এক কাপ চা

বর্ণালি বসাক বোস on

সোনারপুরের জমিদার বাড়ী আজ ফুল আর আলোয় সেজে উঠেছে । ঠাকুর দালান নাট মন্দির থেকে শুরু করে বাগান, কাছারি, অন্দরমহল কোন জায়গাই বাদ নেই। চারিদিকে আলো ঝলমল করছে ,নানা রঙয়ের আলো । নতুন করে ফোয়ারা বসান হয়েছে তাতে একসাথে চলছে গান, আলো আর জলের খেলা ।রাস্তা দিয়ে যত লোক যাচ্ছে প্রত্যেকের নজর কাড়ছে এই জমিদার বাড়ী । লোকজন বলাবলি করছে জমিদার বাবু দেখিয়ে দিলেন কেমন করে ছেলের বিয়ে দিতে হয় । জমিদার দূর্জয় সিংহ । জমিদারি না থাকলেও বিষয় সম্পত্তি আছে প্রচুর । ওনার বাবা , ঠাকুরদা ছিলেন এই অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার । তাই ওনাকেও গাঁয়ের লোকজন খুব মান্য করে এবং সবাই তাঁকে জমিদার বাবু বলেই ডাকে। ছোটবেলা থেকেই দূর্জয় বাবুর বিষয়–আশয় বা জমিদারির প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না । তিনি সাহিত্য চর্চা করতে ভালবাসতেন , পড়াশুনাতেও বরাবরই খুব ভালো ছিলেন। গ্রামে বাড়ী হলেও শহরে গিয়ে তিনি বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করেছেন ।তারপর গ্রামে ফিরে পৈত্রিক সম্পত্তি দেখাশোনা ও ব্যাবসার কাজে মন দেন আর পাশাপাশি সাহিত্য চর্চাও চালিয়ে যান ।আজ তার একমাত্র ছেলে সুজয়ের বিয়ে । ছেলেকেও তিনি উচ্চশিক্ষিত করেছেন ।এখন সে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের পদে কর্মরত । জমিদারির কোন দায় দ্বায়িত্বে তিনি ছেলেকে জড়ান নি । ছেলে স্বাধীন ভাবে নিজের জীবন যাপন করছে। সুজয় অবশ্য বিয়ে করছে তারই এক সহকর্মী দিশাকে । দূর্জয়বাবু ছেলের পছন্দকে কক্ষনও অস্বীকার করেন নি । সুজয়কে তিনি এই ব্যাপারে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন । শুধু তার একটাই শর্ত ছিল তার পুত্রবধূটি যেন শিক্ষিতা ও সুন্দরী হয় ।


নিজের বিয়ের ব্যাপারেও এই বিষয়ে তিনি অনড় ছিলেন । সেই সময় নিজে পছন্দ করে বিয়ে করা সম্ভব ছিলনা ঠিকই তবু উনি ওনার বাবাকে বলেছিলেন , “ ঘর যেমনি হোক বাবা আপনি দেখবেন মেয়েটি যেন শিক্ষিতা হয় এবং ইংরেজিটা যেন অবশ্যই জানে ।” ওনার বাবা অজয় সিংহ মহাশয় তখন পরেছিলেন মহা ফ্যাসাদে সেই সময় ইংরেজি জানা শিক্ষিত মেয়ে পাওয়া প্রায় অসম্ভব । বহু খোঁজাখুঁজির পর সুভদ্রাদেবীর খোঁজ পাওয়া গেল । সুভদ্রাদেবী রায়পুরের জমিদার শ্রী সুভাষ রায়ের কন্যা । দূর্জয়বাবুর মত না হলেও তিনি ছিলেন শিক্ষিতা । বাবা ছেলে দুজনেরই মনের মত । অজয়বাবুর ইছা তাঁর একমাত্র পুত্রবধূ অবশ্যই সুন্দরী হওয়া চাই ।


অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন সুভদ্রাদেবী আজও তাঁর রূপে এতকুকু ভাটা পড়েনি । লাল পেড়ে গরদের শাড়ি আর এক গা গয়না পরে তিনি অপেক্ষা করছেন ছেলে – বউমাকে বরণ করার জন্য ।ঠিক যেন একটি দেবী প্রতিমার মত লাগছে ওনাকে । ছেলে আর বউমা এল সুভদ্রাদেবী ওদের বরণ করে ঘরে তুললেন। বাড়ীতে লোকে লোকারণ্য সকলে এসেছেন জমিদারবাড়ীর বউ দেখতে । সুজয়ের বউ দিশাকে দেখতে অপরূপা । শাশুড়িমার উপযুক্ত পুত্রবধূ হয়েছে বলে গাঁয়ের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল । একটি হিরের নেকলেস দিয়ে সুভদ্রাদেবী বউমার মুখ দেখলেন । পরের দিন বউভাত গোটা গাঁয়ের লোক নিমন্ত্রিত । তাঁর সঙ্গে আত্মীয় স্বজনরা তো আছেই । সকলেই নতুন বউয়ের প্রশংসা করছে দেখে দূর্জয়বাবু আর সুভদ্রাদেবীর মন ভরে গেল ।


সুভদ্রাদেবী খুব মার্জিত ও শান্ত স্বভাবের মানুষ । সকলকে তিনি বললেন , “ আপনারা ওদের আশীর্বাদ করুন অরা যেন সুখি হয় ।” দূর্জয়বাবু আগে থেকেই সুজয়ের জন্য কোলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনে রেখেছিলেন । অষ্টমঙ্গলা সেরে সুজয় আর দিশা নতুন ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠল । সুভদ্রাদেবী ওদের নতুন সংসারটা নিজের হাতে ভালো করে গুছিয়ে দিলেন । তারপর কয়েকদিন ওদের সাথে থেকে সোনারপুরে ফিরে এলেন । সুজয় আর দিশা নিজেদের ব্যাস্ত জীবনে ফিরে গেল । সুভদ্রাদেবী মনের মত বউমা পেয়ে খুব খুশি । মনে মনে ভাবেন আজকালকার দিনে এত ঘরোয়া মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । দিশা কত শিক্ষিত তাও কত মন দিয়ে সংসারের সব দ্বায়িত্ব সামলাছে । ছেলের দ্বায়িত্ব দিশার উপরে দিয়ে সুভদ্রাদেবী খুব নিশ্চিন্ত । সকলের কাছে বৌমার প্রশংসায় তিনি পঞ্চমুখ ।


এই ভাবে এক বছর কেটে গেল । একদিন সকালে সুভদ্রাদেবী পুজো করে ঠাকুরদালান থেকে আসছেন এমন সময় তাঁর মোবাইলটা বেজে উঠল । দেখলেন দিশার ফোন, একটু আবাক হলেন ভাবলেন ওরা তো এত তারাতারি ঘুম থেকে ওঠেনা ! আবার ভাবলেন ছেলে নিশ্চই কিছু খেতে চেয়েছে আর দিশা ও ওঠার আগেই চুপিচুপি রেসিপিটা শুনে নিতে চাইছে । এরকম দুষ্টুমি তো সুজয় হামেশাই করে দিশা পারেনা এরকম খাবারই ওর খেতে ইচ্ছে হয় । আর দিশা সুভদ্রাদেবীর কাছে রেসিপি শুনে ওকে রান্না করে খাওয়ায় । মনে মনে হাসতে হাসতে ফোনটা ধরে সুভদ্রাদেবী বলেন , “ বল আজ আবার বাবু কি খেতে চেয়েছে ? ”


ওদিক থেকে দিশা বলল , “বাবু কিছু খেতে চায়নি মা ও খুব অসুস্থ কালরাতে ওর খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল আমি ওকে নার্সিং হোমে ভর্তি করেছি । তোমরা তারাতারি চলে এসো ।”


সুভদ্রাদেবী তো আকাশ থেকে পড়লেন ভাবলেন কাল অফিস থেকে ফেরার পরেই তো ছেলের সঙ্গে কথা বললেন তখন তো দিব্যি ভালো ভাবেই কথা বলল । এর মধ্যে এত অসুস্থ হয়ে পড়ল ? একটুও দেরি না করে দূর্জয়বাবু আর সুভদ্রাদেবী বেড়িয়ে পড়লেন । দুশ্চিন্তায় দুজনের পাগল পাগল অবস্থা । শ্যামসুন্দর ওনাদের পুরনো ড্রাইভার দূর্জয়বাবু ওকে বললেন যতটা সম্ভব তারাতারি চালাতে । তাও ছয় থেকে সাত ঘণ্টা লেগে যাবে পৌছাতে ।


শ্যামসুন্দর বলল , “ বাবু চিন্তা করবেন না ছোটবাবু ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে । আমি যতটা সম্ভব তারাতারি চালাচ্ছি ।” দুপুর আড়াইটার দিকে ওরা নার্সিং হোমে পৌঁছাল কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ । দিশা একটা চেয়ারে বসে কেঁদে যাচ্ছে । সুভদ্রাদেবীকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলল , “ অনেক চেষ্টা করলাম মা আমি পারলাম না আমাকে তোমরা ক্ষমা করো ।”সুভদ্রাদেবী পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন । দূর্জয়বাবু সুজয়ের কাছে গেলেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন , “আমাদের ছেড়ে চলে গেলি বাবু !” পোস্ট মর্টাম করার পর রাত দশটা নাগাদ ওরা সুজয়ের বডি শশ্মানে নিয়ে গেল । শেষ কৃত্য করে রাত বারটার দিকে ওরা সুজয়ের ফ্ল্যাটে গেল ।


কাজের মেয়ে চম্পা ওদের চা করে দিল । সুভদ্রাদেবীর মন কিছুতেই মানতে চাইছে না, একটা সুস্থ সবল ছেলে দুম করে মারা গেল ?দুদিন পরে সুভদ্রাদেবী শ্যামসুন্দরকে নিয়ে কলকাতার এক গোয়েন্দার কাছে গেলেন । নাম হরিমাধব সেন । পেশায় ডাক্তার । গোয়েন্দাগিরি তাঁর শখ । উনি আর ওনার মেয়ে রাগিনি দুজনে মিলে গোপনে অনেক তদন্ত করেছেন । ওনাদের সাহায্য করেন হরিমাধব বাবুর বন্ধু পুলিশের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী অমরেশ ঘোষ । ওনাদের তিনজনেরনের একটা খুব ভালো টিম তৈরি হয়েছে । সুভদ্রাদেবী লোকাল থানায় গেলে সেখানে অমরেশ বাবুই তাঁকে হরিমাধব বাবুর কথা বলেন । শ্যামসুন্দর তাদের খুব বিশ্বস্থ লোক, সে গোপনে সুভদ্রাদেবীকে এখানে এনেছে ।দূর্জয় বাবুও সবটা ভালো মত জানেন না ।


সুভদ্রাদেবী হরিমাধব বাবুকে সুজয়ের কথা বললেন এবং এটাও বললেন যে তিনি কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না । ওনার মন বলছে এই মৃত্যুটা স্বাভাবিক হতেই পারে না ।পোস্ট মর্টাম রিপোর্টে বলা হয়েছে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে মৃত্যু কিন্ত ছোটবেলা থেকে ওর তো কক্ষনও শ্বাসকষ্ট ছিল না আর এখানেই খটকা লাগছে সুভদ্রাদেবীর। হরিমাধব বাবু সব শুনলেন । তিনি রাগিনিকে সুভদ্রাদেবীর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন । বললেন , “ আজ থেকে ও আপনার সঙ্গে থাকবে । আপনি ওকে আপনার নার্স বলে পরিচয় দেবেন । আরও কিছু দিন আপনি আপনার ছেলের ফ্ল্যাটে থাকুন । আশা করছি একটা সমাধান ঠিক পাওয়া যাবে ।”রাগিনির নাম দেওয়া হল রিয়া ।সুভদ্রাদেবী ডাক্তার দেখানোর নাম করে বেড়িয়ে ছিলেন । তাই বাড়ী এসে রাগিনিকে নিযুক্ত করতে কোন অসুবিধাই হল না এদিকে রাগিনির ওর বাবার নার্সিং হোমের ঠিকানা দিয়ে দিল ওর কাজের জায়গার নামে যাতে কেউ খোঁজ নিতে গেলেও কোন সমস্যা তৈরি না হয় । সব রকম আটঘাট বেধে ওরা কাজে নেমে পড়ল ।কোন কিছুতেই বেশি কৌতূহল দেখানো যাবে না মাথায় রেখে রাগিনি সুত্র খোঁজা শুরু করল । দিশার কথাবার্তা , চম্পার আচরণ সব ভালো করে মেপে নিতে থাকল । বাড়ীর আনাচে কানাচে খেয়াল করতে থাকে কিছু পাওয়া যায় নাকি । হরিমাধববাবু খোঁজ নিতে থাকে সুজয়ের বন্ধুবান্ধব , অফিস কলিগদের সম্বন্ধে । তাদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কেমন ছিল । কারো সঙ্গে শত্রুতা ছিল কিনা । সুজয়ের মৃত্যু সাতদিন হয়ে গেল তদন্ত একচুলও এগল না । কোন জায়গাতে কোন ফাঁক তারা খুজে পাচ্ছে না । এদিন সকালে চম্পা চা করতে গিয়ে বলে , “ বউদি আজকে দাদার চা পাতাটা দিয়ে চা করি ? ওটা আর রেখে কি করবে ?তোমরা খেয়ে ফেল ।” দিশার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল কেমন যেন চমকে উঠল দিশা ব্যাপারটা রাগিনির চোখ এড়াল না । দিশা বলে উঠল , “ না না আমারটা দিয়েই কর ।”সুভদ্রা দেবী কিছু বললেন না দেখে রাগিনিই বলে বসল – ও মা বউদি তুমি আর দাদা কি আলাদা আলাদা চা খেতে ?


— হ্যাঁ ভাই তোমার দাদার ছিল ফ্লেবার টি পছন্দ ও গ্রিন টি পছন্দ করত না।আর আমি গ্রিন টি পছন্দ করি তাই দুজনের দুরকম চা পাতা ।
— ও আচ্ছা ।


প্রথম দিন থেকেই রাগিনির চোখ টানছে এক জোড়া রূপোর কাপ প্লেট। আর একটি রূপোর গ্লাস । সুভদ্রা দেবীকে জিজ্ঞেস করলে উনি বলেন ওটা সুজয়ের ঠাকুরদাদা ওকে দিয়েছিলেন বলেছিলেন রোজ এটাতে করে চা খেতে । রাগিনি খেয়াল করল প্লেট আর গ্লাসটা যত চকচকে কাপটা কেমন যেন একটু কাল হয়ে আছে । রাগিনির ওটা ঠিক চায়ের দাগ মনে হল না । কাপটি চেয়ে নিল রাগিনি। একটু পরে রান্নাঘরে জল গরম করতে এসে রাগিনির চোখে পরে সকালে যে চা পাতাটি চম্পা সুজয়ের বলছিল সেই কৌটোটা ফাঁকা প্রায় আধ কউত মত চা পাতা ছিল ।রাগিনি বুঝল এটা হয় দিশা নয় চম্পা দুজনের একজন সরিয়েছে। রাগিনি তন্ন তন্ন করে খুজতে থাকে শেষে ডাস্তবিনের মধ্যে কাগজে মোড়া অবস্থায় চা পাতাগুলো খুঁজে পায় । একটু স্যাম্পল নিয়ে নিল রাগিনি । হঠাৎ করে দিশা সেখানে চলে আসে ।
বলে – কি ব্যাপার রিয়া ডাস্টবিনে কি করছ ?
— কিছু না বউদি । এই মাসিমার ওষুধের খালি প্যাকেট গুলো কোথায় ফেলব তাই দেখছিলাম ।
— এ বাবা চা পাতা গুলো এভাবে কে ফেলল ?
— ওগুলো আমার কাছেই পরে গেল গো এক্ষুনি উঠিয়ে দিচ্ছি ।
— রিয়া কাজের লোকদের সব জায়গায় হাত দেওয়া আমার পছন্দ না ।
— সরি বউদি ।
রাগিনি বুঝে গেল দিশাই চা পাতাগুলো সরিয়েছে । বাইরে যাওয়ার নামকরে সুজয়ের কিছু ব্যাবহার করা জিনিসের সঙ্গে চা পাতা ও কাপটি ল্যাবে পাঠিয়ে দিল।আর হরিমাধববাবুকে চম্পা আর দিশার আগের জীবন সম্বন্ধে খোঁজ নিতে বলল ।দিশা সুজয়ের বন্ধু বান্ধব দের বাড়ীতে কাজের দিন আসার জন্য বলতে গেল । আর এই সুজগে রাগিনি সুভদ্রা দেবী কে দিয়ে চম্পার সাথে কথা বলল ।
সুভদ্রাদেবী বললেন – চম্পা তোর দাদা বউদির ঝগড়া হত না ?
— না গো মাসিমা । দাদা বউদির কক্ষনো ঝগড়া হত না । খুব প্রেম ছিল ওদের । বউদি দাদার খুব যত্ন করত । দাদার সব জিনিস যেমন চা পাতা থেকে জুতো অবধি সব বউদি পছন্দ করে আনত ।দাদা কোন কারনে রেগে গেলে বউদি দাদাকে মানিয়ে নিত নিজে কক্ষনও রাগ করত না । মাঝে মাঝে আমি তো লজ্জাই পেয়ে যেতাম ।
— কেন ?
— মানে ওই আর কি ।বউদি যে ভাবে দাদার রাগ ভাঙাত । তবে একদিন আমি বউদির রাগ দেখেছিলাম ।
— কোন দিন ?
— কি যে হয়েছিল সে দিন বউদির। দাদা কে বলে যাচ্ছে তুমি তোমার বাবা–মা কে সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে আমাদের এখানে এসে থাকতে বলো। কি করবে ওরা অত সম্পত্তি। দাদা কিছুতেই রাজী হলেন না। দাদা বললেন বাবা–মা ওখানে নিজেদের মত ভাল আছেন। অত বড় খোলামেলা বাড়ী আমাদের। ওসব ছেড়ে এই দুটো ঘরে ওনারা থাকবেন কি করে আর তা ছাড়া বাবা যে লাইব্রেরিটা বনিয়েছেন, কত বই আছে জান ওখানে ? কত দুঃস্থ ছেলে মেয়েরা ওখানে পড়তে আসে। পুরনো থেকে আধুনিক সবরকম বই এর কালেকশন বাবার। যারা বই কিনতে পারেনা বাবার কাছে এলেই বাবা নির্দ্বিধায় তাদের বই দিয়ে দেন। প্রতিবছর বাবা যেমন নিজের জন্য বই কেনেন, তেমন গ্রামের ছেলে মেয়েদের জন্য কেনেন। ওত বড় লাইব্রেরি আর রাজ্যে আছে কিনা সন্দেহ। পাঁচ–ছটা ঘর নিয়ে শুধু বই আর বই। আবার ছেলে মেয়েদের বসে পরার ব্যাবস্থাও করেছেন। বাবার জন্যই আজ ওই গ্রামে শিক্ষিতের হার এত বেশি। বাবা চলে এলে ওদের কি হবে। তাছারা আমি তো ভেবে নিয়েছি এখানকার ভাল শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে আমিও এখন থেকে বই পাঠাবো। আমি খেয়াল করলাম বউদি কটমট করে দাদার দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বউদি বলল, ভাবলাম ওনাদের বয়েস হয়েছ, তাই বললাম। তা তোমার যখন ইচ্ছে নেই, তো থাক।


রাগিনি কথা গুলো মন দিয়ে শুনল। কথাও একটা সুত্র খোঁজার চেষ্টা করল। এদিকে চম্পাকেও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারছে না।হরিমাধববাবুর সুজয়ের অফিসে তদন্ত শেষ। সেখানে সন্দেহের কিছু পাননি। উলটো ওদের মধুর সম্পরকের কথা জেনেছেন। রাগিনি এখানেই বারবার খটকা লাগছে। সকলের মুখেই ওদের প্রেম কাহিনী। রাগিনির একবার দিশার ঘরটা সার্চ করার ইচ্ছা হল। সুভদ্রা দেবী কে দিশার ঘরে গেল। দিশা তখন ঘুমাচ্ছিল। রাগিনি ঘরটা একটু চোখ বুলিয়ে নিল। সন্দেহজনক কিছু চোখে পরল না। বেড়িয়ে আশার সময়ে রাগিনি দেখতে পেল একটা সেল ফোন চার্জে বসানো আছে কিন্তু সাহস করে ওটাতে হাত দিতে পারেনা। দিশার তো একটা দামি স্মার্টফোন আছে, তাহলে এত পুরনো ফোনটা ব্যাবহার করে কেন? নাম্বার টা পেতেই হবে। ওরা দিশার ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ঘরের সামনের ছোট্ট বারান্দাটায় বসল। একটু পরে দিশা ওদের কাছে এসে বসলো। রাগিনি বলল, “ভাবছি আজকে রাতে একটু বাড়ি যাব। আমার মায়ের শরীরটা নাকি খুব খারাপ। একটা রাতের জন্য আমি ছুটি নেব বউদি। মাসিমা তো আগের থেকে একটু সুস্থ”। সুভদ্রাদেবী তো অবাক। এই মেয়ে তো আগে ছুটির কথা বলেনি। কোন কারন আছে ভেবে চুপ করে থাকলেন। একটু পরে দিশা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। সুভদ্রাদেবী কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই রাগিনি বলল। মাসিমা আজ রাতে আমি ফিরব না। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। বউদি র ফোনটা সাইলেন্ট করে এমন একটা জায়গায় লুকিয়ে ফেলতে হবে যে ও যেন খুঁজে না পায়। তারপর নিজে প্রচন্ড অসুস্থতার অভিনয় করবে। আর আমাকে খবর দিতে বলবে। বউদি ফোন টা খুজে পাবেনা তুমি বলবে তোমার ঘরে তো আরেকটা ফোন আছে। ওটা থেকে করো না। আসলে আমার ওই নাম্বার টা চাই। পারবে না মাসিমা ?
— হ্যাঁ পারব। পারতে আমাকে হবেই। কিন্তু কোথায় ছিল ফোনটা?
— ছিল ছিল। এবার তোমাকে যা যা বললাম ঠিক মত করে ফেল কেমন ? আমি আটটার দিকে বের হব । তুমি এগারটার দিকে কাণ্ডটা ঘটাবে । চম্পা দশটার দিকে খাওয়া দাওয়া মিটিয়ে চলে যাবে । বউদি সাড়ে দশটা থেকে পৌনে এগারটার দিকে ওয়াশ রুমে যায় কুড়ি থেকে বাইশ মিনিট লাগে বউদির ফ্রেশ হতে । তার মধ্যে তোমার মোবাইলটা লুকানো হয়ে যাবে । আমি যাবার সময় তুমি তোমার ফোনটা ঠিক করতে দোকানে দেবার জন্য দিয়ে দেবে । আমার নাম্বারটা তোমার ডাইরিতে আছে আর ডাইরিটা তোমার মাথার বালিশের নিচে রাখা আছে ।

র চা করে দিল । সুভদ্রাদেবীর মন কিছুতেই মানতে চাইছে না, একটা সুস্থ সবল ছেলে দুম করে মারা গেল ?দুদিন পরে সুভদ্রাদেবী শ্যামসুন্দরকে নিয়ে কলকাতার এক গোয়েন্দার কাছে গেলেন । নাম হরিমাধব সেন । পেশায় ডাক্তার । গোয়েন্দাগিরি তাঁর শখ । উনি আর ওনার মেয়ে রাগিনি দুজনে মিলে গোপনে অনেক তদন্ত করেছেন । ওনাদের সাহায্য করেন হরিমাধব বাবুর বন্ধু পুলিশের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী অমরেশ ঘোষ । ওনাদের তিনজনেরনের একটা খুব ভালো টিম তৈরি হয়েছে । সুভদ্রাদেবী লোকাল থানায় গেলে সেখানে অমরেশ বাবুই তাঁকে হরিমাধব বাবুর কথা বলেন । শ্যামসুন্দর তাদের খুব বিশ্বস্থ লোক, সে গোপনে সুভদ্রাদেবীকে এখানে এনেছে ।দূর্জয় বাবুও সবটা ভালো মত জানেন না ।


সুভদ্রাদেবী হরিমাধব বাবুকে সুজয়ের কথা বললেন এবং এটাও বললেন যে তিনি কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না । ওনার মন বলছে এই মৃত্যুটা স্বাভাবিক হতেই পারে না ।পোস্ট মর্টাম রিপোর্টে বলা হয়েছে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে মৃত্যু কিন্ত ছোটবেলা থেকে ওর তো কক্ষনও শ্বাসকষ্ট ছিল না আর এখানেই খটকা লাগছে সুভদ্রাদেবীর। হরিমাধব বাবু সব শুনলেন । তিনি রাগিনিকে সুভদ্রাদেবীর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন । বললেন , “ আজ থেকে ও আপনার সঙ্গে থাকবে । আপনি ওকে আপনার নার্স বলে পরিচয় দেবেন । আরও কিছু দিন আপনি আপনার ছেলের ফ্ল্যাটে থাকুন । আশা করছি একটা সমাধান ঠিক পাওয়া যাবে ।”রাগিনির নাম দেওয়া হল রিয়া ।সুভদ্রাদেবী ডাক্তার দেখানোর নাম করে বেড়িয়ে ছিলেন । তাই বাড়ী এসে রাগিনিকে নিযুক্ত করতে কোন অসুবিধাই হল না এদিকে রাগিনির ওর বাবার নার্সিং হোমের ঠিকানা দিয়ে দিল ওর কাজের জায়গার নামে যাতে কেউ খোঁজ নিতে গেলেও কোন সমস্যা তৈরি না হয় । সব রকম আটঘাট বেধে ওরা কাজে নেমে পড়ল ।কোন কিছুতেই বেশি কৌতূহল দেখানো যাবে না মাথায় রেখে রাগিনি সুত্র খোঁজা শুরু করল । দিশার কথাবার্তা , চম্পার আচরণ সব ভালো করে মেপে নিতে থাকল । বাড়ীর আনাচে কানাচে খেয়াল করতে থাকে কিছু পাওয়া যায় নাকি । হরিমাধববাবু খোঁজ নিতে থাকে সুজয়ের বন্ধুবান্ধব , অফিস কলিগদের সম্বন্ধে । তাদের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কেমন ছিল । কারো সঙ্গে শত্রুতা ছিল কিনা । সুজয়ের মৃত্যু সাতদিন হয়ে গেল তদন্ত একচুলও এগল না । কোন জায়গাতে কোন ফাঁক তারা খুজে পাচ্ছে না । এদিন সকালে চম্পা চা করতে গিয়ে বলে , “ বউদি আজকে দাদার চা পাতাটা দিয়ে চা করি ? ওটা আর রেখে কি করবে ?তোমরা খেয়ে ফেল ।” দিশার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল কেমন যেন চমকে উঠল দিশা ব্যাপারটা রাগিনির চোখ এড়াল না । দিশা বলে উঠল , “ না না আমারটা দিয়েই কর ।”সুভদ্রা দেবী কিছু বললেন না দেখে রাগিনিই বলে বসল – ও মা বউদি তুমি আর দাদা কি আলাদা আলাদা চা খেতে ?
— হ্যাঁ ভাই তোমার দাদার ছিল ফ্লেবার টি পছন্দ ও গ্রিন টি পছন্দ করত না।আর আমি গ্রিন টি পছন্দ করি তাই দুজনের দুরকম চা পাতা ।
— ও আচ্ছা ।
প্রথম দিন থেকেই রাগিনির চোখ টানছে এক জোড়া রূপোর কাপ প্লেট। আর একটি রূপোর গ্লাস । সুভদ্রা দেবীকে জিজ্ঞেস করলে উনি বলেন ওটা সুজয়ের ঠাকুরদাদা ওকে দিয়েছিলেন বলেছিলেন রোজ এটাতে করে চা খেতে । রাগিনি খেয়াল করল প্লেট আর গ্লাসটা যত চকচকে কাপটা কেমন যেন একটু কাল হয়ে আছে । রাগিনির ওটা ঠিক চায়ের দাগ মনে হল না । কাপটি চেয়ে নিল রাগিনি। একটু পরে রান্নাঘরে জল গরম করতে এসে রাগিনির চোখে পরে সকালে যে চা পাতাটি চম্পা সুজয়ের বলছিল সেই কৌটোটা ফাঁকা প্রায় আধ কউত মত চা পাতা ছিল ।রাগিনি বুঝল এটা হয় দিশা নয় চম্পা দুজনের একজন সরিয়েছে। রাগিনি তন্ন তন্ন করে খুজতে থাকে শেষে ডাস্টবিনের মধ্যে কাগজে মোড়া অবস্থায় চা পাতাগুলো খুঁজে পায় । একটু স্যাম্পল নিয়ে নিল রাগিনি । হঠাৎ করে দিশা সেখানে চলে আসে ।
বলে – কি ব্যাপার রিয়া ডাস্টবিনে কি করছ ?
— কিছু না বউদি । এই মাসিমার ওষুধের খালি প্যাকেট গুলো কোথায় ফেলব তাই দেখছিলাম ।
— এ বাবা চা পাতা গুলো এভাবে কে ফেলল ?
— ওগুলো আমার কাছেই পরে গেল গো এক্ষুনি উঠিয়ে দিচ্ছি ।
— রিয়া কাজের লোকদের সব জায়গায় হাত দেওয়া আমার পছন্দ না ।
— সরি বউদি ।
রাগিনি বুঝে গেল দিশাই চা পাতাগুলো সরিয়েছে । বাইরে যাওয়ার নামকরে সুজয়ের কিছু ব্যাবহার করা জিনিসের সঙ্গে চা পাতা ও কাপটি ল্যাবে পাঠিয়ে দিল।আর হরিমাধববাবুকে চম্পা আর দিশার আগের জীবন সম্বন্ধে খোঁজ নিতে বলল ।দিশা সুজয়ের বন্ধু বান্ধব দের বাড়ীতে কাজের দিন আসার জন্য বলতে গেল । আর এই সুজগে রাগিনি সুভদ্রা দেবী কে দিয়ে চম্পার সাথে কথা বলল ।
সুভদ্রাদেবী বললেন – চম্পা তোর দাদা বউদির ঝগড়া হত না ?
— না গো মাসিমা । দাদা বউদির কক্ষনো ঝগড়া হত না । খুব প্রেম ছিল ওদের । বউদি দাদার খুব যত্ন করত । দাদার সব জিনিস যেমন চা পাতা থেকে জুতো অবধি সব বউদি পছন্দ করে আনত ।দাদা কোন কারনে রেগে গেলে বউদি দাদাকে মানিয়ে নিত নিজে কক্ষনও রাগ করত না । মাঝে মাঝে আমি তো লজ্জাই পেয়ে যেতাম ।
— কেন ?
— মানে ওই আর কি ।বউদি যে ভাবে দাদার রাগ ভাঙাত । তবে একদিন আমি বউদির রাগ দেখেছিলাম ।
— কোন দিন ?
— কি যে হয়েছিল সে দিন বউদির। দাদা কে বলে যাচ্ছে তুমি তোমার বাবা–মা কে সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে আমাদের এখানে এসে থাকতে বলো। কি করবে ওরা অত সম্পত্তি। দাদা কিছুতেই রাজী হলেন না। দাদা বললেন বাবা–মা ওখানে নিজেদের মত ভাল আছেন। অত বড় খোলামেলা বাড়ী আমাদের। ওসব ছেড়ে এই দুটো ঘরে ওনারা থাকবেন কি করে আর তা ছাড়া বাবা যে লাইব্রেরিটা বনিয়েছেন, কত বই আছে জান ওখানে ? কত দুঃস্থ ছেলে মেয়েরা ওখানে পড়তে আসে। পুরনো থেকে আধুনিক সবরকম বই এর কালেকশন বাবার। যারা বই কিনতে পারেনা বাবার কাছে এলেই বাবা নির্দ্বিধায় তাদের বই দিয়ে দেন। প্রতিবছর বাবা যেমন নিজের জন্য বই কেনেন, তেমন গ্রামের ছেলে মেয়েদের জন্য কেনেন। ওত বড় লাইব্রেরি আর রাজ্যে আছে কিনা সন্দেহ। পাঁচ–ছটা ঘর নিয়ে শুধু বই আর বই। আবার ছেলে মেয়েদের বসে পরার ব্যাবস্থাও করেছেন। বাবার জন্যই আজ ওই গ্রামে শিক্ষিতের হার এত বেশি। বাবা চলে এলে ওদের কি হবে। তাছারা আমি তো ভেবে নিয়েছি এখানকার ভাল শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে আমিও এখন থেকে বই পাঠাবো। আমি খেয়াল করলাম বউদি কটমট করে দাদার দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বউদি বলল, ভাবলাম ওনাদের বয়েস হয়েছ, তাই বললাম। তা তোমার যখন ইচ্ছে নেই, তো থাক।
রাগিনি কথা গুলো মন দিয়ে শুনল। কথাও একটা সুত্র খোঁজার চেষ্টা করল। এদিকে চম্পাকেও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারছে না।হরিমাধববাবুর সুজয়ের অফিসে তদন্ত শেষ। সেখানে সন্দেহের কিছু পাননি। উলটো ওদের মধুর সম্পরকের কথা জেনেছেন। রাগিনি এখানেই বারবার খটকা লাগছে। সকলের মুখেই ওদের প্রেম কাহিনী। রাগিনির একবার দিশার ঘরটা সার্চ করার ইচ্ছা হল। সুভদ্রা দেবী কে দিশার ঘরে গেল। দিশা তখন ঘুমাচ্ছিল। রাগিনি ঘরটা একটু চোখ বুলিয়ে নিল। সন্দেহজনক কিছু চোখে পরল না। বেড়িয়ে আশার সময়ে রাগিনি দেখতে পেল একটা সেল ফোন চার্জে বসানো আছে কিন্তু সাহস করে ওটাতে হাত দিতে পারেনা। দিশার তো একটা দামি স্মার্টফোন আছে, তাহলে এত পুরনো ফোনটা ব্যাবহার করে কেন? নাম্বার টা পেতেই হবে। ওরা দিশার ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ঘরের সামনের ছোট্ট বারান্দাটায় বসল। একটু পরে দিশা ওদের কাছে এসে বসলো। রাগিনি বলল, “ভাবছি আজকে রাতে একটু বাড়ি যাব। আমার মায়ের শরীরটা নাকি খুব খারাপ। একটা রাতের জন্য আমি ছুটি নেব বউদি। মাসিমা তো আগের থেকে একটু সুস্থ”। সুভদ্রাদেবী তো অবাক। এই মেয়ে তো আগে ছুটির কথা বলেনি। কোন কারন আছে ভেবে চুপ করে থাকলেন। একটু পরে দিশা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। সুভদ্রাদেবী কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই রাগিনি বলল। মাসিমা আজ রাতে আমি ফিরব না। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। বউদি র ফোনটা সাইলেন্ট করে এমন একটা জায়গায় লুকিয়ে ফেলতে হবে যে ও যেন খুঁজে না পায়। তারপর নিজে প্রচন্ড অসুস্থতার অভিনয় করবে। আর আমাকে খবর দিতে বলবে। বউদি ফোন টা খুজে পাবেনা তুমি বলবে তোমার ঘরে তো আরেকটা ফোন আছে। ওটা থেকে করো না। আসলে আমার ওই নাম্বার টা চাই। পারবে না মাসিমা ?
— হ্যাঁ পারব। পারতে আমাকে হবেই। কিন্তু কোথায় ছিল ফোনটা?
— ছিল ছিল। এবার তোমাকে যা যা বললাম ঠিক মত করে ফেল কেমন ? আমি আটটার দিকে বের হব । তুমি এগারটার দিকে কাণ্ডটা ঘটাবে । চম্পা দশটার দিকে খাওয়া দাওয়া মিটিয়ে চলে যাবে । বউদি সাড়ে দশটা থেকে পৌনে এগারটার দিকে ওয়াশ রুমে যায় কুড়ি থেকে বাইশ মিনিট লাগে বউদির ফ্রেশ হতে । তার মধ্যে তোমার মোবাইলটা লুকানো হয়ে যাবে । আমি যাবার সময় তুমি তোমার ফোনটা ঠিক করতে দোকানে দেবার জন্য দিয়ে দেবে । আমার নাম্বারটা তোমার ডাইরিতে আছে আর ডাইরিটা তোমার মাথার বালিশের নিচে রাখা আছে ।

ঠিক আটটার দিকে রাগিনি বেড়িয়ে গেল । সুভদ্রাদেবী রাগিনির কথা মত কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল । হাত পা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে । তবু নিজেকে শান্ত রেখে বসে আছেন । ঠিক দশটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে দিশা ওয়াশ রুমে গেল। সুভদ্রাদেবী ফোনটা রাগিনির কথা মত রান্নাঘরে লুকিয়ে রেখে বুকটা চেপে ধরে চিৎকার করতে থাকে । দিশা বেড়িয়ে তো হতভম্ব । সুভদ্রা দেবী বললেন রিয়াকে ফোন করতে । যথারীতি দিশা ওর ফোন খুঁজে খুঁজে নাজেহাল । বলছে – মা আমার ফোনটা যে কোথায় রাখলাম।তোমার ফোনটাও তো রিয়া নিয়ে গেল । কি যে করি এখন ? তোমাকে কোন ওষুধটা দেব বলতো ?
— ওসব আমি জানি না । রিয়া জানে ।
— ইস ফোনটা যে কোথায় রাখলাম ।
— কেন তোমার ছোট ফোনটা থেকে করনা ।
— ছোট ফোন ?
— তোমার ঘরে চার্জে বসান ছিল যে
দিশা বাধ্য হয় ওটা থেকে রাগিনিকে ফোন করতে ।রাগিনি তখন আমরেশ বাবুর সঙ্গে থানায় বসে বসে ভাবছে সুভদ্রা দেবী কাজটা করতে পারল কি না । এগারতা কুড়ি বেজে গেল যত সময় যায় ভাবনা বাড়তে থাকে হঠাৎ রিং বেজে ওঠে ফোনে । রাগিনি আনন্দে চিৎকার করে ওঠে , “ এসে গেছে আঙ্কেল এসে গেছে ।” রাগিনি কিছুক্ষন পরে ফোন টা ধরে বলে – “হ্যালো । কে বলছেন?”
— রিয়া মার শরীরটা খুব খারাপ হয়েছে তুমি শিগগির চলে এসো ।
— কে বউদি নাকি ?
— হ্যাঁ
— এ বাবা আমি তো শুয়ে পড়েছি গো । দ্যাখ মাসিমার ওষুধের প্যাকেটে রাতের খাবার ওষুধ আছে একটু দিয়ে দাও না ।
— না না আমি পারব না । তুমি চলে এস ।
— আচ্ছা আসছি ।
রাগিনি নাম্বারটা অমরেশ বাবুকে দিয়ে বলল – আঙ্কেল এই নাম্বারের পুরো ডিটেলস আমার কালই চাই ।
— ওকে ম্যাডাম । একদম বাবার মত দুঁদে গোয়েন্দা হয়েছিস ।
অমরেশ বাবু রাগিনিকে ওনার গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে গেল । ফিরে এসে রাগিনি সুভদ্রা দেবীকে ওষুধ দিল । সুভদ্রাদেবি একটু সুস্থ হবার পর রাগিনি দিশাকে বলল – বউদি কার ফোন থেকে ফোন করেছিলে ওটা তো তোমার নাম্বার না ।
— ওটা আমারি পুরনো ফোন ।আমার ফোনটা তো খুঁজেই পাচ্ছি না ।
— ও ।দ্যাখ কোথায় রেখেছ । ও মাসিমা এই নাও তোমার ফোন দোকান বন্ধ হয়ে গেছিল তাই দিতে পারিনি ।
সুভদ্রা দেবী দিশার নান্বারে ফোন করল দিশার খাটের নিচ থেকে ফোনের রিং শোনা গেল । রাগিনি এসেই ওটা রেখে দিয়েছিল । দিশা ফোনটা নিতে গেল রাগিনি সুভদ্রা দেবীকে ইশারা করল , “ ওয়েল ডান ” পরের দিন রাগিনি আবার মার আসুস্থতার কারন দেখিয়ে বাড়ি যেতে চাইল । দিশার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না কিন্তু সুভদ্রা দেবী আপত্তি করল না বলে সেও চুপ করে রইল । এবার রাগিনি , হরি মাধব বাবু আর অমরেশ বাবু তিনজনে নিজেদের জোগাড় করা সুত্র গুলি নিয়ে আলোচনায় বসলেন । হরিমাধববাবুর দ্বায়িত্বে ছিল সুজয়ের বাইরের জীবনযাত্রা । চম্পার সম্বন্ধে খোঁজ নেওয়া আর দিশার বিয়ের আগের জীবন সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া । প্রথমটিতে কোনোরকম অসামঞ্জস্যতা চোখে পরেনি তাঁর । এক কথায় সকলের কাছ থেকে যা জানা যায় তাতে করে বোঝা যায় সুজয়ের সঙ্গে সকলের সম্পর্ক বেশ ভালই ছিল । কোন বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কও সুজয়ের ছিল না । দ্বিতীয়টি হল চম্পা ।মেয়েটি এমনি ভালো তবে ওর স্বামী খুনের আসামি তিন বছর হল জেলে । বৃদ্ধা শাশুড়িকে আর পাঁচবছরের ছেলেকে নিয়ে থাকে । শেষ থাকল দিশা । দিশার সম্পর্কে জানা যায় ছোট বেলা থেকেই ও ছিল উচ্চাভিলাষী । মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হলেও জামা কাপড় পড়ত সবসময় দামী । উচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে– মেয়েদের সঙ্গে ছিল ওঠা বসা । অভিনেত্রী হবার ইচ্ছা ছিল । অমরেশ বাবু দিশার নাম্বারের ডিটেলস নিয়ে এসেছেন । রাগিনি কল লিস্টটা ভালো করে দেখতে লাগল । রাগিনি খেয়াল করল অনেক নাম্বারে ফোন হলেও একটা নাম্বারে সুজয়ের মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকে অনেক বার ফোন হয়েছে । এবং সুজ্যের মৃত্যুর পর দুদিন পর্যন্ত ও এই নাম্বারে ফোন হয়েছে কিন্তু তারপর থেকে আর হয়নি । নাম্বারটি কার আর তাঁর ঠিকানাটা অমরেশ বাবু বের করে দিলেন । রাগিনি ওই ঠিকানায় কে থাকে খোঁজ করতে যেতে চাইল । যাবার সময় হরিমাধববাবুকে বলল , “ বাবা থেকে ল্যাব থেকে টেস্টের রিপোর্ট গুলো আন ।আজ কিছু জিনিসের রিপোর্ট দেবে বলেছিল ।”
রাগিনি সেলস ম্যানের বেশ ধরে বাড়িটিতে যায় । ট্যাক্সি থেকে নেমে কিছুতা এগিয়ে গিয়ে দেখল একটা বড় লোহার দরজা ঠিক মাঝখান বরাবর কংক্রিকেটের বাঁধান রাস্তা । দু পাশে সাজান বাগান । কত রকমের গাছ । রাস্তাটি গিয়ে থেকেছে বাড়িটির গ্রিল বারান্দায় । কলিং বেল বাজাতেই একজন ভদ্রমহিলা বাইরে এলেন । রাগিনি তাঁর কাছে জিনিস বিক্রি করতে চাইলে তিনি তো কিছুতেই রাজি হলেন না । অগত্যা ফিরে যাবার সময় রাগিনি ওনার কাছে এক গ্লাস জল চাইল । জল খেতে খেতে রাগিনি ওনার বাগানের খুব প্রশংসা করতে থাকে । তখন কথায় কথায় রাগিনি তাঁর সম্বন্ধে কিছু তথ্য জেনে নেয় । রাগিনি বাড়ি ফিরে আসে অমরেশ বাবু ওহরিমাধববাবু ওর জন্য অপেক্ষা করছিলেন ।টেস্ট রিপোর্ট গুলো দেখে রাগিনির সব দুয়ে দুয়ে চার হয়ে গেল ।তবু ও একটা বিষয় নিয়ে একটু পড়াশুনা করে নিতে চাইল । রাগিনি তার ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল আর টেস্টের রিপোর্ট গুলো দেখতে থাকল । ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে হাঁসি হাঁসি মুখে বলল, “ বাবা আমি পেরেছি। আঙ্কেল তুমি কাল দশটা নাগাদ সুজয়বাবুর বাড়ীতে চলে এস ।” অমরেশ বাবু বললেন, “ কি হয়েছে বলবি তো। মাধব দেখেছিস এই পুচকে গোয়েন্দা কেমন হাসতে হাসতে চলে গেল কিচ্ছু বলল না । ” রাগিনি দরজা দিয়ে বেরতে বেরতে চিৎকার করে বলল , “ তোমরা আমার উপর ভরসা রাখ কাল সব জানতে পারবে ।”
সুজয়ের মারা যাওয়া দশ দিন হয়ে গেল । সুভদ্রা দেবী দুদিন ধরে রাগিনিকে বলেচলেছেন ছেলের কাজের দিন চলে এল ।আর কত দিন লাগবে । আজ রাগিনি ফিরে এসে বলল, “মাসিমা আমার কাজ শেষ ।”
— মানে ? কি হয়েছিল আমার ছেলের ?
— খুন ।
— খুন ? কে ? কে করেছে ?
— এক কাপ চা ।
— মানে ? চা কি ভাবে খুন করল ?
— সব জানতে পারবেন কাল সকালটা হতে দিন ।
সারা রাত সুভদ্রা দেবীর ঘুম আসে না ।রাগিনি রাত জেগে পরের দিনের হোম ওয়ার্ক টা সেরে নিল ।
পরের দিন সকাল দশটা অমরেশ বাবু দুজন মহিলা আর দুজন পুরুষ কনস্টেবল নিয়ে হাজির । এসে বললেন , “ মিসেস দিশা সিংহ ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট ।”
— মানে ? কে আপনি ?
— আমি এস পি অমরেশ ঘোষ ।
— আপনার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে দেখে নিন ।
— এসবের অর্থ কি আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ।
— মানেটা আমি তোমায় বুঝিয়ে বলছি । প্রথমে আমার আসল পরিচয়টা তোমায় দেই ।আমি গোয়েন্দা রাগিনি সেন । ডঃ হরি মাধব সেনের মেয়ে।
— ও তাই বুঝি তুমি সারাক্ষন বাড়ীর এদিক ওদিক দেখে বেড়াতে ? তা তুমি গোয়েন্দা ভালো কথা এনারা আমাকে অ্যারেস্ট করতে চাইছেন কেন ? কি করেছি আমি ।
— তুমি কি করেছ তা তুমি খুব ভালো করেই জান । তবুও তুমি যদি আমার মুখ থেকে শুনতে চাও তাহলে শোন । তুমি ঠাণ্ডা মাথায় সুজয় বাবুকে খুন করেছ ।
— কি যা তা বলছ ? আমি খুন করব সুজয়কে ? তুমি জান না আমরা দুজন দুজনকে কতটা ভালবাসতাম । ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আমরা ।
— হ্যাঁ জানি । ভালোবেসে সুজয় বাবু তোমায় বিয়ে করেছিলেন , তুমি নয় । তুমি করেছিলে লোভে । তুমি জানতে সুজয়বাবু অত বড় রিয়াল এস্টেটের এক মাত্র ওয়ারিশ ।সুভদ্রা দেবী ও দূর্জয়বাবুর অবর্তমানে তুমিই হবে ওই সম্পত্তির মালকিন । বিয়ের আগে থেকেই সেই ছক তোমার কষা ছিল । তাই তোমার আর সুজয়বাবুর প্রেমটা এতটা খোলামেলা ছিল ।আসলে ওটা ছিল তোমার নিজের স্বপক্ষে সাক্ষি জোগারের একটা কৌশল । না হলে কেউ কাজের মেয়ে বা কোলিগদের সামনে স্বামির সঙ্গে এতটা অন্তরঙ্গ হতে পারে না । তুমি জানতে এতে করে কেউ বিস্বাসই করবে না যে তুমি এমনটা করতে পার । এটা ছিল আমার প্রথম খটকা । আমার দ্বিতীয় খটকা টা হল দুর্জয় বাবু আর সুভদ্রাদেবীর সব সম্পত্তি বিক্রি করে তোমাদের কাছে নিয়ে আসার জন্য সুজয় বাবুকে চাপ সৃষ্টি করা । আর সুজয়বাবু রাজি না হওয়ায় তোমার ওই রকম রেগে যাওয়া । এমনি তে তো তুমি রাগ করতে না অথচ এই ব্যাপারে তুমি এত রেগে গেলে ? আমার তৃতীয় খটকা এবার অবশ্য আমার সন্দেহ হয় চম্পাকেও হঠাৎ শ্বাসকষ্ট মানে শরীরে এমন কিছুর প্রবেশ যা থেকে মৃত্যু হতে পারে মানে খাবারের সাথে বিষাক্ত কিছু মেশান হতে পারে । আমি চম্পাকেও চোখে চোখে রাখি । কিন্তু ওর আচরনে কোন আস্বাভাবিকতা চোখে পরে না ।আমার এর পরে খটকাটা লাগে যে দিন চম্পা সুজয়বাবুর চা পাতা দিয়ে চা করতে চাইল সেদিন সবার অলোক্ষে তুমি চা পাতাগুল ডাস্টবিনে ফেলে দিলে । আমি কাপটা আর চা পাতাগুল ল্যাব টেস্টের জন্য পাঠাই । আমার ধারনা ছিল ধাতুতে বিষাক্ত কিছু লাগলে একটু হয়তো বিক্রিয়া হবেই তা যত সামান্য হোক ল্যাবে ধরা পরবেই ।কিন্তু শুধু এই ধারনার উপর ভর করে বসে থাকা যায় না ।তবে তুমি যদি চা পাতাগুলো না ফেলতে তা হলে ওটা নিয়ে আমার হয়তো কক্ষনো সন্দেহই হতো না । তোমার ঘরটা সার্চ করা দরকার ছিল এদিকে তোমার ঘরে ঢোকা তুমি পছন্দ করতে না তাই তুমি যখন ঘুমচ্ছিলে আমি সুভদ্রা দেবীকে নিয়ে তোমার ঘরে যাই কিন্তু সন্দেহ জনক কিছু চোখে পরে না ।বেড়িয়ে আসার সময় তোমার পুরন সেল ফোনটা আমার চোখে পরে ।ফোনটা চার্জে বসান ছিল মানে ওটা ব্যাবহার হয় ।অথচ ওই নাম্বারটা কারো কাছে নেই । তখন আমি প্রায় নিশ্চিত যদি তুমি সুজয়বাবুকে খুন করে থাক তবে এটাই হবে আমার ব্রহ্মাস্ত্র । সেদিন রাতে সুভদ্রাদেবীর অভিনয় তুমি বুঝতে না পেড়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তোমার ওই ফোন থেকে আমায় ফোন করলে ।আর আমার ব্রহ্মাস্ত্র আমার হাতে দিয়ে দিলে । কল লিস্ট দেখে আমি সুমনাদেবীর বাড়ি যাই । সুমনা দেবীকে তুমি নিশ্চই অস্বিকার করতে পারবে না সুজয়বাবুর মারা যাবার কয়েকদিন আগে থেকে সুজয়বাবু মারা যাবার পর দুদিন পর্যন্ত তোমাদের যোগাযোগ ছিল । ওনার বাড়ীতে গিয়ে জানতে পারলাম উনি বোটানির স্টুডেন্ট ছিলেন । তাই জন্য ওনার বাড়ীতে অনেক রকমের গাছ । বোঝা যায় গাছপালার প্রতি তাঁর অগাধ জ্ঞান আর ভালোবাসা । কিন্তু শিক্ষাকে কেউ খারাপ কাজে লাগালে তার ফল হয় মারাত্মক । বাড়ি ফিরে এসে দেখলাম ল্যাবের রিপোর্ট এসে গেছে আমার সন্দেহই ঠিক চা পাতার মধ্যে বিষাক্ত কিছু পাওয়া গেছে যার নাম ‘ওলিয়ান্ডারিন’ । যা সরাসরি ফুসফুসে গিয়ে আঘাত করে শ্বাসকষ্ট সুরু হয় এবং হৃদযন্ত্রকে বিকল করে দেয় । আমি নেটে ওলিয়েন্ডারিনের উৎস খুঁজে বের করি । দেখলাম এই বিষ পাওয়া যায় করবী ফুলের গাছ থেকে । আমার হিসাব মিলে যায় । সুমনাদেবীর বাড়ীতে আমি এই গাছ দেখেছি অনেকগুল লাল ,সাদা ,গোলাপি সব গাছে ভর্তি ফুল ছিল । একমাত্র তাদের পক্ষেই এটা জানা সম্ভব জারা এসব নিয়ে পড়াশুনা করেছেন যে এই গাছটির সর্বাঙ্গই বিষাক্ত ।ছাল , পাতা ,বিজ সব । আই গাছ প্রায় সবার বাড়িতেই দেখা যায় কিন্তু সবাই এর ফুলের সৌন্দর্যই দেখে বিষের খবর বেশিরভাগ লোকই জানে না । ওলিয়েন্ডার বা করবী দেখতে সুন্দর হলেও এর একটি পাতা খেলে একটি শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে আর বেশি খেলে প্রাপ্ত বয়স্ক লোকও মারা যেতে পারে শ্বাসকষ্টে ।২০০২ সালে অ্যামেরিকায় ৮৪৭ টি বিষ ক্রিয়া দেখা যায় এই বিষ থেকে । ঘাসে মেশা করবী পাতা খেয়ে গবাদি পশুদের মৃত্যু হয় । ওই চাপাতার স্যাম্পেলে যতটা মাত্রায় ওলিয়েন্ডারিন পাওয়া যায় তা এক জন মানুষের মৃত্যুর পক্ষে যথেষ্ট । এবং হয়েছেও তাই। সন্ধে বেলা চম্পা যখন সুজয় বাবু কে চা দেবে। তখন তুমি আসল চা টা ফেলে দিয়ে কিছুটা চা পাতার সঙ্গে ক্ররবী গাছের পাতার গুড় মিশিয়ে দিয়েছিলে। এবং ওই চা খেয়ে কিচ্ছুক্ষন পর সুজয় বাবুর প্রজন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং পরে ওনার হৃদপিণ্ডটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। এবার আমার একটা জিনিশ মাথায় ধুকছে না সুমনা দেবী তোমাকে এই কাজ করতে সাহায্য করল কেন ? আমি যদি খুব ভুল না করি, সেটাও হয়ত টাকার লোভে, তাই না ?
— হ্যাঁ। সুমনা আমার সঙ্গে কলেজে পড়ত। পড়াশোনায় ভাল ছিল কিন্তু চাকরি পায়নি। একদিন কথায় কথায় ওকে সব বলি। ও আমায় সাহায্য করবে বলে। আমি জানতাম এত বড় রিয়াল এস্টেটের মালকিন হব আমি। তাই ওকে ১ কোটি টাকার অফার দিই। ও রাজি হয়ে যায়। আর দুজনে মিলে কাজ টা করে ফেলি।


পাশের চেয়ারে বসে সুভদ্রাদেবী হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন। বলেন “ওরে তোর টাকার দরকার ছিল বলতেই তো পারতিস। আমার ছেলেটাকে মেরে ফেললি কেন ? ওকে যখন তুই ভালইবাসতিস না তাহলে ওকে ছেড়ে দিয়ে টাকা নিয়ে চলে যেতে পারতিস।” ততক্ষণে দূর্জয় বাবু আর শ্যামসুন্দর চলে এসেছে। রাগিনি সকালেই ওনাদের আসতে বলেছিল। সুভদ্রাদেবী দুর্জয় বাবু কে জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন আর বললেন, “ভাবতে পারছিনা এক কাপ চা আমার ছেলে টা কে শেষ করে দিল।” দিশা একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পরল। সুমনাকেও পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে এল। দিশা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করল।


দুর্জয় বাবু রাগিনি কে ৫ লক্ষ টাকার চেক দিলেন। ওনাদের মনের অবস্থা দেখে রাগিনির টাকা টা নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু সুভদ্রাদেবী বললেন, “ তোমার জন্য আমার ছেলের খুনিরা শাস্তি পাবে। আমি এবার নিশ্চিন্তে ছেলের কাজ করব। ওরা শাস্তি না পেলে আমার বাবুর আত্মার শান্তি হত না। আর কাজ করেও কোন লাভ হত না। এটা আমাদের আশীর্বাদ স্বরুপ তুমি গ্রহন করো মা।” রাগিনি চেক টা হাতে নিল। হরিমাধব বাবু মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, “ এই ভাবেই মন দিয়ে কাজ করে যাও।”



বর্ণালি বসাক বোস

বর্ণালি বসাক বোস একজন পুরপুরি গৃহবধূ । রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মাষ্টার ডিগ্রি করেছেন বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে । ছাত্রজীবন থেকেই লিখতে ভালোবাসেন । স্বামীর উতসাহে, ছেলের উদ্দীপনায় ও ভাগ্নির আব্দারে আবার লেখার জীবনে ফিরে আশা । সংসারের কাজের ফাঁকে গান আর লেখা তার সঙ্গী । সমাজের চারিপাশের বিভিন্ন রকম চরিত্র যেটা তার মনকে নাড়া দেয়, তাই নিয়েই তিনি লিখতে ভালোবাসেন । এসবের পাশাপাশি সংসারের সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন । এতদিন স্বামীই ছিলেন তার লেখার একমাত্র পাঠক তারই অনুপ্রেরণায় আজ এই লেখা সকলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য প্রকাশিত । বাবা, মা এবং শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদকে ও ছোট বোনের ভালোবাসাকে জীবনের পাথেয় করে চলতে চান ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।