মৃত্যুর জন্য একটি লেখা

দীপ শেখর চক্রবর্তী on

একটি উদ্দেশ্যহীন পথ কতদূর যেতে পারে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর যতদিন পাবো না ততদিন আমার এই অস্তিত্বের কোন মানে পাইনা।

সেলুনটার সামনে জলের কল দিয়ে অফুরন্ত প্রবাহ। গ্রীষ্মের দিনে পিচের রাস্তায় আড়াআড়ি তাকালে একরকম মরীচিকা দেখতে পাওয়া যায়। সকলের মতো প্রতিদিন এই শরীর ও মনের বয়স বাড়েনি আমার। সেলুনের শাদা জোব্বাটি গায়ে দিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে বসি। কানের সামনে যন্ত্রের মতো কাচি চলছে, মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে আমার বয়স। রেডিওতে বেজে চলেছে দুপুর দেড়টার গান, পুনঃপ্রচার, কেমন অদ্ভুত মায়ার সুরে। চোখ খুলে দেখি আয়নার ভেতর দিয়ে আরও আয়না এবং আরও গভীরতর আমি। এই শাদা রঙের জোব্বাটি আমাকে এগিয়ে দেয়নি নাপিত বরং এই আমার পিতার দান। পিতাকে জন্মসূত্রে এই পোশাক দিয়েছেন তার পিতা।

শাদা জোব্বাটির বাইরে ফুলের গন্ধ, ভেতরে সর্বদা চিতা প্রস্তুত আছে।

জীবন সহজকে সহজের পথে নিয়ে যায়, কঠিনকে কঠিনের পথে ঘুরিয়ে মারে। পরস্পর পরস্পরের প্রতি ঈর্ষান্বিত। দীঘিটির শেষ ধাপে বসে ভাবি এমন অনন্তের কথা। মনে হয় প্রত্যেক মানুষের একটি বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন, তা যত অন্ধই হোক না কেন। বিশ্বাসহীন মানুষের মতো অভিশপ্ত কিছুই তেমন নেই। গোটা জীবন সাঁতার না জেনে জলে জলেই কেটে গেলো। দীঘিটি যেন বিরাট এক উল্টোনো কচ্ছপের মতো শুয়ে আছে। ওর নিঃশ্বাস প্রশ্বাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার পা। একদিন মৃত্যু এসে নিয়ে যাবে ডেকে এই সিঁড়ির ধাপ থেকে। আরও কতবছর রয়ে যাবে কচ্ছপটি জানা হবেনা। কতদূর যাবো?মৃত্যুর অর্থহীনতা জীবনের থেকেও বেশি আমাকে ভীত করে রেখেছে সেই কোন শৈশব থেকে।

মৃত্যু একবার ছিনিয়ে নিয়ে গেলেই আমি অর্থহীন, একা। একটি বিরাট অন্ধকার পথ হেঁটেই চলেছি, হেঁটেই চলেছি, কোন আলোর দেখা নেই। কোন ডাক নেই এমন যা আমাকে ফিরিয়ে আনতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার জন্য মায়ের ডাক যেমন। শৈশব থেকেই আমি দুটো চোখ বন্ধ করে অভ্যেস করি কবরের ভেতর শুয়ে থাকা। চেতনাহীনতার এক বোধ আমাকে আড়ষ্ট করে রাখে।

মৃত্যুর অর্থহীনতাকে মনে মনে প্রবল সমীহ কি করিনি। তাই অন্ধকারকে ভালোবেসেছি। মনোরঞ্জন সমিতির মাঠের এক কোণের হলুদ রঙের হ্যালোজনটির চারপাশে জমে থাকা অন্ধকারে তামাক খেতো তখন বেপাড়া যুবকের দল। সেই তামাক অন্ধকারের সঙ্গে পুড়ে মৃত্যুর আশ্চর্য এক গন্ধ দিয়ে গেছে আমাকে।

কত জায়গায় কতদিন অহেতুক বসে বসে আমি ভেবেছি মৃত্যুর কথা। মাখন সাহার পুকুরের থেকে একটু এগিয়ে বামহাতের ধানক্ষেতটা পার করলে যে ইট খোলার উঁচু জমিটা তার ওপরে একটা শিমুল গাছ আছে। গ্রীষ্মের দুপুরবেলা সেখানে একা একা বসে শুনতে শিখিনি কি স্তব্ধতার গান?

এই স্তব্ধতার গানটি আমার বুকের ভেতর কখন প্রবেশ করে ক্রমাগত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মতো বড় হচ্ছে। একি মৃত্যুর শব্দ?মাঝে মাঝে জীবন এসে এই স্তব্ধতার গানের পাশে কিছুক্ষণ বসে, তারপর উঠে চলে যায়। আরও আরও বড় হয়ে যায় বুকের ভেতরের সমস্তকিছুর দূরত্ব। সমস্ত বিশ্বাসের অন্ধকারের ওপর একেকদিন নেমে আসে এমন কোন গ্রহাণু ঠিক যেমন আঘাতে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছিল আদিম ডায়নোসরেরা। কোন শব্দ হয়না কারণ স্তব্ধতার গান বেজে চলেছে।

আমার কবরের ভেতরেও কি এমন স্তব্ধতার গান বেজে চলবে?

কাঠ চেরাইয়ের মিস্টি গন্ধটা কাজিপাড়া শ্মশানের রাস্তা দিয়ে গেলেই পাই। বিকেলের দিকে একেকদিন ঝড় এলে মন শান্ত হয়ে আসে। বৃষ্টি ভেজার বয়স আমার শরীর থেকে কেটে ফেলে দিয়েছে সাত টাকার নাপিত। রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে এখন দর্শক আসনে বসেছি, মাঝে মাঝে প্রশংসা করে চলেছি জীবনের আশ্চর্য নিষ্ঠুরতার। কি অপূর্ব নিষ্ঠুর। এক মুঠো বেশি নয়, এক মুঠো কম নয়, ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটাই নাটকের দৃশ্য।

তবে এই ঝড়বৃষ্টির পর সমস্ত আকাশ জুড়ে গোধূলি নামে। এ তো না পাওয়ার ভেতর থেকে পাওয়া। জীবনের চাবুক কে অতিক্রম করে এ যেন রঙ্গমঞ্চে কারও সামান্য বেশি অভিনয়, চোখের জল। মৃত্যুর রঙ কী গোধূলি?যে জীবন ঢলে পড়ছে অন্তিমশয্যায়, একি তার বিদায়বার্তা নয়?

বড় বাজারের ধারে সুটি নদীটি তার মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বুজে যাওয়া একটা খালের মতো বেঁচে থাকে, নামাজ পড়তে আসে মসজিদে নিয়ম করে। সন্ধের অন্ধকার ঘন হয়ে এলে মনে হয় আমরা বন্ধুরা সেই কোন শৈশবে এক লুকোচুরি খেলা শুরু করেছিলাম। নিজেদের লুকোনো, জয়ের কথা ভেবে বেছে নিয়েছিলাম এক একটি অন্ধকার কোণা। অথচ খেলাটির কোথায় শেষ তা লুকোনোর আগে কেউ পরামর্শ করে নেইনি, যার খুঁজতে আসার কথা ছিল সে হয়ত ভুলে গেছে আমাদের কথা। আগুয়ান সঙ্ঘের মাঠের পাশ দিয়ে খুঁজি তাকে, যার খুঁজতে আসার কথা ছিল একদিন, পরস্পরকে খুঁজি।

এভাবে আমাদের গোটা জীবন এক বৃহত্তর লুকোচুরি খেলায় পরিণত হয়। বন্ধুদের খুঁজে পাইনা। পেয়েছিলাম সেই মেয়েটিকে যে কৈশোরের সীমারেখায় একদিন আগুনের খেলা দেখাবে বলে ডেকে নিয়ে গেছিল। অথচ আগুনের খেলা দেখানো অতটা সহজ নয়, কারণ যে কোন মুহূর্তেই আগুন পোশাকে ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই হল

আমি দেখলাম উলটনো কচ্ছপটির মতো তার দুটি উন্মুক্ত বুক। তার গলার হাড় এখন স্তব্ধতার গানটি। তার কোমরের স্পর্শ যেন সেলুনের শাদা আলখাল্লার ভেতরের চিতা। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি আমার শৈশব থেকেই। তার কালচে গোলাপি রঙের গুহার ভেতর প্রবেশ করে নতুন করে অন্ধকারের রূপ চিনলাম। তবে কি মৃত্যুর রঙ কালচে গোলাপি?

গুহার বাইরে মশালটি রেখে এসেছিলাম। প্রবেশ করা মাত্রই অন্ধকার তাকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে। আবার বাইরে আসি, আবার প্রবেশ করি। এইভাবে মৃত্যুর অভ্যাস করি আমি।

নকশাল করা প্রেতেদের একটা দল গভীর রাতে বেরোয়। কালিকাপুরের আকাশ বাতাসে উড়ে বেড়ায় বীণা মাসি। বীণা মাসির কেউ ছিল না, শুধু একটা পোষা অন্ধ বেড়াল ছিল। রাতের বেলা পাঁচিল কাঁপিয়ে যখন সে পূর্বমুখী তখন আমাদের বাড়ির সামনের আগুনে পোড়া মেয়েটি মৃত্যুর ওপার থেকে এসে হারমোনিয়ামে গান তোলে।

বেসুরো সেই গানই হয়ত বাজে সেলুনের রেডিওতে, ভালো করে খেয়াল করলে হয়ত দেখবো আমার এই ধারণা ঠিকই। এদিকে শাদা আলখাল্লার ভেতরে চিতা জ্বলে, হাত দুটো সেই জোব্বার ভেতরে বেঁধে রেখে নাপিত কেটে ফেলে দিচ্ছে আমার সমস্ত বয়স। ধীরে ধীরে কুৎসিত হয়ে উঠছে আমার মুখ আর বিশ্রী দাঁতে হাসছে পেছনের পেছনের আয়নার সমস্ত আমি।

তবু মৃত্যুর প্রস্তুতি থেকে নিজেকে দূরে সরাইনা আমি। প্রতিদিন সেই মেয়েটিকে খুঁজে বের করি, মশালে আগুন জ্বালাই। আমি জানি অনন্ত এই প্রবেশ ও প্রস্থানের মধ্যে একদিন আগুনকে আমি নিয়ে যেতে পারবো গুহার ভেতরে।

এই বিশ্বাস আমাকে সহজ একটি পথ দেয়। যেমন মাঝে মাঝে সুস্পষ্ট দেখি একা একা বেজে চলেছে বাবার সাইকেলের পুরোনো ঘন্টি এবং সেই শব্দে আশ্চর্য ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে আমার আশেপাশের সমস্ত ভিড়।

ভিড় সরে গেলে বাবার সাইকেল আসবে একদিন। সামনের সিটে বসিয়ে নিয়ে যাবে জীবনের মানেহীন এক মানের কাছে। বাবার বুকের তাপ আমাকে আশ্রয় দেবে, মৃত্যুর অনিবার্যতা ও জীবনের অসহায়তার সমস্ত সীমারেখা পেরিয়ে যাবে আমাদের পুরোনো সাইকেলটি।



দীপ শেখর চক্রবর্তী

জন্ম বৈশাখের প্রথম দিন,শহরতলি। কর্ম,জন্ম ও মৃত্যু মাঝের সরলরেখাটিকে নিয়ে নিরন্তর বিপজ্জনক সব খেলা। স্বপ্ন,দিবা।গোত্র,পলায়নপর। প্রিয় রঙ গাঢ় নীল। প্রিয় ঋতু শীত ও নারীর বুকের গন্ধ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।