কত রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়!

শাশ্বত বোস on

“হোলি মানেই সেইসময় আমাদের মত ছেলেদের জন্য একএকটা নতুন নতুন আবিষ্কারের দিন। সেটা প্রাপ্ত বয়স্কদের মাথায় আসবে না এবং খুদেরা ভাবতেও পারেনা……” বলে শুরু করলেন হারান কাকা। বাড়ির হলে একটা বড় চেয়ারে বসে বলতে শুরু করতেন। সামনে আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধু – সবাই সমবয়সী। কাকা গল্প বলছে এবং এই “না ভাবতে পারার” কথা শুনে একটা খটকা মনে লাগল। সবার অধীর আগ্রহ যেন কৌতূহলে পরিণত হল। কথা শেষ হতে না হতেই কৌতূহলেই জিজ্ঞেস করলাম সবাই,

  • কেন বলো তো ?
  • কেন ? আইডীয়া কর !
  • বাবারে ! ইংলিশ কোথায় শিখলে ?
  • ওইত চাঁদু…… বাঙ্গালরা সবই পারে…… আচ্ছা চেষ্টা কর। তারাতারি। জানি পারবিনা, তাও ট্রাই কর।
  • কি আর, কোন মন্ত্রি আসত রঙ খেলতে আর তাকে নিয়ে আসতে তুমি ! তাই না ?
  • মাথায় যে তোর গোবর আছে আজকে তা প্রমান হল। তাই না?

অল্প হাসির মাঝখানে আবার, আরেকজন বলল,

  • মনে হয় তোমরা লুকিয়ে বানাতে আর খেতে।
  • কি ?
  • ওইত ওটা।
  • কোনটা ?
  • আরে ওটা।
  • কি রে কোনটা ?
  • আরে যেটা খেলে কারোর মাথা কাজ করে না।
  • ও, ভাং ?
  • আজ্ঞে হ্যাঁ।
  • ওটা তো ছিল, কিন্তু তার সাথে আরেকটি জিনিস ছিল। তোরাও তো জানিস। ভাব। ভাব। পারবি।
  •  কি ? ডি.জে ?
  • মাথা ঠিকঠাক আছে তো ? না পাগল হয়ে গেছিস ? রঙে তোরা কি মেশাস ?
  • হাজারপাওয়ারি। ও তোমরাও ?
  • হ্যাঁ ।

পিছন থেকে প্রশ্ন করল কয়েকজন “ বেশি পড়াশোনা করা” ছেলে। তারা হোলিতেও যেন পরীক্ষা দেয়। প্রায় বাধ্য হয়েই বলতে হল – আরে যে রঙের পাওয়ার হাজার। মানে যেটা তুলতে কষ্ট হয়। তখনই কাকা বলল –

  • একদম ঠিক। তবে আমাদের হোলি হত আরও নৃশংস।
  • “নৃশংস” মানে ?
  • আরে বালুরঘাটের সিঙ্গারার চেও লোকপ্রিয় ছিল আমাদের ছেলেদের হোলি। উদাহরণ দিয়ে বোঝাবো ?
  • থিওরি দিও, প্র্যাক্টিকাল না……
  • বলি তাহলে। আমরা যখন ছোটো ছিলাম ত…………
  • কাকা ফাস্ট ফরওয়ার্ড কর।
  • আচ্ছা।
  • ব্যাপার হচ্ছে ১৯৮২ সালের। আমি তখন ১৩
  • আচ্ছা।
  • হোলির দিনটা যেন আমার কালঘাম ঝড়িয়ে ছেড়েছিল।
  • কেন ?
  • আমাদের সময়ে চল ছিল…
  • ড্রেনের জলে হোলি খেলা ?
  • হ্যাঁ। তো সেবার তা না হয়ে, আমার কাকা দিল্লি থেকে হাজারপাওয়ারি নিয়ে আসে।
  • তারপর ?
  • হোলির দিনে সেটা নিয়ে দারুন কেস হয়।
  • কি হয় ?

এই বলে তিনি শুরু করলেন…

  • বাইরে বেরোতেই আমি আগেই বলে দিলাম যে আমার কাছে ব্রহ্মাস্ত্র আছে। সবাই বুঝে গেল যে কেস টা খাঁসা। এবার প্ল্যান না করলে অসুবিধা হয়ে যাবে বলে একটা মুরগি খোজা হয়। তাকে ধরে সকলে ড্রেনের জলের মধ্যে ব্রহ্মাস্ত্র মিশিয়ে মাখাবো। এটাই আনন্দ। কিন্তু ব্যাপার হল যে সেও জানত না যে জিনিস প্রস্তুত করা আছে। তো, যথারীতি হাতে মাখানো হল ব্রহ্মাস্ত্র। তাকে মাখাব বলে আমরা প্রস্তুত কিন্তু………
  • কিন্তু কি ?
  • দুর্ভাগ্য এই যে তারা আর মুরগিটাকে চিনতে পারল না। সবাই এতো বাজে ভাবে রঙ মেখে ছিল যে কাওকে আর চেনা যাচ্ছিল না আর চিনতে না পেরে……
  • না পেরে ?
  • আমাকেই………
  • ওরে বাবা রে ! তারপর।
  • তখন না হাজারপাওয়ারি হত রূপালী রঙের। এখনকার বারনিশের মত। তাতে, আমার রংবিরঙ্গা মুখটা একদম সিলভার মেডেলের মত হয়ে গেল।
  • তো তুমি তা ঠিক করলে কি করে ?
  • সেটাই তো কেস। বাড়িতে এসেই তো সবার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল। এমনকি আমি নিজেকে দেখেও না হেসে পারিনি। এবার মা বলল, “বাবা, সাবান দিয়ে রঙ টা তুলে নে”। তাই করলাম। সাবান মুখে দিয়ে ভালো করে মুখ ধুলাম কিন্তু তাতে কি আর রঙ যায়? তারপর শুরু হল এক্সপেরিমেন্ট।

এবার কাকা নিজের বলার ক্ষমতা লাগিয়ে যেন প্রত্যক্ষ দেখা গল্পের মত বলতে শুরু করে। এই সময় আমরা সবাই একদম চুপ।

  • আমাদের বাড়ির পাশে আমার এক দাদা থাকত। তখন এই অঞ্চল গ্রাম্য এলাকা। অনেকজন অনেক ঘড়োয়া টোটকা জানত। সেটাই প্রয়োগ করা শুরু হল। সেই দাদা প্রথমে বলল, “ভাই, এক খানা কাম কর, আমি কই কি তুই ঘাটে গিয়া লাল-মাটি মাইখ্যা নদীতে নেয়ে আয়। রঙ কি, রঙের লাইগ্যা সব দাগ সাফ হমু – এই আমি কইয়্যা দিলাম”। আর কি তাই করলাম ! লাল কেন, সেখানের হলুদ, সাদা, কালো আর যত রকম মাটি হয় সব মাখলাম কিন্তু রঙ ওঠেনা। এবার আমাদের বাড়ির কাজের মাসি বলে, “বাবা। মুখে ডিম আর বেসনের ঘোল বানিয়ে লাগা। রঙ উঠে যাবে”। সেটাও করলাম। ডিমের গন্ধ নাকে লাগছে, তাও নিজের সম্মান নিজের হাতে। করতেই হল। কিন্তু তাও রক্ষে নেই। মুখ থেকে যেন রঙ ওঠেনা। লোকে বলে, “রঙ যেন মোর মর্মে লাগে” আমি তখন বলছি, “হাজারপাওয়ারি মোর মুখে লাগে”। তারপর পুরো পাড়ার আকর্ষণ যেন আমার মুখের ওপর। কেও বলে, “মুখে তুলসি আর নীম পাতা বেটে লাগা। রঙ উঠে যাবে”। আবার কেও বলে, “নারকেলের ছোবা দিয়ে মুখ ঘস। কাজ হবে”। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হয়না।

অনেকক্ষন শান্ত থাকার পরে, আমি বললাম,

  • তাহলে ঠিক হল কি করে ?
  • শেষে দুধ আর গোবর মিশিয়ে সেটাকে মুখে রেখে ১৫ মিনিট পরে মুখ ধুলাম, তাতে রংটা গেল। সেই হোলিতে আমার মুখ ধুতে ধুতেই যেন দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল।

হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম,

  • এতো ভালো বুদ্ধি দিল কে ?
  • আর কে ? আমার দিদা। তার আবার এই দিকে ভালো ধাত ছিল, তাই……
  • তাও, দারুন অভিজ্ঞতা !
  • হ্যাঁ। তাই বলে দিচ্ছি, সাবধানে হোলি খেলবি, গণ্ডগোল করিস না।
  • আচ্ছা কাকা। ব্রহ্মাস্ত্রটার স্যাম্পেল আছে ?
  • থাকলেও আর দিমু না। তারপর তোরা আমারেই মাখাইয়া দে আর কি ।

শেষে, আরও কিছুক্ষণ গল্প করে বাড়ি ফিরলাম। দুনিয়ার অনেক আজব রঙ্গ দেখে েই হোলিতে বেড়িয়ে পরলাম কাকা দের মতো, “ নতুন পথের সন্ধানে………”


শাশ্বত বোস

আত্রেয়ী ডি. এ. ভি পাবলিক স্কুলের অষ্টম শ্রেনির ছাত্র, সারাদিন পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে লিখতে ভালবাসে। নিজের এই  ১৩ বছরের জীবনের হাসির ঘটনাগুলি নিয়েই তার বেশিরভাগ  অনুগল্প লেখা। সে ইংরেজিতে কিছু আর্টিকেলও লিখেছে যেগুলি 'শমি ডট ইন' পত্রিকায় প্রকাশিত ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।