সামনে যে বাড়তি ছ’ইঞ্চি শান বাঁধানো জায়গাটি রয়েছে তাতে তিনজন সাকুল্যে বসতে পারে । পাঁচজন একসাথে এসে গেলে দু’জনকে অলটার করে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে হয় । একেবারে মোড়ের মাথায় । চারদিক দিয়েই লোক চলাচল করে এখানে । ভীড়ের মাঝেই  একটু নাগরিক নিরিবিলি । গতকাল থানা থেকে একজন অফিসার এসেছিল গাড়ি হাঁকিয়ে । ওরা তখন টিউশানির বাড়িগুলি কেমন হারামি হয়ে গিয়েছে সেই আলোচনায় ব্যাস্ত ।

– এই তোমরা কারা বলত ? সেই কখন থেকে দেখতে পাচ্ছি গ্যাজেল্লা করে যাচ্ছ । বাড়ি ঘর নেই তোমাদের ?

– আমি আবীর ।

– আমি পলাশ ।

– আমার নাম রক্তিম ।

– আমার নাম স্যার …

– ব্যাস ব্যাস আর বলতে হবে না – তোমার নাম বসন্ত না হয়ে যাবেই না । একেবারে চৈতালি ব্যান্ড পার্টি ।

– না স্যার , আমার নাম দক্ষিণবায় রায়চৌধুরি ।

– বাবা রে এটা নামা না এনফিল্ড বুলেট মোটর বাইক । অফিসার তাঁর টুপিটিই খুলে ফেলেন ইন্টারোগেশানের প্রাথমিক পর্যায়েতেই । একেবারে বুকের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিলে ভাই । হাত বুলিয়ে টাকের ঘাম মুছে ফেলেন তিনি ।

– একটা ভাল ডাকনামও আছে স্যার । বলব ? দুখু সবিনয় নিবেদন করে ।

– না তার দরকার নেই । আর কেউ নেই তোমাদের ?

– ওই তো ওপারে দাঁড়িয়ে আছে । ওই যে দেওয়ালে সাইকেল হেলান দিতে দিতে দেওয়ালেই ছবি হয়ে গিয়েছে স্যার । পুলিশ দেখেছে তো তাই ভেবলে গেছে । রুকু ওরফে রক্তিম হাত নেড়ে ডাকে তাকে । আরে চলে আয় । স্যার এমনি গল্প করছেন আমাদের সাথে । ওর নাম দোলন স্যার ।

– বাআআ বা । এটারই দরকার ছিল । একেবারে কমপ্লিট বাসন্তি প্যাকেজ । ভেরি সন্দেহজনক ব্যাপার । এই তোমরা বানিয়ে বানিয়ে নামগুলি বলছ না তো ।

– না না স্যার । একদম বানিয়ে নয় । আবু মানে আবীর সজোরে ঘোষণা করে । বাইচান্স মিলে গিয়েছে স্যার । মানে আপনিই মিলিয়ে দিয়েছেন । আমাদের নামের মধ্যে এই যে বাসন্তি প্যাকেজ রয়েছে সেটা আমরা আজ পর্যন্ত বুঝতেই পারিনি । এই এতদিন আড্ডা মারছি একসাথে কই বুঝতে তো পারিনি । এই তোরা পেরেছিলি ?

– সবাই মাথা নেড়ে সায় দেয় । কেউ বুঝতেই পারেনি ব্যাপারটা । আপনি স্যার বিদ্যোদ্‌জন । স্যার আপনি পারফেক্ট ইন্টেলেক্‌চুয়াল । আপনি স্যার নির্ঘাৎ কবিতা লেখেন । পলু মানে পলাশ রায়দান করে ।

অফিসার লাজুক হেসে একেবারে প্রায় গলনাঙ্কে পৌঁছে গিয়েছেন এমন সময় তার ড্রাইভার এসে তাড়া লাগায় । স্যার রঘুনাথপুরে মদের দোকানে রেইড করবেন বলেছিলেন । দেরি হয়ে গেলে কিচ্ছু পাবেন না কিন্তু । সব অ্যালার্ট হয়ে যাবে । আপনি বেরিয়েছেন এটা খবর হয়ে গিয়েছে অলরেডি ।

অফিসার ব্যাস্ত হয়ে রওয়ানা হয়ে যান । – এই তোমরা চৈতালি ব্যান্ড পার্টি সামনের দোলে একদম হুজ্জোতি করবে না । কেমন ? মোড়ের মাথায় বসে দোলের দিন মেয়েদের টিজ় করবে না । মনে থাকবে ?

সবাই ভাল মানুষের মত মাথা নাড়ে । অফিসার গাড়ি থেকে মাথা বের করে বলেন , চলে আস না , একদিন থানায় । তোমাদের কবিতা শোনাব আমি । না থানায় নয় । আমার কোয়ার্টারেই চলে এস । চেন তো কোয়ার্টার ? গিয়ে সোজা এ-ব্লকের দোতলায় ফুঁড়ে উঠবে । দেখবে আমার নাম লেখা । এই যে- বুকের ব্যাজ দেখান তিনি – ডি.সি.দে – মনে থাকবে ? দিতে চাইলে দে । কেমন প্রফেসনের সাথে ম্যাচ করে গিয়েছে ?

– সবাই আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে । আপনি স্যার ব্যাপক । একেবারে গোলার মত লাইন ছাড়েন । অফিসার মুচকি হাসেন । চৈত্রের বাতাস পথের ধুলো আর প্লাসটিক ওড়ায় । গাড়ি হুস করে বেরিয়ে যায় ।

আবুর পা দোলানোর মাঝেই দোলা ওরফে দোলন চলে আসে । সে গতকাল একটু লেট করেছিল বলে গোটা ঘটনাটা সরেজমিনে শুনতে পায়নি । আবু তাকে আদ্যোপান্ত আবার বলে । দোলা উত্তেজিত হয়ে যায় । -গেলে নির্ঘাৎ মাল খাওয়াবে দেখিস ।ওই মালের দোকানে রেইড করতে গেল না । সেই দামি দামি বোতল সব নিয়ে আসবে ।আজই চল যাই ।

– বালের মত কথা বলিস নাতো । অফিসারের সঙ্গে অত দোস্তি ভাল নয় । কোন ঝামেলায় ফাঁসিয়ে দেবে দেখিস । শুনিসনি অফিসারের সামনে আর ঘোড়ার পেছনে থাকতে নেই । দোলা মনের দুঃখে টিউশানি ঢোকার আগে যে বিড়িটা অর্ধেক খেয়ে নিভিয়ে দিয়েছিল সেটাই মানিব্যাগ থেকে বের করে আগুন লাগায় । পলু , দুখু আর রুকুও চলে আসে দেখতে দেখতে । দুখু রুকু শুনে বলে , কাজ নেই অফিসারের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে । কি হতে কি হয় ।

– দুখু , নিচু গলায় বলে শুনলাম ডি.সি.দে -র দু’দুটো মেয়ে রয়েছে । একটা এইচ এস আরেকটা সেকেন্ড ইয়ার ।এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় । দেখলেই বলে ছেলেদের সব নেটওয়ার্ক খাড়া হয়ে যায় ।

শুনে সবাই নড়েচড়ে বসে । আবীর আমতা আমতা করে বলে , সে গেলে যাওয়া যেতেই পারে । আমরা চোর না ডাকাত যে আমাদের ভয় আছে ?

পলু বলে , তাছাড়া উনি তো কবিতা শোনাবেন আমাদের । আমরা শুনব , মেলা তারিফ করব আর চলে আসব ।

রক্তিম বলে , হ্যা হ্যা তারিফ করব ।আমি জানি তারিফ করতে । একবার না-বুঝে একটা কবি সম্মেলনে ঢুকে পড়েছিলাম রবীন্দ্র ভবনে । সে শালা দু’চার লাইন বললেই সবাই বলছে কেয়া বাত কেয়া বাত । কেউ কেউ এমন আহাআআ করে উঠছে যে মনে হয় পোঁদে পিন ফুটিয়ে দিয়েছে । আর একটু সমস্কৃত শব্দ টব্দ থাকলে বলতে হবে সাধু সাধু । কবিতা শেষ হলে লাস্ট লাইনটা  তোকে  আওড়াতে হবে আর মাথা নাড়তে নাড়তে বলতে আহা আহা যেন চাক ভাঙা মধু ।

– শুধু এক কথা বললে তো হবে না । দোলা বিজ্ঞের মত জানায় । একটু ভ্যারিয়েশান আনব আমরা ।একটা কবিতা শেষ হল তো বললাম – আহা যেন শেষ ফুচকার জল , আরেকটা শেষ হল তো বললাম , উহু , যেন খিদের পেটে রেস্টুরেন্ট থেকে ভেসে আসা বিরিয়ানির সুবাস …..

রুকু বিরক্ত হয়ে বলে তোর নির্ঘাৎ খিদে পেয়েছে । টিউশানি বাড়িতে চায়ের সাথে আজ বিস্কুট দেয়নি বুঝি ?

– দিতে চেয়েছিল , বলল দোলা বিস্কুটগুলি না কৌটোর তলানিতে পড়ে গিয়েছে , সবগুলিই প্রায় ভাঙা , দেব ? আমি বললাম থাক মাসিমা ।আজ শুধু চা দিন ।

তাই বল । ওসব হাভাতে মার্কা তারিফে চলবে না । বসন্ত কালে কবিতা পড়বেন যখন তখন নিশ্চয়ই প্রেমের কবিতা বলবেন । সেই অনুযায়ী তাল ঠুকতে হবে না কী ? এই যেমন ধর – আহা গাছ থেকে খসে পড়া কৃষ্ণচূড়া ফুল যেন । আর ঠিক সেই সময় অফিসারের একটি মেয়ে চা আরেকটি মেয়ে স্ন্যাকসের ট্রে হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করবে ।

– আবে হারামি নাটকের মঞ্চ পেয়েছিস নাকি ।  ইঃ প্রবেশ করবে ! কেন ওনার কাজের মাসি নেই ! মেয়েদুটোকেই চা নিয়ে আসবে হবে । ওদের পড়াশুনো নেই নাকি ? সামনেই তো পরীক্ষা ।

– হ্যা উনি কৃষ্ণচূড়া ঝড়াচ্ছেন আর তখনই ওরা প্রবেশ করল । ইয়ার্কি আরকি । টাইমিং দেখ ।

রুকু সমঝোতার স্বরে বলে , ঠিকাছে ঠিকাছে । আমরা সবাই একসাথে তারিফ করব না হয় । একই কথা একসাথে বলব । হল তো ।

– তার জন্য রিহার্সাল লাগবে । পলু বলে । নাহলে আগে পিছে ডায়লগ হয়ে গেলে কিছুই বোঝা যাবে না । প্রশংসা করছি না খিস্তি করছি ।

আচ্ছা এখন থেকেই শুরু হয়ে যাক ।বলে উত্তেজিত হয়ে পলু উঠে দাঁড়ায় । রুকু টুক করে থ্রি সিটারে বসে পড়ে । – বল সবাই সাধু সাধু । কই বল । আরে একসাথে বল সাধু সাধু ।

প্রথম প্রথম কারোরই গলা মেলে না । শেষে পলু হাত তালি দিয়ে তাল মেলায় । সাধু সাধু । কেয়াবাত কেয়াবাত । আহহহা আআআ ।আহহহাআআআ । ওরা পাঁচজন গলা মেলাতে থাকে । পথচারিরা যেতে যেতে একবার চকিতে তাকিয়ে নেয় ।সঙ্গীকে নিচু গলায় বলে চাকরিবাকরি না পেয়ে বুঝলেন তো … মাথাফাতা সব গেছে । সামলে হাঁটুন । কামড়ে দিলে জলাতঙ্ক । বসন্তের বাতাস পথে ছোটাছুটি করা নেড়ি কুকুরগুলির চার পায়ের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে উড়ে যায় নাগরিক ধুলো ওড়াতে ওড়াতে ।


বরুণ তালুকদার

জন্মঃ ১৪-০৬-১৯৭২ নিবাসঃ বালুরঘাট , দক্ষিণ দিনাজপুর পেশাঃ শিক্ষকতা নেশাঃ পালটে পালটে যায় । তবে গপ্পো বানানোটা স্থায়ী নেশার মত জাঁকিয়েই বসেছে । প্রথম গল্পঃ মনে নেই ।জেলা গ্রন্থাগার থেকে প্রকাশিত একটা লিটল ম্যাগ থেকে বেরিয়েছিল । তবে বিষয়বস্তু মনে আছে । একটা কাগজকুড়ুনি ছেলেকে নিয়ে লিখেছিলাম । বর্তমানে প্রকাশিত গল্পঃ ১০- ১৫ টা হবে । লিখিত পুস্তকঃ নেই ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।