এক হত্যা রহস্য

অভিজিৎ রায় on

“আসুন। বাড়ির যা হাল”, মহেশ কিঞ্চিত লজ্জার হাসি দিয়ে বললেন।
স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বড়, একটা অতি কারুকার্য মূলক চাবি দিয়ে সদর দরজার তালাটি খুলতেই একটা বিকট গন্ধ নাকে এসে আছড়ে পড়লো।
“নেহাত আপনার আবদারটি ফেলতে পারলামনা তাই। আমার পিতার মৃত্যুর পর দশ বৎসর বাড়িটি খোলা হয়নি।“
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ । এই বাড়িটির উপর দীর্ঘ দিন ধরেই আমার নজর কেড়েছে। একটু খুলেই বলি, আমার পরবর্তী লেখাটি একটি রহস্য , রোমাঞ্চকর আর যানেনই তো কলকাতার বুকে এত পুরনো বাড়ি দ্বিতীয়টি পাওয়া মুশকিল, সমরেশ বলল।
 “বসু আর মজুমদারের পর, আপনি গাঙ্গুলি যে ভাবে বাঙালির মন জয় করেছেন তাতো বলাই বাহুল্য।”
 একটু মৃদু হাসি দিয়ে পাঞ্জাবি পরিহিত কাঁধে শান্তিনিকেতনের পাটের ব্যাগ ঝোলানো, সমরেশ বাড়ির অন্দর মহলগুলি ঘুরে দেখতে লাগল। ইংরেজ আমলের বাড়ি, মুঘলি ঘরানার আসবাব, জানালায় বেলজিয়ামের অতি মূল্যবান কাঁচ- সে যেন অমূল্য সম্পদ ধূলায় গড়ায় অবস্থা। সব ঘর গুলিই নতুন করে বিস্ময়ে চোখ ও মন ভরিয়ে তোলে সমরেশের। একটি ঘর যদিও প্রবেশ নিষিদ্ধের হয়ে থাকে কারণ মহেশের বাবুর চাবির গোছা থেকে ঠিক সেই দরজার চাবিটিই দীর্ঘদিনই খোয়া গেছে।
“আপনি তালাটিতো পাল্টে ফেলতে পারতেন?”
“তা হয়তো পারতাম, তবে এই ঘরে কিছু পুরনো তৈলচিত্র ছাড়া মূল্যবান কিছুই না থাকায় আর মাথা ঘামাইনি।“
তালাটির বর্তমান পরিস্থিতি দেখে সমরেশ বুঝতে পারল, এটি ভাঙতে গেলেও মহেশ বাবুকে বেশ বেগ পেতে হবে।
বাড়ি ভ্রমনের পাঠ চুকিয়ে সমরেশ যাত্রা শুরু করল ২৭/বি সাতকরি মিত্র লেনে তার দু কামরার বাড়ির উদ্দেশ্যে। অবিবাহিত এই লেখা প্রিয় মানুষটির দ্বিতীয় ঘরের সঙ্গি তার অপেক্ষা দুবছরের ছোট বন্ধু স্বরাজ সমাদ্দার। সমরেশের একাকি জীবনের স্বাধীনতার স্বাদ যে স্বরাজকেও আক্রান্ত করেছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে হিসেব রক্ষক স্বরাজের একমাত্র নেশা মগজ চর্চা ও সিগারেট।
সমরেশের রহস্য উপন্যাসটি বাবুলেনের ‘মিত্র বাড়ির কান্ডকারখানা’ নামে পাঠকের মধ্যে রহস্যের এক নতুন রোমাঞ শুরু করেছে। প্রথম এডিশন প্রায় শেষের মুখে। টাকার অঙ্কটিও নেহাত কম আসেনি হাতে। তাই বিগত এক সপ্তাহ সমরেশ বিলাসিতাতেই দিন কাটাচ্ছে।
রবিবার সকাল ৯টা। হন্তদন্ত হয়ে সমরেশ, স্বরাজের ঘরে ঢুকেই বিছানায় ধপাস করে বসে একটি খবরের কাগজের পাতা স্বরাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “সর্বনাশ হয়েগেছে।“
কাগজের প্রথম পাতার নিচের অংশের শিরোনাম ‘ব্যবসায়ী মহেশচন্দ্র মিত্র আকস্মাৎ খুন’। ‘আমার নতুন উপন্যাসের প্রেক্ষাপট মিত্র বাড়ির মালিক সমরেশ আহত গলায় বললেন।
স্বরাজ কাগজটি তুলে নিয়ে খবরটুকু পড়ে স্তম্ভিত। ‘অমন একটি ঐতিহাসিক সম্পত্তির মালিক এতদিন রেহাই পেয়েছিলেন কার দয়ায় তাও তো বুঝলাম না’- স্বরাজ বলল।
“আমি কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি।“ সমরেশ বলল।
স্বরাজ ভ্রু কুঁচকে জিগ্গেস করে, “ঠিক বুঝলামনা।“
“দিন তিনেক আগে আকস্মাৎ ফোন করেন মহেশ বাবু। তার কথায় আতঙ্কের আভাস পাই। এখন বেশ বুঝতে পারছি তার ভয়টি অমূলক ছিলোনা।“
“আর একটু স্পষ্ট করে বলুন।”
সমরেশ ইতস্তত করতে করতে বলল, “আমার নতুন কাল্পনিক উপন্যাসটি, তাতে আমি একটি গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছি ঐ পরিত্যক্ত মিত্র বাড়ির বদ্ধ ঘরে। গল্পে একটি ধাঁধাও বাতলেছি…”
“আপনার গুপ্তধনের চাবিকাঠি। আর তাতেই সমস্যার উদ্ভব, তাইতো? তারপরের টুকু বলুন।”
“একি যেমন তেমন সমস্যা, একেবারে প্রান হানির হুমকি।
“বাকি কথা পরে হবে। এখুনি মিত্র বাড়ি যাওয়াটা প্রয়োজন। আমি কিন্তু আপনারো বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।”
“বিপদ!”
“ধাধাটির আবিস্কারক আপনিই কিনা।”
প্রায় ১২ টা নাগাদ মিত্র বাড়িতে মুখোমুখি হতে হল ইনেসপেকটর রাতুল বর্মনের সাথে। খুবই বিচক্ষণ ব্যাক্তি। সমরেশের পরিচয় পেয়েই বলে উঠলো, “আমার পরবর্তী গন্তব্য ছিল আপনারই বাড়ি। ইনি…?”
“আমি সমরেশ বাবুর বন্ধু ও লিখনীর ভক্ত, স্বরাজ। আমার বন্ধুটি যে নিরিহ তা আমি হলফ করে বলতে পারি।“
“বুঝলাম। একটি কথা বলুনতো, এই আপনার উপন্যাসটির গুপ্তধনের সন্ধান কি আপনি সত্যি জানেন?”
“গু- গুপ্তধন!” সমরেশ স্তম্ভিত গলায় বলল।
“হ্যাঁ, ফ্রম গুপ্তধন টু গুপ্তহত্যা।“
“একটু যদি খুলে বলেন”, স্বরাজ সাগ্রহে জিগ্গেস করে।
“খুন হওয়ার ঠিক আগের দিন মহেশ বাবু একটি হুমকি চিরকুট নিয়ে থানায় আমার কাছে অভিযোগ জানাতে আসেন।“
“হুমকি?” সমরেশ কম্পমান গলায় জিজ্ঞেস করে।
“ধাধার উত্তরটি চাই, নাহলে খালাস।“
“কি সাঙ্ঘাতিক!”
“অবাক বিষয় হল, চিঠিটি সংবাদপত্রের শব্দ কেটে জুড়ে বানানো।“
“হাতের লেখা ধরা পড়ার ভয়।“ স্বরাজ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল।
“সমরেশদা ধাঁধাটা কি ছিল?”
“সে তো এখন আমারই মুখস্থ হয়ে গেছে?” ইন্সপেক্টর বর্মন বলে উঠলেন, “দিনের তারা জলে যখন/ সোনার তরী চিন্তা হরেন তখন।”
“এটা কিন্তু সম্পূর্ণই মন গড়া।” সমরেশ বলল।
“আপনার কি বাড়ির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গেছে?” স্বরাজ জানতে চায়।
“না তবে এখনই করবো বলেই যাচ্ছিলাম।”
“সন্দেহের তালিকায় কে কে আছে জানতে পারি?” স্বরাজ জিজ্ঞেস করে।
“মহেশ বাবু বিপত্নীক। সন্তান বলতে একটিই রতন। তবে শুনেছি বেকার হওয়ায় বাবার সম্পত্তিই হল তার একমাত্র ভরসা। তার খুনের মোটিভটি কিন্তু সব থেকে জোরালো।”
“খুনটা ঠিক কিভাবে হয় বলতে পারেন?” স্বরাজ জানতে চায়।
“প্রাথমিক তদন্তে বোঝা গেছে মাথার পেছনে কোনো শক্ত কিছুর আঘাত দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
“আসুন”, বলেই ইন্সপেক্টর বর্মন তাদেরকে একটি ঘরের দিকে নিয়ে গেল।
সুঠাম ও সুদর্শন রতনের বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি। তবে তার শুভ্র মুখটি দেখলে যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না সে ও খুনি হতে পারে। সম্পত্তির লোভে ছেলে বাবাকে খুন করে এমন ঘটনার নজির কলকাতা তথা ভারতবর্ষের বুকে অনেক পাওয়া যায়।
ইন্সপেক্টর বর্মন বাবু যথেষ্ট সাবলীল ভাবেই প্রশ্ন করতে থাকেন একে একে সকলকে। বাড়ির চাকর দেরকেও ডাকা হয়। কমলাবতি—রাধুনী, শিবসংকর—মালি, ও জনার্দন সবচেয়ে পুরনো বিশ্বস্ত চাকর। সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ না গেলেও, জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তেমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে না এলেও জানা যায় যে মহেশ বাবু একটু বিলাশি এবং আয়েশী ছিলেন। যদিও তাকে চরিত্রদোষ বলা যায় কিনা তা প্রমান সাপেক্ষ।
“আচ্ছা, মিত্র বাবুর পরিত্যক্ত বাড়িটি কি একবার ঘুরে দেখা যায়? রহস্যের কেন্দ্র তো সেখানেই,” ইন্সপেক্টর বর্মন প্রশ্নটি করায়, রতন প্রথম দিকে খানিকটা ইতস্তত করলেও, একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাজি হয় এবং তাদেরকে নিয়ে বাড়িটির উদ্দেশ্যে। তবে বাড়িটি পরিদর্শনকালে সবথেকে বেশি বিস্মিত হয় সমরেশ। বাড়িটিকে আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন মনে হয়। আর সবথেকে অদ্ভুত বিষয়টি হল যে ঘরটির চাবি মহেশ বাবুর কাছে ছিল না তা কিন্তু রতনের চাবির গোছা থেকে অনায়াসে বেড়িয়ে এলো। ঘরের ভেতর ছিল সমরেশের দ্বিতীয়বার অবাক হওয়ার পালা। আসবাব বিহীন ঘরটি অস্বাভাবিক রকম পরিচ্ছন্ন।
“এই ছবিটি এখানে, মানে?” সমরেশ পূর্বমুখী একটি দেওয়ালের ওপর টাঙ্গানো একটি তৈলচিত্রের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে অবাক ভাবে বলে ওঠে।
ঘরের আধো-অন্ধকারে স্বরাজ খেয়াল করতে পারে, সেটি একটি বয়ে যাওয়া নদীর চিত্র যার মাঝ বরাবর একটি নৌকো। তবে ঠিক নৌকোটির উপরে কেউ একজন ছুরি চালিয়ে চিত্রটি কে নষ্ট করে দিয়েছে। তৈলচিত্রের এই হত্যা নিয়েও যে অনুসন্ধান করতে হবে তা বোধহয় আগে কারোরই জানা ছিল না।
“কিছু বুঝতে পারছেন?” খুব নিচু স্বরে স্বরাজ জিজ্ঞেস করে।
“এই ছবিটি আমি মিত্র বাবুর বসার ঘরে দেখেছিলাম।”
ঘরটি ভালো করে পর্যবেক্ষণে স্বরাজ একটি বিষয় লক্ষ্য করে। তৈলচিত্রটির ঠিক বিপরীত দেওয়ালে একটি ছোট জানালা। ইন্সপেক্টর বর্মনের নজরে ছবিটি পড়ে এবং তিনি সেটিতে খুলে নিয়ে গিয়ে অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নেন।
বাড়ি ফিরে সমরেশ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বিকেলে একটি চায়ের দোকানে বসে সমরেশ স্বরাজ এর মধ্যে কথাবার্তা চলাকালীন, সমরেশ বলে যে মৃত্যু বাড়ির বসার ঘরে সে ছবিটি এক অদ্ভুত ভাবে সেই ঘরে যাওয়া টি তার মধ্যে একটা রহস্যের আন্দাজ দিয়েছে। ঠিক তখনই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে স্বরাজ তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি ছোট্ট সোনার আংটি খুলে সমরেশের দিকে বাড়িয়ে ধরে।
“দেখুনতো এটি চিনতে পারছেন কিনা?” স্বরাজ জানতে চায়।
আংটিটি হাতে নিয়ে একটু নেড়েচেড়ে ভ্রু কুঁচকে অবশেষে সেটি স্বরাজের হাতে ফেরত দিয়ে বলল, “না ঠিক চিনতে পারলাম না তো।”
“আমি কিন্তু খানিকটা আন্দাজ করতে পারছি”
“আহ, বলুনই না। আর রহস্য সহ্য হচ্ছেনা, মশাই।”
“ক্রমশ প্রকাশ্য। আমাদের মনে হচ্ছে আরেকবার রতন বাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। তার বিপদও নেহাত কম নয়।”
“রতন? বিপদ? মানে তো কিছুই বুঝতে পারছিনা।”
“সমরেশ বাবু, মস্তিষ্ক চর্চাটি আমার কাজ, আপনার না। তাই যেটা বলছি সেটাই করুন, সঙ্গে চলুন।”
“বলছি এই ভর সন্ধ্যেবেলায়। কাল গেলে হতো না।”
এক প্রকার সমরেশ বাবুর সমস্ত আপত্তি কে উপেক্ষা করেই, স্বরাজ গিয়ে হাজির হল মিত্র বাড়িতে।তবে বাড়ির ভেতরে কিন্তু তিনি ঢুকলেন না। বরং বাড়ির পেছনের দিকটায় যে দিকটায় চাকরদের থাকার ঘর, সে দিকে গিয়ে হাজির হলেন। জনার্দন যে ঘরটিতে থাকে তার পেছন দিক থেকে জানলা দিয়ে আড়ি পেতে বুঝতে পারল তিনি তখন রামায়ণ পড়তে ব্যস্ত। ধার্মিক মানুষ। সমস্যা বাড়লো যে ঘরে শিব শংকর থাকে সেই ঘরটি পেছনে গিয়ে। ভেতর থেকে চাপা উত্তেজিত গলায় দুজনের আওয়াজ শোনা গেল। পুরুষের গলা। সমরেশ ও স্বরাজ সেখান থেকে ফিরে সোজা তাদের সাতকড়ি মিত্র লেনের বাড়িতে ফিরলো। রাত্রি স্বরাজের কাটলো উদ্বিগ্ন। সিদ্ধান্ত নিল পরদিন সকালে আরেকবার সে দেখা করবে রতনের সাথে।
পরদিন সকালে সমরেশ বাবুর ঘুম ভাঙ্গার আগেই, স্বরাজ রওনা হলো মিত্র বাড়ির উদ্দেশ্যে। রতন বাবু বরাবরই একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেন। সেই দিন অবশ্য গিয়ে দেখা গেল তখনো ঘুম থেকে ওঠেন নি। তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে স্বরাজ চাকরদের ঘরগুলোতে একবার দেখতে চায়। রতন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কি ডিটেকটিভ? যাকে তাকে আমাদের চাকরদের ঘর তল্লাশি করতে দিতে পারবনা।”
“সেটা নিয়ে না হয় পরে ভাববেন। আপনার বিপদের কথাটি ভেবেই আপনাকে প্রস্তাবটি দিচ্ছি। আমাকে একটু সহযোগিতা করুন। এতে আপনার প্রাণটিই রক্ষা পাবে।”
রতন একটু হেসে বলে, “কি বলছেন মশাই আমি তো পুলিশের প্রাইম সাসপেক্ট। বেকার ছেলে, কোন রকমের রুজি রোজগার নেই, বাবার যদি কোন গুপ্তধন হাতে লেগে যায় তবে তো বরাত খুলবেই। আপনার সেটা মনে হয় না?”
“সেটাই হওয়া উচিত ছিল বটে, যদি না আমার হাতে এমন কিছু প্রমাণ আসতো যা আপনাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে।”
“ প্রমাণ? আপনাকে ঠিক কেন বিশ্বাস করবো বলুন তো?”
কারণ সেটি ছাড়া এখন আপনার কাছে আর কোন উপায় নেই।”
একটু ভেবে রতন বলে, “ঠিক আছে তবে যখন চাকররা কাজে ব্যস্ত থাকবে, একমাত্র তখনই আপনাকে আমি তাদের ঘরে নিয়ে যেতে পারি।”
পরিকল্পনামাফিক সেটিই হয়। অন্তত ঘন্টাখানেক দুটি চাকরের ঘর ভালো করে অনুসন্ধান করে দেখে স্বরাজ। হাসিমুখে ফিরে এসে রতনের কাঁধে হাত রেখে বলে, “নিশ্চিন্ত থাকুন আর যাইহোক আপনার কিছুই হতে দেব না। আমি ঠিক দু’দিন পর আবার আসবো। তবে পুলিশকে এর মধ্যে আর কিছু জানানোর দরকার নেই। আর একটা কথা, খুব সাবধানে থাকবেন।”
ঠিক দুইদিন পর সমরেশ, স্বরাজ এবং ইন্সপেক্টর বর্মন মিত্র বাড়িতে হাজির হয়। একটি ঘরে তিনজন চাকর এবং রতন জমায়েত হয় যেন একটা বিচারসভা বসেছে। সবথেকে বেশি অবাক হয়ে ছিল ইন্সপেক্টর বর্মন কারণ পুরো ব্যাপারটি সমান্তরালভাবে স্বরাজও তদন্ত করছিল সে বিষয়ে তার ঘুণাক্ষরেও ধারণা ছিল না।
“তবে শুরু করা যাক।” স্বরাজ বলল।
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না আমাদের এখানে ডেকে আনার মতলবটা কি?” ইন্সপেক্টর বর্মন জানতে চায়।
“একটু ধৈর্য ধরুন, সবই জানতে পারবেন”, স্বরাজ বলে।
“আচ্ছা রতন বাবু, আপনার কি মনে হয় আপনার বাবার কোন গুপ্তধন আদৌ ছিল?”
“বাবা কোনদিনই আমায় বিশ্বাস করতেন না। তাই যদি গুপ্তধন থেকেও থাকে, সে বিষয়ে বাবা আর যাকেই বলুক আমাকে যে কিছুই বলতেন না এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই।“
“যাকেই বলুক মানে? আপনার কি মনে হয় অন্য কাউকে আপনার বাবার বলার মতন ছিল?”
রতন মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে।
“বেশ, আপনাকে আর অস্বস্তিতে ফেলেবোনা। একটু কমলাবতীর কথায় আসা যাক।”
কমলাবতি নাম এই বিষয়ে উঠে আসায় সকলেই একটু অবাক হয়ে স্বরাজের দিকে তাকায়।
আপনিতো বাংলাদেশ থেকে আগত পরিবারের মেয়ে। কুপার্স ক্যাম্পে আপনারা থাকতেন। অনেকেই এখানে ভাবছে আমি ‘আপনারা’ কেন বলছি। কারণ এখানে তার স্বামীও মজুত আছেন।”
সকলেরই মুখের ভাষা শুকিয়ে যায় শুধুমাত্র শিব শংকর বাদে, যিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, “কি যা তা বকছে, মশাই?”
“তবে কি বাকিটা আপনি স্পষ্ট করবেন শিবশংকর বাবু? নাকি বিবাহিত স্ত্রীকে অস্বীকার করবেন, শুধুমাত্র এই কারণে যে তার সাথে মহেশ বাবুর একটি সম্পর্ক ছিল। অবশ্যি তাতে তো আপনার সায় ছিলই।”
“মুখ সামলে কথা বলবেন, আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু চরিত্রহীন নই।” শিবশংকর রেগে বলে ওঠে। স্বরাজ একটু মৃদু হাসি দেয়।
“সমরেশ বাবু একটি সত্য কথা আপনার জানা দরকার। আপনি মিত্র বাবুর বসার ঘরে যে ছবিটি দেখে আপনার গল্পের প্রেক্ষাপটটি তৈরি করেছিলেন ঠিক সেই ধাঁধা এবং ছবিটিকেই কাজে লাগিয়ে মিত্র বাবুর হত্যার পরিকল্পনাটি করা হয়।”
“কি বলছেন মশাই?” সমরেশ বলে ওঠে।
“শুধুই সত্য। ওই ঘরের চাবিটি আপনি প্রথমবার দেখেছিলেন খোয়া গিয়েছে, সেটি আসলে খুব পরিকল্পনা করেই চুরি করা হয়েছিল মিত্রবাবুর চাবির গোছা থেকে। কি কমলাদেবী ঠিক বললাম তো? যদিও মিথ্যে বলে খুব একটা লাভ হবে না। প্রথম দিন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই আমি লক্ষ্য করেছিলাম আপনার ডান হাতের মধ্যাংগুলটি শূন্য হলেও তাতে একটি আংটি পরার দাগ আছে, যে আংটিটি আমি দ্বিতীয় দিন মিত্র বাবুর সেই বদ্ধ ঘরের মেঝে থেকে কুড়িয়ে পাই। চাবির গোছা থেকে চাবিটি চুরি করে স্বামী স্ত্রী সেই ঘরে রাতে একসাথে থাকার শান্তিটুকু উপভোগ করতেন। খুব সহজভাবেই ওই ঘরটিতে কেউই কখনও প্রবেশ করতে পারত না। সঙ্গত কারণ ছিল, এতে তেমন কিছু নেই। কিন্তু অন্যায়টি হল হত্যাকাণ্ডটি করার পর। আমি সমস্ত তথ্য অনুসন্ধান করে দেখেছি আপনাদের একত্রিত জীবনটি এর আগে রানাঘাট কুপার্স ক্যাম্প কেটেছে। অর্থের একটা অভিলাষ আপনাদের মধ্যে ছিল। ভাবছিলেন কিভাবে বৃদ্ধকে মেরে তার সম্পত্তিটি হাতিয়ে নেওয়া যায়। সমরেশ বাবুর কাল্পনিক গল্পটি আপনাদের কাছে হাতিয়ার হয়ে ওঠে। খুব বুদ্ধি খাটিয়ে এই ছবিটিকে নিয়ে গিয়ে ঘরের মধ্যে এমনভাবে আপনারা রেখেছেন যাতে ধাঁধাটি সহজেই বুঝতে পারা যায়। সমরেশ বাবু আপনি বোধহয় খেয়াল করেননি ছবিটি বিপরীতে দেওয়ালে একটি জানালা ছিল সেটি খুলে দিলে, সূর্যের আলো এসে পড়তো ঠিক ওই নৌকোটির উপর যাকে ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছে এমনভাবে যেন মনে হয় ওখান থেকে চুরি গেছে একটি গোপন তথ্য। স্বাভাবিকভাবেই পিতার সম্পত্তির লোভে সন্তানের খুন করার মোটিভটা খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সেটিকেই কাজে লাগিয়ে এনারা দুজন সুপরিকল্পনায় রতনকে হত্যাকারী প্রমাণ করার জন্য সমস্ত রকম চেষ্টা করতে থাকে। তবে রতন বাবু আপনার বাবার সাথে কমলা দেবীর একটি অবৈধ সম্পর্ক ছিল তা তো আপনি জানতেন।”
রতন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সায় দেয়, “এ নিয়ে বাবার সাথে আমার অনেকবারই মতবিরোধ হয়েছে।”
“খুবই স্বাভাবিক, এবং আমি আপনার বাবার উকিলের থেকে খবর নিয়ে জানতে পেরেছি, তিনি সম্পত্তির একটি অংশ কমলাদেবী নামে লিখে দিয়েছিলেন।  বলাইবাহুল্য পরবর্তী পরিকল্পনাটি তাকে বিবাহ করাই ছিল, যেহেতু তিনি তখনো জানতেন না কমলাদেবী বিবাহিত।”
এতোটুকু বলার পর স্বরাজ কমলাদেবী কে জিজ্ঞেস করলেন, “যদি কোন ভুল হয়ে থাকে একটু সংশোধন করে দেবেন। আমি যখন শিব শংকর বাবুর ঘরে তল্লাশি চালাইসেখানে কিছু খবরের কাগজ ছেড়া অবস্থায় দেখতে পাই। হুমকির চিঠিটি কে লিখেছিল আমার কাছে বুঝতে আর দেরি হয়না।”
সকলেই প্রায় বাকরুদ্ধ। শিবশংকরই প্রথম মৌনব্রত ভাঙলেন। হ্যাঁ খুনটা করেছি আমরাই কারণ উদ্বাস্তুর এ জীবন আমাদের আর সহ্য হচ্ছিল না। আমরাও একটু সুখ চেয়েছিলাম শান্তি চেয়েছিলাম। সমাজের উঁচুতলার কিছু মানুষ সবসময় নীচু তলাকে দমন করে বড় হতে চায়। বাকি জীবনটুকু আমরা দুজন একটু শান্তি চেয়েছিলাম।”
“হাতে রক্তের দাগ নিয়ে কি শান্তি পাওয়া যায় শিবশংকর বাবু? ইন্সপেক্টর বর্মন, আমার মনে হয় এনারা দুজন নিজেদেরকে ধরা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।”
“আপনিতো কামাল করে দিয়েছেন মশাই।” ইন্সপেক্টর বর্মন বললেন।
“প্রথমে সমরেশ বাবুর কাছে একটা ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আমার আসল পরিচয়টা আমি দিতে চাই। আমি আসলে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, আপনাদের ভাষায় যাকে বলে, টিকটিকি, ঠিক তাই। আমার আসল নাম অদ্রীশ জানা।”
“আপনি টিকটিকি নন। আপনি হলেন ধুরন্ধর টিকটিকি।” বলেই সমরেশ বাবু সশব্দে হেসে উঠলেন।



Categories: গল্প

অভিজিৎ রায়

পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী অভিজিৎ রায় একজন ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক। তিনি বর্তমানে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক। তিনি বাংলা এবং ইংরেজিতে লিখতে ভালোবাসেন। তিনি ছবি আঁকতো ভালোবাসেন।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।